চোর কিন্তু চুরি কেন: হন্য বনাম হন্যে: মধুমাস বনাম মধুফল

ড. মোহাম্মদ আমীন

চোর কিন্তু চুরি কেন: হন্য বনাম হন্যে: মধুমাস বনাম মধুফল

সংযোগ: https://draminbd.com/চোর-কিন্তু-চুরি-কেন-হন্য-ব/

 
 ‘চুরি’ শব্দে উ-কার হলে ‘চোর’ শব্দে ও-কার কেন হয়?
চোর ব্যক্তিজ্ঞাপক। চুরি হলো চোর শব্দের কর্মজ্ঞাপক বাগ্‌ভঙ্গি। দুটোই বিশেষ্য। সাধারণত (দুই বর্ণের) ব্যক্তিজ্ঞাপক শব্দের বানানের প্রথমে ও-কার থাকলে ওই ব্যক্তির কাজকে নির্দেশ করার জন্য শেষ শব্দে ই/ঈ-কার দিলে প্রথম শব্দের ও-কারউ-কার হয়ে যায়। পদটি তখন কর্মজ্ঞাপক বিশেষ্য হয়ে যায়।
যেমন:
  • ঢোল— ঢুলি: ঢোল বাজায় ঢুলি।
  • চোর— চুরি: চোর করে চুরি।
  • গোল— গুলি: গোল বাঁচায় গুলি।
সাধারণ নিয়ম: পদের প্রথমে ও-কার থাকলে তা বিশেষ্য বা কর্মজ্ঞাপক বিশেষ্য, বিশেষণ/ক্রিয়া বা ক্রিয়াবিশেষ্য বা ক্রিয়াবিশেষণে পরিণত করার জন্য শব্দের শেষ বর্ণে ই/ঈ-কার দিলে মূল পদের আদ্য ও-কার সাধারণত উ-কার হয়ে যায়। যেমন:
  • ঘোর/ ঘোরা— ঘুরি
  • পোড়/পোড়া— পুড়ি
  • মোড়/মোড়া— মুড়ি
  • খোল/খোলা— খুলি
  • খোঁড়/খোঁড়া— খুঁড়ি
  • শোন/শোনা— শুনি
  • গোলা/গোলি— গুলি

অনেক সময় স্ত্রীবাচক পদের ক্ষেত্রেও এমন পরিবর্তন হয়। যেমন: টোনা— টুনি।

হন্য বনাম হন্যে

 
হন্য ও হন্যে ভিন্ন অর্থের পৃথক দুটি শব্দ। ‘হন্য’ শব্দের অর্থ বধযোগ্য, হন্তব্য বা হননীয়। যেমন: পাগলা কুকুর একটি হন্য প্রাণি।
হন্যে শব্দের অর্থ উন্মত্ত, ক্ষিপ্ত, পাগলা, হিতাহিতজ্ঞানশূন্য, খাপ্পা, বিকৃত মস্তিষ্ক ইত্যাদি। যেমন: হন্যপ্রাণিটি হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বনকর্মীরা হন্যে হয়ে হন্যপ্রাণি খুঁজছে।
অনেকে ‘হন্যে’ অর্থে ‘হন্য’ লিখে বাক্যে হাস্যকর অর্থের অবতারনা ঘটায়।
তিনি হন্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।এর অর্থ ‘তিনি বধযোগ্য হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’ এটি হাস্যকর। উন্মত্ত, ক্ষিপ্ত বা অস্থির হয়ে ঘুরে বেড়ানো অর্থে লিখুন; হন্যে।
মধুমাস বনাম মধুফল
‘মধুমাস’ শব্দের অর্থ ‘চৈত্রমাস’। অনেকে জ্যৈষ্ঠ মাস অর্থে শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। এটি অশুদ্ধ। মধুমাস কেবল চৈত্র মাসকে বুঝায়। অন্যদিকে ‘মধুফল’ বলে কোন শব্দ বাংলা অভিধানে নেই। তবে বৃন্দাবনের একটি বনের নাম মধুবন। কিন্তু ‘মধুফল’ নামের কোন ফল কোথাও নেই।
মধুমাস মানে চৈত্রমাস। খনা, রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল, নজরুল, হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় সবাই মধুমাস বলতে চৈত্রমাসকেই বুঝিয়েছেন। সর্বজনাব কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় সমার্থকোষ’ অভিধানে বলা হয়েছে, ‘চৈত্রমাসকে কেন মধুমাস বলা হয়। তার কারণ জানা যায় ‘বসন্ত’ শব্দ থেকে। দুধের থেকে সর, সর থেকে ঘোল মাখন হয়ে ঘি-এ পৌঁছানো যায়। সেই সুবাদে মধু হলো ঘি। ঠিক সেইরূপ বৈশাখ থেকে বসবাস ও বর্ষের শুরু, এবং তার চূড়ান্ত হয় বসন্তে। সেই বসন্তের শেষ মাস হলো চৈত্রমাস। গ্রহণ-বর্জন-পুনরুৎপাদনের নীতিতে চলা মানবজীবনের জৈবিক সার্থকতা পুনরুত্পাদনে। বসন্তের অন্তে বা চৈত্রমাসে মানুষের প্রতিপালন প্রাচীন শব্দবিদগণের অখণ্ড চিন্তাশৃঙ্খলার সঙ্গে খাপ খেয়ে যায়। সেই কারণে তারা চৈত্রমাসকে মধুমাস নাম দিয়েছিলেন।’ বাংলা একাডেমিও ‘মধুমাস’ বলতে চৈত্রমাস বুঝিয়েছে।
error: Content is protected !!