জন্য বনাম জন্যে

খ্যাতিমান শুবাচি জনাব খুরশেদ আহমেদ ‍শুবাচের মন্তব্য জানালায় লিখেছেন, “আমি যেভাবে বুঝি, ‘জন্য’ ও ‘জন্যে’ দুটো রূপই প্রচলিত, বৈধ ও শুদ্ধ, বাংলা ভাষার নানা মুনির বিপরীতধর্মী—এমনকি বাংলা একাডেমির স্ববিরোধী—নানা মত সত্ত্বেও।
১। বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ [প্রথম প্রকাশ: মাঘ ১৪২০/জানুয়ারি ২০১৪] ২০ পৃষ্ঠায় বলেছে: “সাধু : … জন্য, …। প্রমিত : … জন্যে, …।” এবং ২০৮ পৃষ্ঠায় বলেছে: “যেহেতু সম্প্রদান কারকের তাত্ত্বিক বৈধতা স্বীকার্য নয় (দ্র. সরকার ২০০৫:৪২-৪৩) সেহেতু কারও জন্য বা কোনো কিছুর জন্য ধারণার প্রকাশে নিমিত্ত কারক নামে একটি কারকের কল্পনা করা হয়েছে । এর চিহ্ন –র #জন্য/জন্যে, যেমন— তোমার জন্যে এ বইটা কিনেছি। শুধু কবিতার জন্য আমি বেঁচে আছি। মানুষ একমুঠো ভাতের জন্য কী না করে?”
২। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান [প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৬] অন্তর্ভুক্ত করেছে কেবল ‘জন্য’; ওতে অনুপস্থিত ‘জন্যে’।
৩। বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান [পরিমার্জিত সংস্করণ ডিসেম্বর ২০০০] ভুক্তির শীর্ষশব্দ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে ‘জন্য, জন্যে’ এবং উদ্ধৃত এই ক্রমে, যা থেকে বুঝি ‘জন্য’ বানান প্রমিত, ‘জন্যে’ অপ্রমিত।
৪। বাংলা একাডেমি বাংলা বানান-অভিধান [পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০০৮] দুটো রূপই অন্তর্ভুক্ত করেছে—’জন্য’ ও ‘জন্যে’, এবং পরপর, বর্ণানুক্রমে।
৫। প্রথম আলো ভাষারীতি [চতুর্থ সংস্করণ, সপ্তম মুদ্রণ: মাঘ ১৪২১, জানুয়ারি ২০১৫] বলছে: লিখব ‘জন্য’; লিখব না ‘জন্যে’।
৬। সুভাষ ভট্টাচার্য তাঁর বাংলা প্রয়োগ অভিধান (নবযুগ প্রকাশনী, পরিমার্জিত নবযুগ সংস্করণ: বইমেলা ২০০৩, চতুর্থ মুদ্রণ: ২০১৪) বইটিতে লিখেছেন: “জন্যে শব্দটি জন্য-র কথ্য রূপ। … এখনও পর্যন্ত প্রচলিত রীতি হল হালকা বা কিশোরপাঠ্য বা কথ্যভঙ্গিতে লেখা রচনায় জন্যে লেখা যেতে পারে, তবে গাম্ভীর্যপূর্ণ রচনায় জন্য-ই এতাবৎ প্রচলিত।”
৭। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯৮৬) থেকে পাই: ‘জন্য’ সংস্কৃত বা তৎসম শব্দ, তা থেকে অপভ্রংশ ‘জন্যে’। [এই একই অভিধানের ভাষায় অপভ্রংশ মানে: অপভাষা; মূল ভাষার বিকৃতি, অশুদ্ধি; ব্যাকরণ ও অলঙ্কার দোষে দুষ্ট ভাষা; “প্রাকৃত ব্যাকরণে যে ভাষা কুলায় না, তাকে অপভ্রংশ বলে” – হরপ্রসাদ শাস্ত্রী; পতন, স্খলন; বিকার; গ্রাম্যতাপ্রাপ্ত।]
৮। অশোক মুখোপাধ্যায়ের সংসদ বানান অভিধান [পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ ২০০৯-এর তৃতীয় মুদ্রণ ২০১৩] বলেছে: ‘জন্য’ ও ‘জন্যে’ দুটোরই সমান মান – ‘দুটোই লেখা চলে’।
৯। বাংলা কথাবার্তায়, ছড়ায়, কবিতায়, গানে, নাটকের সংলাপে ‘জন্য’ ও ‘জন্যে’ দুটো রূপই পাই। শব্দটির ব্যবহারে আমি ‘জন্য’ রূপটিতে অভ্যস্ত; তবে ‘জন্যে’ রূপে আমার কোনো অ্যালার্জি নেই।”

‘জন্য’ সাধারণত অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।  স্বভাবতই ‘জন্য’ শব্দের সঙ্গে এ-বিভক্তি যুক্ত করা সমীচীন নয়। এটি আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহৃত শব্দ। সাধারণত কথোপকথনে ব্যবহৃত হয়। যদিও কাব্যে অনেককে ‘জন্যে’ ব্যবহার করতে দেখা যায়। সতীনাথের (৭ই জুন ১৯২৫ – ১৩ই ডিসেম্বর ১৯৯২) কণ্ঠে কী মধুর লাগে:  শুধু তোমার জন্যে ওই অরণ্যে পলাশ হয়েছে লাল—।  কাব্যিক রূপ সর্বদা আদর্শ রূপ নাও হতে পারে। আবার অনেকের সাহিত্যকর্মেও মাঝে মাঝে ‘জন্যে’ দেখা যায়। এসব ব্যবহার উদাহরণ নয়, ব্যতিক্রম এবং কাব্যিক অনিবার্যতা।

ব্যতিক্রম গ্রাহ্য উদাহরণ হতে পারে না। ‘জন্য’জন্যে নিয়ে আগে কোন গ্রন্থে কী লেখা হয়েছে এবং কোন ব্যক্তি কী বলেছে তা গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে অধিকাংশ নজিরই ‘জন্য’ বানান ব্যবহারের পক্ষে। অধিকন্তু, অধুনা জন্যে শব্দের স্বাভাবিক ও সাধারণ ব্যবহার নেই। জন্যে বানানকে প্রায়োগিক বিবেচনায় এমনকি ব্যাকরণগতভাবেও সুষ্ঠু ও আদর্শ বলা যায় না। অব্যয় হিসেবে প্রমিত বাংলায় ‘জন্যে’ বানানের কোনো সুষ্ঠু ও সুস্থ শব্দ হতে পারে না।  এটি অশুদ্ধপ্রয়োগ। সবকিছু বিবেচনায় বাংলা একাডেমি হতে প্রকাশিত সর্বশেষ অভিধান ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ গ্রন্থে, একমাত্র ‘জন্য’ বানানকে প্রমিত করেছে। ওই অভিধানে ‘জন্যে’ বানানের কোনো শব্দ নেই। অতএব, বাংলা একাডেমির সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী একমাত্র প্রমিত বানান ‘জন্য’। নির্মলেন্দু গুণ ‘শুধু তোমার জন্য’ কবিতায় লিখেছেন:

“আমার ঈশ্বর জানেন— আমার মৃত্যু হবে তোমার জন্য।
তারপর অনেকদিন পর একদিন তুমিও জানবে,
আমি জন্মেছিলাম তোমার জন্য। শুধু তোমার জন্য।”
—————

All Link

বিসিএস প্রিলি থেকে ভাইভা কৃতকার্য কৌশল

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা বইয়ের তালিকা

বাংলা সাহিত্যবিষয়ক লিংক

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/২

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন /৩

কীভাবে হলো দেশের নাম

ইউরোপ মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

দৈনন্দিন বিজ্ঞান লিংক

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৩

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/৪

কীভাবে হলো দেশের নাম

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/১

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র/২

বাংলাদেশের তারিখ

ব্যাবহারিক বাংলা বানান সমগ্র : পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.

শুদ্ধ বানান চর্চা প্রমিত বাংলা বানান বিধি : বানান শেখার বই

কি না  বনাম কিনা এবং না কি বনাম নাকি

মত বনাম মতো : কোথায় কোনটি এবং কেন লিখবেন

error: Content is protected !!