চন্দ্রবিন্দু স্থাপন: শব্দের কোথায় বসে চন্দ্রবিন্দু

ড. মোহাম্মদ আমীন

চন্দ্রবিন্দু স্থাপন: শব্দের কোথায় বসে চন্দ্রবিন্দু (১-১৭)

এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/চন্দ্রবিন্দু-স্থাপন-শব্/

১. নাসিক্যবর্ণ লোপ হওয়ার কারণে যেসব শব্দে চন্দ্রবিন্দু আসে সেসব শব্দে সাধারণত লোপকৃত নাসিক্যবর্ণের পূর্বের বর্ণে চন্দ্রবিন্দু বসাবেন— কোনো কার, স্বরচিহ্ন বা ফলার ওপর নয়। যেমন: অংশ>আঁশ, পঞ্চ>পাঁচ, বন্ধু>বঁধু, অন্ধকার>আঁধার, ধূম>ধোঁয়া, আমিষ>আঁশ, স্কন্ধ>কাঁধ প্রভৃতি।
 
চন্দ্রবিন্দু কোথায় বসানো উপযুক্ত তা পরীক্ষা করার জন্য একটি বর্ণে চন্দ্রবিন্দু দিয়ে দেখুন: আঁ, ইঁ, ঈঁ, উঁ, ঊঁ, এঁ, ওঁ, তঁ, জঁ, হঁ, লঁ, পঁ, যঁ, সঁ। এখানে প্রতিটি বর্ণের ওপর চন্দ্রবিন্দু বসেছে। অনুরূপ: বঁটি, বঁধু, ভঁইস, খিঁচুনি, গিঁট, চিঁহি, সিঁড়ি, কুঁড়ে, খুঁটি, গুঁজা, পুঁই, পুঁটি, কেঁচো, পেঁপে, ভেঁপু,হুঁশিয়ার, হেঁয়ালি প্রভৃতি।
 
দন্ত>দাঁত, কম্পন>কাঁপা, বংশী>বাঁশি, হংস>হাঁস, বৃন্ত>বোঁটা, সন্ধ্যা>সাঁঝ; ছোঁ, ছোঁড়াছুঁড়ি, জাহাঁপনা, কাঁচি, চ্যাঁচামেচি, চ্যাঁচারি, ত্যাঁদড়, হ্যাঁ, ত্যাঁদড়ামি প্রভৃতি শব্দের চন্দ্রবিন্দুভবন দেখতে পারেন। এসব কম্পোজ-শব্দ দেখে মনে হতে পারে স্বর-চিহ্নের উপর চন্দ্রবিন্দু বসেছে। আসলে তা নয়, চন্দ্রবিন্দুটি বসেছে যে স্বরচিহ্নে (আ-কার) চন্দ্রবিন্দুটি বসেছে মনে হচ্ছে; ঠিক তার পূর্বের ব্যঞ্জনের ওপর। কারণ ওই বর্ণটিই নাসিক্য-চিৎকার দেয়।
 
২. যেসব শব্দ ১নং বিধি মানে না সেসব শব্দে যে বর্ণটি নাসিক্য উচ্চারণ দেবে তার ওপর চন্দ্রবিন্দু দেবেন। যেমন: পলাণ্ডু থেকে পিঁয়াজ/পেঁয়াজ, সংক্রম থেকে সাঁকো।
 
৩. নাসিক্যবর্ণ লোপ না পেয়েও শব্দে চন্দ্রবিন্দু হয়। যেমন: বক্র থেকে বাঁক; কর্কর থেকে কাঁকর; ক্ষত থেকে খুঁত; খড়্‌গ থেকে খাঁড়া, ঘৃষ্ট থেকে ঘ্যাঁচড়া, ছাতন থেকে ছাঁটা, ছিত্বর থেকে ছ্যাঁচড়, ছিদ্র থেকে ছ্যাঁদা। এরূপ শব্দে যে বর্ণটি নাসিক্য উচ্চারণ দেবে ১নং বিধি অনুযায়ী ঠিক তার মাথার ওপর চন্দ্রবিন্দু হবে। যেমন বক্র>বাঁক, বিদ্ধ>বিঁধ, যূথিকা>জুঁই, শস্য>শাঁস, শুষ্ক>শুঁটকি।
 
৪. ঋ-দিয়ে শুরু করা সব শব্দই তৎসম। তাই ঋ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
 
৫. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে ঐ-বর্ণ এবং ও-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া সব শব্দ তৎসম। এজন্য ঐ-বর্ণ এবং ও-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেখা যায় না।
 
৬. যুক্ত হোক বা বিযুক্ত হোক মূর্ধন্য-ণ যুক্ত কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। নাসিক্যবর্ণ ত্যাগ করে চন্দ্রবিন্দু আসে বলে চন্দ্রবিন্দুযুক্ত শব্দে নাসিক্য বর্ণের উপস্থিতি বিরল।
 
৭. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে মূর্ধন্য-ষ যুক্ত কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেখা যায় না। ব্যতিক্রম: ষাঁড়, ষাঁড়া, ষাঁড়াষাঁড়ি।
 
৮. যুক্তব্যঞ্জনের ওপর চন্দ্রবিন্দু হয় না। চন্দ্রবিন্দু-যুক্ত শব্দগুলো যুক্তব্যঞ্জনহীন হয়।
 
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
৯. বিসর্গযুক্ত এবং বিসর্গসন্ধি সাধিত শব্দসমূহে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
 
১০. বহুবচন বাচক গণ মণ্ডলী বৃন্দ বর্গ আবলি গুচ্ছ দাম নিকর পুঞ্জ মালা রাজি রশি প্রভৃতির যে কোনো একটি থাকলে ওই শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
 
১১. উপমান কর্মধারয়, উপমিত কর্মধারয় এবং রূপক কর্মধারয় সমাস গঠিত শব্দে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
 
১২. অব্যয়ীভাব ও প্রাদি সমাস দ্বারা গঠিত পদগুলোতে সাধারণত চন্দ্রবিন্দু হয় না।
 
১৩. শব্দের শেষে তব্য ও অনীয় থাকলে ওইসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন: কর্তব্য, মন্তব্য, দ্রষ্টব্য, ভবিতব্য, করণীয়, দর্শনীয়, বরণীয়, রমণীয়।
 
১৪. শব্দের শেষে তব্য, অনীয় থাকলে ওইসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না। কর্তব্য, ভবিতব্য, অনুষ্ঠাতব্য, বরণীয়, করণীয়, দর্শনীয়, রমণীয় প্রভৃতি।
 
১৫. শব্দের শেষে তা, ত্ব,তর, তম, বান, মান, মাণ, এয়, ঈয়, র্য প্রভৃতি থাকলে ওই শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
 
১৬. প্র প্ররা অপ সম অব অন নির্‌ (নিঃ‌), দুর(দঃ), উৎ, অধি, পরি, প্রতি, উপ, অভি, অতি প্রভৃতি শব্দ যুক্ত থাকলে সেগুলোর বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
 
১৭. ঙ ঞ ণ ম ন ং প্রভৃতি ব্যঞ্জনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই বর্ণগুলো সংস্কৃত থেকে অপভ্রষ্ট হয়ে তদ্ভব শব্দে চন্দ্রবিন্দু রূপ ধারণ করে বাংলায় অবস্থান করে। যেমন: অঞ্চ >আঁচ, অঞ্চল>আঁচল, ষণ্ড>ষাঁড়, গ্রাম>গাঁ, শঙ্খ>শাঁখ, ঝম্প>ঝাঁপ, বংশ>বাঁশ, সিন্দুর>সিঁদুর, সামন্তপাল>সাঁওতাল, চম্পা>চাঁপা, কঙ্কন>কাঁকন, কণ্টক>কাঁটা, ভাণ্ড>ভাঁড়।
 
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
বিস্তারিত দেখুন নিচের সংযোগে: শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি
 
error: Content is protected !!