ছন্দ: ছন্দের সাতকাহন, ছন্দের ইতিবৃত্ত: ছন্দের প্রকারভেদ ইতিহাস বিবিধ

ছন্দের সাতকাহন: তৃতীয় পর্ব
[ দীর্ঘ লেখা পড়তে যাদের সমস্যা হয়, চোখ ব্যথা করে, ঘাড় ব্যথা করে, মাথা ঝিমঝিম করে তারা অনুগ্রহ করে এই যযাতি এড়িয়ে চলুন]
আগেই বলেছি যে, বাংলা-কাব্য-সাহিত্যে প্রচলিত ছন্দ হচ্ছে তিনটি। ছড়া,পদ্য,কবিতা লেখার জন্য আপনাকে এই 👉(স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত) তিন নিয়মের অন্তত যে-কোন একটি মেনে লিখতে হবে। যদিও অক্ষর,মাত্রা,পর্ব বিভাজন দিয়ে ছন্দগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায় তথাপি এদের মধ্যে মূল পার্থক্য করা হয়েছে আবৃত্তির বৈশিষ্ট্যের ওপর।
★স্বরবৃত্ত ছন্দ: 👉 এই ছন্দের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লয় ক্ষিপ্র আর পর্বের শুরুতে শ্বাসঘাত পড়ে। আমরা অনেকেই লয় একটু-আধটু অনুমান করতে পারলেও সমস্যায় পড়ি ‘শ্বাসঘাত’ নিয়ে। শ্বাসঘাত দেখার আগে স্বরবৃত্ত ছন্দের মাত্রার নিয়মটি আরও একবার দেখা যাক।
★স্বরবৃত্তে মাত্রা গণনার নিয়ম হচ্ছে
‘মুক্ত অক্ষর’ ১মাত্রা এবং
‘বদ্ধ অক্ষর’ও ১ মাত্রা।
উদাহরণ
থাকব নাকো 👉 থাক্১, ব১, না১, কো১= ৪ মাত্রা।
বদ্ধ ঘরে 👉 বদ্১, ধ১, ঘ১, রে১=৪ মাত্রা।
দেখব এবার 👉দেখ্১, ব১, এ১, বার১=৪ মাত্রা।
জগতটাকে,👉 জ১, গত১, টা১, কে১=৪
অর্থাৎ এই লেখাটির প্রতিটি চরণ স্বরবৃত্তে ৪+৪+৪+৪= ১৬ মাত্রায় লেখা।
নিচের চরণটি আপনি চেষ্টা করুন।
“কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে”।
শ্বাসঘাতের ব্যাখ্যা হচ্ছে উচ্চারণের সময় একটু জোর দেওয়া। এই জোর প্রাত্যহিক জীবনে আমরা অনেকভাবে দিয়ে থাকি।
ওই দেখছেন? উনি আমাদের আমীন স্যার। পথিমধ্যে গাড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ, উনার গাড়ির চাকা গর্তে পড়েছে। চলুন, সবাই মিলে ধাক্কা দেই। আরে উনাকে না, উনার গাড়িকে ধাক্কা মারুন। এইভাবে না, এইভাবে না। আমি প্রথমে বলব তারপর আপনারা ধাক্কা মারবেন।
-এ-এ-ই ধাক্কা মারো।
-হেইও।
-আরও জোরে।
-হেই্ও।
দেখেছেন 👀
আমি আপনাদেরকে উচ্চারণের প্রথমে (হেই্) জোর দিতে অর্থাৎ শ্বাসঘাত দিতে বলিনি কিন্তু আপনারা ঠিকই দিচ্ছেন!
এবার
“থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে দেখব এবার জগতটাকে” আবৃত্তি করুন। না পারলে মিছিলের মতো করে আবৃত্তি করার চেষ্টা করুন। আশাকরি শ্বাসঘাত স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসে যাবে।
শ্বাসঘাত আর দ্রুত আবৃত্তি করলে অর্ধেক শ্বাস প্রথমেই খতম। বাকি অর্ধেক শ্বাস নিয়ে আপনি আর কয়টি অক্ষর উচ্চারণ করতে পারবেন? এই কারণে স্বরবৃত্ত ছন্দে ৪ মাত্রার অধিক পর্ব ধরা হয় না। আর এই বৈশিষ্ট্য দিয়ে সর্বোচ্চ ১৬ মাত্রার চরণ আপনি আবৃত্তি করতে পারবেন। এর বেশি হলে পরবর্তী চরণ শুরু করার জন্য যে সময় পাবেন তা আপনার হৃদপিণ্ডের জন্য যথেষ্ট হবে না। কিছু চরণ আবৃত্তি করার পর ঈশ্বরপ্রাপ্তি না-হলেও চোখে সরিষা ফুলের প্রাপ্তি ঘটবে।
এর মানে স্বরবৃত্তে ১৬ মাত্রার অধিক চরণ হয় না?
-হ্যাঁ, হয়। আমি স্বরবৃত্ত ছন্দের বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছি। আপনি এই বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করে তাল লয় ঠিক রেখেও ছড়া,পদ্য,কবিতা লেখতে পারবেন। বিতর্ক এড়াতে “ছন্দ আর বৃত্ত এক নয়” কথাটি বলছি না। তারচেয়ে বরং স্বরবৃত্তের কিছু বৈচিত্রময় নিয়ম দেখে আসি।
“ডালিম গাছের/ ফাঁকেফাঁকে
বুলবুলিটি/ লুকিয়ে থাকে,
উড়িয়ে তুমি/ দিও না মা/ ছিঁড়তে গিয়ে/ফল-
দিদি এসে/শুনবে যখন/বলবি কি মা/বল!”
(কাজলা দিদি) – যতীন্দ্রমোহন বাগচী।
মূল লেখাটি স্বরবৃত্তে পূর্ণপর্ব ৪ এবং অপূর্ণপর্ব ২ও১-এ লেখা।
খেয়াল করুন 👀
“লুকিয়ে, উড়িয়ে” তিনটি করে অক্ষর হয়েও ২ মাত্রা আবার “দিও না মা” তিনটি অক্ষর হয়েও ৪ মাত্রা।
শম্ শম্ শম্/ হাওয়ার বেগে/কাঁপবে নায়ের/পাল,
সিন্দাবাদের/ মতন আমি/ধরবো কষে/হাল।
(বাণিজ্যেতে যাব আমি)- আশরাফ সিদ্দিকী।
মূল লেখাটি স্বরবৃত্তে পূর্ণপর্ব ৪ এবং অপূর্ণপর্ব ২ও১-এ লেখা।
খেয়াল করুন 👀
স্বরবৃত্তে একই পর্বে “শম্ শম্ শম্” তিনটি বদ্ধ অক্ষর ৪ মাত্রা ধরা হয়েছে।
সূয্যিমামা/জাগার আগে/উঠব আমি/ জেগে,
‘হয়নি সকাল,/ঘুমো এখন’/মা-বলবেন/রেগে।
(খোকার সাধ) কাজী নজরুল ইসলাম।
মূল লেখাটি স্বরবৃত্তে পূর্ণপর্ব ৪ এবং অপূর্ণপর্ব ২ও১-এ লেখা।
খেয়াল করুন👀
‘মা-বলবেন’ স্বরবৃত্তে ১টি মুক্ত অক্ষর আর ২টি বদ্ধ অক্ষর নিয়ে ৩ মাত্রা।
বিজন রাতে /দোসর আমার/ আকাশের ওই/ চন্দ্রা,
না না না /ঘুমায় না সে /যতই আসুক /তন্দ্রা।
👀“না না না” স্বরবৃত্তে ৪ মাত্রা। নাম বললে চাকরি থাকবে না।
👀‘কানা বগীর ছা’ লিখেছেন খান মুহম্মদ মঈনুদ্দিন। এটি স্বরবৃত্তে লেখা অসাধারণ একটি মুক্তক।
আমরা নূতন /আমরা কুঁড়ি /নিখিল মানব /নন্দনে।
(কিশোর)- গোলাম মোস্তফা।
👀স্বরবৃত্তে পূর্ণপর্ব ৪ আর অপূর্ণপর্ব ৩-এ লেখা এটি যেমন গান তেমনি কবিতাও।
যারা রবীন্দ্রনাথের ভক্ত তারা নিশ্চয় এতক্ষণে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে আছেন। আপনাদের থেকে ছুট পেতে চলুন ছুটি।
“মেঘের কোলে/ রোদ হেসেছে,/ বাদল গেছে/ টুটি।
আহা, হাহা,/ হা।
আজ আমাদের /ছুটি ও ভাই,/ আজ আমাদের/ ছুটি।
আহা, হাহা, /হা ॥
এটা শিশুতোষ হয়ে গেছে। চলুন, চলতে চলতে একটা রোমান্টিক গান শুনি।
কৃষ্ণকলি/ আমি তারেই/ বলি,
কালো তারে /বলে গাঁয়ের/ লোক।
মেঘলা দিনে /দেখেছিলেম /মাঠে
কালো মেঘের/ কালো হরিণ-/চোখ।
ঘোমটা মাথায় /ছিল না তার/ মোটে,
মুক্তবেণী /পিঠের ‘পরে /লোটে।
কালো? তা সে/ যতই কালো /হোক,
দেখেছি তার /কালো হরিণ/-চোখ।
স্বরবৃত্তে লেখা ছড়া,পদ্য,কবিতা মন্তব্যের ঘরে দিতে পারেন।
 

error: Content is protected !!