চাটগাঁইয়া ভাষা: চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা: প্রকৃতি স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য: চাটগাঁইয়া ভাষা কি বাংলা ভাষা?

 ড. মোহাম্মদ আমীন
ড. মোহাম্মদ আমীন
চাটগাঁইয়া ভাষা: চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা: প্রকৃতি স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য: চাটগাঁইয়া ভাষা কি বাংলা ভাষা?
বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিবাসীরা আঞ্চলিকভাবে পরস্পরের মধ্যে যে ভাষায় কথা বলে সেটি চাটগাঁইয়া ভাষা বা চট্টগ্রামের ভাষা বা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা নামে পরিচিত। এদের অনেকে এই ভাষাকে তাদের মাতৃভাষা গণ্য করেন। অনেকে বলেন, চাটগাঁইয়া ভাষা বাংলার একটি উপভাষা। তবে, চাটগাঁইয়াদের মতে, চট্টগ্রামের ভাষা বাংলার কোনো উপভাষা নয়। বরং একটি স্বতন্ত্র ভাষা।  এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য বাংলা থেকে  ভিন্ন স্বতন্ত্র এবং স্বকীয় । তাই  চট্টগ্রামের বোদ্ধা সমাজ তাঁদের ভাষাকে বাংলার উপভাষা বলতে রাজি নন, যেমন সিলটিরা রাজি নন তাদের ভাষাকে বাংলার উপভাষা বলতে। চাটগাঁইয়াদের  মতে,  তাাঁদের ভাষাটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র  একটি পরিপূর্ণ ভাষা। যদিও নৈকট্যের কারণে বাংলার সঙ্গে চাটগাঁইয়া ভাষার অনেক মিল লক্ষ করা যায়।  যেমন লক্ষ করা যায় বাংলার সঙ্গে উর্দু, হিন্দি অসমিয়া ওড়িয়া বিহারি সিলেটি রংপুরিয়া রোহিঙ্গা প্রভৃতি ভাষার। প্রসঙ্গত, রংপুরিয়া ভাষা ভারতে রাজবংশী আর নেপালে কামতাপুরি নামে পরিচিত।   গবেষকবৃন্দের  অভিমত,  প্রাচীন বৃহত্তর বঙ্গভূমির অন্যান্য  ভাষার মতো চাটগাঁইয়া ভাষাও প্রাকৃত-পালি হতে সৃষ্ট একটি স্বতন্ত্র মৌলিক ভাষা। 
 একটি ভাষা উপভাষা না কি স্বতন্ত্র ভাষা তা ওই ভাষার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দুটো দিয়ে  চিহ্নিত করা যায়। এবার দেখা যাক, চাটগাঁইয়া  ভাষাকে  বাংলার উপভাষা না বলে স্বতন্ত্র ভাষা বলা কতটুকু যৌক্তিক; একই সঙ্গে বিশ্লেষণ করা যাক  চাটগাঁইয়া ভাষা  স্বতন্ত্র ভাষা  হওয়ার  অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য কতটুকু ধারণ করে। 
  • চাটগাঁইয়া ভাষার স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট নির্ধারণের জন্য যেসব বিষয় প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে তা হলো: (১) উৎস ও উদ্ভপ্রক্রিয়া,   (২) সহজ বোধগম্যতা, (৩) সামগ্রিক মৌলিকত্ব, (৪) ভাষাভাষীর ভাষিক মাতৃত্ব, (৫) মৌলিক বাচনভঙ্গি, (৬) উচ্চারণগত স্বকীয়তা, (৭)ভাষিক স্বতন্ত্র ধ্বনি, (৮) ধ্বনি ভঙ্গিমা ও বাক্যগঠনে চৌকশ মাধুর্য, (৯) ধ্বনির ভাষিক রূপকতা, (১০) ধ্বানিক স্বকীয়তা, (১১) স্বতন্ত্র ও মৌলিক ব্যাকরণবিধি, (১২) সামগ্রিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা, (১৩) গ্রহণ বর্জন ও সমৃদ্ধায়ন সামর্থ্য, (১৪) সৃজনশীলতা এবং (১৫) ভৌগোলিক বিস্তৃতি।
১. উৎস ও উদ্ভপ্রক্রিয়া: একটি ভাষাকে স্বতন্ত্র ভাষা হতে হলে তার স্বতন্ত্র উৎস আর পৃথক সৃষ্টি বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য। যা একটি ভাষার স্বতন্ত্র মর্যাদার জন্য অনিবার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত। দেখা যাক চাটগাঁইয়া ভাষায় তা আছে কি না। চাটগাঁইয়া ভাষার  আদি পূর্বপুরুষ হলো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর দক্ষিণ এশীয় রূপ। এই রূপ থেকে  সৃষ্ট প্রাচীন প্রাকৃত-পালি হতে ক্রম বিবর্তনের মাধ্যমে বাংলার মতো সুস্পষ্ট পৃথক ধারায়  চাটগাঁইয়া ভাষার উদ্ভব।  সুতরাং, চাটগাঁইয়া ভাষা স্বতন্ত্র ভাষা হওয়ার মতো মৌলিক সৃষ্টিপ্রকিয়ার অধিকারী একটি ভাষা।   চাটগাঁইয়া ভাষার বাবা  প্রাকৃত পালি এবং ভাই-জ্ঞাতি হচ্ছে বাংলা, হিন্দি  অসমিয়া ওড়িয়া সিলটি বিহারি – – –  প্রভৃতি।
২. সহজ বোধগম্যতা: উপভাষাসমূহ সব মুল ভাষাভাষীর কাছে মোটামুটি বোধগম্য কিংবা অল্প আয়াসে বোধগম্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। কাছাকাছি হলেও  স্বতন্ত্র ভাষা  উপভাষার মতো  অন্যভাষীর কাছে তত সহজবোধ্য নয়।  যেমন: ফ্রান্স আর ইংল্যান্ড কাছাকাছি হলেও না শিখলে ফরাসিভাষীর কাছে ইংরেজি আবার ইংরেজভাষীর কাছে ফরাসি দুর্বোধ্য। পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তরবঙ্গের ভাষা, ঢাকা কিংবা কুমিল্লার লোকজন আবার ঢাকাইয়া ভাষা উত্তরবঙ্গের বা কুমিল্লা অঞ্চলের অধিবাসীরা যত সহজে বুঝতে পারে চাটগাঁইয়া ভাষা তত সহজে বুঝতে পারে না। কারণ এটি বাংলা হতে স্বতন্ত্র একটি ভাষা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রচলিত ভাষার মতো চাটগাঁইয়া ভাষা বাংলাভাষীর কাছে বোধগম্য নয়, বরং দুর্বোধ্য। কারণ চাটগাঁইয়া ভাষা বাংলা ভাষা নয়। আমার এক নোয়াখাইল্যা  বন্ধুর অভিমত, “আমি হিন্দি-উর্দু-অসমিয়া যত সহজে বুঝতে পারি চাঁটগাইয়া  ভাষা তত সহজে বুঝতে পারি না।”
৩. সামগ্রিকর মৌলিকত্ব: ভাষাভাষীর ভাষানিবিড়তা স্বতন্ত্র ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই কোনো ভাষাভাষী যে ভাষায় কথা বলুক না কেন, মাতৃভাষার টান বা বাচনভঙ্গি নিজের অস্তিত্বের মতো অক্ষুণ্ণ থেকে যায়। মাতৃভাষাকে অবহেলা করে অন্য ভাষার টানা রপ্ত করা কঠিন।  কুমিল্লা বা যশোর  অঞ্চলের কোনো লোকের প্রমিত বাংলার কথা শুনে তিনি কোন অঞ্চলের লোক তা বলা সহজ হবে না। কারণ বাংলা তার মাতৃভাষা এবং তিনি মাতৃভাষায় বলেছেন। কিন্তু চাটগাঁইয়া অঞ্চলের কোনো লোক যদি প্রমিত বাংলায় কথা বলে তাহলে তার বাচনভঙ্গি দেখে সহজে বলে দেওয়া যাকে যে, তার বাড়ি চট্টগ্রাম। কারণ  চাটগাঁইয়া  তার মাতৃভাষা, যা বাংলা হতে স্বতন্ত্র।   
৪. ভাষাভাষীর ভাষিক মাতৃত্ব:  বলা হয়, মানুষ মায়ের উদর হতে মাতৃভাষা শিখে আসে। তাই মানসিক কারণে সব স্মৃতি হারিয়ে ফেললেও মাতৃভাষায়  কথা বলার স্মৃতি হারায় না। চাটগাঁইয়া ভাষা চাটগাঁইয়াদের জন্য মায়ের উদর হতে শিখে আসা ভাষা।  ভাষাটি একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় অভিন্ন দ্যোতনায় প্রচলিত দ্যোতিত ও স্বতস্ফূর্তভাবে ব্যবহৃত। এটি শেখার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয়ে ভর্তি হতে হয় না। চাটগাঁইয়ারা পারিবারিক পরিবেশে জন্মের কয়েক বছরের মধ্যে সহজে এবং বিনা আয়াসে চাটগাঁইয়া ভাষা রপ্ত করে নিতে পারে। কারণ  এটি তাদের মাতৃভাষা।   অথচ অন্য অঞ্চলের কোনো লোক দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম থাকলেও চাটগাঁইয়া ভাষায় চাটগাঁইয়াদের মতো কথা বলতে পারে না। কারণ এটি তাদের মাতৃভাষা নয়।  যদি  বাংলা তথা তাদের মাতৃভাষা হতো তাহলে অন্য অঞ্চলের লোকও চাটগাঁইয়া ভাষায় চাটগাঁইয়ার মতো কথা বলতে পারত।
৫. মৌলিক বাচনভঙ্গি: চাটগাঁইয়া ভাষার বাচনভঙ্গি বাংলা বাচনভঙ্গি হতে ভিন্ন। এ ভাষায় পদ বা বাক্যের অর্থ শুধু বানান বা বাক্যের ওপর নির্ভর করে না, বাচনভঙ্গির ওপরও নির্ভর করে। এটি চাটগাঁইয়া ভাষার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। যেমন: বাংলায় তুই অর্থ সর্বদা আদর বা তুচ্ছার্থে তুমি এবং ‘তুই’ অর্থ  ‘তুমি’ নয়।  চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ‘তুই’  অর্থ আদরার্থে বা তুচ্ছার্থে ‘তুই’ এবং ‘তুমি’ দুটোই দ্যোতিত করে।  কোনটা কখন দ্যোতিত হচ্ছে তা বাচনভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। যেমন: ‘তুই’ উচ্চারণ তুঁউই হলে তুই অর্থ বাংলার তুই। উচ্চারণ তুই হলে এর অর্থ—  বাংলার ‘তুমি’। অনুরূপ, বাজি (উচ্চারণ বা-আ- জি) অর্থ—  বাবা, পিতৃব্য, মুরুব্বি, স্নেহের কেউ; কিন্তু বাজি (উচ্চারণ: বাজি) অর্থ—  জুয়া খেলার পণ।
 ৬. উচ্চারণগত স্বকীয়তা:বাংলায় উচ্চারণগত দীর্ঘস্বর নেই, কিন্তু চট্টগ্রামের ভাষায় উচ্চারণগত দীর্ঘস্বর রয়েছে। এ বিবেচনাতেও চাটগাঁইয়া ভাষা, বাংলা হতে ভিন্ন। বাংলায় ই ঈ এবং উ  ঊ ধ্বনি অভিন্ন উচ্চারণ দেয়। চট্টগ্রামের ভাষায় তা এক নয়।  চট্টগ্রামের ভাষায় শব্দ পদ বা বাক্য উচ্চারণে যে টান এবং বাচনভঙ্গি  তা বাংলায় নেই। এর সঙ্গে মিল পাওয়া যায় আরবি ভাষার। চট্টগ্রামের ভাষায়  হ্রস্ব আর  দীর্ঘস্বর নয়, মধ্যস্বরও রয়েছে। যেমন: ও বাজিরে ক্যান লাগে হওতো, ইয়্যান একখান হথা অইল না ওবা!
৭. ভাষিক স্বতন্ত্র ধ্বনি: ভাষার লেখ্যরূপের জন্য বর্ণ বা ধ্বনিচিহ্ন আবশ্যক। তবে কথার জন্য বর্ণ না হলেও চলে, কিন্তু ধ্বনি অনিবার্য। পৃথিবীতে অনেক ভাষা আছে যেগুলো ভাষার বৈশিষ্ট্য অনুসারে স্বতন্ত্র হলেও নিজস্ব বর্ণমালা নেই, কিন্তু নিজস্ব ধ্বনি আছে।  চট্টগ্রামের ভাষাতেও কোনো বর্ণমালা নেই।
আহমেদ আমিন চৌধুরী আর আমি চাটগাঁইয়া ভাষার বর্ণমালা ‍তৈরির চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু করোনা এবং আহমেদ আমিন চৌধুরীর মৃত্যুর কারণে তা পিছিয়ে গেছে। চাটগাঁইয়া ভাষা স্বতন্ত্র ভাষা হলেও নিজস্ব কোন বর্ণ না থাকায় বাংলা বর্ণে লেখা হয়। যা প্রায়শ মুরাদ টাকলা বাংলিশের মতো হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
৮.  ধ্বনি ভঙ্গিমা ও বাক্যগঠনে চৌকশ মাধুর্য: নিজস্ব ধ্বনিতে স্বকীয় ভঙ্গিমায় গঠিত এবং নিজস্ব রীতিতে অর্থবহ প্রকৃষ্টতায় উচ্চার্য বাক্য সৃষ্টি  স্বতন্ত্র  ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। চাটগাঁইয়া ভাষার এ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য এত মৌলিক  ও স্পষ্ট  যে, তা বাংলা বা অন্য ভাষার সঙ্গে  খায় না। খাপ খাওয়াতে গেলে  সৃষ্টি হয়ে যায় গোরুর গলা দিয়ে মহিষের চিৎকার বের করার মতো হাস্যকর পরিস্থিতি। চাটগাঁইয়া ভাষার ধ্বনি ভঙ্গিমা ও বাক্যগঠনের চৌকশ মাধুর্য রয়েছে। যেমন: যার গরত গাই গোরু নাই অ্যাই আলা বেচের দই, দেশ দুইন্যা ছাড়ি আঁই মরি যাইয়ুমগুই।
৯. ধ্বনির ভাষিক রূপকতা: চাটগাঁইয়া ভাষার এমন কিছু মৌলিক  বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা বাংলা ভাষার বর্ণ/ধ্বনি কিংবা গঠনরীতি দিয়ে যথাযথভাবে  উপস্থাপন করা যায় না। কুমিল্লা বা ঢাকা-ময়মনসিংহ কিংবা পশ্চিমবঙ্গ বা উত্তরবঙ্গের ভাষাকে বাংলা বর্ণে যত সহজোচ্চার্য বা সহজবোধ্যভাবে লেখা যায় চট্টগ্রামের ভাষাকে তত সহজে লেখা সম্ভব নয়।  যেমন:  কথা না বলে কোথায় গিয়েছ?” বাক্যটি চাটগাঁইয়া ভাষা বললে যা হয় তা কখনো বাংলায় অবিকলভাবে লেখা যাবে না। বাংলায় লেখা হয়: হথা ন হই হই গেইয়ুদে?  এমন লেখা হলেও এর উচ্চারণ চাটগাঁইয়া ছাড়া অন্য বাংলাভাষীর পক্ষে করা প্রায় অসম্ভব।  
১০. ধ্বানিক স্বকীয়তা: বাংলা বর্ণ দিয়ে চাটগাঁইয়া ভাষা অবিকল ভঙ্গিমায় দ্যোতিত করা যায় না। যেমন: পাগলকে চট্টগ্রামের ভাষায় যা বলে তা বাংলা বর্ণে লিখলে লিখতে হয়— পল; বাংলায় যার উচ্চারণ হয়— “পল মিশ্রিত অন্ন” বাগ্‌ভঙ্গির ‘পল’-এর মতো। অথচ চাটগাঁইয়া ভাষায় পাগল অর্থদ্যোতক ‘পল’ এর উচ্চারণ ঠিক /পল্/ নয়; অনেকটা প-অ-ল্। কিন্তু তাতেও উচ্চারণটি স্পষ্ট প্রকাশ করা যায় না। কেননা, চাটগাঁইয়া ভাষায় ‘প’-এর উচ্চারণ হুবহু /প্/ নয়, অনেকটা ‘ফ’-এর মতো, তবে এটি উচ্চারণ করতে প্রমিত /ফ্/ উচ্চারণ করার মতো শ্বাসে জোর দিতে হয় না। ওপরের পাটির দাঁত আলতো করে নিচের ঠোঁটে লাগিয়ে মুখ দিয়ে হালকা বাতাস বের করে দিলে এই উচ্চারণ পাওয়া যায়। তাই, বাংলা বর্ণ দিয়ে চট্টগ্রামের ভাষা লেখা অনেক সময় বাংলিশের মতো হাস্যকর ও বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। যা প্রমাণ করে, চাটগাঁইয়া ভাষা বাংলা ভাষা নয়, স্বতন্ত্র ভাষা। 
১১. স্বতন্ত্র ও মৌলিক ব্যাকরণবিধি : মৌলিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষার মতো চাটগাঁইয়া ভাষাও নির্দিষ্ট ব্যাকরণবিধি অনুসরণ করে রচিত দ্যোতিত পরিমার্জিত এবং বিকশিত। এর রয়েছে নির্দিষ্ট ব্যাকরণবিধি। যেমন: বাংলায় না-বোধক পদ সাধারণত ক্রিয়ার আগে বসে। যেমন:  আমি যাব না। চাটগাঁইয়া ভাষায় না-বোধক পদ সাধারণত ক্রিয়ার পরে বসে। যেমন: আঁই ন-যাইয়ুম। চর্যাপদেও এমন দেখা যায়। এজন্য অনেকে বলেন, চর্যাপদ প্রাচীন চাটগাঁইয়া ভাষায় রচিত।

 ১২. সামগ্রিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা:   চট্টগ্রামের ভাষা তার নিজস্ব ক্ষেত্র, পারিমণ্ডলিক কাঠামো, ভাষিক গঠন এবং ভাবপ্রকাশ ও অর্থদ্যোতকতায় স্বয়ংসম্পূর্ণ; স্বাধীন ও সার্বভৌম। শব্দ আর ব্যাকরণিকভাবে চাটগাঁইয়া ভাষা দিয়ে যেকোনো  মনোভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা যায়। যা একটি স্বতন্ত্র ভাষার অপরিহার্য শর্ত।   এর সঙ্গে বাংলার গঠনগত মিল খুবই কম।

১৩. গ্রহণ বর্জন ও সমৃদ্ধায়ন সামর্থ্য: গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যেমে সমৃদ্ধায়ন  স্বতন্ত্র ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যা চাটগাঁইয়া ভাষায় পুরোপুরি রয়েছে। চাটগাঁইয়া ভাষা বাংলা আরবি ফারসি  ইংরেজি ও বর্মি-সহ আরও অনেকে ভাষার শব্দ গ্রহণ করে শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। অন্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ ও বর্জন এবং অভিযোজন বৈশিষ্ট্যে চাটগাঁইয়া ভাষার  সামর্থ্য বিস্ময়কর।  সে শব্দ গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে আবার প্রয়োজনে  বিসর্জন দিয়ে দায়মুক্ত হয়েছে। চাটগাঁইয়া ভাষায় এমন অনেক শব্দ আছে যার প্রতিশব্দ বাংলায় নেই। যেমন: মাইল্যাপিড়া  চাটগাঁইয়া ভাষার একটি শব্দ। এর অর্থ: এমন কোনো ব্যক্তি বা বস্তু বা পরিস্থিতি যা আর্থিক, সামাজিক, মানসিক, দৈহিক, হার্দিক, রাষ্ট্রিক, পারিবারিক ও পারিবেশিকভাবে অকল্যাণকর।

১৪. সৃজনশীলতা: সৃজনশীলতা স্বতন্ত্র ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আঞ্চলিক ভাষা হলেও চাটগাঁইয়া ভাষার সৃজনশীলতা স্বতন্ত্র ভাষার মতো অপরিসীম। চাটগাঁইয়া ভাষার রচিত গান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বহুল জনপ্রিয়। এই ভাষায় রচিত হয়েছে অনেক নাটক, উপন্যাস এবং গল্প। 

১৫. ভৌগোলিক বিস্তৃতি:  ভৌগোলিক বিস্তার বিবেচনাতেও চাটগাঁইয়া ভাষা স্বতন্ত্র ভাষার মতো অনবদ্য মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার প্রায় সবাই এবং রাঙ্গামাটি খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার ৪৫ ভাগ অধিবাসী চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে। ‍পার্বত্য  এলাকার আদিবাসীরাও প্রাত্যহিক কাজে প্রয়োজনে চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে। ভাষাভাষীর সংখ্যা বিবেচনায়  চাটগাঁইয়া ভাষার স্থান নবতিতম। প্রসঙ্গত, বর্তমানে প্রায় এক  কোটি পঁচিশ লাখ লোট চাটগাঁইয়া ভাষায় কথা বলে। 

১৬. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:  ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রাম আরাকান রাজাদের অধীনে শাসিত হয়েছে। তখন বঙ্গদেশ ছিল চট্টগ্রামের জন্য বিদেশ  চট্টগ্রামও ছিল বঙ্গদেশের জন্য বিদেশ। আরাকান-চট্টগ্রামের এর আগেকার ইতিহাস ছিল অস্পষ্ট। আরাকান-শাসিত চট্টগ্রামের বাইরে  নোয়াখালী হতে শুরু করে বাংলাভাষী অধ্যুষিত বাকি অঞ্চল বঙ্গ, বঙ্গদেশ, বাঙলা, বাঙ্গালা প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। তন্মধ্যে বঙ্গ ছিল সবচেয়ে পরিচিত নাম। আরকান-চট্টগ্রামের অধিবাসীদের কাছে বাংলাভাষী এলাকা বিশেষ করে প্রতিবেশী বর্তমানে নোয়াখালী নামে পরিচিত এলাকা বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল।  বঙ্গদেশের লোকদের আরাকান-চট্টগ্রামের লোকজন বইঙ্গা বা বৈঙ্গা ডাকত।  মীরসরাই পর্যন্ত ছিল আরাকান রাজাদের রাজ্যসীমা। মীরসরাইর পর নোয়াখালী ছিল দক্ষিণ দিক হতে বঙ্গদেশের সূচনা-ভূমি। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় নোয়াখালীর লোকদের সঙ্গে আরাকানের লোকদের নানা কারণে যোগাযোগ করতে হতো এবং প্রায়শ যোগাযোগ হতো। এই যোগাযোগে আরাকানিরা নোয়াখালীর লোকদের বঙ্গদেশের অধিবাসী বা বাংলাভাষী হিসেবে বঙ্গিয়া বা বৈঙ্গা নামে ডাকত। 
উপসংহার:  একটি ভাষাকে উপভাষা না বলে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে   যেসব  বৈশিষ্ট্য থাকতে হয় কিংবা যেসব শর্ত পূরণ করতে হয় তার প্রত্যেকটি চাটগাঁইয়া ভাষার আছে। অতএব, চাটগাঁইয়া ভাষা বাংলার উপভাষা নয়, একটি স্বতন্ত্র ভাষা।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত কিছু জনপ্রিয় গান
চট্টগ্রামের ভাষায় অনেক গান রয়েছে তার মধ্যে কিছু গানের নাম উল্ল্যেখ করা হল
  • মন হাচারা মাঝি তোর সাম্পানত; চৈরতাম নয়
  • অ জেডা পৈরার বাপ
  • বাঁশহালি মইশহালি পাল ওড়াইয়া দিলে সাম্পান
  • সাম্পান ক্যাক্কুরত্‌
  • মধু হই হই আরে বিষ হাওয়াইলা
  • টেকনাইফফা পঅনা সুয়ারি মইশখাইল্লা পান রে
  • বাইক্কা টিয়া দে
  • আই আইলে এনকা গরর
  • হেড মাস্টরে তোঁয়ারে তোঁয়ার
  • আঁই ভাত নাহায়ম গোসসা অইয়ম
  • যার গরত গাই গোরু নাই তারত বেচের দই
  • ঘুম যারে দুধের বাছা ঘুম যারে তুই
  • সুর্য ওডেরলে ভাই লাল মারি
  • ওরে ও হালা ভোমরা আই আইজ ফুলর হরা
  • হতদিন অইয়েদে বারিত নজাইদ্দে
  • অ হালাচান গলার মালা
  • পিরিত মানি পুডুর পাডুর
  • নযাইও দুবাই বন্ধু আরে ফেলাই
  • যদি সুন্দর এক্‌খান মুখ পাইতাম
  • বানু রে অ বানু
  • কুতুবদিয়া আর বাড়ি
  • নাতিন বরই হা বরাই হা হাতে লইয়া নুন
  • রসর হতা হই হই
  • কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্খুম তোঁয়ারে
  • বাইন দুয়ার দি ন-আইস্যু তুই
  • ও ভাই আরা চাঁটগাইয়া নওজোয়ান
  • রইস্যা বন্ধু ছাড়ি গেলগই আঁরে বুকত সেল মারি
  • সোনাবন্ধু তুই আমারে করলি রে দিওয়ানা
  •  ‘রসিক তেল কাজলা কোন পাঞ্জাবিঅলা’
  • বন্ধু আঁর দুয়ারদি যঅ
  • অই লাল কোর্তা অলা
  • ছোডকাইল্লা পীরিত আঁর
  • ন মাতাই ন বোলাই গেলিরে বন্ধুয়া
  • মনের বাগানে ফুটিল ফুলরে
  • তুঁই যাইবা সোনাদিয়া বন্ধু, মাছ মারিবার লাই
  • অ শ্যাম রেঙ্গুম ন যাইও
  • ঢোল বাজের আর মাইক বাজের
  • বানুরে অ বানু আঁই যাইয়্যুম গই চাটগাঁ শঅরত তোঁয়ার লাই আইন্নুম কি?
  • দুই কূলের সোলতান ভান্ডারী
  • দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে
  • কতো খেলা জানরে মওলা
  • মাইজভাণ্ডারে কি ধন আছে
  • চল যাই জিয়ারতে মোহছেন আউলিয়ার দরবারে
  • আল্লাহর ফকির মরে যদি
  • কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যুম তোঁয়ারে ও ননাইরে
  • মাঝি পাল তুইলা দে
  • ও পরানের তালত ভাই, চিডি দিলাম পত্তরো দিলাম ন আইলা কিল্লাই
  • যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম,

    শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
    শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
error: Content is protected !!