চন্দ্রবিন্দু: মৃত ব্যক্তির নামের আগে চন্দ্রবিন্দু দেওয়া হয় কেন?

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/চন্দ্রবিন্দু-মৃত-ব্যক্ত/

চন্দ্রবিন্দু একটি পরাশ্রয়ী বর্ণ। কারণ চন্দ্রবিন্দু নামের বর্ণটি স্বাধীনভাবে কোনো বাংলা শব্দে ব্যবহৃত হয় না। এটি কেবল অন্য বর্ণের আশ্রয়ে শব্দে ব্যবহৃত হয়। তাই চন্দ্রবিন্দুকে পরাশ্রয়ী বর্ণ বলা হয়। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তাঁর বঙ্গীয় শব্দকোষ গ্রন্থে  চন্দ্রবিন্দু নামের বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণটিকে অনুনাসিক বর্ণ বলেছেন । পাণিনি তাঁর অষ্ট্যাধ্যায়ী  গ্রন্থের অষ্টধ্যায়ের চতুর্থ পাদের ৫৮-৫৯ সূক্তে চন্দ্রবিন্দুকে সানুনাসিক উল্লেখ করেছেন। পাণিনি সূক্তদ্বয়ে দেখিয়েছেন অনুস্বার (ং) কীভাবে চন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সংস্কৃত মতে অনুস্বার (ং) একমাত্রা বিশিষ্ট ধ্বনি।  একমাত্রার এই ধ্বনিটি অর্ধ-মাত্রায় রূপ নিলে চন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পাণিনি উদাহরণ দিয়েছেন:  কিংযুক্তম্>কিঁয্যুক্তম্, সংযন্তা>সঁয্যন্তা, সংবৎসরঃ>সঁব্বৎসরঃ।

চন্দ্রবিন্দু ধ্বনি অন্য কোনো স্বরধ্বনি ছাড়া উচ্চারিত হতে পারে না। তাই এটি ব্যঞ্জনধ্বনি। স্বরবর্ণের সঙ্গে নাসিক্য ধ্বনি যুক্ত করা চন্দ্রবিন্দুর কাজ। যেমন: হাঁস, বাঁশ, চাঁদ ইত্যাদি। চন্দ্রবিন্দু ধ্বনি উচ্চারণের সময়, আল্‌জিহ্বা ও কোমল তালু জিহ্বামূলে পুরোপুরি নামিয়ে আনা হয় না।  ফলে, স্বরবর্ণ নাসিক্য না হয়ে সানুনাসিক স্বরধ্বনিতে পরিণত হয়।  সানুনাসিক ধ্বনি নাক এবং মুখ উভয় দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়। যে ধ্বনি কেবল নাক দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাকে নাসিক্য ধ্বনি বলা হয়।  ঙ, ঞ, ন, ণ, ম, ং প্রভৃতি নাসিক্য ব্যঞ্জন। এসব ধ্বনি উচ্চারণের সময় যখন রুদ্ধ হয়ে যায়, তখন নাসিক্য রূপ পাওয়া যায়। যেমন রঙ ঢঙ বা রং ঢঙ, নঞ্ (নঙ্), আম (আম্),  বন (বন্)। এস ধ্বনির সঙ্গে যখন চন্দ্রবিন্দু যুক্ত হয়, তখন  নাসিক্য ধ্বনি সানুনাসিক  ধ্বনিতে পরিণত হয়। যেমন- ম্ ঙ্‌ ঞ্‌ ন্‌ ণ্‌ প্রভৃতি নাসিক্য ধ্বনি। 

ঙ, ঞ, ন, ণ, ম এবং ং (অনুস্বার) ব্যঞ্জনগুলোর একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও বুৎপত্তি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এ বর্ণগুলো মূল সংস্কৃত শব্দ থেকে সুস্পষ্টভাবে অপভ্রষ্ট হয়ে তদ্ভব শব্দে চন্দ্রবিন্দুর রূপ ধারণ করে বাংলা ভাষায় অবস্থান করে। যেমন: অন্ত্র থেকে আঁত, অঞ্চল থেকে আঁচল, ষণ্ড থেকে ষাঁড়, গ্রাম থেকে গাঁ, শঙ্খ থেকে শাঁখ, ঝম্প থেকে ঝাঁপ, বংশ থেকে বাঁশ, সিন্দুর থেকে সিঁদুর, সামন্তপাল থেকে সাঁওতাল, চম্পা থেকে চাঁপা, কঙ্কন থেকে কাঁকন, কণ্টক থেকে কাঁটা, ভাণ্ড থেকে ভাঁড় ইত্যাদি। এ জন্য নাসিক্যব্যঞ্জনগুলোর সাথে চন্দ্রবিন্দু যুক্ত হয় না।
হিন্দুশাস্ত্রে  চন্দ্রবিন্দুকে বিন্দু রূপার প্রতিরূপ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এজন্য শক্তিবিগ্রহের পূর্বে চন্দ্রবিন্দু লেখা  হয়। যেমন: শ্রীশ্রী ৺শারদীয়া দুর্গাপূজা। এজন্য চন্দ্রবিন্দু ঈশ্বরের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।  সনাতন ধর্মাবলম্বী মৃত ব্যক্তির নামের আগে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করা হয়। এর একটি অর্থ ওই ব্যক্তি মারা গেছে এবং দ্বিতীয় অর্থ মৃতব্যক্তি স্বর্গগত হয়েছে বা ঈশ্বরপ্রাপ্ত হয়েছে।  স্বর্গত বা ঈশ্বরপ্রাপ্ত হয়েছে বিবেচনায়  ঈশ্বরের প্রতীক হিসাবে মৃত ব্যক্তির নামের আগে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহৃত হয়। যেমন: ৺মধুসূধন মুখোপাধ্যায়; এর অর্থ  মৃত মধুসূধন মুখোপাধ্যায় স্বর্গপ্রাপ্ত হয়েছে, ঈশ্বরপ্রাপ্ত হয়েছে।

চন্দ্রবিন্দু সমগ্র

ড. মোহাম্মদ আমীন
শুবাচে চন্দ্রবিন্দু নিয়ে সেসব যযাতি রয়েছে, তার কয়েকটি নিচে দেওয়া হলো। এর অতিরিক্ত পড়তে চাইলে অনুসন্ধান-জানালায় চন্দ্রবিন্দু লিখে খোঁজ করতে পারেন।
——-

চন্দ্রবিন্দু সমগ্র ওয়েবসাইট

চন্দ্রবিন্দু সমগ্র শুবাচ

error: Content is protected !!