ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল

 . মোহাম্মদ আমীন

ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল

“ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল,
কিছু দূর গিয়া মর্দ রওনা হইল।
ছয় মাসের পথ মর্দ ছয় দিনে গেল!
লাখে লাখে সৈন্য মরে কাতারে কাতার,
শুমার করিয়া দেখি পঞ্চাশ হাজার।”

মধ্যযুগে লিখিত চরণগুলো, বিশেষ করে প্রথম পঙ্‌ক্তির অর্থ নিয়ে নানা আলোচনা হয়। অনেকে মনে করেন সাংঘর্ষিক। তাদের যুক্তি, ঘোড়ায় চড়িয়া একজন মরদ কীভাবে ‘হাঁটিয়া’ গেল।

কবিতায় বর্ণিত মর্দ বা মরদ ফারসি শব্দ। আভিধানিক অর্থ পুরুষ, পতি, যুবক, বীর, পুরষোচিত গুণসম্পন্ন, পুরুষজাতীয় প্রভৃতি। প্রাচীন বাংলা কাব্যে শব্দটি

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

মূলত বীর ও পুরুষোচিত গুণসম্পন্ন মানুষ প্রকাশে ব্যবহৃত হতো। এই বীর যে কেবল পুরুষ হবে তা ঠিক না। তবে অধিকাংশ বীর ও ঘোড়সওয়ার পুরুষ ছিল। তাই মর্দ ও পুরুষ শব্দ অনেকটা সমার্থক হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের কাব্যিক বর্ণনায় মর্দ শব্দটি বীর প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হতো। এখানেও সেটি করা হয়েছে। অতএব কবিতায় ব্যবহৃত মর্দ ছিলেন একজন বীর।

বলা হয় কবিতাটি নোয়াখালী-সন্দ্বীপ-হাতিয়া (Hatiya) এলাকার কোনো কবির লেখা (?)। ‘হাতিয়া’ নামকরণ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হাঁটিয়া হতে হাটিয়া বা হাতিয়া নামের উদ্ভব। মধ্যযুগে এটি হাঁটিয়া নামে পরিচিত ছিল। হাতিয়া দ্বীপে সাধারণ লোকদের হাঁটিয়া হাঁটিয়া স্থানান্তর করতে হতো। তাই এর নাম হয় হাঁটিয়া, তা থেকে হাটিয়া এবং পরবর্তীকালে হাতিয়া।এই বিষয়ে আরো জানতে চাইলে পড়তে পারেন “তিলোত্তমা হাতিয়া ইতিহাস ও ঐতিহ্য”।বীরের পক্ষে ঘোড়ায় চড়ে ছয় মাসের পথ ছয় দিনে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। তখন হাতিয়া ও সন্দ্বীপের মধ্যে জল দূরত্ব এত কম ছিল যে, ঘোড়া লাফ দিয়ে পার হতে পারত। কিন্তু সাধারণ জনগণের কাছে ছিল অনেক দূরের পথ। দুই দ্বীপের মধ্যে প্রভাব নিয়ে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। যুদ্ধের বর্ণনা করতে গিয়ে সন্দ্বীপের(?) কবি লিখেছেন, “ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া (হাটিয়া) চলিল”। মানে বীর ঘোড়ায় চড়ে হাতিয়া গেল। অনেকে বলেনে হাঁটিয়া কীভাবে নাম হয়? সহজ উত্তর লাল মিয়া যেভাবে হয়, চান মিয়া যেভাবে হয়। ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজধানী রাঁচিতেও ‘হাঁটিয়া’ নামের একটি জায়গা আছে।

আবার অনেকে বলেন, “ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল” পঙ্‌ক্তির ‘হাঁটিয়া’ শব্দটি প্রকৃতপক্ষে ‘হাঁকিয়া’ চলা। শুবাচি নজরুল ইসলামের ভাষায়, “পুঁথিটি পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল ছোটবেলায়। সেখানে লেখা ছিল, ”ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁকিয়া চলিল।’ কে বা কারা হাঁকিয়া শব্দটিকে বিকৃত করে হাঁটিয়া করেছিল জানি না।” তবে তিনি পুথিটির রচয়িতা এবং পুথির নাম বলতে পারেননি। ‘হাঁটিয়া’ শব্দকে ‘হাঁকিয়া’ ধরলে পঙ্‌ক্তিটির অর্থ হয়, বীর ঘোড়ায় চড়ে হেঁকে চলল। দ্রুত চলা প্রকাশে একসময় হাঁটিয়া শব্দের ব্যবহার ছিল। শুবাচি আলী সাহেবের মতে, ‘হাঁটিয়া’ অর্থ দ্রুত চলা। কোনো কোনো অঞ্চলে এখনও দ্রুত চলা প্রকাশে ‘হাঁটিয়া’ শব্দটির প্রয়োগ দেখা যায়। সে হিসেবে “ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল” পঙ্‌ক্তির অর্থ, বীর ঘোড়ায় চড়ে দ্রুত চলল। বাংলায় রচিত প্রাচীন মহাকাব্যের অন্যতম হলো হায়াত মামুদ রচিত ‘ জঙ্গনামা’। প্রায় সাড়ে তিন শত বছর আগে রচিত এই মহাকাব্যের পান্ডুলিপি রংপুর অঞ্চল থেকে পাওয়া যায়। এই মহাকাব্যেরই একটি চরণ এটি। প্রসঙ্গত, রংপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় দ্রুত আসা কে এখনও হাঁটিয়া আসা বলা হয়।

এ বিষয়ে অন্য একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া যায়। সেটি হচ্ছে নিয়মতান্ত্রিক ব্যাখ্যা। বীরগণ যুদ্ধক্ষেত্রে বা নির্দেশিত স্থানে যাত্রার পূর্বে ঘোড়াশালে গিয়ে প্রথমে নিজের ঘোড়াকে প্রয়োজনীয় সজ্জা বা সমরাস্ত্রে সজ্জিত করে নিত। তারপর ঘোড়ায় চড়ে পরীক্ষা করে নিত, কোনো শারীরিক বা অন্য কোনো অসুবিধা আছে কি না।

ড. মোহাম্মদ আমীন

যদি ঘোড়ার কোনো অসুবিধা না থাকত তাহলে মর্দ, ঘোড়া থেকে নেমে হেঁটেই সেনাপতির পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করত। সেনাপতির নির্দেশ পাওয়ার পর ঘোড়ায় চড়ে বসত এবং আর একবার মহড়া করে গন্তব্যস্থানের দিকে রওয়ানা দিত। এভাবে পর্যবেক্ষণ করে রওয়ানা দিলে পথিমধ্যে ঘোড়ার গতির কোনো অসুবিধা হতো না। ফলে ছয় মাসের পথ ছয় দিনে পার হওয়া ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার।

২. লাখে লাখে সৈন্য মরে কাতারে কাতার,
শুমার করিয়া দেখি পঞ্চাশ হাজার।
এখানে কবি কোনো সংখ্যা বুঝাননি। উপমা দিয়েছেন। যেমন- চাঁদের মতো মুখ, উপত্যাকার মতো বুক, আলোর মতো হাসি, নাকের মতো বাঁশি ইত্যাদি। এই কবিতায় কবি বুঝাতে চেয়েছেন, যুদ্ধ বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শোনা কথা কীভাবে অতিরঞ্জিত হয়। কীভাবে তিল হয়ে যায় তাল, পা হয়ে যায় গাল কিংবা দুধ

হয়ে যায় লাল। তৎকালে নোয়াখালী-হাতিয়া-সন্দ্বীপ এলাকা মিলেও হয়তো অত লোক ছিল না। কিন্তু মুখে মুখে তা হয়ে যেত বেশুমার। এই লাইন দুটি দিয়ে যুদ্ধকালীন মানুষের সংবাদ আদানপ্রদানের অবিশ্বাস্য অনুমান এবং কান কথার হাস্যকর বিস্তারকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অধিকন্তু নানা পক্ষ থেকেও উদ্দেশ্যমূলকভাবেও এমন অতিরঞ্জিত প্রচার করা হয়। এখনও এমন দেখা যায়, শোনা যায়। বাংলাদেশে যত পত্রিকা আছে এবং যে প্রচার সংখ্যা দেখানো হয় তা, হিসাব করলে দেখা যায়, প্রত্যেক শিক্ষিত বাঙালি দৈনিক পাঁচটা করে পত্রিকা পড়েন

যুদ্ধক্ষেত্রে যখন সৈন্যরা আহত হয়ে পড়ে যায়, তখন দূর হতে মনে হতো মারা গেছে। অধিকন্তু যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সৈন্যদের মৃত্যু বা আহত হওয়ার সংখ্যাটি যথার্থভাবে জানা সম্ভব ছিল না। তাই বহুলাংশে অনুমানের উপর ভিত্তি করে মৃতদের সংখ্যা ঘোষণা করা হতো। বর্তমানেও এমন দেখা যায়। সেই মধ্যযুগে বিষয়টি ছিল আর অধিক অনুমানভিত্তিক। তাই লাখ লাখ সৈন্য মারা গেছে মনে হলেও পরবর্তীকালে প্রকৃত সংখ্যার কমবেশি হয়ে যেত।

উৎস: বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন,পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

বিদ্যুদায়ন বিদ্যুতায়ন; বৈদ্যুতিক; বিদ্যুদায়িত বিদ্যুতায়িত

স্ত্রীবাচক শব্দে পুরুষাধিপত্য

ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল

প্রেসক্রিপশনে RX কেন লেখা হয়

#subach

You cannot copy content of this page

poodleköpek ilanlarıankara gülüş tasarımıantika alanlarPlak alanlarantika eşya alanlarAntika mobilya alanlarAntika alan yerlerpoodleköpek ilanlarıankara gülüş tasarımıantika alanlarPlak alanlarantika eşya alanlarAntika mobilya alanlarAntika alan yerler
Casibomataşehir escortjojobetbetturkeyCasibomataşehir escortjojobetbetturkey