ছন্দ: ছন্দের সাতকাহন, ছন্দের ইতিবৃত্ত: ছন্দের প্রকারভেদ ইতিহাস বিবিধ

ছন্দের_সাতকাহন: চতুর্থ পর্ব
★মাত্রাবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দ।
মাত্রাবৃত্তের ছন্দের বৈশিষ্ট্যে বলা হয়েছে যে, এটার লয় স্বরবৃত্তের চেয়ে একটু ধীর আর অক্ষরবৃত্তের চেয়ে একটু দ্রুত। আপনি যদি লয়ই না-ধরতে পারেন তাহলে কোনটা ধীর আর কোনটা দ্রুত বুঝবেন কীভাবে?
চলুন ‘লয়’কে চিহ্নিত করি।
★ছন্দপ্রকরণের ভাষায় #লয় মানে আবৃত্তি করার গতি।
আপনি কাবাডি খেলেছেন? না-খেললেও খেলতে দেখেছেন নিশ্চয়? তো এই কাবাডি খেলায় বিপক্ষদলের অংশে যেয়ে বোল দিতে হয় ‘কা বা ডি, কা বা ডি,কা বা ডি’। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটু ধীরে ধীরে এই বোল দেওয়া হয়। কিন্তু ছোঁ মেরে বিপক্ষদলের খেলোয়াড়কে স্পর্শ করার সময় অথবা বিপক্ষদলের হাতে ধরা পড়লে বেরিয়ে আসার সময় এই বোল আর ধীর বা স্বাভাবিক থাকে না বরং অনেক দ্রুত হয়ে যায়। এই যে ধীর আর দ্রুত; এটাই লয়।
আশাকরি লয় কাকে বলে বুঝতে পেরেছেন?
বৈশিষ্ট্যে মধ্যম লয় বলা হলেও মাত্রাবৃত্ত ছন্দ হচ্ছে বৈচিত্রময় লয়-এ সম্ভার। এই ছন্দের দ্রুতলয় স্বরবৃত্তছন্দের চেয়েও ক্ষিপ্র।
যেমন:
“সফদার ডাক্তার মাথা ভরা টাক তার ক্ষিধে পেলে পানি খায় চিবিয়ে।”
এবং ধীরলয় অক্ষরবৃত্তছন্দের মতো শ্লথ।
যেমন:
সাহেব কহেন, “চমৎকার! সে চমৎকার! “
মোসাহেব বলে, “চমৎকার সে হতেই হবে যে! হুজুরের মতে অমত কার?”
★মাত্রাবৃত্তে মুক্ত অক্ষর ১ মাত্রা আর বদ্ধ অক্ষর ২ মাত্রা ধরা হয়।
নিয়মটা একটু দেখা যাক।
সফ দার ডাক তার ২+২+২+২=৮ মাত্রা,
মা থা ভ রা টাক তার ১+১+১+১+২+২=৮ মাত্রা,
ক্ষি ধে পে লে পা নি খায় ১+১+১+১+১+১+২=৮ মাত্রা,
চি বি য়ে ১+১+১=৩ মাত্রা।
চে য়া রে তে রাত দিন ১+১+১+১+২+২=৮ মাত্রা,
ব সে গো নে দুই তিন ১+১+১+১+২+২=৮ মাত্রা,
প ড়ে বই আ লো টা রে ১+১+২+১+১+১+১=৮ মাত্রা,
নি ভি য়ে ১+১+১= ৩ মাত্রা।
অর্থাৎ, লেখাটি মাত্রাবৃত্তে ৮+৮+৮+৩ দিয়ে লেখা।
আমাদের ছোট নদী /চলে বাঁকেবাঁকে,
বৈশাখ মাসে তার /হাঁটুজল থাকে।
*বৈশাখ → ‘বৈ’ বদ্ধস্বর। আপনি এই রকম ঐ-কার দিয়ে উচ্চারিত বর্ণ মাত্রাবৃত্তে ২ মাত্রা ধরবেন। একইভাবে ঔ-কার থাকলেও ২ মাত্রা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই লেখাটি মাত্রাবৃত্তে ৮+৬-এ লেখা।
একই লেখায় “সকালে বিকালে কভু/ *নাওয়া হলে পরে” → ‘নাওয়া’ কিন্তু ২ মাত্রা ধরা হয়েছে। মাত্রাবৃত্তে লেখা অনেক ছড়া,পদ্য,কবিতায় শব্দের মাঝে ও-যুক্ত বদ্ধস্বর ১ মাত্রা ধরা হয়েছে। আপনিও চাইলে এমনটি করতে পারবেন।
সাহেব কহেন, “বসিয়া বসিয়া পড়েছি কখন ঝিমায়ে!”
মোসাহেব বলে, “এই চুপ সব! হুজুর ঝিমান! পাখা কর, ডাক নিমাইএ।”
নজরুলের এই লেখাটি মাত্রাবৃত্তে পূর্ণপর্ব ৬ হলেও অপূর্ণপর্ব ৫,৪,৩।
খেয়াল করুন, ‘নিমাইএ’ ৪ মাত্রা হলেও এখানে ৩ মাত্রা। এই সমস্যাটি বেশি হয় অন্ত্যমিলে যদি কাঁঠালও এবং আঠালো এই রকম শব্দ থাকে। হয় কাঁঠালও-কে ৩ মাত্রা ধরতে হবে না-হয় আঠালো-কে ৪ মাত্রা ধরতে হবে।
পল্লীকবি জসিম উদ্দিনের বিখ্যাত কবিতা ‘কবর’।
ওইখানে তোর/ দাদির কবর/ ডালিম গাছের/ তলে,
তিরিশ বছর/ ভিজায়ে রেখেছি/ দুই নয়নের/ জলে। মাত্রাবৃত্তে ৬+৬+৬+২ (কয়েকটি চরণে অপূর্ণপর্ব ১ আছে)।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত কবিতা ‘দুই বিঘা জমি’।
এ জগতে হায়/সে’ই বেশি চায়/ যার আছে ভুরি/ভুরি,
রাজার হস্ত/ করে সমস্ত/ কাঙালের ধন/ চুরি।
মাত্রাবৃত্তে ৬+৬+৬+২।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘নারী’।
বিশ্বে যা-কিছু /মহান্‌ সৃষ্টি/ চির-কল্যাণ/কর,
অর্ধেক তার/ করিয়াছে নারী,/ অর্ধেক তার /নর।
মাত্রাবৃত্তে পূর্ণপর্ব ৬ আর অপূর্ণপর্ব ২।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কবিতা ‘আঠারো বছর’।
এ বয়স জেনো/ ভীরু, কাপুরুষ নয়
পথ চলতে এ/ বয়স যায় না থেমে,
এ বয়সে তাই/ নেই কোনো সংশয়—
এ দেশের বুকে/ আঠারো আসুক নেমে।
মাত্রাবৃত্তে ৬+৮।
শামসুর রহমানের বিখ্যাত কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’।
স্বাধীনতা তুমি/
বোনের হাতের/ নম্র পাতায় /মেহেদীর রঙ।
স্বাধীনতা তুমি /
বন্ধুর হাতে/ তারার মতন/ জ্বলজ্বলে এক /রাঙা পোস্টার।
মাত্রাবৃত্তে ৬ মাত্রার পর্ব।
কবিতা তো অনেক হলো, এবার কিছু বিখ্যাত গান শুনি। বি.টি.ভি-তে প্রচারিত কৃষিভিত্তিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান #মাটি_ও_মানুষ যে গানটি দিয়ে শুরু হয় তা নিম্নরূপ।
আমার দেশের/ মাটির গন্ধে/ ভরে আছে সারা/মন,
শ্যামল কোমল/ হরষ ছাড়া যে/ নেই কিছু প্রয়ো/জন। মাত্রাবৃত্তে ৬+৬+৬+২। লিখেছেন আব্দুল আহাদ। সুর দিয়েছেন ড. মনিরুজ্জামান।
“সেদিন দুজনে/ দুলেছিনু বনে,/ ফুলডোরে বাঁধা/ ঝুলনা।
সেই স্মৃতিটুকু/ কভু খনে খনে/ যেন জাগে মনে,/ ভুলো না।।” এখন থেকে এই রবীন্দ্রসংগীতটি শোনার সময় মাত্রাবৃত্তে ৬ মাত্রার পূর্ণপর্ব আর ৩ মাত্রার অপূর্ণপর্বও ঝুলতে দেখবেন।
নজরুলের এই গানে পথিক আসুক বা না আসুক, মাত্রাবৃত্তে ৮ মাত্রার পর্ব কিন্তু ঠিকই এসেছে।
দীপ নিভিয়াছে ঝড়ে ,/জেগে আছে মোর আঁখি।
কে যেন কহিছে কেঁদে/ মোর বুকে মুখ রাখি’/
পথিক এসেছ নাকি ৷৷
হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জনপ্রিয় একটি গান দিয়ে এই পর্ব সমাপ্ত করছি।
আমায় প্রশ্ন করে/ নীল ধ্রুবতারা ৮+৬
আর কত কাল আমি/ রব দিশাহারা ৮+৬
রব দিশাহারা। ৬
জবাব কিছুই তার /দিতে পারি নাই শুধু ৮+৮
পথ খুঁজে কেটে গেল/ এ জীবন সারা,৮+৬
এ জীবন সারা।৬

error: Content is protected !!