চন্দ্রবিন্দু: বর্ণের কোথায় বসা উচিত

অনুলিখন: মিনহা সিদ্দিকা

শুবাচি জনাব জাকিয়া খান(Zakia Khan) ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর শুবাচের একটি যযাতিতে লিখেছেন: “চন্দ্রবিন্দু বর্ণের কোথায় বসা উচিত? বাংলা একাডেমির ২০১৬ এর অভিধান এ আ-কারযুক্ত শব্দে আ-কার এর উপর চন্দ্রবিন্দু বসানো আছে। আবার একই অভিধানের সংযুক্তি অংশে আ-কারযুক্ত শব্দেই (১৪১৪ পৃষ্ঠায়) বর্ণের উপর চন্দ্রবিন্দু দেওয়া হয়েছে। কোনটা অনুসরণ করব?” 

নাব জাকীয় খানের প্রশ্নের জবাবে পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী (শ্রীদেবেন্দ্র কুমার বিদ্যারত্ন সম্পাদিত। বলরাম প্রকাশনী। মহালয়া, ২০০৩।) এবং বঙ্গীয়

এম রহমান সবুজ

শব্দকোষ (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সাহিত্য অকাদেমি। পঞ্চম মুদ্রণ ২০০১।) এর উদ্ধৃতি দিয়ে শুবাচি জনাব এম রহমান সবুজ লিখেছেন: যেসব শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে এসেছে এবং নাসিক্যবর্ণ যেমন ঙ-সহ অন্যান্য বর্ণগুলো বাংলা ভাষায় প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে বর্ণ বাদ পড়ে তার আগে চন্দ্রবিন্দু বসবে। যেমন অঙ্কন = আঁকা, গাঁ = গ্রাম ইত্যাদি । অবশ্য চন্দ্রবিন্দু কোথায় বসবে বা বসবে না তার অন্য কতগুলো ব্যতিক্রমী নিয়ম আছে। তবে এটাই  সহজ সূত্র । রন্ধনী = ন্ধ ওঠানোর কারণে রাঁধুনি লিখতে গিয়ে র আ- কার এর উপরে চন্দ্রবিন্দু দিতে হয় ।  চন্দ্রবিন্দু কোথায় বসবে সে বিষয়ে নিচের কয়েকটি নিয়ম দেখা যেতে পারে:

১. কারবিহীন ব্যঞ্জনধ্বনির উপরে চন্দ্রবিন্দু থাকবে। যেমন– কঁ।
২. যে সকল ব্যঞ্জনবর্ণের ডানদিকে কার চিহ্ন থাকে, সে সকল ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে যুক্ত কার-চিহ্নের উপর চন্দ্রবিন্দু বসবে। যেমন– কাঁ, কীঁ।
৩. যে সকল বর্ণের কার-চিহ্ন ব্যঞ্জনবর্ণের আগে বা নিচে থাকবে, সে ক্ষেত্রে চন্দ্রবিন্দু ব্যঞ্জনবর্ণের উপরে বসবে। যেমন– কিঁ, কুঁ, কূঁ, কেঁ, কৈঁ।
৪. যে সকল কারধ্বনি ব্যঞ্জনবর্ণের উভয় দিকে বসে, সে সকল ব্যঞ্জনবর্ণের ডানদিকের কার-চিহ্নের উপরে চন্দ্রবিন্দু বসবে। যেমন– কোঁ, কৌঁ।
সূত্র :
পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী। শ্রীদেবেন্দ্র কুমার বিদ্যারত্ন সম্পাদিত। বলরাম প্রকাশনী। মহালয়া, ২০০৩।
বঙ্গীয় শব্দকোষ। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সাহিত্য অকাদেমি। পঞ্চম মুদ্রণ ২০০১।

“চন্দ্রবিন্দু বর্ণের কোথায় বসা উচিত?” এ প্রসঙ্গে শুবাচি জনাব খুরশেদ আহমেদ  (Khurshed Ahmed)-এর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি শুবাচের মন্তব্যের জনালায় লিখেছেন, বর্ণের মাথায় চন্দ্রবিন্দুর অবস্থান ঠিক কোথায় হবে তা নিয়ে এখন বাংলা একাডেমির মধ্যেই অস্থিরতা রয়েছে।  অভ্রতে  অনুনাসিক স্বরধ্বনি যেভাবে লেখা যায় তা হলো: ইঁ উঁঁ এঁ ওঁ অ্যাঁ অঁ আঁ।

 বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ [প্রথম প্রকাশ: মাঘ ১৪২০/জানুয়ারি ২০১৪] ৬৩ পৃষ্ঠায় অনুনাসিক স্বরবর্ণ লিখতে—বা অনুনাসিক স্বরবর্ণযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ লিখতে—চন্দ্রবিন্দুটি বসিয়েছে, সাধারণভাবে, বর্ণটির মাথায়, মোটামুটি মাঝখানে। ২০১৬ সংস্করণের বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান [প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬; পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ: এপ্রিল ২০১৬] সে-অবস্থানে থাকেনি; বরং, চন্দ্রবিন্দুকে ঢালাওভাবে সরিয়ে এনেছে ডানদিকে, যেমন আ-কার ও অ্যা-কারের ক্ষেত্রে, যার যৌক্তিকতা তাদের ব্যাখ্যা থেকে কিছুটা বোঝা যায়, ঠিক তেমনই এ-কার ই-কার-সহ অন্য সকল কার-এর ক্ষেত্রে, যার কোনো যৌক্তিকতা বোঝা যায় না।
এ-অভিধান তার মুখবন্ধে বলেছে: “বাংলা বর্ণমালায় চন্দ্রবিন্দু অনুনাসিক স্বরধ্বনির চিহ্ন। কোনো স্বরবর্ণ বা স্বরান্ত ব্যঞ্জনের সঙ্গে চন্দ্রবিন্দু যুক্ত করলে সেই বর্ণের স্বর অনুনাসিক হয়। ব্যঞ্জনান্ত বর্ণে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার নেই। এই যুক্তির ভিত্তিতে মুদ্রণে চন্দ্রবিন্দুর অবস্থান একটু ডানদিকে সরিয়ে আনা হয়েছে।”

‘চাঁদ’ বা ‘প্যাঁচ’ লিখতে চন্দ্রবিন্দু ডান দিকে সরে এসে কার-চিহ্নের ওপর বসল, সে না-হয় বোঝা গেল; কিন্তু ‘সিঁথি’, ‘পেঁয়াজ’, ‘খোঁপা’, ‘খোঁজাখুঁজি’-তে চন্দ্রবিন্দু কেন কার-চিহ্নের বা বর্ণের ওপর এবং/অথবা মাঝখানে বসল না? আগের কালে চন্দ্রবিন্দু যেভাবে বসানো হতো, বর্ণের মাথার ওপর, মোটামুটি

খুরশেদ আহমেদ

মাঝখানে, সেখানে কী সমস্যা ছিল?  যেভাবেই লেখা হোক না কেন—আগের কালের মতো বা এখনকার মতো—অনুনাসিক স্বরধ্বনি, অথবা অনুনাসিক স্বরধ্বনি-যুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি, ওটা আসলে একটি অখণ্ড অবিভাজ্য মূলধ্বনি, ওটাকে ভেঙ্গে বা বিশ্লেষ করে দেখাতে গেলে ওটা আর ওটা থাকে না।

 ‘ওঁ’ কি ও+ঁ, অথবা, ঁ+ও, অথবা, অবিশ্লেষ্য একটি মূলধ্বনি?  ‘ওঁ’ তো এমন একটি ধ্বনি যেখানে মৌখিক স্বরধ্বনি ‘ও’ এবং অনুনাসিকতা সমান্তরালভাবে ধ্বনিত হয়; একটি ধ্বনি আগে এবং অন্যটি তার পরে এমনটি নয়। আমার মনে হয়, একটি অনুনাসিক ধ্বনি, যেমন, ওঁ বা গোঁ, প্রকৃতপক্ষেই অবিভাজ্য, রসায়নের যৌগিক পদার্থের মতো।তাই, চন্দ্রবিন্দুর অবস্থান হওয়া উচিত, সকল ক্ষেত্রে, প্রযোজ্যমতো স্বরবর্ণ বা ব্যঞ্জনবর্ণের ঠিক মাথার ওপর, মোটামুটি মাঝখানে।

এ প্রসঙ্গে  শুবাচি জনাব  এম রহমান সবুজ লিখেচেন, হয়েছে উচ্চারণের কারণে ধ্বনির সূত্র যদি বাংলাএকাডেমি না বলে এর সাথে উচ্চারণের সম্পর্ক আছে সোজা কথায় নাকা ধ্বনি বলি একে, বিষয়টি দুঃখজনক । যেমন খো উচ্চারণ করতে ঙ মতো এসে যায়, পে থেকে য়াজ উচ্চারণ করতে গেলে ঙ মতো এসে যায়, দেখবেন বানর লিখতে গেলে চন্দ্রবিন্দু বসে না কিন্তু বাঁদরের ক্ষেত্রে চন্দ্রবিন্দু বসে বা থেকে ন পর্যন্ত আসতে বেগ পেতে হয় না কিন্তু বা থেকে দ পর্যন্ত আসতে উচ্চারণের সময় একটা চাপ লক্ষ্য করা যায় , মূলত কিছু কিছু ক্ষেত্রে আ- কার ও বর্ণের উপরে কখন চন্দ্রবিন্দু বসবে তা নির্ভর করে উচ্চারণের কারণে ধ্বনির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই কারণ । বাংলাএকাডেমির ঐ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা যতদিন ত্যাগ করতে না পারবে ততদিন লোকে ব্যাকরণ চর্চা করবে না ততটা ।


error: Content is protected !!