জগদীশ চন্দ্র বসু: রচনা জগদীশ চন্দ্র বসু: বাঙালি বিজ্ঞানীর বিশ্বজয়

ড. মোহাম্মদ আমীন 

জগদীশ চন্দ্র বসু:  রচনা জগদীশ চন্দ্র বসু বাঙালি বিজ্ঞানীর বিশ্বজয়

ভূমিকা: বাঙালি পদার্থবিদ, জীববিজ্ঞানী এবং কল্পবিজ্ঞান রচয়িতা স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুকে বলা হয় উপমহাদেশে ব্যবহারিক এবং গবেষণাধর্মী বিজ্ঞানের প্রকৃত পথিকৃৎ। তিনিই প্রথম বিনা তারে শব্দ প্রেরণের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। এজন্য ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স তাঁকে রেডিও বিজ্ঞানের একজন জনক হিসেবে অভিহিত করে। উপমহাদেশে তিনি ছিলেন প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া আধুনিক বিজ্ঞানী। বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগ প্রযুক্তির যে অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে, তাতে জগদীশচন্দ্র বসুর অবদান অবিস্মরণীয়।  উদ্ভিদের প্রাণ আছে, এই ধারণা অনেক প্রাচীন কাল হতে মানুষ জানা ছিল। কিন্তু প্রমাণ ছিল না। জগদীশ চন্দ্র বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণ করে দেখান যে উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে।  বিবিসি জরিপে তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় সপ্তম স্থান লাভ করেন।

জন্মস্থান ও জন্ম: জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বিক্রমপুরের রাঢ়িখাল গ্রামে তাঁর পরিবারের  আদি বাসস্থান ছিল। জন্মকালে জগদীশ চন্দ্র বসুর পিতা ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী ভগবান চন্দ্র বসু ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। এর পূর্বে তিনি ১৮৫৩ থেকে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রসঙ্গত, ভগবান চন্দ্র ছিলেন ময়মনসিংহ জেলা স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক। 

ছাত্রজীবন: জগদীশ চন্দ্র বসুর পিতা ভগবান চন্দ্র  ইংরেজ সরকারের  কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও  ছেলেকে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করাননি। জগদীশ চন্দ্রের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন স্কুল ছিল ময়মনসিংহ জিলা স্কুল। বাংলা স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যাপারে তাঁর যুক্তি ছিল প্রবল।  তিনি মনে করতেন, ইংরেজি শেখার আগে এদেশীয় ছেলেমেয়েদের মাতৃভাষা রপ্ত করা উচিত।  জগদীশ চন্দ্র কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে পড়াশোনা করে ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন।  এরপর তিনি আইসিএস পরীক্ষায় বসার জন্য ইংল্যান্ডে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে পিতা ভগবান চন্দ্র  রাজি হননি। তাই তিনি আর আইসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি।  

উচ্চশিক্ষা:  বাবার ইচ্ছা ও নিজের আগ্রহে জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে চিকিৎসাবিজ্ঞান অধ্যয়নের উদ্দেশ্যে লন্ডন গমন করেন।কিন্তু অসুস্থতার কারণে বেশিদিন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। পরে ভগ্নিপতি আনন্দমোহন বসুর আনুকূল্যে জগদীশ চন্দ্র প্রকৃতিবিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে ক্যামব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে তিনি ট্রাইপস পাশ করেন। ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে  জগদীশ চন্দ্র লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি পাশ করেন। ক্যামব্রিজে  উইলিয়াম স্ট্রাট, ৩য় ব্যারন রেলি, মাইকেল ফস্টার, জেমস ডেওয়ার, ফ্রান্সিস ডারউইন, ফ্রান্সিস মেটল্যান্ড বালফুর, সিডনি ভাইনসের মতো খ্যাতিমান বিজ্ঞানীগণ তাঁর শিক্ষক ছিলেন।  

প্রেসিডেন্সি কলেজে যোগদান: ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে জগদীশ চন্দ্র ভারত প্রত্যাবর্তন করেন। তৎকালীন ভারতের গভর্নর-জেনারেল জর্জ রবিনসন, প্রথম মার্কুইস অব রিপন-এর অনুরোধে স্যার অ্যালফ্রেড ক্রফট বসুকে প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক নিযুক্ত করেন। কলেজের অধ্যক্ষ চার্লস হেনরি টনি এই নিয়োগের পক্ষে ছিলেন না।  তাই জগদীশ চন্দ্র বসুকে গবেষণার জন্য কোনো রকম সুবিধা দেওয়া হতো  না।  অধিকন্তু তাঁকে ইউরোপীয় অধ্যাপকদের অর্ধেক বেতনেরও কম  পারিশ্রমিক দেওয়া হতো।  এর প্রতিবাদে  জগদীশ চন্দ্র বসু বেতন নেওয়া বন্ধ করে দেন।  তিন বছর পর্যন্ত তিনি কোনো বেতন না নিয়ে অধ্যাপনা চালিয়ে যান। এমন দীর্ঘ অভিনব প্রতিবাদের ফলে তাঁর বেতন ইউরোপীয়দের সমান করার আদেশ জারি করা হয়।

অবলা ও জগদীশ চন্দ্র: ১৮৮৭  খ্রিষ্টাব্দে জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে অবলার বিয়ে হয়। অবলা ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের বিখ্যাত সংস্কারক দুর্গা মোহন দাসের কন্যা। বিয়ের আগে অবলা বসু কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে চাইলেও তাকে ভর্তি হতে দেওয়া হয়নি। কারণ সেখানে তখন মেয়েদের ভর্তি নিষিদ্ধ ছিল। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গ সরকারের বৃত্তি নিয়ে অবলা চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়নের উদ্দেশে মাদ্রাজে যান। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অধ্যয়ন শুরু করলেও অসুস্থতার কারণে আবার ফিরে আসতে বাধ্য হন। 

ডিএসসি ডিগ্রি লাভ: প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার প্রথম আঠারো মাসে জগদীশ চন্দ্র যেসব গবেষণা  সম্পন্ন করেছিলেন তা লন্ডনের রয়েল সোসাইটির জার্নালে প্রকাশিত হয়। এই গবেষণাসমূহ বিবেচনা করে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে তাঁকে ডিএসসি ডিগ্রি প্রদান করে। 

লন্ডন যাত্রা: প্রেসিডেন্সি কলেজে কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণার ছিল না। তাই জগদীশ চন্দ্র বসুকে ২৪-বর্গফুট (২.২ মি) একটি ছোটো ঘরে  গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে হতো। প্রতিদিন নিয়মিত ৪ ঘণ্টা শিক্ষকতার পর যেটুকু সময় পেতেন  সেসময় তিনি  গবেষণার কাজ করতেন। অধিকন্তু প্রেসিডেন্সি কলেজে কোনো উন্নতমানের গবেষণাগার ছিল না, অর্থ সংকটও ছিল মারাত্মক। সীমিত ব্যয়ে স্থানীয়  মিস্ত্রিদের  শিখিয়ে তিনি পরীক্ষণেরউপকরণ প্রস্তুত করতেন। তাঁর এই গবেষণা কর্মগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করে  ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন তাকে ইংল্যান্ডের লিভারপুল-সহ আরও অনেক মর্যদাকর প্রতিষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার  আমন্ত্রণ জানান এবং সস্ত্রীক লন্ডন গমন করেন।  সফল বক্তৃতা শেষে ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে তিনি সস্ত্রীক দেশে ফিরে আসেন। 

অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ সৃষ্টি ও প্রেরণ: জগদীশের আঠারো মাসের  গবেষণার মূল বিষয় ছিল অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ সৃষ্টি এবং কোনো তার ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তা প্রেরণে সফলতা পান। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে বিজ্ঞনী হের্‌ৎস প্রত্যক্ষভাবে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ করেন। এ নিয়ে আরও গবেষণা করার জন্য তিনি চেষ্টা করছিলেন যদিও শেষ করার আগেই তিনি মারা যান। জগদীশ চন্দ্র তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে সর্বপ্রথম প্রায় ৫ মিলিমিটার তরঙ্গ দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট তরঙ্গ তৈরি করেন। এ ধরনের তরঙ্গকেই বলা হয়ে অতি ক্ষুদ্র তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ। আধুনিক রাডার, টেলিভিশন এবং মহাকাশ যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই তরঙ্গের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মূলত এর মাধ্যমেই বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ তথ্যের আদান প্রদান ঘটে থাকে।

 ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনে বক্তৃতা:  যুক্তরাজ্যের লিভারপুলে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনে জগদীশ চন্দ্র বসুর বক্তৃতার বিষয় ছিল “অন ইলেকট্রিক ওয়েভ্‌স”। মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে করা পরীক্ষণগুলোর উপর ভিত্তি করেই তিনি বক্তৃতা করেন যা ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের হতবাক করে দিয়েছিলেন। অশীতিপর বৃদ্ধ বিজ্ঞানী লর্ড কেলভিন জগদীশের বক্তৃতা শোনার পর  উচ্চসিত প্রশংসা করেছিলেন। জগদীশ এবং অবলা দুজনকেই তাঁর বাসায় নিমন্ত্রণ করেছিলেন। এই বিষয়ের উপর বিখ্যাত সাময়িকী “টাইম্‌স”-এ একটি রিপোর্ট ছাপা হয় যাতে বলা হয়, “এ বছর ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের সম্মিলনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল বিদ্যুৎ-তরঙ্গ সম্পর্কে অধ্যাপক বসুর বক্তৃতা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, কেমব্রিজের এম.এ. এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর অফ সাইন্স এই বিজ্ঞানী বিদ্যুৎরশ্মির সমাবর্তন সম্পর্কে যে মৌলিক গবেষণা করেছেন, তার প্রতি ইউরোপীয় বিজ্ঞানী মহলে আগ্রহ জন্মেছে। রয়্যাল সোসাইটি বিদ্যুৎরশ্মির তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও প্রতিসরাঙ্ক নির্ণয়ের গবেষণাপত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেছে।” এই বক্তৃতার বিষয়ে পারসন্‌স ম্যাগাজিন লিখেছিল: বিদেশি আক্রমণ ও অন্তর্দ্বন্দ্বে বহুবছর ধরে ভারতে জ্ঞানের অগ্রগতি ব্যাহত হয়ে চলেছিল।— প্রবল বাধা-বিপত্তির মধ্যে গবেষণা চালিয়ে একজন ভারতীয় অধ্যাপক আধুনিক বিজ্ঞানের জগতেও বিশেষ উল্লেখযোগ্য কাজের নজির রেখেছেন। বিদ্যুৎরশ্মি বিষয়ে তার গবেষণাপত্র ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনে পঠিত হবার সময় তা ইউরোপীয় জ্ঞানী-গুণীমহলে প্রবল আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। তাঁর ধৈর্য ও অসাধারণ শক্তির প্রশংসা করতেই হয়- অন্ততঃ যখন ভাবি যে তিনি মাত্র ১৮ মাসের মধ্যে বিদ্যুতের মতো অত্যন্ত দুরূহ বিভাগের ছয়টি উল্লেখযোগ্য গবেষণা শেষ করেছেন।

রয়্যাল ইন্সটিটিউশনে সান্ধ্য বক্তৃতা:  লিভারপুলে বক্তৃতার পর জগদীশের আর সাফল্য ও সুনাম আসে।  এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রয়্যাল ইন্সটিটিউশনে সান্ধ্য বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ।  এই বক্তৃতাটি আনুষ্ঠানিকভাবে “ফ্রাইডে ইভনিং ডিসকোর্স” নামে সুপরিচিত ছিল। এই ডিসকোর্সগুলোতে আমন্ত্রিত হতেন একেবারে প্রথম সারির কোন আবিষ্কারক। সে হিসেবে এটি জগদীশচন্দ্রের জন্য একটি দুর্লভ সম্মাননা ছিল। ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে জানুয়ারি  প্রদত্ত তার এই বক্তৃতার বিষয় ছিল “অন দ্য পোলারাইজেশন অফ ইলেকট্রিক রেইস” অর্থাৎ  বিদ্যুৎরশ্মির সমাবর্তন। বায়ুতে উপস্থিত বেশ কিছু বিরল গ্যাসের আবিষ্কারক হিসেবে খ্যাত বিজ্ঞানী লর্ড র‌্যালে জগদীশের বক্তৃতা শুনে এবং পরীক্ষাগুলো দেখে এতোটাই বিস্মিত হয়েছিলেন যে, তিনি অলৌকিক প্রতিভা মর্মে মন্তব্য করেছিলেন।  তিনি এ সম্পর্কে বলেছিলেন, “এমন নির্ভুল পরীক্ষা এর আগে কখনও দেখিনি- এ যেন মায়াজাল”। এই বক্তৃতার সূত্র ধরেই বিজ্ঞানী জেমস ডিউয়ার-এর সঙ্গে জগদীশচন্দ্রের বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। ডিউয়ার গ্যাসের তরলীকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বিখ্যাত। এই বক্তৃতা সম্বন্ধে “স্পেক্টেটর” পত্রিকায় লিখা হয়েছিল, “একজন খাঁটি বাঙালি লন্ডনে সমাগত, চমৎকৃত ইউরোপীয় বিজ্ঞানীমণ্ডলীর সামনে দাঁড়িয়ে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত দুরূহ বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন- এ দৃশ্য অভিনব।” এই বক্তৃতার পর ফ্রান্স এবং জার্মানি থেকে আমন্ত্রণ আসে এবং তিনি সেখানে কয়েকটি বক্তৃতা দেন। সবখানেই বিশেষ প্রশংসিত হন। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও অধ্যাপক কর্ন তার বন্ধু হয়ে যায় এবং তিনি ফ্রান্সের বিখ্যাত বিজ্ঞান সমিতি Société de Physique-এর সদস্য মনোনীত হন।

পদার্থবিদ্যায় অবদান: মাইক্রোওয়েভ গবেষণায় জগদীশ চন্দ্রের অবদান অসামান্য। তিনিই প্রথম বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ-দৈর্ঘ্যকে মিলিমিটার পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হন। তিনি রেডিও সংকেতকে শনাক্তকরণের জন্য অর্ধপরিবাহী জাংশন ব্যবহার করেন। এই আবিষ্কার পেটেন্ট করে বাণিজ্যিক সুবিধা নেওয়ার বদৌলতে তিনি সেটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। এসব অবদানের কারণে প্রযুক্তি-পেশাজীবীদের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট অভ ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ তাঁকে রেডিও বিজ্ঞানের জনক হিসেবে অভিহিত করেছে।

জীববিজ্ঞানের অবদান: উদ্ভিদবিদ্যাতেও জগদীশচন্দ্র বসুর অবদান অনন্য। তিনি উদ্ভিদ শারীরতত্ত্বের উপর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। উদ্ভিদের সূক্ষ্ম নড়াচড়া শনাক্ত করা এবং বিভিন্ন উদ্দীপকে উদ্ভিদের সাড়া দেওয়া ইত্যাদি ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়। আবিষ্কার করেন উদ্ভিদের বৃদ্ধি রেকর্ড করার জন্য ক্রেস্কোগ্রাফ নামক যন্ত্র। উদ্দীপকের প্রতি উদ্ভিদের সাড়া দেওয়ার প্রকৃতি যে বৈদ্যুতিক, সেটিও তিনি প্রমাণ করেন।

বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা এবং অন্যান্য কৃতিত্ব: ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর উদ্ভিদ শারীরতত্ত্ব নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি কলকাতায় ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর জীবনের উপার্জিত সমস্ত অর্থ তিনি এই গবেষণাগার নির্মাণ করতে ও এর জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনতে ব্যয় করেন। বাংলা ভাষার একজন বিখ্যাত লেখক হিসেবেও জগদীশচন্দ্র বসুর খ্যাতি রয়েছে। তাঁর একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘অব্যক্ত’।

দেশপ্রেমিক জগদীশ: আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু শুধু বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন অতুলনীয় দেশপ্রেমিক। আচার্য বসু ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য অধ্যাপক ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের আমন্ত্রণে  ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে বক্তৃতা দিতে গিয়ে “ভারতে বিদ্যাচর্চার ধারা” সম্পর্কে বলেন –  শিক্ষা প্রচারে ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা ভারতে কখনও কোনো বিঘ্ন উৎপাদন করিতে সমর্থ হয় নাই৷ অতীতের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে দেখিতে পাই, অমর আচার্যগণ আজিও জীবিত থাকিয়া আমাদিগকে উৎসাহিত করিতেছেন৷ দেখিতেছি, আচার্য শঙ্কর পাণ্ডিত্য প্রভাবে দিগ্বিজয়ে বাহির হইয়া দক্ষিণ হইতে আরম্ভ করিয়া উত্তর ভারতের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত সমস্ত দেশ জয় করিয়া চলিয়াছেন৷ দেখিতেছি বঙ্গদেশের পণ্ডিতগণ কয়েকখানি তালপাতার পুঁথি মাত্র সম্বল লইয়া হিমালয় পর্বত অতিক্রম করিতেছেন- উদ্দেশ্য তিব্বত, চীন ও সুদূর প্রাচ্যে জ্ঞানালোক প্রচার৷ এই যে বিদ্যার অনুশীলন, তাহা কখনও কোনো বিশেষ প্রদেশে নিবদ্ধ ছিল না! বহু শতাব্দী ধরিয়া ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই জ্ঞান প্রজ্জ্বলিত ছিল৷ আচার্যের খ্যাতির দ্বারা আকৃষ্ট হইয়াই সুদূর দেশ হইতে বিদ্যার্থীগণ আসিয়া আচার্যগৃহে সমবেত হইত৷ সেই প্রাচীন রীতি অদ্যাপি লুপ্ত হয় নাই৷ কারণ, বর্তমানকালেও চিন্তানায়কগণ দেশের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত পরিভ্রমণ করিতেছেন এবং ঐক্য ও জাতিবন্ধন অক্ষুণ্ণ রাখিতেছেন৷ ঠিক ঠিক ভাবে যাঁহারা ইতিহাস পাঠ করিয়াছেন তাঁহারা বুঝিতে পারিয়াছেন যে, যে সমস্ত বিভিন্ন জাতি ও প্রকৃতির লোক এদেশে আসিয়া এদেশকে নিজের মনে করিয়াছে, তাহাদিগকে এদেশ কি মহাশক্তি বলে নিজের করিয়া লইয়াছে৷ তাহাদেরই মিলিত চেষ্টায় ভবিষ্যতের বৃহত্তর ভারত গড়িয়া উঠিবে৷

ওই সভাতেই “আধুনিক বিজ্ঞানে ভারতের দান” সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন – বিজ্ঞান প্রাচ্যেরও নহে, পাশ্চাত্যেরও নহে, ইহা বিশ্বজনীন৷ তথাপি ভারতরবর্ষ উত্তরাধিকারসূত্রে বংশ পরম্পরায় যে ধীশক্তি পাইয়াছে, তাহার দ্বারা সে জ্ঞানপ্রচারে বিশেষ করিয়া সক্ষম৷ যে জ্বলন্ত কল্পনা বলে ভারতবাসী পরস্পর বিরোধী ঘটনাবলীর মধ্য হইতে সত্য বাছিয়া লইতে পারে, সে কল্পনাই আবার ভারতবাসী সংযত করিতে পারে৷ এই মনঃসংযমই সত্যান্বেষণের শক্তি দিয়া থাকে৷

বিশ্বখ্যাতদের চোখে জগদীশ চন্দ্র বসু: বিজ্ঞান শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে জগদীশ চন্দ্রের সফলতার কথা কর্মজীবন অংশেই উল্লিখিত হয়েছে। এছাড়া তিনি বিজ্ঞান গবেষণায়ও প্রভূত সাফল্য অর্জন করেছিলেন যার জন্য তার সুখ্যাতি তখনই ছড়িয়ে পড়েছিল। বাঙালিরাও বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে নিউটন-আইনস্টাইনের চেয়ে কম যায়না তিনি তা প্রমাণ করেন। জগদীশ চন্দ্র যে গ্যালিলিও-নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানী তার স্বীকৃতি দিয়েছিল লন্ডনের ডেইলি এক্সপ্রেস পত্রিকা, ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে। আর আইনস্টাইন তার সম্পর্কে নিজেই বলেছেন: জগদীশচন্দ্র যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন তার যে কোনটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঋষিতুল্য বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে বলেছেন: ভারতের কোনও বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি হে আর্য আচার্য জগদীশ।

ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে জগদীশ চন্দ্র:  ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তাদের ৫০ পাউন্ডের নোটে নতুন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির মুখ যুক্ত করার জন্য জরিপ কার্যক্রম গ্রহণ করে। তাদের ওয়েবসাইটের হিসাবে  ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ শে নভেম্বর  পর্যন্ত প্রায় ১,৭৫,০০০ লোক জরিপে অংশগ্রহণ করে। । তন্তম্যে ১,১৪,০০০ লোক স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুকে সেরা তালিকায় রেখেছেন।  মূলত তারবিহীন প্রযুক্তিতে তিনি যে অবদান রেখেছেন সেটার কল্যাণেই এখন আমরা ওয়াইফাই, ব্লুটুথ বা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ খুব সহজে ব্যবহার করতে পারছি। যদিও আমরা আধুনিক রেডিও-র জনক হিসেবে জি.মার্কনিকে বিবেচনা করে থাকি ১৯০১ সালে তার আবিষ্কারের জন্য, কিন্তু তার কয়েক বছর আগেই স্যার জগদীশচন্দ্র বসু তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তাই, যদি নির্বাচিত হয় তাহলে  ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ৫০ পাউন্ডের নোটে দেখা যাবে জগদীশ চন্দ্রের নাম।

জীবনাবসান: ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে নভেম্বর ভারতের ঝাড়খন্ডের গিরিডিতে  বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্রের জীবনাবসান ঘটে।

উপসংহার: মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে তিনি তাঁ আজীবন সঞ্চিত ১৭ লাখ টাকার মধ্যে ১৩ লাখ টাকা ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’কে দান করে দেন। ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে জগদীশ চন্দ্রের শততম জন্মবার্ষিকী উদ্‌যাপন উপলক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকার “JBNSTS” নামে একটি বৃত্তি চালু করে।  বিজ্ঞানে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য তিনি ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে নাইটহুট উপাধি, ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে রয়েল সোসাইটির ফেলো,  ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে ভিয়েনা একাডেমি অফ সাইন্স-এর সদস্য, ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস-এর ১৪তম অধিবেশনের সভাপতি প্রভৃতির মতো বিরল সম্মানে ভূষিত হন। তিনি ছিলেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সাইন্সেস অব ইন্ডিয়া-এর প্রতিষ্ঠাতা ফেলো। এর বর্তমান নাম ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সাইন্স একাডেমি।  বিবিসি জরিপে তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় সপ্তম স্থান লাভ করেন।  এই মহান বাঙালি বিজ্ঞানী শুধু বাঙালির বা উপমহাদেশের নয়, সারা বিশ্বের, সারা মানবজাতির অনুপম অহংকার।

 

শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও প্রধান

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি
শুবাচ আধুনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান

 

error: Content is protected !!