চন্দ্রবিন্দু সমাচার সমগ্র

Jhalak Das

চন্দ্রবিন্দু সমাচার/১

চন্দ্রবিন্দু (ঁ) বাংলা বর্ণমালার পঞ্চাশত্তম বর্ণ। এর ইংরেজি নাম moon-dot. স্বতন্ত্র বর্ণ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয় না—অন্য বর্ণ বা ধ্বনির সাথে যুক্ত হয়ে থাকে। চন্দ্রবিন্দু সানুনাসিকতার প্রতীক। এটি স্বরধ্বনির অনুনাসিক উচ্চারণে সাহায্য করে। অ/ঈ/ঊ/ঋ/ঐ/ঔ—এই ছয়টি স্বরবর্ণের

Jhalak Das

স্বাধীন ব্যবহারের ক্ষেত্রে এগুলোর সাথে চন্দ্রবিন্দু যুক্ত হয় না। এমনকি উপর্যুক্ত বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া শব্দের অন্য কোনও বর্ণে এর ব্যবহার নেই। চন্দ্রবিন্দুর বিলুপ্তির জন্য শব্দের অর্থগত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। নিম্নে ‘আ’ বর্ণে প্রয়োগ দেখানো হলো:

আঁজি (রেখা), আজি (অদ্য)

আঁট ( দৃঢ়তা), আট (৮ সংখ্যা)

আঁটা (সংকুলান হওয়া), আটা (গমের গুঁড়ো)

আঁটি (ফলের বিচি), আটই (মাসের আট তারিখ)

আঁতকানো (ভয়ে চমকে ওঠা), আতকা (আচমকা)

আঁতেল (পণ্ডিত), আতেলা (তেলহীন)

আঁধার (আলোহীন), আধার (মাছ/পাখির খাদ্য)

আঁধি (অন্ধকার করা ধূলিঝড়), আধি (বর্গা)

আঁশ (তন্তু, মাছের শল্ক), আশ (আশা)।

সুহৃৎ পাঠক, চন্দ্রবিন্দুর অনিবার্য কার্যকারণ কয়েকটি পর্বে উপস্থাপনের প্রত্যাশা করছি। শুবাচ কর্তৃবর্গের উদ্দেশে অশেষ কৃতজ্ঞতা। ত্রুটি নির্দেশ বাঞ্ছনীয়।

চন্দ্রবিন্দু সমাচার/২

বাংলা বর্ণমালায় চন্দ্রবিন্দু অনুনাসিক স্বরধ্বনির চিহ্ন। বানানে এর ব্যবহার বেশ বৈচিত্র্যময়। ব্যঞ্জনান্ত বর্ণে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার নেই। অর্থাৎ শব্দের যে-সকল ব্যঞ্জনে স্বরচিহ্ন (কারচিহ্ন) কিংবা অ-কার (অ-ধ্বনি) থাকে না, সেখানে এর ব্যবহার হয় না। পূর্বপাঠের ধারাবাহিকতায় চন্দ্রবিন্দু বিলুপ্তির কারণে শব্দার্থের অনিবার্য পরিবর্তন নিম্নে দেখানো হলো।

উঁকি (লুকিয়ে দেখা), উকি (হেঁচকি)

কাঁক (কোমর), কাক (পাখিবিশেষ, crow)

কাঁচা (অপক্ব), কাচা (ধোয়া)

কাঁজি (অম্লজল), কাজি (পদবিবিশেষ)

কাঁটা (কণ্টক), কাটা (কর্তন করা)

কাঁঠি (জালের গুটিকা), কাঠি (সরু শলাকা)

কাঁড়া (ছাঁটা), কাড়া (কেড়ে নেওয়া)

কাঁদা (ক্রন্দন), কাদা (কর্দম)

কাঁসি (কাঁসার বাদ্যযন্ত্র), কাশি (রোগবিশেষ)

কুঁচ (গুঞ্জাফল, লাল), কুচ (স্তন, পয়োধর)

কুঁচানো (কুঞ্চিত), কুচানো (কুচিকুচি করে কাটা)

কুঁড়া (খনন করা, খোঁড়া), কুড়া (ঝাঁট দেওয়া)

কুঁড়ি (মুকুল), কুড়ি (২০ সংখ্যা)

কোঁচ (বর্শা), কোচ (উপজাতিবিশেষ)।

আজ এপর্যন্ত। ত্রুটি নির্দেশ বাঞ্ছনীয়।

 
 
 

চন্দ্রবিন্দু সমাচার/৩

চন্দ্রবিন্দু সাধারণত শব্দের স্বরধ্বনিযুক্ত প্রথম বর্ণে বসে। শব্দের প্রথম বর্ণ ব্যতীত অন্য বর্ণে এর ব্যবহার বিরল। শব্দের প্রথমে আ-কারযুক্ত বর্ণে এর ব্যবহার সর্বাধিক। ব্যঞ্জনান্ত বর্ণে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার নেই—এই যুক্তির ভিত্তিতে আধুনিক বানানে এটি ডানদিকে সরে এসে আ-কারের মাথার উপরে অবস্থান নিয়েছে। পূর্বপাঠের ধারাবাহিকতায় চন্দ্রবিন্দুর অনিবার্য ব্যবহার নিম্নে দেখানো হলো।

খাঁ (পদবি); খা (খওয়ার আদেশ)

খাঁই (লোভ, চাহিদা); খাই (আহার করি)

খাঁট (শঠ); খাট (খাটিয়া)

খাঁড়া (খড়গ); খাড়া (সোজাভাবে দাঁড়ানো)

খাঁড়ি (গোটা, আস্ত); খাড়ি (নদীর মোহনা)

খাঁদা (বোঁচা, থ্যাবড়া); খাদা (গর্ত, খাদ)

খুঁট (কাপড়ের প্রান্তভাগ); খুট (অনুকার শব্দ)

খুঁড়া (খনন করা); খুড়া (কাকা, চাচা)

খোঁজা (সন্ধান করা); খোজা (খাসিকরণ)

খোঁয়াড় (পশু-কারাগার); খোয়ার (দুর্গতি)

আজ এপর্যন্ত। ত্রুটি নির্দেশ বাঞ্ছনীয়।

চন্দ্রবিন্দু সমাচার/৪

গাঁ (গ্রাম); গা (শরীর)

গাঁই (ব্রাহ্মণদের শ্রেণিবিভাগ); গাই (গাভি)

গাঁজন (পচন); গাজন (গম্ভীরা)

গাঁতা (দলবদ্ধভাবে কাজ); গাতা (গায়ক)

গাঁথা (গ্রন্থন করা); গাথা (কাব্য)

গাঁদা (ফুলবিশেষ); গাদা (স্তুপ)

গুঁড়া (চূর্ণ, রেণু); গুড়া (নৌকার আড়কাঠ)

গুঁড়ি (কাণ্ড); গুড়ি (নিঃশব্দে গুটিসুটি হয়ে থাকা)

গুঁড়িগুঁড়ি (বিন্দুবিন্দু); গুড়িগুড়ি (ধীরগতিতে)

গেঁট (অনড়, আঁটোসাঁটো); গেট (ফটক)

গেঁয়ো (গ্রাম্য); গেয় (গাওয়ার উপযুক্ত)

গোঁ (জিদ, একরোখামি); গো (গোরু)

গোঁড় (নাভির স্ফীত মাংসপিণ্ড); গোড় (গোড়ালি)

গোঁড়া (অন্ধবিশ্বাসী); গোড়া (মূল)

গোঁপ (গুম্ফ, গোঁফ); গোপ (গো-রক্ষক)

উপর্যুক্ত ‘গ’-বর্ণে চন্দ্রবিন্দু বিলুপ্তির কারণে শব্দার্থের অনিবার্য পরিবর্তন দেখানো হলো।

মৌলিক শব্দে সর্বদা চন্দ্রবিন্দুর অবস্থান প্রথম বর্ণে। কারণ, ধ্বনি পরিবর্তনের সময় শব্দের মাঝে অনুনাসিক ধ্বনি থাকলে তা সাধারণত প্রথম বর্ণে সঞ্চালিত হয়। যেমন :

বাম > বাঁও, ভূমি > ভুঁই।

বিদেশি শব্দের অন্ত্যবর্ণে কদাচিৎ চন্দ্রবিন্দু দেখা যায়। যেমন : জাহাঁপনা, রেস্তোরাঁ, রেনেসাঁস, জাহাঁবাজ।

কয়েকটি সংখ্যাবাচক শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার আছে। যেমন : পাঁচ, পঁচিশ, পঁয়ত্রিশ, সাঁইত্রিশ, পঁয়তাল্লিশ, পঁয়ষট্টি, পঁচাত্তর, পঁচাশি, পঁচানব্বই।

আজ এপর্যন্ত, ত্রুটি নির্দেশ বাঞ্ছনীয়।

চন্দ্রবিন্দু সমাচার (৫)

ঘাঁটন (মন্থন); ঘাটন (কম পড়া)

ঘাঁটা (ঘোঁটা, আলোড়ন করা); ঘাটা (ঘাট)

ঘাঁটি (সেনা স্থাপনা, ফাঁড়ি); ঘাটি (ক্ষতটি)

ঘাঁটিয়াল (ঘাঁটিরক্ষক); ঘাটিয়াল (ঘাটরক্ষক)

চাঁই (চাঙড়, চাপ, সর্দার,); চাই (প্রয়োজন)

চাঁচা (মার্জিত, মসৃণ); চাচা (কাকা, পিতৃব্য)

চাঁটা (চপেটাঘাত); চাটা (লেহন করা)

চাঁটি (করাঘাত, চড়); চাটি (ধ্বংস, বিনষ্ট)

চাঁদ (চন্দ্র, ইন্দু, সোম); চাদ (দেশের নাম)

চাঁপা (ফুলবিশেষ, চম্পা); চাপা (চাপ দেওয়া)

চোঁয়ানো (স্বল্প পোড়ানো); চোয়ানো (চুইয়ে পড়া)

ছাঁট (কেটে বাদ দেওয়া টুকরো);

ছাট (বায়ুতাড়িত জলের ছিটা)

ছাঁৎ (বুকে হঠাৎ তীব্র শিহরণ); ছাত (ঘরের চাল)

ছাঁদ (গড়ন, আদল); ছাদ (আচ্ছাদন, ছাত)

ছোঁড়া (বালক, কিশোর); ছোড়া (নিক্ষেপ করা)

ছোঁড়াছুঁড়ি(কিশোরকিশোরী);ছোড়াছুড়ি (লোফালুফি)

চন্দ্রবিন্দু বিলুপ্তির কারণে শব্দার্থের অনিবার্য পরিবর্তন পূর্বপাঠের ধারাবাহিকতায় দেখানো হলো।

বাংলায় নাসিক্য-ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে চন্দ্রবিন্দু যুক্ত হয় না। কারণ নাসিক্য-ব্যঞ্জনবর্ণের ধ্বনি স্বাভাবিকভাবে অনুনাসিক হয়ে থাকে। মূল সংস্কৃত শব্দের নাসিক্যধ্বনি (ঙ/ঞ/ণ/ন/ম/ং) লুপ্ত হয়ে নাসিক্যভবনের ফলে বাংলায় বহু শব্দে চন্দ্রবিন্দু এসেছে। যেমন :

অন্ত্র > আঁত কম্পন > কাঁপন

অংশু > আঁশ কাংস্য > কাঁসা

আমিষ > আঁষ গ্রাম > গাঁ

অঞ্চল > আঁচল গ্রন্থি > গাঁট

অন্ধকার > আঁধার গুম্ফ > গোঁফ

ইন্দুর > ইঁদুর চন্দ্র > চাঁদ

কঙ্কন > কাঁকন চম্পা > চাঁপা

কঙ্কর > কাঁকর ছন্দ > ছাঁদ

কণ্টক > কাঁটা যন্ত্র > জাঁতা

কন্থা > কাঁথা ঝম্প > ঝাঁপ

পরবর্তী অংশ আগামী পর্বে আলোচনার আশা করছি। আজ এপর্যন্ত। ত্রুটি নির্দেশ বাঞ্ছনীয়।

শুবাচ লিংক:

চন্দ্রবিন্দু সমচার/১

চন্দ্রবিন্দু সমাচার/২

চন্দ্রবিন্দু সমাচার/৩

চন্দ্রবিন্দু সমাচার/৪

চন্দ্রবিন্দু সমাচার/৫

চন্দ্রবিন্দু সমাচার সমগ্র

error: Content is protected !!