ছন্দ: ছন্দের সাতকাহন, ছন্দের ইতিবৃত্ত: ছন্দের প্রকারভেদ ইতিহাস বিবিধ

 

Nour Hossain

ছন্দ: ছন্দের সাতকাহন, ছন্দের ইতিবৃত্ত: ছন্দের প্রকারভেদ ইতিহাস বিবিধ

ছন্দের সাতকাহন প্রথম পর্ব
 
ছন্দ কী?
কাব্যের রসঘন ও শ্রুতিমধুর বাক্যে সুশৃঙ্খল ধ্বনিবিনাসের ফলে যে সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয় তাকে ছন্দ বলে।
ছন্দপ্রকরণ কী?
ওই যে বলা হচ্ছে “সুশৃঙ্খল ধ্বনিবিন্যাস”, মূলত এটার উপর ভিত্তি করে ছন্দপ্রকরণের উদ্ভব। ছন্দপ্রকরণ লিখিত কাব্যগুলো পর্যবেক্ষণমূলক পর্যালোচনার মাধ্যমে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে ছন্দের গতি-প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য।
ছন্দপ্রকরণ জানা থাকলে কবি হয়ে যাবেন?
না। ছন্দপ্রকরণ মুখস্থ, কন্ঠস্থ, ঠোঁটস্থ করলেও কবি হওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু কবি হতে হলে ছন্দপ্রকরণ অবশ্যই জানতে হবে। আর যদি কাব্য-সমালোচক হতে চান, তাহলে ছন্দপ্রকরণ জানা ব্যতীত কোন উপায় নেই। ভালো পাঠক হওয়ার জন্যেও একই কথা প্রযোজ্য।
তা শুরু করা যাক ছন্দের সাতকাহন।
ছন্দপ্রকরণের প্রথম পাঠ হচ্ছে অক্ষর। শুধু আপনি না, আমিও জেনে এসেছি স্বরলিপির প্রতিটি বর্ণই অক্ষর। যুক্তিতর্কে না-যেয়ে বর্ণকে অক্ষর মেনে নিলাম। তবে ছন্দপ্রকরণে ‘অক্ষর’-এর আলাদা সংজ্ঞা আছে। আর এই অক্ষর বুঝতে পারলে ছন্দের প্রায় অর্ধেক কাজ আপনি করতে পারবেন।
অক্ষর কী?
অক্ষর : (বাগযন্ত্রের) স্বল্পতম প্রয়াসে বা এক ঝোঁকে শব্দের যে অংশটুকু উচ্চারিত হয়, তাকে অক্ষর বলে। এই অক্ষর অনেকটাই ইংরেজি Syllable-র মত।
অক্ষরের এই সংজ্ঞা পড়ে আমরা অনেকেই সংজ্ঞাহীন,বিরক্ত, নিরাসক্ত হয়ে পড়ি। প্রকৃতপক্ষে, কথোপকথনে ‘অক্ষর’ যত সহজে বোঝানো যায় তারচেয়ে ঢের বেশি কঠিন লিখে বোঝানো। তারপরেও আমি চেষ্টা চালাচ্ছি “স্বল্পতম প্রয়াস বা এক ঝোঁক”টা কেমন?
“তার চমকে চমকে গেছে পিলে,
গালের ‘পরে এটুকু এক তিলে”।
এখানে একটি শব্দ (চমকে) পরপর বসেছে যার বানান একই কিন্তু উচ্চারণ ভিন্ন।
দেখি কেমন ভিন্ন?
প্রথম ‘চমকে’ → উচ্চারণ করছি চ/ম/কে।
দ্বিতীয় ‘চমকে’ →উচ্চারণ করছি চম্/কে।
উচ্চারণ অনুযায়ী আমি এই (/) চিহ্ন দিয়ে অক্ষরগুলো আলাদা করে দিয়েছি যেন আপনারা “স্বল্পতম প্রয়াস বা এক ঝোঁক” বুঝতে পারেন।
আরও কিছু শব্দ দেখাচ্ছি।
পুরোহিত এবং তিরোহিত। উভয় শব্দের শেষাংশে বানানরূপ “হিত” কিন্তু উচ্চারণ করছি দুই রকম।
পুরোহিত→ হিত্
তিরোহিত → হি/ত
আশাকরি, ‘অক্ষর’-এর সংজ্ঞা আপনি বুঝতে পেরেছেন?
এখনও না বুঝলে এটা দেখুন যে উচ্চারণ অনুযায়ী কীভাবে অক্ষর হয়।
আম (উচ্চারণ) আম্
আমড়া (উচ্চারণ) আম্/ড়া
আমলকি (উচ্চারণ) আ/ম/ল/কি [ খেয়াল করুন তৃতীয় উদাহরণে ‘আম’ কিন্তু আ/ম উচ্চারণ হচ্ছে।]
পথ→ উচ্চারণ → পথ্
কিন্তু
পথশিশু→ উচ্চারণ → প/থ/শি/শু।
টলমল
১/ টলমল→ যদি উচ্চারণ করেন ট/ল/ম/ল তাহলে চারটি অক্ষর।
যদি এইভাবে উচ্চারণ করেন
২/টলমল →ট/ল/মল্ তাহলে তিনটি অক্ষর।
অথবা যদি এইভাবে উচ্চারণ করেন
৩/টলমল→ টল্/মল্ তাহলে দুইটি অক্ষর। [এটা ভালোভাবে খেয়াল করলে অক্ষর বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়]
এটা বুঝলে আপনি পৃথিবীর প্রায় সব উচ্চারিত শব্দের অক্ষরবিন্যাস করতে পারবেন। বানানের চেয়ে উচ্চারণের উপর খেয়াল রাখবেন বেশি।কারণ, অক্ষর উচ্চারণের উপর নির্ভরশীল। বানান অনেক সময় আপনাকে ধোঁকা দিতে পারে।
যদি অক্ষর বলতে কারও আপত্তি থাকে তাহলে স্বর বা দল বলতে পারেন।
অক্ষর বিন্যাস করতে পারলে কী হবে?
আপনি অক্ষরবিন্যাস জানলে মাত্রার পরিমাণ,পর্ব এবং ছন্দের নাম জানতে পারবেন।
অক্ষর (বা স্বর কিংবা দল) কয় প্রকার?
অক্ষর ২ প্রকার।
১/মুক্ত
এবং
২/বদ্ধ।
মুক্ত অক্ষর কোনটি?
ওই যে উচ্চারণ অনুযায়ী এই (/) চিহ্ন দিয়ে শব্দের অক্ষর বিভাজন করেছেন তাতে বর্ণের পরিমাণ দুই রকম। যেই ভাগে একটি করে বর্ণ পাচ্ছি তাকে মুক্ত অক্ষর বলে। আমি এই (*) দিয়ে মুক্ত অক্ষরগুলো দেকাচ্ছি।
যেমনঃ *চ/*ম/*কে তিনটি।
আবার চম্/*কে→’ (কে) একটি।
*পু/*রো/হিত→ (পু) এবং (রো) ২টি মুক্ত অক্ষর।
*তি/*রো/*হি/*ত চারটি মুক্ত অক্ষর।
*ট/*ল/*ম/*ল চারটি মুক্ত অক্ষর।
*ট/*ল/মল্ → (ট) এবং (ল) দুইটি মুক্ত অক্ষর।
নিচে একটা জনপ্রিয় ছড়ার মুক্ত অক্ষরগুলো দেওয়া হয়েছে।
খো/কন খো/কন ডাক পা/ড়ি → খো খো পা ড়ি
খো/কন মো/দের কার বা/ড়ি→ খো মো বা ড়ি
আয় /রে খো/কন ঘ/রে আয়→ রে খো ঘ রে
দুধ-মা/খা-ভাত কা/কে খায়→ মা খা কা কে
আপনি এটা চেষ্টা করুন।
আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা
ফুল তুলিতে যাই,
ফুলের মালা গলায় দিয়ে
মামার বাড়ি যাই।
পর্যায়ক্রমে অবশিষ্ট অংশ নিয়ে বলার চেষ্টা করব।
 
 
error: Content is protected !!