চায়না (China) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

চায়না (China)

চীন বা চায়না নামের উদ্ভব সম্পর্কে একাধিক প্রবাদ রয়েছে। কথিত হয়, মধ্য পারসিয়ান চিনি (Chīnī) শব্দ হতে চিন বা চায়না নামের উৎপত্তি। চিনি শব্দটি সংস্কৃত ভাষায় এসে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে চিনাহ্ বা চায়নাহ্ (Cīnāh) রূপ ধারণ করে। অনেকে বলেন পারসি চিনি হতে সংস্কৃতাগত চিনাহ্ হতে চিন বা চায়না নামের উৎপত্তি। অনেকে বলে থাকেন চিনের বিখ্যাত সামাজ্রের প্রতিষ্ঠাতা কিন ( খ্রিষ্টপূর্ব ২২১- খ্রিষ্টপূর্ব ২০৬) এর নাম হতে চিন বা চায়না নামের উৎপত্তি। তবে কিন সা¤্রাজ্যের অনেক আগে মহাভারতে চিনাহ্ বা চায়নাহ্ নামের উল্লেখ রয়েছে। মহাভারতে দক্ষিণ তিব্বত ও বার্মিজ উচুভূমির লোকদেরকে চিনাহ্্ বা চায়নাহ্ বলা হয়েছে। সুতরাং চিন বা চায়না নাম যে কিন (Qin) হতে আসেনি- এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়।

খ্রিষ্টপূর্ব ২১০০ অব্দে চিনে প্রথম পরিকল্পিত সাম্রাজ্য ঘটন করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ২২১ অব্দে কিন রাজবংশের আমলে বিভিন্ন রাজ্যকে একীভূত করে অখ- চিন গঠন করা হয়। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি রিপাবলিক চায়না প্রতিষ্ঠা হয় এবং ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ১ অক্টোবর পিপলস রিপাবলিক চায়না প্রতিষ্ঠা করা হয়।

গণচীনের আয়তন ৯৫,৯৬,৯৬১ বর্গ কিলোমিটার। তন্মধ্যে জলীয়ভাগ ০.২৮%। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী গণচীনের জনসংখ্যা ১৩৭,৬০,৪৯,০০০ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ১৪৫ জন। আয়তন বিবেচনায় গণচীন পৃথিবীর চতুর্থ বা পঞ্চম কিন্তু জনসংখ্যার দিক হতে প্রথম। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ৮৩-তম। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে চিনের জিডিপি (পিপিপি) ১৮.৯৭৬ ট্রিলিয়ন এবং মাথাপিছু আয় ১৩,৮০১ ইউএস ডলার। জিডিপি (নমিনাল) ১১.২১২ ট্রিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৮,১৫৪ মার্কিন ডলার। গিনি ৫৫.০ এবং এইচডিআই ০.৭১৯, যা বিশ্বে ৯১-তম। চিনের মুদ্রার নামর রেনমিনবি, যা ইউয়ান নামে বেশি পরিচিত। প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর পূর্বে চিনে প্রথম কাগুজে মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। এর রাজধানী বেজিং এবং বৃহত্তম শহর সাংহাই। বেজিং শহরে মুক্ত বাতাসে একদিন বসবাস করা ২১টি সিগারেট পানের চেয়েও ক্ষতিকর। চায়নার জাতীয় খেলা হচ্ছে টেবিল টেনিস।

চীনে ২২টি প্রদেশ রয়েছে। এ ছাড়া তাইওয়ানকে চায়না সরকার ২৩-তম প্রদেশ মনে করে। যদিও বর্তমানে তাইওয়ান রিপাবলিক অব চায়না দ্বারা শাসিত হয়। যা পিপলস রিপাবলিক অব চায়নার দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। চীনে পাঁচটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল রয়েছে। যা নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু দ্বারা শাসিত। এছাড়া রয়েছে চারটি মিউনিসিপালিটি এবং দুটি বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল [Special Administrative Regions (SARs)]। বিশেষ প্রাশাসনিক অঞ্চলগুলো অতিরিক্ত রাজনীতিক স্বাধীনতা ভোগ করে। ২২টি প্রদেশ, পাঁচটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, চারটি মিউনিসিপালিটিকে একত্রে মেইন ল্যান্ড চায়না (mainland China) বলা হয়। দুটি বিশেষ প্রাশাসনিক অঞ্চল হচ্ছে হংকং ও ম্যাকাও। এ দুটি অঞ্চল মেইনল্যান্ড চায়নার বাইরে।

শিশুরা চীনের যে কোনো স্থানে পায়খানা করতে পারে। যাতে সহজে পায়খানা করতে পারে এ জন্য প্যান্টের পেছনে খোলা ও বন্ধ করার সুবিধা রাখা হয়। রাজ হাঁসের আক্রমণাত্মক আচরণ ও একাগ্রতা বিবেচনায়, চায়নায় কিছু কিছু স্থানে পুলিশ বাহিনি, কুকুরের পরিবর্তে রাজহাঁস ব্যবহার করে। চীনে মুত্র-ডিম্ব চিকিৎসা অনেকের কাছে জনপ্রিয়। দশ বছরের কমবয়সী বালকের মূত্রে সারাদিন ডিম সিদ্ধ করা হয়। চায়নিজ চিকৎসকগণ বলেন, এভাবে সিদ্ধ করা ডিম খেলে স্বাস্থ্যের প্রভূত উন্নতি হয়, রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। ইন্টারনেট আসক্তদের চিকিৎসার জন্য চীনে চিকিৎসা ক্যাম্প রয়েছে। চীনে প্রতিবছর ৪ মিলিয়ন বিড়াল সুস্বাদু খাদ্য হিসাবে খাওয়ার জন্য হত্যা করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য চায়না ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ১০ মিলিয়ন নারী সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল।

বছরে সারা পৃথিবীতে যত মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়, চিনে একই তার চারগুণ মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। প্রতিবছর চিনে ৪৫ বিলিয়ন চপস্টিক ব্যবহার করা হয়। সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া চিনে পুনরায় দেহ ধারণ (Reincarnation) নিষিদ্ধ। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ হতে চিনে ফেসবুক, টুইটার ও নিউইয়র্ক টাইমস নিষিদ্ধ। পৃথিবীর বৃহত্তম মল চিনে অবস্থিত, যার ৯৫ ভাগই প্রায় খালি পড়ে থাকে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এখন চিনের প্রায় ৩৫ মিলিয়ন লোক গুহায় বসবাস করে। যা অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। চীনের ৭০০ মিলিয়ন লোক দুষিত পানি পান করে। এ দেশের ১০০ মিলিয়ন লোককে দৈনিক ১ মার্কিন ইউএস ডলার আয় দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। চায়না সীমানায় অবস্থিত পাঁচটি টাইম- জোনকে একটি টাইম জোনে পরিণত করায় চিনে এমন কতগুলো অঞ্চল রয়েছে যেখানে দশটার পর সুর্যদোয় হয়। সানফ্রান্সিসকো শহরের এক তৃতীয়াংশ বায়ুদুষণের বায়ু চীন হতে আসে। চিনে ইনস্টলকৃত ৭৮ ভাগ সফটওয়্যারই পায়রটেট।

প্রতি ৩০ সেকেন্ডে চিনে একটি করে প্রতিবন্ধী শিশু জন্মগ্রহণ করে। পৃথিবীর মানুষ যত মোজা পরিধান করে তার প্রতি তিনটার মধ্যে একটা জুতো চীনের জুজি জেলায় তৈরী হয়। এজন্য এ শহরকে মোজা-শহর বলা হয়। চিনের একশিশু নীতির কারণে প্রতিবছর এক মিলিয়নেরও অধিক মেয়ে-ভ্রƒণ হত্যা করে এবং হাজার হাজার শিশু গোপনে পরিত্যক্ত হয়। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে চিনের ৩০ হতে ৪০ মিলিয়ন লোক বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজে পাবে না। চিনে কসমেটিকস সামগ্রী বাজারজাত করার পূর্বে জীবজন্তু দিয়ে পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। পৃথিবীর একমাত্র দেশ চীন, যেখানে আপনি ব্রা-অধ্যয়নকে প্রধান বিষয় হিসাবে গ্রহণ করতে পারেন। চীনের সাংহাই শহরে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ যানজট হয়েছিল। ৬২ মাইল দীর্ঘ এ যানজট ঠেকাতে ১২ দিন সময় লেগেছিল। চীনের কিছু কিছু এলাকায় স্মার্টফোন আসক্তদের চলাচলের জন্য কিছু পথ নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে। যাতে আসক্তির কারণে সাধারণ লোকদের কোনো অসুবিধা না হয়। এ দেশে নতুন সৈনিকদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় সারাক্ষণ মাথা উঁচু করে রাখতে হয়। তারা যাতে মাথা নিচু করার সুযোগ না পায় এ জন্য জামার কলারে এমনভাবে একটি পিন গেঁথে দেওয়া হয়, যার মুখ উপওে এবং গলার কাছাকাছি থাকে। মাথা নিচু করলে যা গলায় ঢুকে যায়।
চীনে সরকারিভাবে ৫৬টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ঘোষণা করা হয়েছে। সংখ্যাগুরু হচ্ছে হ্যান চায়নিজ। তাদের সংখ্যা চীনের মোট জনসংখ্যার ৯১.৫%। বাকি ৫৫টি নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর জনসংখ্যা হচ্ছে মাত্র ৮.৫%। হ্যান চায়নিজ হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম একক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের শুমারি অনুযায়ী চীনে মোট ৫৯৩,৮৩২ জন বিদেশি লোক বসবাস করে। চীনে মোট ভাষার সংখ্যা ২৯২। তবে অধিকাংশ অধিবাসী চায়নিজ ম্যান্ডারিন ভাষায় কথা বলেন।

চায়না সরকার দাপ্তরিকভাবে নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী। আধুনিক বিশ্বে নাই-অস্তিত্বে বিশ্বাস না করার যে বিচক্ষণতা তাই চীন সরকারে দেখা যায়। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, চীনের ৪৭% লোক নিজেদের এথিস্ট দাবি করেন। প-িতদের ধারণা, আসলে চীনে ধর্ম নিয়ে কোনো সীমারেখা নেই। চীনে বিদ্যমান ধর্মসমূহের মধ্যে বুড্ডিজম, তাউইজম এবং স্থানীয় কিছু ধর্ম বিশ্বাস দেখা যায়। চিনে খ্রিস্টানের সংখ্যা ৫৪ মিলিয়ন। তবে এগুলো নিয়ে সরকার বা ব্যক্তির কোনো মাথাব্যাথা নেই। কেবল নামে আছে। হয়তো এজন্য এখানে হানাহানি ধর্মবাজ রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় অতি নগণ্য। ১-২% অধিবাসী মুসলিম।

গ্রেট ওয়াল চীনের একটি অনবদ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। বিভিন্ন যাযাবর গোষ্ঠীর আক্রমণ হতে চীনা সা¤্রাজ্যকে রক্ষার জন্য খ্রিস্টপূর্ব সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধে একাধিক ওয়াল নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীকালে তা যুক্ত করে আরও লম্বা ও মজবুত দেওয়াল প্রস্তুত করা হয়। বিভিন্ন ওয়ালসমূহের যুক্তরূপই বর্তমানে গ্রেটওয়াল নামে পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব ২২০-২০৬ অব্দে তৎকালীন সম্রাট কিন সিঙ হুয়াঙ গ্রেট ওয়ালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ নির্মাণের জন্য খ্যাত হয়ে আছেন। বর্তমানে গ্রেট ওয়ালের সিংহভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। বিদ্যমান ওয়ালের অধিকাংশ মিং সা¤্রজ্যের সময় নির্মিত। সম্প্রতি এক জরিপে দেখা যায়, শাখাপ্রশাখাসহ গ্রেটওয়ালের মোট দৈঘ্য ২১,১৯৬ কিলোমিটার।

চায়না পতাকার জমিন লাল। তন্মধ্যে পাঁচ পাঁচবিন্দুর তারকা রয়েছে। একটি বড়, বাকি চারটি ছোট। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর বর্তমানে প্রচলিত পতাকাটি গ্রহণ করা হয়।

আর্মেনিয়া (Armenia) : ইতিহাস ও নামকরণ

বাহরাইন (Bahrain) : ইতিহাস ও নামকরণ

বাংলাদেশ (Bangladesh) : ইতিহাস ও নামকরণ

ভুটান (Bhutan) : ইতিহাস ও নামকরণ

ব্রুনাই (Brunei) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

 

error: Content is protected !!