ঘুণ, ঘুণ পোকা, ঘুণাক্ষর, ঘুণ-ঘুনসি, বাংলা ঘুণ পণ্ডইতি ঘুণ

ইউসুফ খান

পণ্ডইতি
ইসকুলের বাচ্চারা বলে কাকস্য পরিবেদনা মানে কাকেরা পরীদের সঙ্গে বসে বেদানা খাচ্ছে। সুকুমার রায়ের পণ্ডিতমশাই বলেছিলেন ‘আই গো আপ উই গো ডাউন’ মানে, গোরুর চোখে জল কেন না উইপোকায় গোডাউন খেয়ে ফেলেছে। এই রকম শব্দ ধরে ধরে মানে করার পণ্ডিতি সব পণ্ডিতই করে থাকেন। গজভুক্ত কপিত্থবৎ কথাটার মানে নাকি হাতিতে খাওয়া কৎবেলের মতো, যেটা বেরোয় গোটা কিন্তু ভেতরে ফাঁকা। তেমনি পরমহংস মানে করা হয়— হাঁস যেমন দুধজল থেকে শুধু দুধটা ছেঁকে খেয়ে নিয় জলটা ফেলে দেয় তেমনি যিনি পরমহংস তিনি সংসারের সারটুকু নিয়ে অসারটা ফেলে দেন। দুটোই বাজে ব্যাখ্যা, কিন্তু বহুল প্রচলিত। হাতি কৎবেল খেলে গোটা বেরোয় না আর হাঁস দুধজল খেলে পুরোটাই খেয়ে ফেলবে। দুটো কথারই খুব সুন্দর ঠিকঠাক ব্যাখ্যা আছে। এখানে গজ মানে হাতি নয়, হংস মানে হাঁস নয়। এরকম উদাহরণ শয়ে শয়ে হয়। বাংলা ইডিআম ‘ঘুণাক্ষরেও টের না পাওয়া’ কথাটা তৈরি হয়েছে এইরকম একটা ভুল বোঝা থেকে। 
 
মজ্জায় ঘুণ
বাংলার সব ডিকশনারিতে ‘ঘুণাক্ষরে টের পাওয়া’ কথাটার মানে দিয়েছে এরকম— কাঠ বা বাঁশে ঘুণে কাটা দাগ যা কোনও অক্ষরের মতো হয় তা থেকে কোনও গূঢ় ইঙ্গিত আভাস মেসেজ পড়ে পড়ে ফেলা। কথা হচ্ছে ঘুণপোকা কাঠ বা বাঁশের ভেতরে ভেতরে কাটে। সেটা বাইরে থেকে থেকে দেখা যায় না। কাঠ বা বাঁশকে না ফাটালে ভেতরে ঝাঁঝরা করছে না ফোঁপরা করছে না অক্ষর লেখালিখি করছে তা বোঝার উপায় নেই। বাইরে থেকে কয়েকটা ফুটোর মুখ দেখা যেতে পারে মাত্র। সেগুলো কোনও অক্ষরের মতো না, জাস্ট একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ফুটোর মুখ। কাঠে একটা সোনামুখী ছুঁচ ফোটালে যেমন হয়। তাই ঘুণাক্ষরে টের পাওয়া মানে ঘুণে-কাটা লেখা পড়ে মেসেজ পাওয়া, এরকম কোনও কথা হতে পারে না। যে মেসেজ দেখাই যাচ্ছে না তা পড়ব কী করে!
 
সমাজের মজ্জায় মজ্জায় ঘুণ ধরে গেছে কথাটার মধ্যে এই অন্তরে ভেতরে ব্যাপারটা বোঝানো আছে। বলতে চাওয়া হচ্ছে বাইরে দেখতে পাচ্ছো না বটে তবে সমাজ ভেতরে ভেতরে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। ঘুণপোকার মতো গায়েবিভাবে সমাজকে ফোঁপরা করে দিচ্ছে ভেতরে ভেতরে। ভেতরে মানেতে আরও একটা কথা আছে— কেউ কোনও কিছুর গভীরে ঢুকতে পেরেছে মানে ‘লোকটা এই কাজে ঘুণ হয়ে গেছে। ’অমুক-পণ্ডিত ন্যায় শাস্ত্রে ঘুণ’। আলালের ঘরে দুলালে আছে— ‘সে লোকটা সদাগরি কর্ম্মে ঘুণ’। বিভূতিভূষণ লিখেছেন – ‘আমি ও কাজে ঘুণ হয়ে গেছি’।
 
 
আউন্স পাউন্ডস
সাহেবদের ডাক্তারি মাপ ছিলো আউন্স। তার আবার ভগ্নাংশ তস্য ভগ্নাংশ ছিল। ২০ গ্রেনে এক স্ক্রুপ্‌ল, ৩ স্ক্রুপলে এক ড্রাম, ৮ ড্রামে এক আউন্স, ১২ আউন্সে এক পাউণ্ড। মানে এক স্ক্রুপ্‌ল খুউব সামান্য পরিমাণ। তাই সাহেবরা যখন বলতে চায় লোকটার মধ্যে বিবেক হিচকিচানির কোনও ছিটেফোঁটা নেই, the man has no scruples of conscience, তখন তারা বলে the man has no scruples. সামান্যতম বোঝাতে স্ক্রুপ্‌ল।
 
 
কড়া ও ঘুণ
বাংলায় পয়সার সঙ্গে যখন কড়া কড়ি চলতো, তখন কড়ি নিজেই খুব ক্ষুদ্র মুদ্রা ছিল। সে যুগেই এক পয়সায় ১০০ কড়ি পাওয়া যেত। কিন্তু সেই কড়িরও আবার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভগ্নাংশ হিসেব ছিল।
২০ বিন্দুতে এক ঘুণ
১৬ ঘুণে এক তিল
২০ তিলে এক কাক
৪ কাকে এক কড়া।
মানে ১২৮০ ঘুণে এক কড়া। কড়ি আবার কড়ার চেয়ে ছোটো।
কড়াকড়ির এই হিসেবটা ছিলো গোনাগুনতির পরিমাণ। এগুলোকেই আবার সাইজের ছোটো মাপ হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। আমাদের কড়ি আঙুল যেমন মোটা তেমনি মোটা বা চওড়া হচ্ছে এক কড়ি পরিমাণ। এই এক কড়ির ১২৮০ ভাগের একভাগ মানে এক মিলিকড়ির চেয়েও ছোটো। মোটকথা আকারে খুব ছোট্ট ইংরেজেতে মাইক্রো ন্যানো বোঝাতে বাংলা কথাটা ছিলো এক ঘুণ। তিল তিল করে গড়া যে তিলোত্তমা সেখানেও তিল বলতে খুব কম পরিমাণকে বোঝানো হয়েছে। যারা তিলের দানা দেখেছেন তারা বুঝবেন এক তিলের ১৬ ভাগের এক ভাগ মানে এক ঘুণ হলে সেটা কত ছোটো।
 
 
ঘুণি ঘুণসি
মাছ ধরার ফাঁদ নানা রকম হয়। তার মধ্যে কিছু হয় বাঁশ চিরে সরু সরু কাঠি বানিয়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে সরু কাঠিগুলোকে বলে ঘুণিকাঠি, প্রায় ঝাঁটাকাঠির মতো সরু। ঘুণিকাঠি দিয়ে বানানো ফাঁদকে বলে ঘুণি-আটল বা শুধুই ঘুণি। পুরনো অভিধানে শব্দটির বানান আছে ‘ঘুণী’। এখন লোকে না বুঝে ঘুনি লেখে। মাদুলি বা চাবি যে সরু সুতোয় গলিয়ে ঝোলানো হয় তাকে বলে ঘুণসি ঘুনসি। এখানে সরু মানে এই সুতো ঘুণসি।
 
 
ঘুণ পোকা
যে পোকা সাইজে ঘুণ, মানে ছোটো সে ঘুণপোকা বা শুধুই ঘুণ। তাই হিন্দিতে কাঠের পোকা গমের পোকা চালের পোকা এমনকি সবজির পোকাকেও বলে ঘুণ। সংস্কৃতে বইপোকা অর্থাৎ তালপাতার পুঁথি কাটে যে পোকা তাকেও বলে ঘুণ। এর মানে সব ছোটো পোক ঘুণ বা ঘুন পোক।  সেখানে বাংলায় শুধুই কাঠ আর বাঁশ গুঁড়ো করা পোকাকে বলে ঘুণ। এরা কাঠ বা বাঁশের মজ্জায় ঢুকে কুরে কুরে খেয়ে কাঠ-বাঁশকে ধুলোর মতো বেসনের মতো গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেয়। কিন্তু বইপোকা বইপত্রকে খেয়ে ঝরঝরে করে দেয়, ধুলো করে দেয় না। বাংলায় ঘুণের বৃহদর্থ ছোটো-কে সরিয়ে বিশিষ্টার্থ কাঠকাটা পোকা অর্থ ধারণ করেছে।
 
ঘুণাক্ষর ন্যায়
সংস্কৃতে ন্যায় মানে যুক্তি লজিক জাস্টিস ম্যাক্সিম। একদা বাঙালি ন্যায়শাস্ত্র যুক্তিশাস্ত্র তর্কশাস্ত্র লজিক পড়েছে সংস্কৃতে। সেখানে কাকতালীয়-ন্যায় ঘুণাক্ষর-ন্যায় নামে শতেক ন্যায় আছে। তালটা পেকেই ছিলো তাই এমনিতেই পড়ত, কাকটা বসল তাই তালটা পড়ল, এরকম বলে কাকের দোষ ধরাটা ঠিক নয়। কাকটাকে ন্যায়বিচার দাও। এই হলো কাক ও তাল টাইপের যুক্তি, কাকতালীয়-ন্যায়।
তালপাতার পুঁথিতে যা লেখা ছিল তা ভালো ভেবেই লেখা ছিল, কিন্তু পোকায় এমনভাবে কেটেছে যেন মনে হচ্ছে কাটাগুলো কোনও অক্ষর, তার ফলে যে মানে আগে ছিল না, নতুন কোনও উটকো অবাঞ্ছিত আনফোরসিন মানে তৈরি হয়েছে। যেমন, হয়তো ছিলো – ‘কবিবর চমৎকার লিখিয়াছেন’, পোকায় কেটে হয়ে গেছে ‘কবিবরাহ চুমুৎকার লিখিয়াছেন।’
যা হবে ভাবিনি কিন্তু হঠাৎ করে হয়ে গেছে বা হয়ে যেতে পারে, যেমনটা পুঁথির বাক্যে এতদিন ছিল না, ঘুণে কাটা অক্ষরে হঠাৎ করে হয়ে গেছে – এইরকম আশ্চর্য ঘটনা দৈবাৎ ঘটতেই পারে। সে ঘটনা ভালো হোক বা মন্দ হোক। ন্যায়বিচারে এরকম যুক্তি তর্কের স্থান হওয়া উচিৎ। ন্যায়শাস্ত্রে এই হলো ঘুণ ও অক্ষরের যুক্তি, ঘুণাক্ষর-ন্যায়।
 
 
বাংলা ঘুণাক্ষর
মগধ মিথিলার ছায়া থেকে বেরিয়ে বাঙালির এই তার্কিক ন্যায়বোধ উবে গেছে। আড়বুঝো বাঙালি ন্যায় মানে বুঝেছে ‘মতো’। আর ঘুণ মানে বাঙালি শুধুই কাঠকাটা পোকা করে নিয়েছে বলে ঘুণাক্ষর যে পুঁথির পাতাখোর পোকা সেটা আর ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। কাঠে ঘুণের কাটা দাগ বাইরে থেকে দেখা না গেলেও জোর করে এর একটা মানে দাঁড় করিয়েছে। তাই ঘুণাক্ষর মানে যে ‘হঠাৎ হওয়া বাঞ্ছিত বা অবাঞ্ছিত উটকো আশ্চর্য ঘটনা’ সেটা ভুলে গিয়ে বাঙালি আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নতুন মানে দাঁড় করিয়েছে – ‘কাঠ কেটে ঘুণ যে অক্ষর তৈরি করে সেটা পড়ে কিছু গোপন কথা বুঝতে পারা’। ঘুণপোকা দিয়ে ফোক এটিমোলজি তৈরির এই যুক্তিকে তাই বলা যেতে পারে পোক এন্টিমোলজিক।
লিংক: https://draminbd.com/ঘুণ-ঘুণ-পোকা-ঘুণাক্ষর-ঘুণ/
 
 
 
 
 
error: Content is protected !!