চর্যাপ্রবাদ

ড. মোহাম্মদ আমীন
১. আপনা মাসে হরিণা বৈরী (৬ নং পদ ভুসুকুপা)
অর্থ: হরিণের মাংসই হরিণে জন্য বড়ো আপদ।
২. হাতের কাঙ্কন মা লোউ দাপন (৩২ নং পদ সরহপা)
অর্থ: হাতের কাঁকন দেখার জন্য দর্পণের প্রয়োজন হয় না।
৩. হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী (৩৩ নং পদ, ঢেগুণ পা)
অর্থ: হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন প্রেমিকেরা এসে ভিড় করে।
৪. দুহিল দুধু কী বেন্টে সামায় (৩৩ নং পদ ঢেগুণপা)
অর্থ: দোহন করা দুধ কি বাটে প্রবেশ করানো যায়?
৫. বর সুন গোহালী কিমু দুঠ্য বলন্দেঁ (৩৯ নং পদ সরহপা)
অর্থ: দুষ্ট গোরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।
৬. আন চাহন্তে আন বিনধা (৪৪ নং পদ কঙ্কনপা)
অর্থ: অন্য চাহিতে, অন্য বিনষ্ট।
৭. কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল। চঞ্চল চীএ পইঠো কাল॥ (চর্যা ১, লুইপা)
অর্থ: শরীরের গাছ তাতে পাঁচখানি ডাল/ চঞ্চল মনে তার ঢুকে পড়ে কাল।

চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন। চর্যা অর্থ আচরণ। গান ও কবিতা নিয়ে চর্যাপদ। চর্যাপদের অন্য নাম চর্যাগীতিকোষ বা দোঁহাকোষ। ‘চর্য্যাচর্যবিনিশ্চয় ’নামটি দিয়েছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। বৌদ্ধ সহজিয়াদের সাধন সংগীতই চর্যাপদের প্রতিপাদ্য বিষয়। পাল আমলে চর্যাপদ রচিত হয়। রচনা কাল শহীদুল্লাহর মতে অনুমান ৬৫০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দ, সুনীতিকুমার সেনের মতে ৯৫০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দ। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত রাজেন্দ্রলাল মিত্রের “Sanskrit Buddhist Literature in Nepal” গ্রন্থের সূত্র ধরে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থশালা থেকে পর পর তিন বারের চেষ্টায় ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদ আবিষ্কার করেন। যা ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায়  “হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা” নামে প্রকাশিত হয়। অপণা মাসে হরিণা বৈরী-প্রবাদটির রচয়িতা  ভুসুকু পা। তিনি ছিলেন সৌরাষ্ট্রের রাজপুত্র।

চর্যাপদের পদসংখ্যা ড শহীদুল্লাহর মতে ৫০ টি; সুকুমার সেনের মতে ৫১ টি। চর্যাপদেরসাড়ে ৪৬ টি পদ পাওয়া গিয়েছে। চর্যাপদের  ২৩(এর ৬টি লাইন পাওয়া গেছে)। তবে ২৪,২৫,৪৮নং পদ পাওয়া যায়নি। ২৩ নং পদটি আংশিক পাওয়া গেছে। এই পদের রচয়িতা ভুসুকু পা। চর্যাপদের পদকর্তা শহীদুল্লাহর মতে ২৩ জন (Buddist Mystic Songs) এবং সুকুমার সেনের মতে ২৪ জন (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস)। চর্যাপদের আদি কবি  লুইপা। চর্যাপদের শ্রেষ্ঠ কবি শবর পা (লুইপার গুরু)। চর্যাপদের প্রথম পদটির রচয়িতা লুইপা। চর্যাপদের প্রথম পদটি  “কাআ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল/চঞ্চল চীএ পৈঠা কাল”। চর্যাপদের অনুমিত মহিলা কবি কুক্কুরী পা।

ড. মোহাম্মদ আমীন

শবর পা, লুইপা, ভুসুকু পা, জয়ানন্দ প্রমুখ চর্যাপদের বাঙালি কবি।  চর্যাপদের প্রথম বাঙালি কবি মীননাথ/মাৎসেন্দ্রনাথ। তবে তাঁর কোন পূর্ণাঙ্গ পদ পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের আধুনিক্ পদকর্তা সরহপা>ভুসুকুপা। চর্যাপদের সবচেয়ে বেশি পদ রচনা কাহ্নপা (অপর নাম কৃষ্ণাচার্য)। কাহ্নপা-১৩টি, ভুসুকুপা-৮টি, সরহ পা-৪টি, লুই-শান্তি-শবরী এরা ২টি করে, বাকিরা ১টি করে পদ রচনা করেন। তবে তন্ত্রীপা ও লাড়িডোম্বীপার কোন পদ পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের ভাষা হচ্ছে প্রাচীন বাংলা। শহীদুল্লাহর মতে চর্যাপদের ভাষা বঙ্গকামরূপী।  চর্যাপদের ভাষা বাংলা এটি প্রমাণ করেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। চর্যাপদের ভাষায় প্রভাব  হিন্দি, অপভ্রংশ (মৈথিলী), অসমিয়া, উড়িয়া ভাষার প্রভাব রয়েছে। বিজয়চন্দ্র মজুমদার (১৯২০) সর্বপ্রথম চর্যাপদের ভাষা নিয়ে আলোচনা করেন। চর্যাপদের ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করেন  সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (১৯২৬)। চর্যাপদের ধর্মমত সম্পর্কে প্রথম আলোচনা করেন শহীদুল্লাহ (১৯২৭)। চর্যাগীতির অন্তর্নিহিত তত্ত্বের ব্যাখ্যা প্রকাশ করেন শশিভূষণ দাশগুপ্ত (১৯৪৬)।মুনিদত্ত চর্যাপদের পদগুলো টীকার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন।  চর্যাপদের তিব্বতীয় অনুবাদ প্রকাশ করেন কে? প্রবোধচন্দ্র বাগচি

error: Content is protected !!