চন্দ্রবিন্দু সমগ্র : চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার: চন্দ্রবিন্দু কী এবং কেন দিতে হয় চন্দ্রবিন্দু নিমোনিক

ড. মোহাম্মদ আমীন

চন্দ্রবিন্দু সমগ্র : চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার: চন্দ্রবিন্দু কী এবং কেন দিতে হয় চন্দ্রবিন্দু নিমোনিক

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

 

চন্দ্রবিন্দুর আগমন: চন্দ্রবিন্দু কখন এবং কেন দিতে হয়: নাসিক্যভবন

বাংলা বানানে অধিকাংশ চন্দ্রবিন্দু আসে সংস্কৃত বানানের ঙ, ঞ, ণ, ন, ম এবং অনুস্বার ( ং) বর্ণের লোপের ফলে। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তৎসম বানানের নাসিক্য ধ্বনি তদ্ভব শব্দে চন্দ্রবিন্দু রূপ লাভ করে। এই ঘটনাকে বলা হয় নাসিক্যভবন। সুতরাং নাসিক্যভবনের ফলে সৃষ্ট চন্দ্রবিন্দুযুক্ত শব্দমাত্রই অতৎসম। যদিও সংস্কৃত বানানে ঙ, ঞ, ণ, ন, ম এবং অনুস্বার ( ং)  না-থাকলেও অতৎসম শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু আসতে পারে। এ বিষয়ে পরে আলোচনা করা হবে। আগে দেখে নিই নাসিক্যভবনের কয়েকটি উদাহরণ:

ঙ: পঙ্ক> পাঁক, অঙ্কন> আঁকা, কঙ্কন> কাঁকন, শঙ্খ> শাঁখ, বঙ্কিম> বাঁকা, পঙক্তি> পাঁতি।

ঞ: পঞ্চ> পাঁচ, অঞ্চল> আঁচল, অঞ্জলি> আঁজলা।

ণ: ভাণ্ডার> ভাঁড়ার, ভাণ্ড> ভাঁড়, কণ্টক> কাঁটা, ষণ্ড> ষাঁড়, শুণ্ড> শুঁড়, পলাণ্ডু> পেঁয়াজ, হণ্টন> হাঁটা, চণ্ডাল> চাঁড়াল।

ন: স্কন্ধ> কাঁধ, দন্ত> দাঁত, সন্তরণ> সাঁতার, বান্দর> বাঁদর, বন্ধন> বাঁধন, ছন্দ> ছাঁদ, চন্দ্র> চাঁদ, গ্রন্থনা> গাঁথা, বৃন্ত> বোঁটা, সন্ধ্যা> সাঁঝ, অন্ধকার> আঁধার, ক্রন্দন> কাঁদা।

ম: ধূম> ধোঁয়া, আমিষ> আঁষ, কম্পন> কাঁপা, ঝম্প> ঝাঁপ, চম্পক> চাঁপা, গ্রাম> গাঁ, সমর্পণ> সঁপা, গুম্ফ> গোঁফ।

ং:  বংশী> বাঁশি, সংক্রম> সাঁকো, হংস> হাঁস, বংশ> বাঁশ।

নাসিক্যধ্বনি বিলুপ্ত না হওয়ার ফল

সংস্কৃত বানানের নাসিক্যধ্বনি বিলুপ্ত না হলে সাধারণত অতৎসম শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন- ঘৃণা> ঘেন্না, রত্ন> রতন, মাণিক্য> মানিক, শাল্মলী> শিমুল, গঙ্গা> গাঙ, বন্য> বুনো, মনুষ্য> মানুষ, বান্দর> বানর, যত্ন> যতন, স্বর্ণ> সোনা, কর্ণ> কান, রন্ধন> রান্না, লাঙ্গল> লাঙল, জন্ম> জনম, হাঙ্গর> হাঙর, ব্রাহ্মণ> বামুন।

ব্যতিক্রম: কখনও দেখা যায় নাসিক্যধ্বনি বিলুপ্ত হলেও চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন—  কঙ্ক> কাক, টঙ্কা> টাকা, কর্দম> কাদা, কৃপণ> কিপটে, লম্ফ> লাফ, ঝঞ্ঝা> ঝড়, কৃষ্ণ> কালো, শৃঙ্খল> শিকল।

শব্দে চন্দ্রবিন্দু ও অতৎসমত্ব

তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ নাসিক্য বর্ণ ত্যাগ করে চন্দ্রবিন্দু পরিধানপূর্বক অতৎসম শব্দে পরিণত হয়। এ যেন, বাবার  মেয়ে কন্যাত্ব পরিত্যাগ করে কপালে চন্দ্রতিলক লাগিয়ে বধূ সেজে শ্বশুর বাড়িতে এল।  তাই কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু থাকলে নিশ্চিত বলে দেওয়া যায়, শব্দটি তৎসম নয়। অতএব, চন্দুবিন্দু-যুক্ত কোনো শব্দই তৎসম নয়।  যেমন: গেন্দুক থেকে গাঁদা, ক্রন্দন থেকে কাঁদা, স্কন্ধ থেকে কাঁধ, অঙ্ক থেকে আঁক, অঙ্কন থেকে আঁকন, অঙ্কুশ থেকে আঁকশি, বন্ধ্যা থেকে বাঁজা, বণ্টন থেকে বাঁটা, বাঁটন, বর্তুল থেকে বাঁটুল প্রভৃতি। তবে নাসিক্য বর্ণ লোপ না- পেলেও চন্দ্রবিন্দু হতে পারে। যেমন  উচ্চ থেকে উঁচু প্রভৃতি।

বানানে যখন চন্দ্রবিন্দু হবে না

১.  অ-বর্ণ ও চন্দ্রবিন্দু:  অ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু নেই। অ-কার সুপ্ত চিহ্ন। চন্দ্রবিন্দু কেবল দৃশ্যমান স্বরচিহ্নের উপর বসে। যেমন : চন্দ্র থেকে চাঁদ। ৩. তৎসম শব্দে চন্দ্রবিন্দু হয় না। আবার অতৎসম শব্দে ঈ, ঈ-কার এবং ঊ ও  ঊ-কার হয় না। তাই  ঈ/ঊ এবং ঈ-কার/ঊ-কার যুক্ত বর্ণে চন্দ্রবিন্দু হয় না। অর্থাৎ কোনো শব্দে ঈ/ঈ-কার কিংবা ঊ/ঊ-কার থাকলে ওই  শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু থাকবে না আবার চন্দ্রবিন্দু থাকলে ঈ/ ঈ-কার বা ঊ/ ঊ-কার থাকবে না।

 ২. ঋ-এর শত্রু চন্দ্রবিন্দু:   ইতঃপূর্বে দেখানো হয়েছে, তৎসম শব্দে চন্দ্রবিন্দু হয় না। ঋ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া প্রায় সব শব্দই তৎসম। তাই ঋ- বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু দেখা যায় না।

৩. ঐ  বনাম চন্দ্রবিন্দু: ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতীত ঐ- বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া প্রায় সব শব্দই তৎসম। এজন্য ঐ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দে  সাধারণত  চন্দ্রবিন্দু  দেখা যায় না।   

৪. ঔ বনাম চন্দ্রবিন্দু:  ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতীত ঔ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া প্রায় সব শব্দই তৎসম। তাই ঔ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া  শব্দের বানানে সাধারণত  চন্দ্রবিন্দু  দেখা যায় না। 

৫.  নাসিক্যবর্ণ বনাম চন্দ্রবিন্দু:  ঙ, ঞ, ন, ণ, ম এবং ং ব্যঞ্জনগুলোর একটি স্বতন্ত্র  বৈশিষ্ট্য ও ব্যুৎপত্তি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এ বর্ণগুলো মূল সংস্কৃত থেকে  অপভ্রষ্ট হয়ে তদ্ভব শব্দে চন্দ্রবিন্দু-রূপ ধারণ করে বাংলায় অবস্থান করে। যেমন : অন্ত্র থেকে আঁত, অঞ্চল থেকে আঁচল, ষণ্ড থেকে ষাঁড়, গ্রাম থেকে গাঁ, শঙ্খ থেকে শাঁখ, ঝম্প থেকে ঝাঁপ, বংশ থেকে বাঁশ, সিন্দুর থেকে সিঁদুর, সামন্তপাল থেকে সাঁওতাল, চম্পা থেকে চাঁপা, কঙ্কন থেকে কাঁকন, কণ্টক থেকে কাঁটা, ভাণ্ড থেকে ভাঁড় ইত্যাদি। এ জন্য নাসিক্যব্যঞ্জনগুলোর সঙ্গে চন্দ্রবিন্দু যুক্ত হয় না।

৬. ণ  ষ বনাম চন্দ্রবিন্দু: অতৎসম শব্দের বানানে সাধারণ ণ হয় না। তাই  মূর্ধণ্য-ণ যুক্ত কোনো শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু থাকবে না। সাধারণত অতৎস শব্দের বানানে ষ থাকে না। তাই ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে মূর্ধণ-ষ যুক্ত কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেখা যায় না।

৭. বিসর্গ বনাম চন্দ্রবিন্দু:  বিসর্গযুক্ত এবং বিসর্গসন্ধিসাধিত শব্দসমূহ চন্দ্রবিন্দু বিমুক্ত।

৮. তৎসম বহুবচনবাচক পদ ও চন্দ্রবিন্দু: বহুবচনবাচক গণ, বৃন্দ, মণ্ডলী, বর্গ, আবলি, গুচ্ছ, দাম, নিকর, পুঞ্জ, মালা, রাজি, রাশি প্রভৃতির যে কোনো একটি থাকলে ওই শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না।

৯. সমাস ও চন্দ্রবিন্দু:  উপমান কর্মধারয়, উপমিত কর্মধারয় এবং রূপক কর্মধারয় সমাস গঠিত শব্দ সাধারণত চন্দ্রবিন্দু হয় না।  অনুরূপভাবে অব্যয়ীভাব এবং প্রাদি সমাস দ্বারা গঠিত পদগুলোয় সাধারণত চন্দ্রবিন্দু হয় না।

১০. তব্য অনীয় বনাম চন্দ্রবিন্দু:  শব্দের শেষে তব্য ও অনীয় থাকলে ওইসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন : কর্তব্য, মন্তব্য, বক্তব্য, দ্রষ্টব্য, ভবিতব্য, করণীয়, দর্শনীয়, বরণীয়, রমণীয় প্রভৃতি।  ১৫. শব্দের শেষে তা, ত্ব, তর, তম, বান, মান, এয়, র্য প্রভৃতি থাকলে সাধারণত ওই শব্দগুলোতে চন্দ্রবিন্দু হয় না। ১৬, যেসব শব্দের পূর্বে প্র, পরা, অপ, সম, অব, অনু, নির(নিঃ), দুর(দুঃ), উৎ, অধি, পরি, প্রতি, উপ, অভি, অতি শব্দগুলো যুক্ত থাকে সেগুলোর বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না।  ১৭. ঈ ঊ এবং ঋ এবং এসব বর্ণের কারচিহ্ন-যুক্ত শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হবে না।

  ১১. কতিপয় যুক্তাক্ষর ও চন্দ্রবিন্দু:  যেসব শব্দের বানানে  ক্ত্র, ´, ক্ষ, ক্ষè, ক্ষ্য, ক্ষ্ম, ক্ষ্ম্য, গ্ধ, গ্ন্য, গ্ম, ঘ্ন, ক্সক্ষ, ক্সম, চ্ছ্ব, চ্ছ্র, জ্ঝ, জ্ঞ, ঞ্ছ,  ট্র, ত্ত্ব, ত্ম্য, ত্র্য, দ্ব্য, দ্ম, ধ্ন, ধ্ম, ন্ত্য, ন্ত্ব ন্ত্র, ন্ত্র্য, ন্দ্ব, ন্ধ্য, ন্ধ্র, ন্ন্য, ল্ম, ñ, শ্ম, ষ্ক্র, ষ্ট্য, ষ্ট্র, ষ¦, ষ্ম, স্ত্য, স্থ্য, হ্ন্য, হ্ম, হ্ল প্রভৃতি যুক্তবর্ণ থাকে  সেসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হবে না।

সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
সব বিধি একসঙ্গে দেখার জন্য নিচের লিংকে ক্লিক করুন:

চন্দ্রবিন্দুর বৈশিষ্ট্য

১. সংস্কৃত শব্দ নাসিক্যবর্ণ ছেড়ে চন্দ্রবিন্দু পরিধানপূর্বক তদ্ভব (খাঁটি বাংলা) উপাধি নিয়ে বাংলায় আসে। এ যেন বাবার মেয়ে কন্যার ‘ন (নথ)’ ছেড়ে কপালে তিলক ফোঁটা পরে বধূ সেজে শ্বশুরবাড়ি এল। তাই কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু থাকলে নিশ্চিত বলে দেবেন ওটি তৎসম নয়। অর্থাৎ তৎসম শব্দে নাসিক্যবর্ণ লোপ পেলে চন্দ্রবিন্দু আসে। তখন শব্দের বানানে  চন্দ্রবিন্দু দিতে হয়। যেমন:
 
পঙ্ক>পাঁক, পঞ্চ>পাঁচ, ভান্ডার>ভাঁড়ার, পলাণ্ডু>পেঁয়াজ/পিঁয়াজ, স্কন্ধ>কাঁধ, দন্ত>দাঁত, বৃন্ত> বোঁটা, সন্ধ্যা> সাঁঝ, অন্ধকার>আঁধার, ধূম>ধোঁয়া, আমিষ>আঁশ, কম্পন>কাঁপা, বংশী>বাঁশি, সংক্রম>সাঁকো, হংস>হাঁস, বংশ>বাঁশ। ব্যতিক্রম: কঙ্ক> কাক, টঙ্কা> টাকা, কর্দম> কাদা, কৃপণ> কিপটে, লম্ফ> লাফ, ঝঞ্ঝা> ঝড়, কৃষ্ণ> কালো, শৃঙ্খল> শিকল প্রভৃতি।
 
তবে নাসিক্যবর্ণ লোপ ছাড়াও চন্দ্রবিন্দু হতে পারে। যেমন: অক্ষি>থেকে আঁখি, অস্থি>আঁটি, উচ্চ>উঁচু; উদ্র>ভোঁদড়; কক্ষ> কাঁখ, কর্কর>কাঁকর, কর্কট >কাঁকড়া, কর্কোটক> কাঁকরোল, কুটির> কুঁড়ে, বক্র> বাঁক, বিদ্ধ>বিঁধ, যূথিকা>জুঁই; শস্য>শাঁস, শুষ্ক>শুঁটকি, শুচিবায়ু>ছুঁচিবাই, শ্রেঢ়ী> সিঁড়ি, সজ্জা>সাঁজোয়া, পিপীলিকা> পিঁপড়া।
 
২. অ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু নেই। চন্দ্রবিন্দু যার ওপরই বসুক, প্রভাব ফেলে স্বরের ওপর। চন্দ্রবিন্দু বিলুপ্ত নাসিক্যবর্ণের পূর্বের বর্ণে বসে উচ্চারণে নাসিক্যভাব আনয়ন করে।
 
৩. তৎসম শব্দে চন্দ্রবিন্দু হয় না। আবার অতৎসম শব্দে ঈ/ঈ-কার, ঊ/ঊ-কার হয় না। অর্থাৎ কোনো শব্দে ঈ/ঈ-কার, ঊ/ঊ-কার থাকলে ওই শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। আবার চন্দ্রবিন্দু থাকলে ওই শব্দে ঈ/ঈ-কার বা ঊ/ঊ-কার দেবেন না।
 
৪. ঋ-দিয়ে শুরু করা সব শব্দই তৎসম। তাই ঋ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
 
৫. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে ঐ-বর্ণ এবং ও-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া সব শব্দ তৎসম। এজন্য ঐ-বর্ণ এবং ও-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেখা যায় না।
 
৬. যুক্ত হোক বা বিযুক্ত হোক মূর্ধন্য-ণ যুক্ত কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। নাসিক্যবর্ণ ত্যাগ করে চন্দ্রবিন্দু আসে বলে চন্দ্রবিন্দুযুক্ত শব্দে নাসিক্য বর্ণের উপস্থিতি বিরল।
 
৭. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে মূর্ধন্য-ষ যুক্ত কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেখা যায় না। ব্যতিক্রম: ষাঁড়, ষাঁড়া, ষাঁড়াষাঁড়ি।
 
৮. যুক্তব্যঞ্জনের ওপর চন্দ্রবিন্দু হয় না। চন্দ্রবিন্দু-যুক্ত শব্দগুলো যুক্তব্যঞ্জনহীন হয়।
 
৯. বিসর্গযুক্ত এবং বিসর্গসন্ধি সাধিত শব্দসমূহে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
 
১০. বহুবচন বাচক গণ মণ্ডলী বৃন্দ বর্গ আবলি গুচ্ছ দাম নিকর পুঞ্জ মালা রাজি রশি প্রভৃতির যে কোনো একটি থাকলে ওই শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
 
১১. উপমান কর্মধারয়, উপমিত কর্মধারয় এবং রূপক কর্মধারয় সমাস গঠিত শব্দে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
 
১২. অব্যয়ীভাব ও প্রাদি সমাস দ্বারা গঠিত পদগুলোতে সাধারণত চন্দ্রবিন্দু হয় না।

১৩. শব্দের শেষে তব্য ও অনীয় থাকলে ওইসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন: কর্তব্য, মন্তব্য, দ্রষ্টব্য, ভবিতব্য, করণীয়, দর্শনীয়, বরণীয়, রমণীয়।

১৪. শব্দের শেষে তব্য, অনীয় থাকলে ওইসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না। কর্তব্য, ভবিতব্য, অনুষ্ঠাতব্য, বরণীয়, করণীয়, দর্শনীয়, রমণীয় প্রভৃতি।

১৫. শব্দের শেষে তা, ত্ব,তর, তম, বান, মান, মাণ, এয়, ঈয়, র্য প্রভৃতি থাকলে ওই শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না।

১৬. প্র প্ররা অপ সম অব অন নির্‌ (নিঃ‌), দুর(দঃ), উৎ, অধি, পরি, প্রতি, উপ, অভি, অতি প্রভৃতি শব্দ যুক্ত থাকলে সেগুলোর বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
 
১৭. ঙ ঞ ণ ম ন ং প্রভৃতি ব্যঞ্জনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই বর্ণগুলো সংস্কৃত থেকে অপভ্রষ্ট হয়ে তদ্ভব শব্দে চন্দ্রবিন্দু রূপ ধারণ করে বাংলায় অবস্থান করে। যেমন: অঞ্চ >আঁচ, অঞ্চল>আঁচল, ষণ্ড>ষাঁড়, গ্রাম>গাঁ, শঙ্খ>শাঁখ, ঝম্প>ঝাঁপ, বংশ>বাঁশ, সিন্দুর>সিঁদুর, সামন্তপাল>সাঁওতাল, চম্পা>চাঁপা, কঙ্কন>কাঁকন, কণ্টক>কাঁটা, ভাণ্ড>ভাঁড়।
 

শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার

১. চন্দ্রবিন্দুর উপস্থিতি-অনুপস্থিতি দুটোই শুদ্ধ বলে প্রচলিত থাকলে ওইসব শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। তবে, এই প্রসঙ্গে প্রমিত বানান রীতিকে প্রাধান্য দিতে হবে। উদাহরণ: ইঁট নয় ইট। কাঁচি, হুঁশিয়ার, জাহাঁপনা প্রভৃতি শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু না দিলেও চলে, কিন্তু বাংলা একাডেমি চন্দ্রবিন্দু দিয়েছে। তাই চন্দ্রবিন্দু যুক্ত বানানই প্রমিত।
 
২. বিখ্যাত বা সম্মাননীয় ব্যক্তির নামের পরিবর্তে ব্যবহৃত সর্বনাম পদে এবং সম্মানসূচক অর্থে ব্যবহৃত শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করা হয়। যথা: কুমকুম বাবু একজন আদর্শ শিক্ষক। তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি ছিল অতি উত্তম। ছাত্ররা তাঁকে অত্যন্ত সম্মান করত। অনুরূপভাবে সম্মানার্থে ‘এঁরা, ওঁরা, ওঁকে, ওঁ, এঁ, এঁদের, তাঁদের, তাঁকে, উঁহাদের, যাঁদের, এঁর’ প্রভৃতি। দন্ত্য-ন আছে এমন সর্বনামে ন নিজেই চন্দ্রবিন্দুর কাজ করে। তাই এখানে চন্দ্রবিন্দু নিষ্প্রয়োজন। যেমন: ইনি, তিনি, যিনি, উনি।
 
৩. নাসিক্য ধ্বনি/বর্ণের (ঙ ঞ ণ ন ম) ওপর কখনো চন্দ্রবিন্দু বসাবেন না। কারণ নাসিক্যবর্ণ নিজেই চন্দ্রবিন্দু হয়ে অন্য বর্ণের মাথায় সওয়ার হয়।
 
৪. যেসব সংখ্যাবাচক শব্দে নাসিক্য উচ্চারণ হয় সেসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু বসে। যেমন: পাঁচ, পঁচিশ, পঁচানব্বই, পঁয়তাল্লিশ, পঁচাশি ইত্যাদি। সহজ কথায় প-দিয়ে শুরু হওয়া সব সংখ্যাবাচক শব্দের পরে যদি ন না থাকে তাহলে ওই সব সংখ্যাবাচক শব্দের বানানের প্রারম্ভিক প-য়ে চন্দ্রবিন্দু হবে। যেমন: পঁচানব্বই কোটি পঁচিশ লাখ পঁয়ষট্টি হাজার পাঁচশ পনের টাকা পঁচাত্তর পয়সা।
 
৫. কিছু কিছু ধ্বন্যাত্মক ক্রিয়াবাচক শব্দে চন্দ্রবিন্দু বসে। যেমন: কাঁদা, কাঁদানো, দাঁড়া, দাঁড়ানো, খোঁজা, বাঁধা, বাঁধানো, কাঁপা, কাঁপানো। সংযোগমূলক ক্রিয়াপদের বানানেও চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার হয়। যেমন: চাঁদা তোলা, ফাঁক করা, খোঁচা দেওয়া, ছেঁকা দেওয়া, উঁকি দেওয়া, ফাঁসি খাওয়া ইত্যাদি।
 
৬. ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত ‘অ ঈ ঊ ঐ ঔ’ ধ্বনির সঙ্গে চন্দ্রবিন্দু যুক্ত হতে দেখা যায় না। তবে ‘অ্যা আ ই উ এ ও’ প্রভৃতি স্বরবর্ণের সঙ্গে চন্দ্রবিন্দুর স্বাধীন ব্যবহার রয়েছে। যেমন: অ্যাঁ, আঁইশ, আঁক, আঁকিবুঁকি, আঁখি, আঁচ, আঁটা, আঁটি, আঁচাআঁচি, আঁতাঁত (আঁতাত নয়), আঁদার-পাঁদার, ইঁচড়, ইঁদারা, উঁকি, উঁচু, উঁহু, এঁকে, এঁকেবেঁকে, এঁটেল, এঁড়ে, ওঁছা ইত্যাদি।
 
৭. কিছু কিছু শব্দের প্রথমে ‘য-ফলা+আ-কার (্যা)’ যুক্ত বর্ণে চন্দ্রবিন্দু হয়। যেমন: ক্যাঁচক্যাঁচানি, চ্যাঁচানি, চ্যাঁচামেচি, চ্যাঁচারি, ত্যাঁদড়, ত্যাঁদড়ামি, হ্যাঁ, হ্যাঁচকা, হ্যাঁগা প্রভৃতি।
 
৮. শব্দের সূচনায় চন্দ্রবিন্দু যুক্ত শব্দের য-ফলা সর্বদা আ-কার নিয়ে বসে। ক্যাঁক, ক্যাঁকক্যাঁক, ক্যাঁচক্যাঁচনি,ক্যাঁচরম্যাচর, খ্যাঁকশিয়াল, খ্যাঁচম্যাচ, ঘ্যাঁচ, ঘ্যাঁট, ঘ্যাঁচড়ানো, ছ্যাঁক, ছ্যাঁকা, ছ্যাঁচড়া, ছ্যাঁচানো, ছ্যাঁৎ, থ্যাঁতলা, ত্যাঁদড়, ট্যাঁ, ট্যাঁক, ট্যাঁকঘড়ি, ট্যাঁস, ঢ্যাঁঢামি, ঢ্যাঁড়শ, ঢ্যাঁড়া প্রভৃতি।
 
৯. বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত কিছু বিদেশি শব্দে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার প্রচলিত আছে। যেমন:
আরবি- তাঁবু, তাঁবে, তুঁত, হুঁকা;
ফারসি- জাহাঁপনা, জাঁহাবাজ, পিঁয়াজ, ফাঁদ, ফাঁশ, বাঁদি, র‌্যাঁদা, হুঁশ, হুঁশিয়ার;
তুর্কি- কাঁচি, বোঁচকা;
ফরাসি- আঁতাঁত, দাঁতাত, রেনেসাঁস।
ইংরেজি- কৌঁসুলি, জাঁদরেল, রেস্তোরাঁ, রোঁদ।
পর্তুগিজ- পেঁপে।
হিন্দি- আঁধি, কাঁচা, খাঁচা, খাঁজ, গঁদ, গাঁইতি, গাঁজা, ছাঁচি, ছাঁট, ঝাঁক, ঝুঁকি, টুঁটি, দোঁহা, ফেঁকড়া, বাঁদি, ভোঁতা।

শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু স্থাপন

চন্দ্রবিন্দু কোথায় বসাবেন? কার ওপরে বসবেন তিনি? দেখুন কোথায় বসাবেন।
১. নাসিক্যবর্ণ লোপ হওয়ার কারণে যেসব শব্দে চন্দ্রবিন্দু আসে সেসব শব্দে সাধারণত লোপকৃত নাসিক্যবর্ণের পূর্বের বর্ণে চন্দ্রবিন্দু বসাবেন— কোনো কার, স্বরচিহ্ন বা ফলার ওপর নয়। যেমন: অংশ>আঁশ, পঞ্চ>পাঁচ, বন্ধু>বঁধু, অন্ধকার>আঁধার, ধূম>ধোঁয়া, আমিষ>আঁশ, স্কন্ধ>কাঁধ প্রভৃতি।
চন্দ্রবিন্দু কোথায় বসানো উপযুক্ত তা পরীক্ষা করার জন্য একটি বর্ণে চন্দ্রবিন্দু দিয়ে দেখুন: আঁ, ইঁ, ঈঁ, উঁ, ঊঁ, এঁ, ওঁ, তঁ, জঁ, হঁ, লঁ, পঁ, যঁ, সঁ। এখানে প্রতিটি বর্ণের ওপর চন্দ্রবিন্দু বসেছে। অনুরূপ: বঁটি, বঁধু, ভঁইস, খিঁচুনি, গিঁট, চিঁহি, সিঁড়ি, কুঁড়ে, খুঁটি, গুঁজা, পুঁই, পুঁটি, কেঁচো, পেঁপে, ভেঁপু,হুঁশিয়ার, হেঁয়ালি প্রভৃতি।
দন্ত>দাঁত, কম্পন>কাঁপা, বংশী>বাঁশি, হংস>হাঁস, বৃন্ত>বোঁটা, সন্ধ্যা>সাঁঝ; ছোঁ, ছোঁড়াছুঁড়ি, জাহাঁপনা, কাঁচি, চ্যাঁচামেচি, চ্যাঁচারি, ত্যাঁদড়, হ্যাঁ, ত্যাঁদড়ামি প্রভৃতি শব্দের চন্দ্রবিন্দুভবন দেখতে পারেন। এসব কম্পোজ-শব্দ দেখে মনে হতে পারে স্বর-চিহ্নের উপর চন্দ্রবিন্দু বসেছে। আসলে তা নয়, চন্দ্রবিন্দুটি বসেছে যে স্বরচিহ্নে (আ-কার) চন্দ্রবিন্দুটি বসেছে মনে হচ্ছে; ঠিক তার পূর্বের ব্যঞ্জনের ওপর। কারণ ওই বর্ণটিই নাসিক্য-চিৎকার দেয়।
 
২. যেসব শব্দ ১নং বিধি মানে না সেসব শব্দে যে বর্ণটি নাসিক্য উচ্চারণ দেবে তার ওপর চন্দ্রবিন্দু দেবেন। যেমন: পলাণ্ডু থেকে পিঁয়াজ/পেঁয়াজ, সংক্রম>সাঁকো।
 
৩. নাসিক্যবর্ণ লোপ না পেয়েও শব্দে চন্দ্রবিন্দু হয়। যেমন: বক্র থেকে বাঁক; কর্কর থেকে কাঁকর; ক্ষত থেকে খুঁত; খড়্‌গ থেকে খাঁড়া, ঘৃষ্ট থেকে ঘ্যাঁচড়া, ছাতন থেকে ছাঁটা, ছিত্বর থেকে ছ্যাঁচড়, ছিদ্র থেকে ছ্যাঁদা। এরূপ শব্দে যে বর্ণটি নাসিক্য উচ্চারণ দেবে ১নং বিধি অনুযায়ী ঠিক তার মাথার ওপর চন্দ্রবিন্দু হবে। যেমন বক্র>বাঁক, বিদ্ধ>বিঁধ, যূথিকা>জুঁই, শস্য>শাঁস, শুষ্ক>শুঁটকি।
 
৪. ঋ-দিয়ে শুরু করা সব শব্দই তৎসম। তাই ঋ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
 
৫. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে ঐ-বর্ণ এবং ও-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া সব শব্দ তৎসম। এজন্য ঐ-বর্ণ এবং ও-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেখা যায় না।
 
৬. যুক্ত হোক বা বিযুক্ত হোক মূর্ধন্য-ণ যুক্ত কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। নাসিক্যবর্ণ ত্যাগ করে চন্দ্রবিন্দু আসে বলে চন্দ্রবিন্দুযুক্ত শব্দে নাসিক্য বর্ণের উপস্থিতি বিরল।
 
৭. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে মূর্ধন্য-ষ যুক্ত কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেখা যায় না। ব্যতিক্রম: ষাঁড়, ষাঁড়া, ষাঁড়াষাঁড়ি।
 
৮. যুক্তব্যঞ্জনের ওপর চন্দ্রবিন্দু হয় না। চন্দ্রবিন্দু-যুক্ত শব্দগুলো যুক্তব্যঞ্জনহীন হয়।
 
৯. বিসর্গযুক্ত এবং বিসর্গসন্ধি সাধিত শব্দসমূহে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
 
১০. বহুবচন বাচক গণ মণ্ডলী বৃন্দ বর্গ আবলি গুচ্ছ দাম নিকর পুঞ্জ মালা রাজি রশি প্রভৃতির যে কোনো একটি থাকলে ওই শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
 
১১. উপমান কর্মধারয়, উপমিত কর্মধারয় এবং রূপক কর্মধারয় সমাস গঠিত শব্দে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
 
১২. অব্যয়ীভাব ও প্রাদি সমাস দ্বারা গঠিত পদগুলোতে সাধারণত চন্দ্রবিন্দু হয় না।
 
১৩. শব্দের শেষে তব্য ও অনীয় থাকলে ওইসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন: কর্তব্য, মন্তব্য, দ্রষ্টব্য, ভবিতব্য, করণীয়, দর্শনীয়, বরণীয়, রমণীয়।
 
১৪. শব্দের শেষে তব্য, অনীয় থাকলে ওইসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না। কর্তব্য, ভবিতব্য, অনুষ্ঠাতব্য, বরণীয়, করণীয়, দর্শনীয়, রমণীয় প্রভৃতি।
 
১৫. শব্দের শেষে তা, ত্ব,তর, তম, বান, মান, মাণ, এয়, ঈয়, র্য প্রভৃতি থাকলে ওই শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
 
১৬. প্র প্ররা অপ সম অব অন নির্‌ (নিঃ‌), দুর(দঃ), উৎ, অধি, পরি, প্রতি, উপ, অভি, অতি প্রভৃতি শব্দ যুক্ত থাকলে সেগুলোর বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
 
১৭. ঙ ঞ ণ ম ন ং প্রভৃতি ব্যঞ্জনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই বর্ণগুলো সংস্কৃত থেকে অপভ্রষ্ট হয়ে তদ্ভব শব্দে চন্দ্রবিন্দু রূপ ধারণ করে বাংলায় অবস্থান করে। যেমন: অঞ্চ >আঁচ, অঞ্চল>আঁচল, ষণ্ড>ষাঁড়, গ্রাম>গাঁ, শঙ্খ>শাঁখ, ঝম্প>ঝাঁপ, বংশ>বাঁশ, সিন্দুর>সিঁদুর, সামন্তপাল>সাঁওতাল, চম্পা>চাঁপা, কঙ্কন>কাঁকন, কণ্টক>কাঁটা, ভাণ্ড>ভাঁড়।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
 
উৎসের অনুনাসিক বর্ণহীন চন্দ্রবিন্দু
সাধারণত সংস্কৃত শব্দের নাসিক্যবর্ণ বা অনুনাসিক বর্ণ লোপ পেলে অতৎসমে চন্দ্রবিন্দু আসে। কিন্তু কিছু কিছু সংস্কৃত শব্দে অনুনাসিক বর্ণ না থাকলেও তৎসমে চন্দ্রবিন্দু দেওয়া হয়। নিচের এরূপ শব্দের কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো:
 
সংস্কৃত অক্ষি থেকে বাংলায় আঁখি;
সংস্কৃত অধঃস্তাৎ থেকে বাংলায় হেঁট;
সংস্কৃত অস্থি থেকে বাংলায় আঁটি;
সংস্কৃত উচ্চ থেকে বাংলায় উঁচু;
 
সংস্কৃত উদ্র থেকে বাংলায় ভোঁদড়;
সংস্কৃত কক্ষ থেকে বাংলায় কাঁখ;
সংস্কৃত কর্কর থেকে বাংলায় কাঁকর;
সংস্কৃত কর্কট থেকে বাংলায় কাঁকড়া;
 
সংস্কৃত কর্কোটক থেকে বাংলায় কাঁকরোল;
সংস্কৃত কুটির থেকে বাংলায় কুঁড়ে [উদা. কুঁড়েঘর];
সংস্কৃত কুব্জ থেকে বাংলায় কুঁজ, কুঁজা ও কুঁজো;
সংস্কৃত কূর্চ্চিকা থেকে বাংলায় কুঁচি;
 
সংস্কৃত ক্ষত থেকে বাংলায় খুঁত;
সংস্কৃত খড়্গ থেকে বাংলায় খাঁড়া;
সংস্কৃত খোড থেকে বাংলায় খোঁড়া;
সংস্কৃত ঘট্টা থেকে বাংলায় ঘুঁটা ও ঘোঁটা;
 
সংস্কৃত ঘট্ট থেকে বাংলায় ঘাঁটা;
সংস্কৃত ঘর্ষ থেকে বাংলায় ঘেঁষা;
সংস্কৃত ঘৃষ্ট থেকে বাংলায় ঘ্যাঁচড়া;
সংস্কৃত ছাতন থেকে বাংলায় ছাঁটা;
 
সংস্কৃত ছিত্বর থেকে বাংলায় ছ্যাঁচড়;
সংস্কৃত ছিদ্র থেকে বাংলায় ছ্যাঁদা;
সংস্কৃত জলৌকা থেকে বাংলায় জোঁক;
সংস্কৃত জুট থেকে বাংলায় ঝুঁটি;
 
সংস্কৃত ঝর্ঝর থেকে বাংলায় ঝাঁজ ও ঝাঁজরা;
সংস্কৃত তষ্ট থেকে বাংলায় চাঁছা;
সংস্কৃত ধৃষ্ট থেকে বাংলায় ঢাঁট;
সংস্কৃত পর্পট থেকে বাংলায় পাঁপড়;
 
সংস্কৃত পাশ থেকে বাংলায় ফাঁস;
সংস্কৃত পীঠ থেকে বাংলায় পিঁড়ি;
সংস্কৃত পীপিলিকা থেকে বাংলায় পিঁপড়া;
সংস্কৃত পুস্ত ও পুচ্ছ থেকে বাংলায় পোঁছা;
 
সংস্কৃত পূয় থেকে বাংলায় পুঁজ;
সংস্কৃত পেচক থেকে বাংলায় প্যাঁচা;
সংস্কৃত পোট্টলি থেকে বাংলায় পোঁটলা;
সংস্কৃত প্রলেপ থেকে বাংলায় পোঁচড়া ও পোঁচলা;
 
সংস্কৃত প্রহেলিকা থেকে বাংলায় হেঁয়ালি;
সংস্কৃত প্রোথিত থেকে বাংলায় পোঁতা;
সংস্কৃত প্রোষ্ঠী থেকে বাংলায় পুঁটি;
সংস্কৃত ফক্কিকা থেকে বাংলায় ফাঁকি;
 
সংস্কৃত ফুৎকার থেকে বাংলায় ফুঁ, ফুঁক, ফুঁকা ও ফোঁকা;
সংস্কৃত বক্র থেকে বাংলায় বাঁক;
সংস্কৃত বিদ্ধ থেকে বাংলায় বিঁধ;
সংস্কৃত যূথিকা থেকে বাংলায় জুঁই;
 
সংস্কৃত শস্য থেকে বাংলায় শাঁস;
সংস্কৃত শুষ্ক থেকে বাংলায় শুঁটকা ও শুঁটকি;
সংস্কৃত শূচিবায়ু থেকে বাংলায় ছুঁচিবাই;
সংস্কৃত শ্রেঢ়ী থেকে বাংলায় সিঁড়ি;
 
সংস্কৃত শৌচ থেকে বাংলায় ছোঁচা;
সংস্কৃত সজ্জা থেকে বাংলায় সাঁজোয়া;
সংস্কৃত সত্য থেকে বাংলায় ছাঁচি [উদা. ছাঁচিপান];

চন্দ্রবিন্দু হয় না কেন

ঙ, ঞ, ন, ণ, ম, এবং অনুস্বার (ং) এ নাসিক্যব্যঞ্জনগুলোর সাথে চন্দ্রবিন্দু যুক্ত হয় না কেন?
 
ঙ, ঞ, ন, ণ, ম এবং ং (অনুস্বার) ব্যঞ্জনগুলোর একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও বুৎপত্তি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এ বর্ণগুলো মূল সংস্কৃত শব্দ থেকে সুস্পষ্টভাবে অপভ্রষ্ট হয়ে তদ্ভব শব্দে চন্দ্রবিন্দুর রূপ ধারণ করে বাংলা ভাষায় অবস্থান করে। যেমন: অন্ত্র থেকে আঁত, অঞ্চল থেকে আঁচল, ষণ্ড থেকে ষাঁড়, গ্রাম থেকে গাঁ, শঙ্খ থেকে শাঁখ, ঝম্প থেকে ঝাঁপ, বংশ থেকে বাঁশ, সিন্দুর থেকে সিঁদুর, সামন্তপাল থেকে সাঁওতাল, চম্পা থেকে চাঁপা, কঙ্কন থেকে কাঁকন, কণ্টক থেকে কাঁটা, ভাণ্ড থেকে ভাঁড় ইত্যাদি। এ জন্য নাসিক্যব্যঞ্জনগুলোর সাথে চন্দ্রবিন্দু যুক্ত হয় না।
 
[বিধুভূষণের মন্তব্য: ওরা নিজেরাই চন্দ্রবিন্দুর আশ্রয়ে অন্যের মাথায় বসে, তাই বোধ হয় তাদের মাথায় চন্দ্রবিন্দুকে বসতে বলার সাহস পায় না! আচ্ছা, এই নাসিক্য বর্ণগুলোর অদৃশ্য হয়ে ঁ হওয়ার সাথে কী আমাদের মরার পর নামের আগে ঁ ব্যবহারের (যেমন- আমি মরার পর ঁবিধুভূষন হয়ে যাবো) কোন যোগসূত্র আছে?!]

পঁচা বনাম পচা

শুবাচ-এর ওয়েবসাইট: শুবাচ-এর ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
বাংলা পচা অর্থ (ক্রিয়াবিশেষ্যে) গলে যাওয়া, বিকৃত হওয়া, দুর্গন্ধযুক্ত হওয়া; (বিশেষ্যে) বিকৃত, খারাপ, নষ্ট।নষ্ট, বিকৃত, খারাপ প্রভৃতি অর্থে পচা লিখুন। পঁচা লিখবেন না। নষ্ট বা খারাপ জিনিসে চন্দ্রবিন্দু থাকে না। যেমন: পচা মাছে ভারি দুর্গন্ধ। পচা জিনিস খেলে পেট খারাপ হয়। পচা লোক পচা কথা বলে
পচা মানে নষ্ট, কিন্তু পঁচা মানে পঞ্চ বা পাঁচ। সংস্কৃত পঞ্চ থেকে উদ্ভূত পাঁচ আঞ্চলিক ভাষায় কোথাও কোথাও পঁচা। কথ্য এমনকি প্রমিত কথাতেও পাঁচ অর্থে পঁচা শব্দের ব্যবহার আছে। পঞ্চগড়কে একসময় বলা হতো পঁচাগড় (পঞ্চগড়)। পঁচা দিন গেল, তবু লোকটি আমার এলে না। পঁচা বছর আগের কথা।
আলমের পঁচা সাবান মানে আলমের বিকৃত বা নষ্ট সাবান নয়; পঞ্চ সাবান, পঁচা মিয়ার সাবান ইত্যাদি।
পঁচানব্বই মানে নষ্টনব্বই নয়, ৯৫।
পঁচা+আশি= পঁচাশি।
৮৫।

ষাঁড় বানানে চন্দ্রবিন্দু কেন

বাবা, ছেলে বললেন, “ষাঁড় বানানে চন্দ্রবিন্দু দেব না।”
দেখো বাবা, পাগলামি করো না, চন্দ্রবিন্দুটা দাও। বাংলায় ষাঁড়-এর মতো সম্মানি শব্দ আর নেই। অতৎসম হয়েও সে একাই ষ আর চন্দ্রবিন্দু ধারণ করে আছে। তুমি আরেকটা শব্দ দেখাও যেখানে ষ-এর মাথায় চন্দ্রবিন্দু আছে। অসুর হয়েও ব্রাহ্মণের ষ নিয়ে- বাংলায় রাজত্ব করছে ষাঁড়। তাকে আমাদের সম্মান করা উচিত।
ছেলে: কিন্তু চন্দ্রবিন্দু দেব কেন? গোরু, চন্দ্রবিন্দু নিয়ে কী করবে?
ষাঁড়ের মাথায় যা আছে তা চন্দ্রবিন্দু নয়।
কী?
শিং। শিং ছাড়া কি ষাঁড় হয়? গুঁতো দেবে কীভাবে?
তাহলে, স্যার-এর মাথায় চন্দ্রবিন্দু নেই কেন? তারাও তো গুঁতো দেয়।
স্যার-এর পিঠে প্যাঁচালো য-ফলা আছে-না? মনে করো ওটাই শিং।
প্যাঁচালো য-ফলা কেন?
স্যারগণ প্যাঁচাল মারেন বেশি, তাই।
কিন্তু, সার বানানে তো আ-কার ছাড়া কিছু নেই।
যার গুণ আছে তার অত ফলা-মলা লাগে না, আ-কারই যথেষ্ট।
সর বানানে তো আ-কারও নেই।
সার-এর চেয়ে সর এক কাঠি সরস। সরস বানানেও আ-কার-ই-কার নেই।
বাবা, পাইছি।
কী পাইছ?
রস।
কীভাবে?
সর উলটিয়ে।
বাবা বললেন, তোমার মামার বাড়ি অভয়নগর। আ-কার-ই-কার নেই।
আমাদের মতলব উপজেলা বানানেও তো বাবা ই-কার-ই-কার নেই।

চন্দ্রবিন্দু সমাচার: কৌতুকে কৌতূহল

ছাত্র: স্যার, দাঁড়াও শব্দের মাথায় চন্দ্রবিন্দু আছে, কিন্তু দৌড়াও শব্দের মাথায় নেই কেন?
শিক্ষক: তুমি কি মাথায় বোঝা নিয়ে দৌড়াতে পারবে?
না, স্যার।
শিক্ষক: তারপরও যদি বোঝা নিয়ে দৌঁড় দাও, তো কী হবে?
ছাত্র: বোঝাটা মাথা থেকে পড়ে যাবে। হাঁটু ভেঙে যাবে।হাঁটতে পারব না আর।
শিক্ষক: ধরে নাও, চন্দ্রবিন্দু তোমার মাথার বোঝা। দাঁড়ানো অবস্থায় ওটি মাথায় ছিল। কিন্তু দৌড় দেওয়াতে পড়ে গেছে। তাই দাঁড়াও শব্দে চন্দ্রবিন্দু আছে, কিন্তু দৌড়াও শব্দে নেই।
ছাত্র: হাঁটা আর হাঁটু শব্দে চন্দ্রবিন্দু কেন?
হাঁট-হাঁটু দৌড় নয়। বুঝেছ?
বুঝেছি।
কী বুঝেছ?
ছাত্র: দাঁড়ানো অবস্থা থেকে হাঁটা পর্যন্ত হাঁটু অবধি চন্দুবিন্দু থাকে। দৌড় শুরু করলে মাথার ‘চন্দ্রবিন্দু’ ধুলায় গড়াগাড়ি খায়। তাই দাঁড়া, হাঁটা ও হাঁটু বানানে চন্দ্রবিন্দু, কিন্তু দৌড়া বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই। কিন্তু, স্যার হাঁস বানানে চন্দ্রবিন্দু কেন?
চন্দ্রবিন্দু হচ্ছে হাঁসের নৌকা।
—————————
সূত্র: বাঙালির বাংলা হাসি, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

কিছু সাধারণ ভুল, যা অনেকে করেন

কাচ:কাচ বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই। কাচের জিনিস ভেঙে গেলে চন্দ্রও ভেঙে যেতে পারে। তাই কাচ বানানে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। একটা মাত্র চাঁদ, ভেঙে গেলে জ্যোৎস্না আপুর কী হবে?
পচাপচা বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই। যেমন: পচা মাছ। পচা জায়গায় চন্দ্র থাকে না। পচা মাথায় চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। পাঁচ-এর মাথায় দেবেন।
যাবৎ: যাবৎ বানানে ত নেই, ৎ দিতে হবে। যাবৎ বানানে আস্ত-ত দিলে ‘যাব ত’ হয়ে যাবে। যাবৎ আর ‘যাব ত’ এক জিনিস নয়।
এযাবৎ:এযাবৎ লিখুন, এযাবত লিখবেন না।
তফাত:তফাত বানানে ৎ নেই, দুটোই আস্ত-ত। কাউকে আস্ত-ত আবার কাউকে খণ্ড-ৎ দিলে পাপ হবে। ন্যয়বিচার করুন। আল্লাহ দয়া করবেন।
উচিত: উচিত বানানে ৎ দেবেন না। প্রিয়জনের জন্য খণ্ড জিনিস নিয়ে যাওয়া উচিত হবে না। উচিত মানুষ কখনো অনুচিত কাজ করে না।
দাড়ি, দাঁড়ি: মুখের দাড়িতে চন্দ্রবিন্দু নেই, কিন্তু বাক্যের দাঁড়িতে চন্দ্রবিন্দু লাগবে। মুখের দাড়ি ঝুলে থাকে। তাই চন্দ্রবিন্দু পড়ে যায়। বাক্যের দাঁড়ি, দাঁড়িয়ে থাকে। তার মাথায় দাঁড়া বানানের চন্দ্রবিন্দু দিলে পড়ে না।
গা গাঁ: গা যদি শরীর হয় চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। গাঁ যদি গ্রাম হয়, চন্দ্রবিন্দু দিতে হয়। শরীরের ওপর চন্দ্রবিন্দু থাকে না; গ্রামের ওপর চন্দ্রবিন্দু থাকে।
 
ফোঁটা ফোটা, দেখতে হবে না মেয়েটি কার! ::
মাম লিখতে বলেছে, “এক ফোঁটা জল পেলে সজীব হয়ে ওঠত ফোটা ফুলটা।”
শামীমা লিখল, “এক ফোটা জল পেলে সজীব হয়ে ওঠত ফোঁটা ফুলটা।”
বাক্যটি বারবার দেখছিল শামীমা ।
ফোটা আর ফোঁটা নিয়ে ভারি মুশকিলে পড়ে যায় সে।
হঠাৎ শামীমার চুল থেকে তারার মতো দুই বিন্দু জল খসে পড়ল খাতায়। এক বিন্দু জল ‘ফোটা’ শব্দের ‘ফ’ বর্ণে চন্দ্রবিন্দু হয়ে বসে গেল। আর এক বিন্দু জল ‘ফোঁটা’ শব্দের চন্দ্রবিন্দুটা অমাবস্যার চাঁদের মতো বিলীন করে দিল।
হায় হায়, কী হবে, বানান ভুল হলে তো মা আস্ত রাখবে না। শামীমা হাত দিয়ে ‘ফোঁটা’ আর ‘ফোটা’ শব্দদুটোকে আগের মতো করতে যাবে এসময় তার মাম এসে গেল।
খাতা দেখে মাম বলল, এতদিন পর তুমি ফোঁটা আর ফোটা শব্দের বানান ঠিকভাবে লিখতে পারলে।মা আমার ভালো হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।
শামীমা খুশি হলো। কিন্তু সে তো জানে এই কৃতিত্ব তার নয়, চুলবিন্দুজলের।
আসল কথা জানিয়ে দেওয়ার জন্য মামকে বলল,
শুদ্ধ কীভাবে হলো জান মাম?
মাম বলল, জানি।
কীভাবে?
মাম বলল, ‘ফোঁটা’ শব্দের অর্থ হচ্ছে তরল পদার্থের বিন্দু, টিপ, তিলক, ছোটো, বিন্দুচিহ্ন ইত্যাদি। তাই তুমি বিন্দু অর্থ প্রকাশিত ফোঁটা শব্দের মাথায় চন্দ্রবিন্দু দিয়েছ। আমরাও ছোটোবেলায় এভাবে মনে রেখেছি। ‘ফোটা’ শব্দের অর্থ প্রস্ফুটিত হওয়া, প্রকাশিত হওয়া, বিস্ফোরিত হওয়া, সেদ্ধ হওয়া, উন্মিলিত হওয়া ইত্যাদি। এখানে বিন্দুর কোনো কাজ নেই। তাই তুমি বিন্দু দাওনি। ঠিক বলেছি না?
মায়ের কথায় শামীমা বুঝে গেল ফোঁটা আর ফোটা কী। সে আর আসল কথা খুলে বলল না।
বুদ্ধিমান মেয়ের মতো বলল, মাম, তুমি বড্ড চালাক। কিন্তু – – –
কিন্তু আবার কী?
আমি তোমার চেয়েও চালাক।
শামীমার মাম বলল, দেখতে হবে না মেয়েটা কার!

কোনো এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোনো রূপকথা নয় সে নয়—। হেমন্ত বাবুর গানটি মনে রাখবেন।
 

বাঁদরের বাঁদরামি বাঁশ বাগানের মাথায়

সংস্কৃত বংশ অনুস্বার ছেড়ে বাপের বাড়ি হতে ছোঁ মেরে চন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে পঁয়ত্রিশটা হাঁস নিয়ে সাঁই সাঁই করে ছাঁদনতলা দিয়ে বাংলা গাঁয়ে চলে এসেছেন। চন্দ্রবিন্দু নয়, যেন সাঁচি বাংলা-বঁধুর সিঁদুরে মমতায় ঘেঁষা নিবিড় ছোঁয়া। বঁধুয়া আমার চোখে জল এনেছে হায় বিনা কারণে- – -।
তাই আমরা প্রিয় বঁধু চন্দ্রবিন্দুকে নিচে নামাই না। সম্মানিত সব গুরুজনের মাথায় বসিয়ে নাকি সুরে বলি- তাঁর, তাঁরা, তাঁদের, যাঁরা, জাঁহাপনা, জাঁদরেল। কী দারুণভাবে গেয়েছেন রবিঠাকুর: চাঁদের হাসির বাধ ভেঙেছে- – -।
বাঁশ বাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই- – -। তাই বাঁশ বানানে চন্দ্রবিন্দু দিতে হয়। একই কারণে বাঁশসংক্রান্ত এবং বাঁশ দিয়ে তৈরি সামগ্রীর বানানেও চন্দ্রবিন্দু লাগে। যেমন: বাঁশি, বাঁশগাড়ি, বাঁশপাতা, বাঁশরি, বাঁহুক, বাঁশঝাড়, ভেঁপু। বাঁশ হয় ভূমিতে।তাই ভুঁই ভুঁইয়াতেও তিনি। বারোভুঁইয়া কীভাবে হবেন চন্দ্রবিন্দু ছাড়া? দাঁড়াতেও তো চন্দ্রবিন্দু লাগে।
বাঁশ থেকে আাঁশ। তাই আঁশ বানানেও চন্দ্রবিন্দু। আঁশ থেকে দড়ি, দড়ি থেকে বাঁধন। এজন্য বাঁধা, বাঁধন, বাঁধানো, বাঁধাবাঁধি, বাঁধুনি শব্দেও চন্দ্রবিন্দু। বাশঁ দিয়ে ঝাঁটা-ঝাঁকা। তাই ঝাঁটা, ঝাঁকা, ঝাঁকানো, ঝাঁকনি, ঝাঁকুনি, ঝাঁকরানো- এমনকি ঝাঁকড়া চুলেও চন্দ্রবিন্দু শোভা পায়।
শুধু তাই নয়, যেখানে বাঁধাবাঁধি সেখানে চন্দ্রবিন্দু। যেমন: বাঁধাকপি, বাঁধনছাড়া, বাঁধাধরা, বাঁধনহারা। বাঁধন ছেঁড়ার প্রশ্ন এলেও দড়ি। বাঁধার মতো ছিঁড়তেও রশি লাগে। বাঁধন না থাকলে ছিঁড়েবেন কী? বিয়ে না করে কি তালাক দেওয়া যায়?
এজন্য ছেঁড়া বানানেও চন্দ্রবিন্দু। যেমন: বাঁধনছেঁড়া। ছিঁড়ে গেলে সেলাই। সুঁই ছাড়া কি সেলাই করা যায়? তাই সুঁই বানানেও তিনি।
চাঁদ দেখতে বাঁকা। এজন্য সব বাঁকা বানানে চন্দ্রবিন্দু। নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে। বাঁক, বাঁকা, বাঁকানল, বাঁকাচোরা, বাঁকানো এমনকি বাঁওড় বানানও বাঁকা চন্দ্রবিন্দু ছাড়া চলতে পারে না।
বাঁদরের বাঁদরামি বন্ধ করার জন্য বাঁধতে হয়। তাই বাঁদর, বাঁদরামি, বাঁদরামো বানানেও চন্দ্রবিন্দু।
নেই তিনি কোথায়? দাঁতের ফাঁকে বৃষ্টির ফোঁটায়;
লক্ষ্মীপ্যাঁচার হাঁটুতে আর পাঁচমিশালি ধাঁধায়।

সর্বনামে চন্দ্রবিন্দু: তার ও তাঁর কখন দেবেন চন্দ্রবিন্দু

সম্মানিত ব্যক্তির জন্য ব্যবহৃত সর্বনামে বাক্যবিশেষে চন্দ্রবিন্দু বা নি উনি প্রভৃতির ব্যবহার শোভনীয় রীতি। যেমন: তার>তাঁর; তাহার>তাঁহার; তাদের>তাঁদের; তাহাদের>তাঁহাদের; ইনি, তিনি, যিনি, উনি, উনাদের প্রভৃতি।
প্রশ্ন হলো সম্মানিত ব্যক্তি কে?
একজন ব্যক্তি সবার কাছে সমানভাবে বিবেচিত নাও হতে পারেন। কারও সর্বোচ্চ সম্মানের ব্যক্তি কারো কাছে নিকৃষ্ট বা ঘৃণার্হ ব্যক্তিও হতে পারেন। তাই আপনি যাকে সম্মানিত মনে করবেন, সম্মানের যোগ্য মনে করবেন কিংবা সম্মান দিতে চাইবেন তিনিই আপনার জন্য সম্মানিত। অন্যে তাঁকে কীভাবে নিচ্ছেন তা আপনার বিষয় নয়।
তবে, মনে যাই থাকুক না কেন, নিজেকে সম্মানিত করার জন্য অন্তত বাক্যে হলেও বয়স্ক, প্রবীণ, জ্যেষ্ঠ, শিক্ষক, গুরুজন, অপরিচিত, সাধারণ বিবেচনায় সম্মান করা সমীচীন- এমন ব্যক্তিবর্গের জন্য ব্যবহৃত সর্বনামে সম্মানসূচক চিহ্ন বা প্রত্যয় ব্যবহার ভদ্রতার পরিচায়ক। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে অবশ্যই সম্মান করবেন, কিন্তু আপনার কাছে গুরুত্বহীন বলে কাউকে সম্মান করবেন না তা উচিত নয়। এতে বরং আপনিই গুরুত্বহীন ও অসম্মানের শিকার হয়ে পড়বেন।
সম্মান এমন একটি বিষয় যা আপনি অন্যকে যতই দেবেন তা তত অনুপম স্নিগ্ধতায় আপনাকে সম্মানিত করার জন্য এগিয়ে আসবে।

কুঁড়ে কুঁড়ে কুঁড়া: নিমোনিক

কুঁড়ে ভুক্তি দুটি।
সংস্কৃত কুটির থেকে উদ্ভূত কুঁড়ে অর্থ— (বিশেষ্যে) খড় পাতা ঘাস প্রভৃতির ছাওয়া ছোটো ঘর (কুঁড়েঘর)। কুঁড়েঘরে খড়-পাতা আর ঘাসের ছাউনি ভেদ করে রাতে চাঁদের আলো প্রবেশ করে। তাই কুঁড়ে বানানে চন্দ্রবিন্দু।
২. দেশি কুঁড়ে অর্থ— (বিশেষণে) অলস। কুঁড়েমি অর্থ— (বিশেষ্যে) আলস্য। যারা অলস তাদের কুঁড়ে ঘরে থাকতে হয়। তাই অলস অর্থদ্যোতক কুঁড়ে বানানেও চন্দ্রবিন্দু। কুঁড়েমিতে অভ্যস্ত কুঁড়েরা কুঁড়েঘরে বসে ধানের কুঁড়া বাছে। তাই ধানের কুঁড়া বানানেও চন্দ্রবিন্দু।

পাপড়িতে নেই পাঁপড়ে আছে

পাপড়ি বাংলা শব্দ। বাক্যে সাধারণত বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত পাপড়ি অর্থ ফুলের দল। শব্দটির বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই। মনে রাখবেন পাপড়ি দেবীর পায়ের নিচে থাকে। তাই পাপড়ি মানে পায়ে পড়ি। এজন্য পাপড়ি থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল ঝরে পড়লেও বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই।
তবে ছাইপাঁশ না খেয়ে পাঁচিল ডিঙিয়ে পাঁঠার মাংস সহযোগে পাঁপড় ও পাঁচফোড়ন খাওয়ার পাঁয়তারা এসব বানানের সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ বানানের মতো পাঁজর ও পাঁড়মাতাল বানানেও চন্দ্রবিন্দু দিতে হবে।

কাঁচা কাচা কচি কাচ

ও সাগর কন্যারে কাঁচা সোনা গায় —।
কাঁচা: কাঁচা অর্থ (বিশেষণে) অপক্ব (ক্-য়ে ব), অপরিণত, অস্থায়ী, অশুষ্ক, পারদর্শী নয় এমন। এটি দেশি শব্দ। কাঁচা ফল পাকা ফলের চেয়ে শক্ত। তাই কাঁচা ফল খেতে ছুরি লাগে। চন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ছুরি। এজন্য কাঁচা বানানে ছুরির প্রতীক চন্দ্রবিন্দু দিতে হয়। কাঁচার মতো কাঁচা-যুক্ত সব শব্দে চন্দ্রবিন্দু।বীন্দ্রনাথের ভাষায়, ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা- – -।
কাঁচা আম, কাঁচা কাজ, কাঁচাগোল্লা, কাঁচা ঘুম, কাঁচা চুল, কাঁচা টাকা, কাঁচাপাকা, কাঁচা বয়স, কাঁচাবাজার, কাঁচা বুদ্ধি, কাঁচামাল, কাঁচামিঠা, কাঁচা রসিদ, কাঁচা লেখা, কাঁচা মাংস, কাঁচা ইট, কাঁচা বুদ্ধি, কাঁচা ঘর, কাঁচা হাতের কাজ, কাঁচা বয়স, কাঁচা হিসাব, কাঁচা সোনা, কাঁচা কাঠ, কাঁচা সের, কাঁচা রাস্তা- সব কাঁচায় চন্দ্রবিন্দু।
কাপড় কাচা: তবে কাপড় কাচতে গেলে চন্দ্রবিন্দু পড়ে যেতে পারে। তাই কাপড় কাচার কাচা বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই।
কচি: কচি বানানে চন্দ্রবিন্দু নেই কেন? কচি মানে কাঁচা নয়, শিশু, নবজাত, কোমল, নরম। যেমন: কচিখোকা, কচিকাঁচার আসর। কচিদের মাথায় চন্দ্রবিন্দুর বোঝা দিতে নেই। পিঠ তাদের এমনই বইয়ের ভারে ন্যুব্জ।
গ্লাসের কাচ: কিন্তু গ্লাসের কাচে চন্দ্রবিন্দু নেই কেন? কাচ একটি ভঙুর জিনিস। হঠাৎ পড়ে গেল কাচের সঙ্গে চন্দ্রবিন্দুটাও ভেঙে যেতে পারে। একটামাত্র চন্দ্র ভেঙে গেলে জোছনা আপুর কী হবে? তাই কাচের গ্লাসের কাচ বানানে চন্দ্রবিন্দু দিতে নেই।

হ্যাঁ ও জি

হ্যাঁ: সম্মতি বা স্বীকৃতমূলক উক্তিঅর্থে হ্যাঁ শব্দের বানানে য-ফলা এবং চন্দ্রবিন্দু দুটোই লাগবে।
জি: মান্যব্যক্তির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত শব্দজি বানানে ই-কার দেবেন। তবে জ-এর নিচে অন্তস্থ-ব দেবেন না। জী, জ্বী, জ্বি প্রভৃতি ভুল। লিখুন: জি। যেমন: জি হ্যাঁ;
সূত্র: ড. মোহাম্মদ আমীন, ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
সর্বনামে সম্মানসূচক চন্দ্রবিন্দু-র প্রয়োগ
হায়াৎ মামুদ আমার শিক্ষক হলেও তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক বন্ধুর মতো। ওঁর (তাঁর) শিশুবিষয়ক লেখা আমাকে মুগ্ধ করে। তাঁর চেয়ে সরল মানুষ আমি দেখিনি। আমি যাঁদের শ্রদ্ধা করি তিনি তাঁদের একজন।যাঁরা আমাকে স্নেহ করেন তিনিও তাঁদের একজন। যাঁরা শিক্ষক তাঁরা কখনো আদর্শ হতে চ্যুত হতে পারেন না। যাঁরা হন, ওঁরা আসলে শিক্ষক নন। শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, ত্যাগ। এখন অধিকাংশ শিক্ষক ত্যাগ ছেড়ে বাণিজ্যে। এঁদের (তাঁদের) আমার ভালো লাগে না।
 
 
 
#চন্দ্রবিন্দু ঁ কখন এবং কেন ব্যবহার হয়।
তৎসম শব্দ থেকে যখন অনুনাসিক বা নাসিক্য ধ্বনি উঠে যায় তখন যে স্থান থেকে নাসিক্য বর্ণ উঠে যায় তার পূর্বের বর্ণের উপর চন্দ্রবিন্দু বসে।
যেমন-
পঞ্চ= পাঁচ
এখানে নাসিক্য বর্ণ ‘ঞ’ চলে যাওয়ায় ‘প’ এর উপর চন্দ্রবিন্দু যুক্ত হয়ে পাঁচ হয়েছে ।
তেমনি,
কাঞ্চা থেকে কাঁচা,
বঙ্কিম থেকে বাঁকা
ক্রন্দন থেকে কাঁদা
হংস থেকে হাঁস
চন্দ্র থেকে চাঁদ
গ্রাম থেকে গাঁ
দেখা যায় অনেকেই সজ্ঞানে বা অজ্ঞতা বসত চন্দ্রবিন্দু যুক্ত শব্দে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করেনা। কিন্তু এই চন্দবিন্দুর এতোই শক্তি, এর বিচ্যুতিতে শব্দটির অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়। বাংলা ভাষায় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কিছু বিষয় আছে তারমধ্যে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার অন্যতম।
যেমনঃ গা – শরীর বা দেহ।
গাঁ – গ্রাম বা গাঁও।
গায়ে – শরীরে।
গাঁয়ে – গ্রামে।
চাদ – একটি দেশের নাম।
চাঁদ – চন্দ্র বা শশী।
তার বা তাহার – বয়োকনিষ্ঠকে বুঝায়।
তাঁর বা তাঁহার – বয়োজ্যেষ্ঠকে বুঝায়।
হাস বা হাসি – আনন্দ প্রকাশের ভঙ্গি।
হাঁস বা হাঁসি – হংস আর হংসী।
হাট – সাপ্তাহিক বাজার বসে যেখানে।
হাঁট – পায়ে হেঁটে চলা।
ধোয়া – পরিস্কার করা।
ধোঁয়া – ধূম্র।
ভাজ – তেলে ভাজতে বলা।
ভাঁজ – গুটিয়ে ফেলা।
কাদি – কলার কাদি, খেজুরের কাদি।
কাঁদি – কান্না করি।
কাদা – কর্দমাক্ত, নরম মাটি।
কাঁদা – ক্রন্দন করা, কান্না করা।
ফোটা – প্রস্ফুটিত হওয়া।
ফোঁটা – জলবিন্দু।
কাচা – ধুয়ে পরিষ্কার করা।
কাঁচা – অপূর্ণ, পাকেনি যাহা।
কাটা – কেটে ফেলা, খন্ড করা।
কাঁটা – কণ্টক, সূচালো বস্তু।
খোঁজা – সন্ধান করা।
খোজা – খাসি করণ।
আঁধার – অন্ধকার।
আধার – পাত্র।
এরকম অনেক শব্দই আছে যেগুলোতে চন্দ্রবিন্দু না দিলে পাঠককে সমস্যায় পড়তে হবে।
নিম্নে কিছু চন্দ্রবিন্দু যুক্ত শব্দ দেয়া হলোঃ
তাঁরা, পৌঁছে, পৌঁছান, ঝাঁপিয়ে, ঝাঁকি , ঝাঁকে, আঁকা, বাঁকা, ঝুঁকি, আঁকাবাঁকা, চিঁড়া, তাঁদের, হ্যাঁ, খুঁজেছি, খুঁজে, খোঁজ, জাঁক, পাঁচটা, হিঁচড়ে, হাঁচি,-কাশি, হাঁটা, হাঁস, সাঁতার, কাঁটা, কাঁধে, কাঁদতে, এঁদের, চাঁদ, মিঁয়া , শাঁসের , শিঁকে, গাঁথা, গাঁয়ের, গাঁজা, রাঁধা, রাঁড়, ফাঁক, ফাঁকা, ফাঁকি, ফিঁচকে , ইঁদুর, উঁকি, উঁচু, ঠাঁসা, ঠাঁই, ধাঁধা, অঁরি, ষাঁড়, বাঁচতে, বাঁক ,বাঁধন, ঘাঁটাঘাঁটি, ঘাঁটতে, যাঁরা, ছাঁদ, ছাঁকে, ভাঁজ, ভেঁজা, থেঁতলে, ফেঁপে, ফেঁসে, ফেঁদে, তেঁতুল, সেঁকা, বেঁধে, পেঁচিয়ে, পেঁয়াজ, পেঁচা ,পঁচা, রেস্তোরাঁ,বাঁশ, রেস্তোরাঁয়, চেঁচামেচি, চেঁচাচ্ছে, ছেঁড়া, ছুঁয়ে, ছুঁড়ে, ফোঁটা, দাঁড়িয়ে, জোঁক, বোঁচকা, ছোঁয়া, ভোঁতা, গোঁফ, গোঁড়ামি, হোঁচট, কাঁকড়া, কেঁচো, ধোঁয়া, ঊঁকি, খাঁটি, খাঁচা, আঁশযুক্ত, আঁচল, আঁকড়ে!!
আশাকরি বিষয়টি সবার মোটামুটি পরিষ্কার হয়েছে।
———
চন্দ্রবিন্দু সমাচার (১) [ঝলক দাস]
চন্দ্রবিন্দু (ঁ) বাংলা বর্ণমালার পঞ্চাশত্তম বর্ণ। এর ইংরেজি নাম moon-dot. স্বতন্ত্র বর্ণ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয় না—অন্য বর্ণ বা ধ্বনির সাথে যুক্ত হয়ে থাকে। চন্দ্রবিন্দু সানুনাসিকতার প্রতীক। এটি স্বরধ্বনির অনুনাসিক উচ্চারণে সাহায্য করে। অ/ঈ/ঊ/ঋ/ঐ/ঔ—এই ছয়টি স্বরবর্ণের স্বাধীন ব্যবহারের ক্ষেত্রে এগুলোর সাথে চন্দ্রবিন্দু যুক্ত হয় না। এমনকি উপর্যুক্ত বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দের অন্য কোনও বর্ণে এর ব্যবহার নেই। চন্দ্রবিন্দুর বিলুপ্তির জন্য শব্দের অর্থগত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। নিম্নে ‘আ’ বর্ণে প্রয়োগ দেখানো হলো:
আঁজি (রেখা), আজি (অদ্য)
আঁট ( দৃঢ়তা), আট (৮ সংখ্যা)
আঁটা (সংকুলান হওয়া), আটা (গমের গুঁড়ো)
আঁটি (ফলের বিচি), আটই (মাসের আট তারিখ)
আঁতকানো (ভয়ে চমকে ওঠা), আতকা (আচমকা)
আঁতেল (পণ্ডিত), আতেলা (তেলহীন)
আঁধার (আলোহীন), আধার (মাছ/পাখির খাদ্য)
আঁধি (অন্ধকার করা ধূলিঝড়), আধি (বর্গা)
আঁশ (তন্তু, মাছের শল্ক), আশ (আশা)।
সুহৃৎ পাঠক, চন্দ্রবিন্দুর অনিবার্য কার্যকারণ কয়েকটি পর্বে উপস্থাপনের প্রত্যাশা করছি। শুবাচ কর্তৃবর্গের উদ্দেশে অশেষ কৃতজ্ঞতা। ত্রুটি নির্দেশ বাঞ্ছনীয়।
 
চন্দ্রবিন্দু সমাচার (২)
বাংলা বর্ণমালায় চন্দ্রবিন্দু অনুনাসিক স্বরধ্বনির চিহ্ন। বানানে এর ব্যবহার বেশ বৈচিত্র্যময়। ব্যঞ্জনান্ত বর্ণে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার নেই। অর্থাৎ শব্দের যে-সকল ব্যঞ্জনে স্বরচিহ্ন (কারচিহ্ন) কিংবা অ-কার (অ-ধ্বনি) থাকে না, সেখানে এর ব্যবহার হয় না। পূর্বপাঠের ধারাবাহিকতায় চন্দ্রবিন্দু বিলুপ্তির কারণে শব্দার্থের অনিবার্য পরিবর্তন নিম্নে দেখানো হলো।
উঁকি (লুকিয়ে দেখা), উকি (হেঁচকি)
কাঁক (কোমর), কাক (পাখিবিশেষ, crow)
কাঁচা (অপক্ব), কাচা (ধোয়া)
কাঁজি (অম্লজল), কাজি (পদবিবিশেষ)
কাঁটা (কণ্টক), কাটা (কর্তন করা)
কাঁঠি (জালের গুটিকা), কাঠি (সরু শলাকা)
কাঁড়া (ছাঁটা), কাড়া (কেড়ে নেওয়া)
কাঁদা (ক্রন্দন), কাদা (কর্দম)
কাঁসি (কাঁসার বাদ্যযন্ত্র), কাশি (রোগবিশেষ)
কুঁচ (গুঞ্জাফল, লাল), কুচ (স্তন, পয়োধর)
কুঁচানো (কুঞ্চিত), কুচানো (কুচিকুচি করে কাটা)
কুঁড়া (খনন করা, খোঁড়া), কুড়া (ঝাঁট দেওয়া)
কুঁড়ি (মুকুল), কুড়ি (২০ সংখ্যা)
কোঁচ (বর্শা), কোচ (উপজাতিবিশেষ)।
আজ এপর্যন্ত। ত্রুটি নির্দেশ বাঞ্ছনীয়।
 
চন্দ্রবিন্দু সমাচার (৩)
চন্দ্রবিন্দু সাধারণত শব্দের স্বরধ্বনিযুক্ত প্রথম বর্ণে বসে। শব্দের প্রথম বর্ণ ব্যতীত অন্য বর্ণে এর ব্যবহার বিরল। শব্দের প্রথমে আ-কারযুক্ত বর্ণে এর ব্যবহার সর্বাধিক। ব্যঞ্জনান্ত বর্ণে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার নেই—এই যুক্তির ভিত্তিতে আধুনিক বানানে এটি ডানদিকে সরে এসে আ-কারের মাথার উপরে অবস্থান নিয়েছে। পূর্বপাঠের ধারাবাহিকতায় চন্দ্রবিন্দুর অনিবার্য ব্যবহার নিম্নে দেখানো হলো।
খাঁ (পদবি); খা (খওয়ার আদেশ)
খাঁই (লোভ, চাহিদা); খাই (আহার করি)
খাঁট (শঠ); খাট (খাটিয়া)
খাঁড়া (খড়গ); খাড়া (সোজাভাবে দাঁড়ানো)
খাঁড়ি (গোটা, আস্ত); খাড়ি (নদীর মোহনা)
খাঁদা (বোঁচা, থ্যাবড়া); খাদা (গর্ত, খাদ)
খুঁট (কাপড়ের প্রান্তভাগ); খুট (অনুকার শব্দ)
খুঁড়া (খনন করা); খুড়া (কাকা, চাচা)
খোঁজা (সন্ধান করা); খোজা (খাসিকরণ)
খোঁয়াড় (পশু-কারাগার); খোয়ার (দুর্গতি)
আজ এপর্যন্ত। ত্রুটি নির্দেশ বাঞ্ছনীয়।
 
চন্দ্রবিন্দু সমাচার (৪)
গাঁ (গ্রাম); গা (শরীর)
গাঁই (ব্রাহ্মণদের শ্রেণিবিভাগ); গাই (গাভি)
গাঁজন (পচন); গাজন (গম্ভীরা)
গাঁতা (দলবদ্ধভাবে কাজ); গাতা (গায়ক)
গাঁথা (গ্রন্থন করা); গাথা (কাব্য)
গাঁদা (ফুলবিশেষ); গাদা (স্তুপ)
গুঁড়া (চূর্ণ, রেণু); গুড়া (নৌকার আড়কাঠ)
গুঁড়ি (কাণ্ড); গুড়ি (নিঃশব্দে গুটিসুটি হয়ে থাকা)
গুঁড়িগুঁড়ি (বিন্দুবিন্দু); গুড়িগুড়ি (ধীরগতিতে)
গেঁট (অনড়, আঁটোসাঁটো); গেট (ফটক)
গেঁয়ো (গ্রাম্য); গেয় (গাওয়ার উপযুক্ত)
গোঁ (জিদ, একরোখামি); গো (গোরু)
গোঁড় (নাভির স্ফীত মাংসপিণ্ড); গোড় (গোড়ালি)
গোঁড়া (অন্ধবিশ্বাসী); গোড়া (মূল)
গোঁপ (গুম্ফ, গোঁফ); গোপ (গো-রক্ষক)
উপর্যুক্ত ‘গ’-বর্ণে চন্দ্রবিন্দু বিলুপ্তির কারণে শব্দার্থের অনিবার্য পরিবর্তন দেখানো হলো।
মৌলিক শব্দে সর্বদা চন্দ্রবিন্দুর অবস্থান প্রথম বর্ণে। কারণ, ধ্বনি পরিবর্তনের সময় শব্দের মাঝে অনুনাসিক ধ্বনি থাকলে তা সাধারণত প্রথম বর্ণে সঞ্চালিত হয়। যেমন :
বাম > বাঁও, ভূমি > ভুঁই।
বিদেশি শব্দের অন্ত্যবর্ণে কদাচিৎ চন্দ্রবিন্দু দেখা যায়। যেমন : জাহাঁপনা, রেস্তোরাঁ, রেনেসাঁস, জাহাঁবাজ।
কয়েকটি সংখ্যাবাচক শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার আছে। যেমন : পাঁচ, পঁচিশ, পঁয়ত্রিশ, সাঁইত্রিশ, পঁয়তাল্লিশ, পঁয়ষট্টি, পঁচাত্তর, পঁচাশি, পঁচানব্বই।
আজ এপর্যন্ত, ত্রুটি নির্দেশ বাঞ্ছনীয়।
 
চমৎকার চন্দ্রবিন্দু
-সুমন বিশ্বাস
———————————
থালা-বাসন ‘ধোয়া’ হলে নিভাই চুলোর ‘ধোঁয়া’-
‘ফোটা’ ফুলে জলের ‘ফোঁটা’ পরে দেই একপোয়া।
ভাবি শরীর ‘ভাঁজা’র পরে ডিম’ভাজা’-ভাত খেয়ে-
‘গাঁ’র বিলে আজ ‘গা’ ভাসাতে যাবো নৌকো বেয়ে।
এমন সময় ‘গোঁ’ ধরা দল- কয় ও কাকা গো-
‘গো’ ছেড়ে আজ ‘চন্দ্রবিন্দু’ ঠিক শেখাবে তো!
ওদের কথায় ‘দাড়ি’ কাটায় দিলাম দিয়ে ‘দাঁড়ি’-
‘খাঁড়া’ ধরার আগেই ‘খাড়া’ জ্ঞানসাগরে পাড়ি।
‘কুড়ি’ টাকার মুড়ি-ভাজা ফুল’কুঁড়ি’দের তরে,
‘শাঁখা’ তো নয় গাছের ‘শাখা’র আমও ছিলো ঘরে।
‘গোড়া’ থেকে বুঝিস সবাই ‘গোঁড়া’ হওয়া নয়,
‘বাঁ’ হাতের খেল ‘বা’ সোজা খুব এমনি যদি হয়।
শোন্ তবে সব, চন্দ্র যখন বিন্দু নিয়ে আসে-
খোকা ‘হাসে’ খুকুর কোলে ‘হাঁসে’ জলে ভাসে।
উঁঅ, ইঁঅ, মূ্র্ধোন্নো ন, দন্ত্য ন ও ম-
আর অনুস্বার লোপ পেলে সব চন্দ্রবিন্দু ক।
তৎসম বানানের বেলা নাসিক্য ধ্বনি-
তদ্ভবে তা চন্দ্রবিন্দু চিরোদিন মণি।
পঙ্ক, অঞ্চল- পাঁক, আঁচল হয় কঙ্কন- কাঁকন-
ভাণ্ড- ভাঁড়া, দন্ত্য- দাঁত আর কম্পন- কাঁপন।
‘রাধা’ জানে রাঁধা-বাঁধা তাই তো ‘বাধা’ সোজা-
‘গাদা’ চুক্তি নিতে গেলে ‘গাঁদা’ ফুলও বোঝা।
থাকলে ‘কাদা’ পিছলে ‘কাঁদা’ ব্যথায় হতে পারে,
কাপড়ে দাগ ‘কাঁচা’ আমের- ‘কাচা’ দিলেই সারে!
বিঁধলে ‘কাঁটা’ বের করা যায় জল যাবে না ‘কাটা’-
‘বাটা’ ভালো মশলাপাতি আর ন্যায্যতায় ‘বাঁটা’।
‘খাঁটি’ পেতে সবাই ‘খাটি’ ছুটি কাজের পিছু-
জ্ঞানের ‘আধার’ নাশে ‘আঁধার’ জানবি, শিখবি কিছু।
 
“চন্দ্রবিন্দু”
গৌতম বিশ্বাস
গগনে উঠেছে ওই | পূর্ণিমার চাঁদ। ||
রেখ না মনের কোণে | এতটুকু ফাঁদ।। ||
বাতাসে বাতাসে ভাসে | কীসের ঐ ধোঁয়া। ||
পবন গতিতে ছুটে | যায় না কো ছোঁয়া।। ||
ধানের খেতের পাশে | মেঠো পথ বাঁকা। |
মাঝি দাঁড় দেয় টান | যেন ছবি আঁকা।। ||
দিঘির জলেতে দেখ | সাদা সাদা হাঁস । ||
ছোটো ছোটো কুঁড়েঘর | গড়া দিয়ে বাঁশ।। ||
জলদে ছাইল ধরা | তরসে এ হাঁটা। ||
সমাধান পেতে তাই | বই নিয়ে ঘাঁটা।। ||
শেষ হয়ে গেল বুঝি | গরিবের পুঁজি। ||
দিশাহারা হয়ে তাই | বারে বারে খুঁজি।। ||
ছেলেগুলো মারে ঢিল | ফলগুলো কাঁচা। ||
দেখে ফেলে বাবুরাম | নিজ জান বাঁচা।। ||
ওই দেখ পড়ে গেল | জানে না সাঁতার। ||
তাড়াতাড়ি কূলে তোল | ঘনায় আঁধার।। ||
চল সবে মাছ ধরি | মেখে গায়ে পাঁক। |
পাখি সব আকাশেতে | উড়ে ঝাঁকে-ঝাঁক।। ||
 
 
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
বাংলা ভাষা মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
 
চন্দ্রবিন্দু সমগ্র: https://draminbd.com/চন্দ্রবিন্দু-সমগ্র-চন্দ/
 

 

error: Content is protected !!