ছেলেরা বিয়ে করে, মেয়েরা বিয়ে বসে কেন

সন্মিত্রা: তৃতীয় পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

রাতে লিখছিলাম।
ঋধিতা তার রুমে টিভি দেখছিল। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর সে রাতে টিভি দেখে সময়টাকে আনন্দময় করে তোলার চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে ছেলের গান শুনে। আমি টিভি দেখি না। কোনো এক জ্ঞানী বলেছেন— টেলিভিশনের আবিষ্কার মানুষের মেধাশক্তি আর বিশ্লেষণ-সামর্থ্যের এক তৃতীয়াংশ শেষ করে দিয়েছে। টেলিভিশন দর্শনে ব্যয়িত সময় পুরোপুরি নষ্ট সময়।
অফিস সময়ের পর বাকি দিনের অধিকাংশই কাটে রিডিং রুমে। ক্লাবে যাই না; ভালো লাগে না। অফিসার্স ক্লাবে যা হয় তা অন্যের বদনাম কিংবা কাকে পদদলিত করে ভালো পদ ভাগানো যায় তা নিয়ে ষড়যন্ত্র। কেউ কেউ বউয়ের অত্যাচার হতে বাঁচার জন্য ক্লাবে আসে। আমাকে বউ যতই অত্যাচার করুক, কিছুই হয় না। বিয়ের আগের দিন গন্ডারের চামড়া পরে নিয়েছিলাম শরীরের ওপর। সবচেয়ে বড়ো কথা লিখতে বসলে পৃথিবী উলটে গেলেও খবর থাকে না, বউয়ের চিৎকার তো নস্যি।
দুই হাজার চারশ বর্গফুটের বাসাটি অধিবাসীর সংখ্যা আর প্রয়োজনের তুলনায় বিশালই বলা যায়। চারটা বেডরুমের কেবল দুটো ব্যবহার হয়। সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় আমার রিডিং রুম।
“এটাই আমার নরক, এটাই আমার স্বর্গ
কখনো ফুলের মেলা কখনো বা খড়্‌গ।”
কম্পিউটারের পর্দায় কল্পনা আর আমার একটা যৌথ ছবি ভাসছিল। আসলে, ডাউনলোড করার পর ছবিটা বড়ো করে তা আবার বন্ধ করার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। লেখকরা এমন আত্মভোলা হয়। ছবিটা ইনবক্সে পাঠিয়েছে কল্পনা। আজ আমার রিডিং রুম খড়্‌গ হয়ে গেল।
এটা কার ছবি?
হঠাৎ ঋধিতার গলা। সে সাধারণত আমার রিডিং রুমে আসে না, কিন্তু আজ কেন এল বুঝলাম ন। যেখানে বাঘের ভয় সেখানে রাত হয়। আমি চমকে উঠে কম্পিউটারের পর্দায় দৃষ্টি দিলাম। ছবিটা অপ্রত্যাশিতভাবে সে দেখে ফেলেছে। না-দেখলে ভালো হতো। জানি না এখন কী হবে। ভয়ে বুকটা ধুরধুর করছে। যে যাই বলুক,আমি বউকে ভয় পাই। ব এর পর ভ। মানে বউয়ের পর ভয়। বর্ণমালায় ব-বর্ণ যখন আছে তখন ভ-বর্ণও থাকবে। সুতরাং, বউ থাকলে ভয় থাকবেই। কেউ যদি স্ত্রৈণ বলে বলুক, অন্তত মিথ্যুক তো আর বলতে পারবে না।
এটা কার ছবি জিজ্ঞাস করছি, শুনতে পাওনি?
“দেখি চিনতে পার কি না?” আমি ঘটনাটাকে সহজ করে দেওয়ার জন্য স্বাভাবিক গলায় বললাম, “তোমার তো চেনার কথা।”
সেই বদমায়েশ মেয়েটার ছবি। যার জন্য তুমি বদ্ধ উন্মাদের মতো সারাক্ষণ অস্থির থাক। আমাকে অবহেলা কর, ঘুমে অবচেতন মনে নাম ধরে ডাক— ঠিক বলেছি না?
বদমায়েশ হবে কেন?
তোমাকে উন্মাদ বললাম কিছু বললে না। মাগিটাকে সামান্য বদমায়েশ বলাতেই রেগে গেলে— কী পিরিত। তোমাকে এমন জড়িয়ে ধরে কেন? মনে হচ্ছে যেন স্বামী-স্ত্রী। তুমি কি লিখছ, না তার ছবি দেখে উষ্ণতা নিচ্ছ?
ছি!
ছি-ই তো।
তাদের আমি কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি।
মানুষ যেমন মোরগ-মুরগি আর গোরু-ছাগল পালন করে। তারপর পুষ্ট হলে জবাই করে খায়। পুরুষদের চিনতে আমার বাকি নেই। সব পুরুষ এক। পুরুষের কাছেও পুরুষ নিরাপদ নয়—গেলাম। বলবে— সে আমার মেয়ের মতো; তাই তো?
সে আমার মেয়ে।
তোমার বাসায় কয়টা অ্যালবামে আমার ছবি আছে?
দুটো অ্যালবামে।
বাসায় কয়টা অ্যালবাম?
সাতটা।
বউয়ের ছবি দুটো অ্যালবামে, অবউ আর অজাত-কুজাতের ছবি পাঁচটা অ্যালবামে, তুমি কেমন স্বামী? লজ্জা করে না?
আমি একটু চমকে উঠলাম। ঋধিতা কখনো অ্যালবাম দেখেনি। দেখার আগ্রহও প্রকাশ করেনি। এসব বিষয়ে তার তেমন কৌতূহলও দেখা যায় না। সারাদিন বাসার নানা কাজ নিয়ে থাকে। কেনাকাটাও করে না। সখ শুধু বাড়িটা পরিষ্কার রাখা আর সুযোগ পেলে আমার ওপর কতৃত্ব ফলানো। হঠাৎ আজ কী হলো বুঝতে পারলাম না।
কোমল গলায় বললাম, অ্যালবাম তো স্মৃতি।
আমি তোমার স্মৃতি নই? ওই আজেবাজে মেয়েগুলোই তোমার স্মৃতি!
তুমি এসেছ এক যুগ। এক যুগে তোমার দুটো অ্যালবাম। বাকিগুলো আমার তিন যুগের আজন্ম-স্মৃতি। ওখানে ওদের ছবি ছাড়াও আমার মা-বাবা, ভাইবোন, বন্ধু-বান্ধব, কর্মস্থল, দেশ-বিদেশ এবং সহকর্মীদের ছবি আছে। ছাত্রজীবনেরও প্রচুর ছবি আছে।
তুমি এমন করো কেন গো?
যে পুরুষ স্ত্রীর সঙ্গে অন্য মেয়ের তুলনা করে, সে স্বামী নয়; খদ্দের। তার প্রতি অমন খদ্দেরে ব্যবহারই উচিত। মা-বাবার ছবি কয়টা আছে তোমার অ্যালবামে? কয়টা রেখেছ ভাইবোনের ছবি? তোমার সব অ্যালবামে রচনা, আল্পনা-কল্পনা হাবিজাবি মেয়েতে ভরা। ওরা তোমার কে?
মেয়ে।
মেয়ে না কি রক্ষিতা?
এমন বললে কষ্ট লাগে।
সত্য কথা বললে কষ্ট হয়। এরকম অনেক কাহিনি আমার জানা আছে। অ্যালবামের ছবি দেখে আমার তো সেরকমই মনে হয়েছে। তুমি সবার সঙ্গে একই বিছানায় থাকতে। থাকতে না?
থাকতাম। তুমি যেভাবে থাকতে তোমার বাবার সঙ্গে; ওরা আমার মেয়ে।
রাখো এসব তত্ত্বকথা। শিশ্নের টানে যেখানে রক্তসম্পর্ক পর্যন্ত যৌনসম্পর্কের কাছে সাগরে ভাসমান খড়কুটোর মতো তুচ্ছ হয়ে যায় সেখানে বস্তি থেকে তুলে আনা মেয়েদের সম্পর্ক কেমন হবে তা আর বলতে— তুমি এদের মেয়ে বানিয়ে মজা লুটেছ। আমি তোমার চেয়ে বয়সে কম হতে পারি, পড়ালেখাতেও কম হতে পারি, কিন্তু বিচক্ষণতা আর বাস্তবতায় তুমি আমার নখস্যও নও। তুমি আমার স্বামী, মানে আমার অধস্তন। ছেলেরা বিয়ে করে, মেয়েরা বিয়ে বসে। কেন জান? বসের কাছে গেলে অনুমতি না-পাওয়া পর্যন্ত অধস্তনদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, না কি? স্ত্রী, তার স্বামীর বস। তাই বস হিসেবে আমরা বসে থাকি, আর তোমরা নকর হিসেবে দাঁড়িয়ে থাক। যত বড়ো অফিসার সে বউয়ের তত বড়ো নকর। দেখো-না, তোমার সচিব সারক্ষণ ভাবির ভয়ে কেমন জড়োসড়ো হয়ে থাকে। প্রশাসনিক রেওয়াজমতে, স্ত্রী স্বামীর পদবির চেয়ে এক ধাপ ওপরে— জানো না?

জানি।

ঋধিতা ধার্মিক। ধর্মের কথা বললে হয়তো থামতে পারে। তাকে থামানোর জন্য বললাম, স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত।
এটা কেন বলা হয়েছে জানো?
কেন?
যাতে বেহেশতের লোভে হলেও স্ত্রীরা তোমাদের অনুগত হয়ে থাকে। রাখতে পেরেছ? বরং তোমরাই অনুগত হয়ে গেছ। বেগম রোকেয়ার স্বপ্ন আর নারীস্থান পড়ো-নি? সারাক্ষণ ওদের ছবি নিয়ে থাকবে, সারাক্ষণ ওদের চিন্তা করবে, আর আমি বসে বসে দেখব? বিয়ে করেছ, অন্তত এখন হলেও একটু ভালো হয়ে যাও। তিন সন্তানের বাপ হয়েছ, আর একজন আসার পথে। চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ।
আমাকে কী করতে হবে?
তুমি কখনো ওদের সঙ্গে দেখা করতে পারবে না। শপথ করো।
জোর করে কথা আদায় করতে পার, শপথও করাতে পার এবং আমি তা দিয়েও দিতে পারি, কিন্তু সে কথা আমি রাখতে পারব না। আমাকে দিয়ে এমন শপথ করিয়ে নিয়ো না, যা আমি রাখতে পারব না।
এটা দিয়েই তোমার দুর্বলতা প্রমাণ হয়ে গেছে। তুমি তাদের প্রতি প্রচণ্ড দুর্বল। যে পুরুষ পরনারীর প্রতি এমন দুর্বল তাদের লুচ্চা বলা হয়।  তুমি একটা লুচ্চা।
আমি তাদের ভালোবাসি। তা যদি লুচ্চামি হয়, তাহলে আমি লুচ্চা।
তুমি তাদের বেশি ভালোবাস না কি আমাকে?
ভালোবাসা কোনো কিছু দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এমন কোনো নিক্তি এ পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। পৃথিবীতে কত ফল, কত উপভোগ বস্তু— প্রতিটা আলাদা স্বাদের আলাদা প্রকৃতির। কারও সঙ্গে কারও তুলনা করা যায় না।  তোমার ভালোবাসার সঙ্গে অন্য কারও ভালোবাসার তুলনা— বোকামি। স্ত্রীকে বলা হয় অর্ধাঙ্গিনী।
 তুমি সবসময় ওদের কাছে ছুটে যাও। এটি আমার প্রতি অবহেলা।
না। ঘরের চেয়ে মানুষ বাইরে বেশি সময় কাটায়। এর মানে ঘরকে অবহেলা করা নয়। প্রকৃতি ঘরের চেয়ে সুন্দর, অনেক খোলামেলা। তবু মানুষ শেষ পর্যন্ত গৃহকোণে ফিরে আসে। এখানেই স্বস্তি পায়।
ভালোবাসা মাপা যায় কি না দেখি— বলে ঋধিতা চলে গেল। আমি আবার লেখায় মগ্ন হয়ে পড়ি। লেখকদের কাছে কোনো কষ্টই বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। লেখায় মগ্ন হলে সব কষ্ট উধাও হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর নাকে ধোঁয়ার গন্ধ এল। দৌড়ে বের হলাম। দেখি— ড্রায়িং রুমের মেঝেতে আগুন জ্বলছে। পাশে ঋধিতা দাঁড়িয়ে।
আগুন কেন?
তোমার সাধের অ্যালবামগুলো আগুনের বুকে বিসর্জন দিলাম। বলতে পার প্রেমযজ্ঞ। কেমন লাগছে এখন?
আমি আগুন নেভানোর জন্য জলভেজা তোয়ালে নিয়ে এগিয়ে গেলাম।
খবরদার, কাছে এলে পুরো ঘরে আগুন লাগিয়ে দেব।
আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। ত্রিশ বছরের চৈত্রিক স্মৃতিমালা আমার চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার নেই। আগুন অ্যালবামে নয়, যেন আমার মগজের কোষে কোষে জ্বলছে।
এ কী করলে? আমি আঁতকে উঠে বললাম।
যা করা একজন স্ত্রী হিসেবে আমার উচিত তাই করেছি। আরও অনেক আগে করা উচিত ছিল। তোমার প্রিয়তমার কাছে রিং করে জেনে নিতে পার— সেও বলবে ঠিক করেছি। কাণ্ড তো সবে শুরু। এরপর কী করব জানো? নিজের শরীরে নিজে আগুন দেব। তারপর তোমার সন্তানদের জ্বালাব। দেখি কে আমাকে বাঁচায়।
অমন করো না, অনুনয়স্বরে বললাম।
করব না। তবে শর্ত আছে।
কী শর্ত?
কখনো তুমি ওই মাগিদের সঙ্গে ছবি তুলতে পারবে না।
বিবেক, বুদ্ধি আর বিবেচনা যখন ঈর্ষার আগুনে পুড়তে থাকে তখন মানুষ রাগের বশীভূত হয়ে যায়। রাগের বশীভূত হলে মানুষ এমন গালি দেয়, এমন অমানবিক শর্ত দেয়। তুমি রাগাচ্ছন্ন। শুধু নিজের কথা ভাবলে হবে না। যে শুধু নিজের চিন্তায় ব্যস্ত থাকে সে কখনো নিজের কল্যাণ করতে পারে না। যে আঙুল একা থাকতে চায় প্রকৃত অর্থে সেটি অকেজো অঙ্গে পরিণত হয়ে যায়। তারা তোমাকে খুব সম্মান করে। তাদের কাছে টেনে নাও, ভালো লাগবে। দেখবে— সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকলে জীবন কত মধুর হয়। তুমি একটা বন্ধু পাবে, যে তোমাকে মায়ের শ্রদ্ধায় অনবরত সিক্ত করে যাবে। ঈর্ষা মানুষকে কষ্টের আগুনে জ্বালানোর জন্যই আসে। তুমি ঈর্ষা ছেড়ে দাও, সব তোমার কাছে ছুটে আসবে।
ঋধিতা জ্বলমান অ্যালবামগুলো আগুনের দিকে আরও ঠেলে দিতে দিতে বলল, রাখো তোমার উপদেশ। ওই রকম উপদেশে আমি থুতুও দিই না। বদমায়েশদের উপদেশ বদমায়েশি করার সুবিধা আদায়ের অপকৌশল।
শান্ত হও।
“হব না”, বলেই ঋধিতা কাঁদতে শুরু করে, “তুমি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছ, তোমাকে কখনো ক্ষমা করব না।”
বিয়ের আগে আমি তোমাকে এদেরে বিষয়ে সব খুলে বলেছিলাম। তুমি সামান্য বিষয়ের জন্য অসামান্য বিষয়কে অবহেলা করছ।  ঈর্ষাটা পরিত্যাগ করো। কাঁদতে হবে না। হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে মন, সঙ্গে সঙ্গে সবার। আনন্দে ভরে যাবে সংসার, চারদিক।
অমিয় বাণী রাখো, ঋধিতা বলল।
ততক্ষণে অ্যালবামগুলো পুড়ে ছাই।
বুকে হাত দিলাম।
মনে হলো বুকের ভিতরেও সবকিছু ছাই হয়ে গেছে পুড়ে।
মাথাটা খা খা করছে।
মনে হলো সব মগজ পুড়ে কয়লা।
স্মৃতিগুলো ধরে রাখার কোনো কোষ আর অক্ষত নেই আমার।

সন্মিত্রা: সমগ্র পর্ব (শুবাচ লিংক)

ছেলেরা বিয়ে করে, মেয়েরা বিয়ে বসে কেন

লিংক: https://draminbd.com/ছেলেরা-বিয়ে-করে-মেয়েরা-বি/

অর্হণা: সমগ্র পর্ব

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!