জর্জিয়া (Georgia) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

জর্জিয়া (Georgia)

জর্জিয়া (Georgia) শব্দের প্রকৃত ব্যুৎপত্তি এখনও অজ্ঞাত। তবে শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে বেশ কয়েকটি ব্যাখ্যা ও প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। কথিত হয়, মধ্যযুগে পশ্চিম ইউরোপে ভূখণ্ডটির প্রকৃতি বিবেচনায় স্থানীয় লোকদের মুখ থেকে ‘জর্জিয়া’ নামটির উদ্ভব ঘটে। সমকালীন ফরাসি কাহিনিকার জ্যাক ডি ভিট্রি ও The Travels of Sir John Mandeville গ্রন্থের লেখক জন মেন্ডেভিলের গ্রন্থে জর্জিয়া নামটি রয়েছে। কতিপয় আধুনিক পণ্ডিতের অভিমত, জর্জিয়া নামটি একাদশ বা দ্বাদশ শতকে সিরিয়াক জর্জ-আন বা -আইয়ান (Gurz-an or -iyan) এবং আরবি জরজান বা জরজ্যান (Jurĵan or Jurzan হতে পারসি ভাষায় জর্জ বা জর্জিয়ান (Gurg or Gurgan) রূপে পরিবর্তিত হয়ে আসে। এবং সেখান থেকে জর্জিয়া নামের উৎপত্তি। বলা হয়, একসময় এটি পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। এখানে বসবাসরত লোকদের জর্জ (Gurj) বলা হতো। এ নাম হতে জর্জিয়া নামের উৎপত্তি। জর্জিয়ার ম্যাপ দেখতে অনেকটা প্লাটিপাসের মতো।

আবার অনেকে মনে করেন, পূর্ব ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান এলাকার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নির্দেশ শব্দ জরজান (Gorgan) হতে উদ্ভত। যার অর্থ নেখড়ের দেশ। বলা হয়, একসময় এ দেশের জঙ্গলে প্রচুর নেখড়ে পাওয়া যেত। আবার অনেকে বলেন, এখানকার আদিবাসীদের নেখড়ের মতো লম্বা দাঁত ও নখ ছিল এবং আচরণেও ছিল নেখড়ের মতো ক্ষীপ্র। আর একটি বর্ণনামতে, গ্রিক জর্জস (georgos) শব্দ হতে জর্জিয়া নামের উদ্ভব। জর্জস শব্দের অর্থ কৃষকের জমি। আবার কেউ কেউ বলেন, ল্যাটিন জর্জিকাস শব্দ হতে জর্জিয়া নামের উৎপত্তি। যার অর্থ কৃষি বা কৃষিকাজ। তবে এটি ঠিক যে, প্রাচীনকাল হতে জর্জিয়ার ভূখণ্ড কৃষিকাজের জন্য জগতজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিল। আর একটি জনপ্রিয় মত হচ্ছে, সেন্ট জর্জ হতে (St. George) হতে জর্জিয়া নামের উৎপত্তি। তিনি হচ্ছে জর্জিয়ার জাতীয় ঋষি বা সেন্ট।

জর্জিয়া ইউরোপের একটি প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম তিবিলিসি। জর্জিয়া কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের মধ্যে অবস্থিত স্থলযোটক দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের সবচেয়ে পশ্চিমে অবস্থিত রাষ্ট্র। দক্ষিণ ককেশাসের অন্য রাষ্ট্রগুলি হল আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া। জর্জিয়ার কিছু অংশ পশ্চিম ইউরোপে এবং কিছু অংশ দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত। একাধিক মহাদেশে অবস্থিত বলে জর্জিয়াকে আন্তর্মহাদেশীয় রাষ্ট্র বলা হয়। ৩৩৭ খ্রিষ্টাব্দে  জর্জিয়ার খ্রিস্টকে জর্জিয়ার রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। জর্জিয়া পৃথিবীর প্রাচীন মানব বসতির একটি। এখানে ১.৭ মিলিয়ন বছর আগের মানুষের মাথার খুলি পাওয়া গিয়েছে। এর রাজধানী তিবলিশ খ্রিস্ট জন্মের ৪০০০ বছর পূর্ব হতে সমৃদ্ধ নগর হিসাবে খ্যাত হয়ে আসছে। তিবলিশ জর্জিয়ান শব্দ। এর অর্থ উষ্ণ। আর্মেনিয়া, তুরস্ক, আজারবাইযান ও  রাশিয়া জর্জিয়ার প্রতিবেশি রাষ্ট্র।

জর্জিয়ার আয়তন  ৬৯,৬২০ বর্গ কিলোমিটার বা ২৬,৯১১ বর্গমাইল। যা বিশ্বের ১২০-তম। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে মোট জনসংখ্যা ৩,৭২৯,৫০০ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৫৩.৫। জনসংখ্যার দিক থেকে জর্জিয়া বিশ্বেও ১৩১-তম এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে ১৩৭-তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে জিডিপি (পিপিপি) ৩৪.২৭ বিলিয়ন (১১৭-তম) ও মাথাপিছু আয় ৭,২৪৫ ইউএস ডলার। অন্যদিকে জিডিপি নমিনাল ১৬.৫৩৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৪,৪৩৩ ইউএস ডলার। গিনি ৪১.৪ এবং এইচডিআই ০.৭৪৪(উচু এবং ৭৯-তম)।

১৮০১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর জর্জিয়া রাশিয়ান সাম্রাজ্যের দখলে চলে যায়। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মে রাশিয়া হতে স্বাধীনতা লাভ করে।  ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে জর্জিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন দখল করে নেয়। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ এপ্রিল জর্জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর স্বাধীনতা ঘোষণার চূড়ান্ত কার্যক্রম সম্পাদিত হয়। প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যে ১৫ টি প্রজাতন্ত্র হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে : রাশিয়া, ইউক্রেন, জর্জিয়া, বেলরুশিয়া, উজবেকিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইযান, কাজাখাস্তান, কিরগিজস্তান, মলদোবা, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও এস্তোনিয়া। জর্জিয়ায় অর্ধ-রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রতিনিধিত্বমূলক বহুদলীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বিদ্যমান। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারপ্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী।

জর্জিয়ার ভূমিরূপ বিচিত্র। এখানে রয়েছে উচ্চ পর্বতমালা এবং উর্বর উপকূলীয় নিম্নভূমি। জনসংখ্যার অধিকাংশই জর্জিয়া জাতির লোক। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে  দেশটিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে  স্বাধীনতা লাভের পর দেশটিতে রাজনীতিক টানাপোড়েন ও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এসব ঘটনার কারণে এবং অন্যান্য প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোর সাথে আর্থনীতিক সম্পর্ক ছিন্ন হবার ফলে জর্জিয়ার অর্থনীতিতে ধ্বস নামে। তবে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ রাজনীতিক সংঘাত কমে গেলে এবং মুক্ত বাজার সংস্কারগুলি প্রতিষ্ঠিত হলে দেশটির অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে জর্জিয়ার প্রথম সোভিয়েত-উত্তর সংবিধান পাস হয়।

জর্জিয়ার সীমানার অভ্যন্তরে দুইটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র বিদ্যমান। একটি হল জর্জিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত আজারিয়া এবং অপরটি দেশের উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত আবখাজিয়া। দুটি প্রজাতন্ত্রেরই কৃষ্ণ সাগরে এক চিলতে উপকূল আছে। এছাড়াও দক্ষিণ অসেটিয়া নামের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল দেশের উত্তরে মধ্যভাগে অবস্থিত। আবখাজিয়া ও দক্ষিণ অসেটিয়ার উত্তরে রাশিয়া অবস্থিত। আজারিয়ার দক্ষিণে তুরস্ক অবস্থিত।

রাশিয়া ও জর্জিয়ার সীমান্তে মাউন্ট ককেসাস অবস্থিত। মাউন্ট ককেসাসের জর্জিয়ার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ শাখার। এর উচ্চতা ৫,১৯৩ মিটার বা ১৭,০৪০ ফুট। গ্রিক পুরাণে বর্ণিত পৃথিবীর কয়েকটি স্তম্ভের মধ্যে একটি জর্জিয়ার এ পর্বতে অবস্থিত। বলা হয়, মানুষকে আগুণ দিয়ে সাহায্য করার শাস্তিস্বরূপ জিউস দেবতা প্রমিথিউসকে এ পবর্তে বন্দি করে রেখেছিলেন। প্রতিদিন একটা ঈগল এসে প্রমিথিউসের কলিজা খেয়ে যেত। কিছুক্ষণ পর আবার প্রমিথিউস পুরো সুস্থ হয়ে ওঠতেন। পরদিন আবার ঈগল এসে তার কলিজা খেত।নৃতাত্ত্বিক জর্জিয়ানরা নিজেদের কার্টভেলেবি (Kartvelebi) ডাকে। পৃথিবীর গভীরতম গুহা বরোনিয়া গুহা জর্জিয়ায় অবস্থিত।

২০০৫ খ্রিষ্টাব্দের ফ্রেবুয়ারি মাসে জর্জিয়ার প্রধানমন্ত্রী যুরাব ঝাভানিয়া ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাউল উসুপভকে তিবলিসের একটি অ্যাপার্টমেন্টে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মৃত্যুর কারণ ছিল ত্রুটিপূর্ণ হিটার থেকে কাবন মনোক্সাইড নিঃসরণ।জর্জিয়ায় একটি কথা প্রচলিত আছে : অতিথি ঈশ্বরের উপহার। তাই বিদেশি অতিথিদের তারা খুব আন্তরিকতার সঙ্গে আপ্যায়ন করে থাকেন। বিদেশিদের প্রতি তাদের আন্তরিকতা সত্যি অতুলনীয়। বিশ্ব ব্যাংক জর্জিয়াকে  `The number one economic reformer in the world’উপাধি দিয়েছে। সহজ ব্যবসা-বাণিজ্য করার পদ্ধতি বিবেচনায় এটি বিশ্বের ১৮-তম।

জর্জিয়া অত্যন্ত নিরাপদ দেশ। এখানে কোনো চুরি হয় না। লোকজন ঘরের দরজা বন্ধ করে না। রাস্তায় প্রচুর পুলিশ কাজ করে। তারা কী করে তা জনগণ সবাই দেখতে পায়। সারনেইম বা উপনাম দেখে বলে দেওয়া যায়, তিনি কোন এলাকার বাসিন্দা। এর শিশুদের খুব ভালবাসে। বলা হয় শিশুর আত্মা ঈশ্বরের প্রতিভূ। জর্জিয়ার সকল সরকারি কাজকর্ম হয় ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে। এখানে গাড়ি চালানোর জন্য কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রয়োজন হয় না। তারা পাসপোর্ট দেখাতে পারে, এটি দেখতে অনেকটা ক্রেডিট কার্ডের মতো। পুলিশ কোনো কারণে গাড়ি থামাতে বললে, শুধু নাম জিজ্ঞাসা করে। বাকি সব তথ্য নামের সাহায্যে কম্পিউটার থেকে সংগ্রহ করে নেয়।

জর্জিয়ান ভাষা কোনো ওয়ার্ড এক্সচেপশন (words exception) নেই। তাই যা শোনা যায় তা সহজে লেখা যায়। নাম থেকে শুরু করে সবকিছু ছোটহাতের অক্ষরে লেখা হয়। কোনো ক্যাপিট্যাল লেটার নেই। লিঙ্গজ্ঞাপক কোনো শব্দ নেই। বলার ভঙ্গি হতে এটি বুঝে নেওয়া যায়। জর্জিয়া এখনও কনে চুরি করা হয়। তবে এটি করা হয় বরের সম্মতিক্রমে। এটি তাদের বিবাহ-রীতি। জর্জিয়ার যে কোনো স্থানে ধুমপান করা যায়। এতে কোনো বাধা নেই। জর্জিয়া উঁচু ভবনে উঠার সময় লিফ্ট ব্যবহার করলে তজ্জন্য ভাড়া দিতে হয়। ভাড়ার পরিমাণ কমেবেশি ১০ তেতরি বা ১.৩ সেন্ট।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের দেহরক্ষী  রুস্তম রাজমাদেজ জর্জিয়ার অধিবাসী। জর্জিয়াকে মদের জন্মস্থান বলা হয়। সম্প্রতি জর্জিয়া পৃথিীর সবচেয়ে প্রাচীন মদ্যপাত্র ও মদ্য পাওয়া গিয়েছে। জর্জিয়াতে পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা মদ ও ভদকা তৈরি হয়।

 

এস্তোনিয়া (Estonia) : ইতিহাস ও নামকরণ

ফিনল্যান্ড (Finland) : ইতিহাস ও নামকরণ

ফ্রান্স (France) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

 

error: Content is protected !!