ছন্দ: ছন্দের সাতকাহন, ছন্দের ইতিবৃত্ত: ছন্দের প্রকারভেদ ইতিহাস বিবিধ

 
ছন্দের সাতকাহন: দ্বিতীয় পর্ব
প্রথমে মনে রাখা দরকার যে,শুবাচ গোষ্ঠী মূলত বাংলা-ব্যাকরণ ও বানান নিয়ে কাজ করে। উনারা দয়াপরবশ হয়ে ছন্দবিষয়ক যযাতি অনুমোদন করেছেন এটাই পরম সৌভাগ্য। তাই যত স্বল্প পরিসরে ছন্দবিষয়ক লেখাগুলো ন্যূনতম পর্বে সমাপ্ত করা যায় ততই মঙ্গল। নচেৎ মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। সুতরাং, একই বিষয়ে দ্বিতীয়বার কোন যযাতি দেওয়া হবে না।
তা যা বলছিলাম। প্রথম যযাতিতে আমরা ‘অক্ষর’ কাকে বলে,কীভাবে অক্ষরবিন্যাস করা হয় এবং মুক্ত অক্ষর কাকে বলে সেই বিষয়ে জানার চেষ্টা করেছি। আজ শুরু করছি বদ্ধ অক্ষর দিয়ে।
অক্ষরবিন্যাস করার ফলে যেই বিভাজনে একের অধিক বর্ণ পাশাপাশি একসাথে থাকে ওটাই বদ্ধ অক্ষর।
যেমন,
আয় ছে/লে/রা আয় মে/য়ে/রা→ আয়, আয়
ফুল তু/লি/তে যাই, → ফুল,যাই
ফু/লের মা/লা গ/লায় দি/য়ে →লের,লায়
মা/মার বা/ড়ি যাই। → মার,যাই।
খো/কন খো/কন ডাক পা/ড়ি→ কন,কন,ডাক
খো/কন মো/দের কার বা/ড়ি→কন,দের,কার
আয়/রে খো/কন ঘ/রে আয়→ আয়,কন,আয়
দুধ/-মা/খা-/ভাত কা/কে খায়→ দুধ,ভাত,খায়
খেয়াল রাখবেন, আমি দুইটি বর্ণ না বলে বলেছি “পাশাপাশি একের অধিক বর্ণ”। কারণ, শব্দের শুরুতে যুক্তবর্ণ ভাঙতে পারবেন না আবার কিছুকিছু বদ্ধ অক্ষরে পাশাপাশি তিনটি বর্ণও থাকতে পারে।
যেমন,
স্বাধীন → উচ্চারণ অনুযায়ী অক্ষরবিন্যাস →স্বা/ধীন। এখানে ‘ধীন’ দুইটি বর্ণ পাশাপাশি একসাথে আছে তাই এটা বদ্ধ অক্ষর। ‘স্বা’-তেও দুইটি বর্ণ আছে কিন্তু উপর-নিচে।তাই এটা মুক্ত অক্ষর।
স্বরচিত → স্ব/র/চি/ত কোন বদ্ধ অক্ষর নেই, সবগুলো মুক্ত অক্ষর।
শ্বশুর → উচ্চারণ অনুযায়ী অক্ষর বিন্যাস শ্ব/শুর অর্থাৎ ‘শুর’ ১টি বদ্ধ অক্ষর আর ‘শ্ব’ মুক্ত অক্ষর।
স্বভাব → উচ্চারণ অনুযায়ী অক্ষরবিন্যাস স্ব/ভাব। ‘স্ব’ মুক্ত অক্ষর আর ‘ভাব’ বদ্ধ অক্ষর।
এই নিয়ম দিয়ে আপনি ‘স্কুল’ এবং এই রকম কিছু শব্দের অক্ষরবিন্যাস করতে পারবেন। ‘স্কুল’ বদ্ধ অক্ষর। এটাকে ‘ইস্কুল’ ধরে অক্ষরবিন্যাস করতে গেলে সমস্যায় পড়ে যাবেন।
বৌদ্ধ→ উচ্চারণ অনুযায়ী অক্ষরবিন্যাস বোওদ্/দ। এখানে ‘বোওদ্’ পাশাপাশি তিনটি বর্ণ নিয়ে একটি বদ্ধস্বর।
সংস্কৃত → উচ্চারণ অনুযায়ী অক্ষরবিন্যাস সংস্/কৃ/ত। এখানেও ‘সংস্’ পাশাপাশি তিনটি বর্ণ নিয়ে একটি বদ্ধ অক্ষর।
অনেক সময় আইন,ফাইন,নাইন, এই রকম শব্দ এবং কিছু আঞ্চলিক শব্দ পাশাপাশি তিনটি বর্ণ নিয়ে ১টি বদ্ধ অক্ষর হয়ে থাকে। “আশাকরি একের অধিক এবং পাশাপাশি” বলার উত্তর পেয়েছেন।
আমি আরও কিছু বদ্ধ অক্ষর দেখাচ্ছি।
অর্জন→ অর/জন, বর্জন→ বর/জন, সংগ্রাম→ সং/গ্রাম, সন্ত্রাস→ সন/ত্রাস, সম্ভব→ সম/ভব, অম্বল→ অম/বল, নির্জর→ নির/জর, জম্পেশ→ জম/পেশ।
কোষ্ঠকাঠিন্য → কোষ/ঠ/কা/ঠিন/ন → ‘কোষ’ এবং ‘ঠিন’ বদ্ধ অক্ষর।
আমিন স্যার → আ/মিন স্যার → ‘মিন’ এবং ‘স্যার’ দুইটি বদ্ধ অক্ষর।
শুবাচ → শু/বাচ → বাচ বদ্ধ অক্ষর।
আশাকরি,
★অক্ষর, ★মুক্ত অক্ষর,★বদ্ধ অক্ষর বুঝতে পেরেছেন।
এটা দেখুন → একদিন সে → এক/দিন/সে → ‘এক’ এবং ‘দিন’ দুটো বদ্ধ অক্ষর।
কিন্তু আপনি যদি “এ ক দিন সে” অর্থাৎ
এক্ না বলে যখন এ কো এইভাবে উচ্চারণ করবেন তখন
‘এক’ বদ্ধ অক্ষর না হয়ে ‘এ/ক’ দুইটি মুক্ত অক্ষর হয়ে যাবে।
বাংলা-কাব্য-সাহিত্যে প্রচলিত ছন্দ হচ্ছে তিনটি।
১/স্বরবৃত্ত ছন্দ,
২/মাত্রাবৃত্ত ছন্দ এবং
৩/অক্ষরবৃত্ত ছন্দ।
মুক্ত অক্ষর সব ছন্দে ১ মাত্রা ধরা হয়। ভিন্নতা দেখা দেয় বদ্ধ অক্ষরে।
[স্বাভাবিকভাবে]
১/স্বরবৃত্ত ছন্দে বদ্ধ অক্ষর ১ মাত্রা।
২/মাত্রাবৃত্ত ছন্দে বদ্ধ অক্ষর ২ মাত্রা।
৩/অক্ষরবৃত্ত ছন্দে শব্দের প্রথমে বা মাঝে বদ্ধ অক্ষর থাকলে ১ মাত্রা কিন্তু শব্দের শেষে বদ্ধ অক্ষর থাকলে ২ মাত্রা।
উদাহরণ দিচ্ছি।
সংসার → সং/সার দুইটি বদ্ধ অক্ষর আর স্বরবৃত্তে বদ্ধ অক্ষর ১ মাত্রা ধরা হয়। তাই ‘সংসার’ স্বরবৃত্তে ২ মাত্রা।
দুইটি বদ্ধ অক্ষর আর মাত্রাবৃত্তে বদ্ধ অক্ষর ২ মাত্রা ধরা হয়। তাই ‘সংসার’ মাত্রাবৃত্তে ৪ মাত্রা।
দুইটি বদ্ধ অক্ষর আর অক্ষরবৃত্তে সাধারণ নিয়মে শব্দের শুরুতে বা মাঝে বদ্ধ অক্ষর থাকলে ১ মাত্রা কিন্তু শেষে থাকলে ২ মাত্রা। তাই ‘সং’ ১ মাত্রা আর ‘সার’ ২মাত্রা অর্থাৎ ‘সংসার’ অক্ষরবৃত্তে ৩ মাত্রা।
উপরে উল্লেখিত জনপ্রিয় ছড়াদ্বয় স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্ত (তিন বৃত্ততেই) পাবেন।
অক্ষর,অক্ষরবিন্যাস, মুক্ত অক্ষর ও বদ্ধ অক্ষর নিজের নাম থেকে নির্ণয় করার চেষ্টা করুন।
অনুগ্রহ করে ইনবক্স-এ প্রশ্ন না করে যযাতির মন্তব্যের ঘরে প্রশ্ন করুন। বুঝতে না পারলে সাধ্যমতো চেষ্টা করব বোঝানোর জন্য।
শুবাচ-গোষ্ঠী-সংশ্লিষ্ট-কুশিলব কর্তৃক সম্মতি সাপেক্ষে পরবর্তী বিষয়াবলী আপনাদের সমীপে তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে।
 
 

error: Content is protected !!