চর্যাপদ একনজরে

চর্যাপদের আবিষ্কারক
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থশালা হতে চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘Sanskrit Buddhist Literature in Nepal’ গ্রন্থে রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রথম, নেপালের বৌদ্ধতান্ত্রিক সাহিত্যের কথা প্রকাশ করেন। পুস্তকটিতে তিনি বিভিন্ন গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রকাশ করেছিলেন। গ্রন্থটি পাঠে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কৌতুহলোদ্দীপ্ত হয়ে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থশালা পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন। পরিদর্শন করে তিনি সেখানে চর্যাপদের সন্ধান পান।

চর্যাপদের আদি রচয়িতা
লুইপাকে চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের টীকায় আদি সিদ্ধাচার্য বলা হয়। কাহ্নপাদের জন্ম কোথায় তা এখনও সঠিকভাবে জানা যায়নি। বিভিন্ন গবেষকদের গবেষণা ও পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি ওড়িষ্যার সোমপুর বিহারে বাস করতেন। চর্যাপদ-এর ভাষা হতে মধ্যযুগের প্রথম গ্রন্থ ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের ভাষায় উন্নীত হতে যে আনুকূল্য, চর্চা এবং রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন ছিল তার সিংহভাগই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুসলিম শাসকবর্গ প্রদান করেছেন।

চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের পদসংখ্যা
চর্যার পুঁথিতে ৫০টি পদ ছিল। তন্মধ্যে টীকাকার ১১ সংখ্যক পদের কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করেননি। তছাড়া প্রাপ্ত পুথির কয়েকটি পাতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনটি ২৪, ২৫ ও ৪৮ সংখ্যক পদের সম্পূর্ণ এবং ২৩ সংখ্যক পদের শেষাংশ পাওয়া যায়নি। সে হিসেবে পুঁথিতে সর্বমোট সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ পাওয়া গিয়েছে।

চর্যাপদের কবি, সংকলক ও টীকাকার
চর্যাচর্যবিনিশ্চয়ের মোট চব্বিশ জন পদ কর্তার পরিচয় পাওয়া যায়। চব্বিশ জন পদকর্তা হলেন— লুই, কুক্কুরী, বিরুআ, গুণ্ডুরী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, সবর, আজদেব, ঢেণ্ডন, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তন্ত্রী ও লাড়ীডোম্বী। উল্লেখ্য কুক্কুরী, ডোম্বী, শবর, তাড়ক, কঙ্কণ, তন্ত্রী, লাড়ীডোম্বী ইত্যদিসহ বেশ কয়েকটি ছদ্মনাম। চর্যাকারদের মধ্যে লুই, কুক্করী, বিরুআ, ডোম্বী, শবর, ধাম, জঅনন্দি  বাঙালি ছিলেন। তবে এগুলো পদকর্তাগণের আসল নাম নয়, ছদ্মনাম। তাঁরা সেন বংশের ব্রাহ্মণদের অত্যাচার হতে বাঁচার জন্য ছদ্মনামে লিখতেন। চর্যাপদের সংকলক কানুভট্ট ও টীকাকার মুনি দত্ত।
সর্বাধিক পদরচিয়তা
চর্যাপদের কবিগণের মধ্যে কাহ্নপাদ সর্বাধিক পদরচিয়তা। তাঁর তেরটি পদ চর্যাপদ গ্রন্থে রয়েছে। ড. শহিদুল্লাহর মতে কাহ্নপাদের বাড়ি ছিল ওড়িষ্যায়। তিনি সোমপুর বিহারে বসবাস করতেন। বাংলার পাল বংশের রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন। তাঁদের আমলে চর্যাগীতিকাগুলোর বিকাশ ঘটে।

চর্যাপদ পাণ্ডুলিপির নাম
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত চর্যাপদের পাণ্ডুলিপির টীকায় প্রদত্ত নাম ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’। চর্যা অর্থ— যা করণীয় বা অনুসরণীয় বা উচিত এবং অচর্য্য অর্থ— যা করণীয় বা অনুসরণীয় নয় বা অনুচিত। অতএব ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ শব্দের অর্থ উচিত-অনুচিত। ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘হাজার বছরের পুরান বাংলা ভাষার গান ও দোহা’ নামে আবিষ্কৃত চর্যাপদগুলো বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ হতে সাড়ে ছেচল্লিশটি চর্যাগীতি গ্রন্থাকারে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। আধুনিক পণ্ডিতদের অনুমান, পুথিটির নাম ছিল ‘চর্যাগীতিকোষ’ এবং ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ এর সংস্কৃত টীকার নাম।

চর্যাপদের রচনা কাল
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লার মতে চর্যাপদের রচনা কাল ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। আবার ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে ৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে চর্যাচর্যবিনিশ্চয় রচিত।

উপমহাদেশের প্রথম চিকিৎসাগ্রন্থ

error: Content is protected !!