চ্যাংদোলা চ্যাং কী

 

ইউসুফ খান, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

চ্যাংদোলা চ্যাং কেন

দোলা
প্রাচীনকালে শ্মশানে মড়া নিয়ে যাওয়া হতো বাঁশে ঝুলিয়ে নিয়ে। ঝোলানোর জন্য মড়ার হাতদুটো এক জায়গায় করে কব্জিতে ছাঁদন দড়ি দিয়ে বেঁধে  দেওয়া হতো। অন্যদিকে, পা দুটো জুড়ে গোড়ালিতে বাঁধন দেওয়া হতো। তারপর হাত পায়ের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে একটা বাঁশ গলিয়ে দিয়ে বাঁশের দুপ্রান্ত দুজন কাঁধে তুলে নিয়ে চলতে শুরু করত। এভাবে মড়া শূন্যে ঝুলতে ঝুলতে এবং দুলতে দুলতে শ্মশানের দিকে এগিয়ে যেত। এই কারণেই মড়া বহন করার আদিম ব্যবস্থাকে বল হতো ঝোলা বা দোলা। ইংরেজ আমল থেকে এখনও পুলিশ প্রত্যন্ত এলাকায় খুন হওয়া দাগি আসামিদের এভাবেই ঝুলিয়ে নিয়ে যায়। মরা গোরু-মোষ প্রভৃতি ভাগাড়ে ফেলার জন্যও এভাবে নিয়ে যাওয়া হয়।

দুলে
দোলাতে শুধুই মড়া বহন করে নিয়ে যাওয়া  হতো না, জীবিত মানুষও বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো। এখনও উড়িষ্যা সাঁওতাল পরগনার প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রাম থেকে রোগী  বা পোয়াতিকে দোলা করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আগে গ্রামের ডাক্তার বাবু বা শহরের হঠাৎ-বাবুরা যাতায়াতের জন্য দোলা ব্যবহার করত। এই দোলা দেখতে অনেকটা দাঁড়িপাল্লার একটা পাল্লার মতো, যেটাকে বাঁশ বা শালকাঠের লাঠি দিয়ে ঝুলিয়ে নেওয়া হতো। যাকে বহন করে নিয়ে যাওয়া হতো সে এই পাল্লাটায় অবস্থান নিত। এই পাল্লার মতো দোলা পরে বেতের বোনা চেয়ারের মতো চেহারা নেয়। যেটায় যাত্রী বসে যেতে পারত, তাই সাহেবরা এটাকে বলতো সেডান, সিট করে যাওয়া যায় তাই সেডান। উড়ে এবং বিহারীরা এদেশে কাহার বা ঝাঁকামুটে হিসেবে আসার আগে এখানকার দোলা বইত মূলত বাগদি-রা, তাই এই দোলা-বওয়া বাগদিদের বলা হতো দুলে-বাগদি, ছোটো করে শুধুই দুলে।

দোলার বিবি
নবাব নিজাম বাদশা এদের প্রধান বিবি খুবই উঁচুদরের হতো। তারা যে ঠাটবাটে চলতো ফিরত, যে জাঁকজমক মিছিল জুলুস করে জনসমক্ষে যেত আসত বা প্রাসাদে ঢুকত, সে সম্মান নিচুদরের বিবিরা পেত না। তবে তাদেরও যেন মাটিতে পা না পড়ে সেটা দেখা হতো। তাদের আড়ালে দোলায় করে যাতায়াত করানো হতো। তাই তারা দোলার বিবি। এদের দেখাদেখি জমিদার বড়োলোকদের মধ্যেও এই দোলার বিবি ব্যাপারটা অল্পস্বল্প চালু হয়। আর সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টা আসে অন্য ভাবে।  বিয়ে করে বিবিকে একদিনের বেগমের সম্মান দিয়ে পালকি করে আনা হতো আর বিবির বোনবান্ধবীদর দোলায় করে আনা হতো। এই মেয়েদের বলা হতো দোলার বিবি। বাংলার মুসলমানদের বিয়েতে বরের সঙ্গে বরযাত্রী হয়ে আসা মেয়েদের বলা হতো দোলার বিবি। বিয়ে বাড়িতে ঢুকতে যাতে এদের পা মাটিতে না পড়ে তার জন্য এদেরকে পাঁজাকোলা করে বাড়িতে ঢোকানো হতো। এখানে পাঁজাকোলাটাই দোলা।

ডুলি
হিন্দিতে দোলাকে বলে ডোলা বা ডোলি। তার প্রভাবে বাংলাতে ডুলি কথাটা চলতো। আগডোম বাগডোম ছড়াতে আছে
বাজ্‌তে বাজ্‌তে চল্লো ডুলি।
ডুলি গেল সেই কমলা পুলি॥
ডাকাতরা ডাকাতির মাল কাঁসা পেতল কাপড়ের বড়ো পোঁটলাতে বেঁধে বা গেরস্ত বাড়ি থেকেই তুলে নেয়া ঝুড়িতে ঝুলিয়ে বাঁশের দোলাতে দুলিয়ে দুলিয়ে নিয়ে যেতো। এটাকে বলতো ডাকাতের ডুলি। এই নামে খগেন্দ্রনাথ মিত্রের একটা গল্প আছে। বয়স্ক লোকেরা তীর্থে তীর্থে ঘুরতে বা পাহাড়ের ওপর মন্দিরে পৌঁছতে ডুলিতে চড়ে বসে।

পালকি

একসময় কাঠের ঝোলানো দোলা বা সেডানের জায়গায়  সাজানো পালঙ্ক ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়া চালু হয়। তাই দোলা মানে পরে দাঁড়িয়ে যায় পালঙ্কি পালানকিন পালকি। পালঙ্কি শুরুতে চারদিক খোলা থাকত, পরে পর্দা আনার জন্য চারদিকে চিক চিলমন চালু হয়। এর  আরো পরে কাঠ দিয়ে ঘিরে পুরো কাঠের বক্স করে ফেলা হয়। ভূপেন হাজারিকার গানে আছে – আঁকা বাঁকা পথে মোরা কাঁধে নিয়ে ছুটে যাই রাজা মহারাজার দোলা। এই দোলা হচ্ছে পালকি। হিন্দি গানে আছে – ডোলি সজাকে রখনা মেহেন্দি লগাকে রখনা। এই ডোলিও পালকি। গরিবের পালঙ্ক হলো প্রকৃতপক্ষে খাটিয়া। তাই রুগি  বা মড়া বহন করার জন্য চারঠেঙো খাটিয়া আজও ব্যবহার হয়। যার মরার বয়েস হয়েছে তাকে আমরা বলি – ‘বুড়ো আজ বাদ কাল খাটে চড়বে’ বা ‘বুড়োর খাটিয়ায় চড়ার বয়েস হয়েছে তাও রস যায় না!’। চ্যাংড়ারা এই বুড়োদের রাগাতে আওয়াজ দেয় – ‘বলো হরি হরিবোল, ঘাটের মড়া খাটে তোল’ বলে। এই খাট হচ্ছে মড়া বওয়া খাটিয়া, রসিক মানুষ এটাকেও বলে পালকি – শ্মশান পালকি। খাটিয়াটাকে দুটো মোটা ডান্ডায় চারজনে বয়, তাই এটা দোলে না, তাও একে চৌদোলা বলে।

চ্যাংদোলা চ্যাংঝোলা
পুকুরে চান করার সময় খেলতে খেলতে দুই কিশোর আর এক কিশোরের হাত-পা ধরে ঝুলিয়ে দোলাতে দোলাতে তাকে ঝপাৎ করে পুকুরে ফেলে দেয়। একজন তার হাত দুটোকে ফাঁক করে ধরে তার কবজি দুটোকে আলাদা আলাদা দু হাত দিয়ে ধরে, আর একজন তার পা দুটো ফাঁক করে ধরে তার গোড়ালি দুটোকে দু হাত দিয়ে ধরে। ঝোলানো দোলানোর জন্য এভাবে ধরাকে বলে চ্যাংদোলা করে ধরা। মাটি কামড়ে পড়ে থাকা নাছোড়বান্দা কাউকে হটাতে তার হাত-পা দুটোকে এইভাবে ধরে শূন্যে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়াকে বলে চ্যাংদোলা বা চ্যাংঝোলা করে নিয়ে যাওয়া।


কিন্তু চেঙ্গ চেঙ চ্যাং কেন?

চ্যাং
মুন্ডারি ভাষায় চাঙ্গা কথাটার মূল অর্থ— পা দুটো দুদিকে ছড়িয়ে ইংরেজি ভি (V) অক্ষরের মতো করা। সেখান থেকে দুফাঁক দুভাগ হওয়া  অর্থে বাংলা ভাষায় চাঙ্গা কথাটির প্রচলন। বাংলায় শব্দটি ঈষৎ পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে চাঙ্গা চ্যাঙ বা চ্যাং বানানে অভিধানে পাওয়া যায়। শব্দটির প্রাচীন বানান  চেঙ্গা চেঙ। পথ চলতে চলতে যেখানে পথ দু-ভাগ হয়ে দুদিকে চলে যায়  সাঁওতালি ভাষায় তাকে  বলে পথটা চাঙ্গা হয়েছে— চাঙ্গাকানা। গাছের ডাল দু-ফ্যাঁকড়া হয়ে    ইংরেজি ওয়ই (Y) বর্ণের আকার ধারণ করাকে সাঁওতালি ভাষায় বলা হয় চাঙ্গাচাঙ্গি। শুবাচি ইউসুফ খানের ভাষায়, “মা যখন বলে, ‘আর কত ঘুমোবি, গা-হাত-পা তোল, চাঙ্গা হ’ তখন আমরা চাঙ্গা হওয়ার জন্য হাত ওপরে তুলে শ্রীচৈতন্য স্টাইলে ভি-এর মতো চাঙ্গা করি । এজন্য দু-হাত ও দু-পা ভি-এর মতো দু-ফ্যাঁকড়া করে নিয়ে যাওয়াকে বলা হয় চাঙ্গা করে নিয়ে যাওয়া। চাঙ্গা করে নেওয়ার সময় দোলে। তাই চাঙ্গদোলা চেঙ্গদোলা চ্যাংদোলা। চ্যাং আসলে মুন্ডা সাঁওতালির চাঙ্গা চাঙ্গ চাঙ। মড়া ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়ার দোলা এজাতীয় দোলা।  হাত-পা দুভাগ করে ঝোলানো হচ্ছে চাঙঝোলা চ্যাংদোলা। রাজমিস্ত্রির জোগাড়েরা সিমেন্ট বালি বহনের জন্য একটা বস্তার ভেতর দিয়ে দুটো বাঁশ গলিয়ে দিয়ে দুজনে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে দোলা বানায় তারও নাম চাংদোলা বা চাঙঝোলা।

চ্যাঙা ব্যাঙা
চ্যাংদোলা করা মানুষের ছবি আর রাস্তায় হাত-পা ছেতরে চিৎ হয়ে পড়ে মরে থাকা সোনা ব্যাঙের ছবি একদম একরকম। হাত-পা ভি-এর মতো ছড়িয়ে রাখা ব্যাঙকে তাই বলে চ্যাঙা-ব্যাঙা। পুরনো বানানে চেঙা-বেঙা চেঙ্গা-বেঙ্গা। কাউকে পিটিয়ে মেরে টেনে রাস্তার ধারে উপুড় করে ফেলে রাখালে তাকেও চ্যাঙা-ব্যাঙার মতো দেখতে লাগে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একটা গল্পে লিখেছেন – লোহার রড দিয়ে চ্যাঙা-ব্যাঙা করে পিটিয়েছিলো। চ্যাঙাব্যাঙার মতো একটা হাতিও হাত-পা ছেতরে চিৎ হয়ে থাকতে পারে! আমাকে ভাবায় সুকুমার রায় –
হ্যাংলা হাতি চ্যাংদোলা
শূন্যে তাদের ঠ্যাংতোলা।
ছবিটা মিলিয়ে নিন চ্যাংদোলা চাঙঝোলা চ্যাঙাব্যাঙার সঙ্গে।

চ্যাংড়া
গাছের ডালের Y এর মতো দুভাগে বেরনো ফ্যাঁকড়াকে সাঁওতালিতে বলে চাঙ্গাচাঙ্গি। গাছের ডালের ফ্যাঁকড়া বেরোচ্ছে মানে চাঙ্গা বেরোচ্ছে, তার মানে গাছ চাঙ্গা আছে বেঁচে আছে। এই চাঙ্গাই বাংলায় চাঙ্গা হয়ে থিতু হয়েছে। যার মানে প্রাণবন্ত।  যেসব ছেলে ছোকরারা বেশি চাঙ্গা বা বেশি প্রাণবন্ত তাদের বলা হয় চ্যাংড়া ছেলে। এদের রোজ রোজ নতুন নতুন হাত-পা গজায়!

চ্যাংমাছ
যে মাছ অকারণে বেশি বেশি লাফায় সে বেশি চাঙ্গা মাছ তাই সেটা চেঙ্গ চ্যাং মাছ। লাফানোতে চ্যাংমাছের বিশেষ নাম আছে। চ্যাং মাছ লাফাতে লাফাতে এক পুকুর থেকে রাস্তা পার হয়ে অন্য পুকুরে চলে যায়। তাই বাংলা প্রবাদ আছে – দু গোড়ের চ্যাং, মানে তলে তলে দুপক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রেখে চলা কুট লোক। কেউ বেশি টগবগ করে ফুটলে আমরা বলি – ‘চ্যাং মাছের মতো লাফাচ্ছিস কেন?’ কিতকিত খেলায় দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে পা ফাঁক করে লাফানো-কে বলে চ্যাং লাফানো। মানে চাঙ্গা চ্যাঙের লাফানো ব্যাপারটা কিতকিতের কথাতেও ধরা আছে। লাফানোতে উচ্চিঙ্গড়ে পোকারও বেশ নাম আছে, এবং এর নামেও চেঙ্গ কথাটা লুকিয়ে আছে।

চিংড়ি
চিংড়ি মাছকে আগেকার দিনের বুড়িরা বলতো চেঙ্গুড়ি চেঙুড়ি চিঙুড়ি। মাছ কথাটা যোগ করত না। খেজুর বাবলা প্রভৃতি গাছের ডাল থেকে ছিরকুটে বেরোনো কাঁটাকেও সাঁওতালিতে বলে চাঙ্গা। চিংড়ি মাছের গোঁফ দাঁড়া ঠ্যাং এরকম কাঁটার মতো দুদিকে বেরিয়ে থাকে। হয়তো সে কারণেই জলের পোকাটাকে বুড়িরা বলতো চেঙ্গুড়ি।

বাংলাভাষার মূলে পৌঁছতে হলে, তাকে রুট থেকে জানতে হলে আমাদের প্রাথমিক কাজ হচ্ছে অস্ট্রিক ভাষা মন্থন করা। কারণ বাংলা অস্ট্রিক মূলের ভাষা। অনার্য প্রকৃত পল্লী বাংলা ভাষার হওয়া-ভাতে কাঠি দিতে, সেদ্ধ ডালে ফোড়ন দিতে আর্য্যামির বাগাড় দেয়া হয়েছে।
(পরের একটা পোস্টে বলবো ফোড়ন কেন বাগাড়।)

ইউসুফ খান, কলকাতা, ২০২০ নভেম্বর ২০

চ্যাংদোলা চ্যাং কী,

লিংক:  https://draminbd.com/চ্যাংদোলা-চ্যাং-কী/

 

error: Content is protected !!