চাদ (Chad) ইতিহাস ও নামকরণ

ড. মোহাম্মদ আমীন

চাদ (Chad)

চাদ মধ্য আফ্রিকায় অবস্থিত একটি স্থলবেষ্ঠিত দেশ। এর উত্তরে লিবিয়া, পূর্বে সুদান, দক্ষিণে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র , দক্ষিণ-পশ্চিমে ক্যামেরুন ও নাইজেরিয়া এবং পশ্চিমে নাইজার অবস্থিত। চাদ (Lake Chad) আফ্রিকার বিখ্যাত একটি হ্রদ। এ হ্রদের নাম থেকে চাদ নামের দেশটির নামকরণ করা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে চাদ হ্রদ অবস্থিত। কানুরি ভাষার শব্দ সাড তে ‘চাদ’ নামের উদ্ভব। স্থানীয় প্রাচীন কানু ভাষায় শব্দটির অর্থ হ্রদ বা বিশাল বিস্তৃত জলের আধার বা জলের বিস্তৃত বিস্তার (large expanse of water)। উল্লেখ্য, নাইজেরিয়া, নাইজার, চাদ ও ক্যামরুনের প্রায় ৪ মিলিয়ন লোক এখনও কানুরি ভাষায় কথা বলে।

প্রাচীন ইংরেজি ভাষার শব্দ চেদ  অর্থ যুদ্ধ। অনেকে বলেন, এ শব্দ হতে ‘চাদ’ নামের উদ্ভব হয়েছে। অতি প্রাচীনকালে এ হ্রদ নিয়ে দুটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রচ- যুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিল। প্রায়শ এ হ্রদের দখল নিয়ে অধিকৃতদের আতঙ্কে থাকতে হতো। তাই হ্রদটির নাম হয় চাদ। চাদ হ্রদের দখলের সঙ্গে জনপদ ও ভূখন্ডের দখল সম্পৃক্ত ছিল। তাই চাদ হ্রদ সংলগ্ন জনপদটির নামও হয়ে যায় চাদ। আবার অনেক মনে করেন, ইংরেজি সেন্ট  শব্দ হতে ‘চাদ; নামের উদ্ভব। যার অর্থ সাধু, ঋষি, পবিত্র ব্যক্তি বা পূণ্যবান। হ্রদের জল ছিল পবিত্র এবং স্থানীয় অধিবাসীরা এ হদ্রকে পবিত্র মনে করতেন।

চাদ আয়তন ১২,৮৪,০০০ বর্গকিলোমিটার এবং ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে জনসংখ্যা, ১,০৩,২৯,২০৮, ঘনত্ব ৮.০০/বর্গকিলোমিটার। আয়তন বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ২১-তম এবং আফ্রিকার ১৫-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় বিশ্বের ২১২-তম জনবহুল দেশ। এর রাজধানী এনজামেনা (ঘ’উলধসবহধ) এবং মুদ্রার নাম ফ্রাঙ্ক। চাদ ধর্মীয় বৈচিত্র্যময় একটি দেশ। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, অধিবাসীর ৫৪% চাদিয়ান মুসলিম, ২০% রোমান ক্যাথলিক, ১৪% প্রোটেস্টেন্ট, ১০% সর্বপ্রাণবাদী এবং ৩% উদার, যারা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাসী নয়। সরকারিভাবে চাদ এর জনগণকে চাদিয়ান বলা হয়। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের ১১ আগস্ট চাদ স্বাধীনতা লাভ করে। চাদে ২০০ নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী এবং ২ লাখ সুদানি শরণার্থী রয়েছে। ফ্রেঞ্চ ও আরবি দেশটির সরকারি ভাষা। তবে বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে প্রচলিত ভাষার সংখ্যা ১০০। ফ্রেঞ্চভাষীর সংখ্যা বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ২১-তম জনবহুল দেশ

২০১৪ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, চাদ এর জিডিপি (পিপিপি) ৩১.৪৪৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ২,৭৮৭ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ১৫.৯৮৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ১,৪১৭ ইউএস ডলার।

৬৮৭৫ বর্গমাইল আয়তনের লেক চাদ আয়তনের দিক হতে পৃথিবীর ১৭-তম বৃহত্তম হ্রদ। এটি পৃথিবীর কয়েকটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিস্ময়কর প্রাকৃতিক স্থাপনার অন্যতম। তাই রাজনীতিক অস্থিরতা ও পর্যটন শিল্পে আধুনিক সুবিধা তেমন পর্যাপ্ত না হওয়া সত্ত্বেও অনেক লোক হ্রদটি দেখতে যায়। আগস্ট হতে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত লেক চাদ দেখার উপযুক্ত সময়। তখন জল পূর্ণ থাকে এবং সময় সময় কুমির ও জলহস্তীও দেখা যায়।

চাদ একটি দরিদ্র রাষ্ট্র। ৮০% চাদিয়ান দরিদ্র সীমার নিচে বাস করে। গড় আয়ু মাত্র ৪৭ বছর। চাদিয়ান মহিলারা গড়ে ৬টি সন্তান জন্মদান করে। লিবিয়া, সুদান ও নাইজেরিয়া চাদের তিন তেলসম্পদ সমৃদ্ধ প্রতিবেশি এবং নাইজারও মধ্য আফ্রিকা পৃথিবীর দরিদ্রতম দুই প্রতিবেশি। এখানে আছে হাতি, গ-ার, জলহস্তী, ওয়ারথগ, জিরাপ, সারং, চিতা, সিংহ, হায়েনা ও সাপসহ আরও অনেক হিংস্র প্রাণী।

চাদ পৃথিবীর হট্টগোলের মিনার (The Babel Tower of the world) নামে পরিচিত। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে চাদ তেল রপ্তানি শুরু করে। এক মার্কিন কসোর্টিয়াম কোম্পানি দক্ষিণ চাদে সংরক্ষিত ১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্তোলনের জন্য ৩.৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। তেল উৎপাদন শুরু হলে দেশটির আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে।

চাদ-এর গ্রামের লোকদের মাঝে একটা কথা প্রচলিত আছে, যদি কেউ কুকুরের চোখ হতে শুকনো কিছু নিয়ে নিজের চোখে দেয়, তাহলে সে দৈত্য, ভূত ও রাক্ষস দেখতে পাবে। তবে এমনটি কেউ করেছে কিনা জানা যায় না। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ভবিষ্য-স্বামীকে তার শ্বশুড় বাড়িতে শ্বশুড়ের সঙ্গে তিন বছর কাজ করতে হয়। চাদিয়ানেরা প্রায়শ মাছ ও মাংস একই পাত্রে একসঙ্গে রান্না করে। তাদের কিছু প্রচলিত চিকিৎসাও রয়েছে। যেমন, হুপিং কাশি বন্ধের জন্য তারা গাধার দুধ ব্যবহার করে।

 সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক

error: Content is protected !!