জাতীয় স্মৃতিসৌধ: স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন: হতভাগা এক খ্যাতিমান স্থপতির করুণ কাহিনি

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/জাতীয়-স্মৃতিসৌধ-স্থপতি-/ ‎
 বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মে তৎকালীন ঢাকা জেলার বিক্রমপুর বর্তমান মুন্সিঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ মুজিবুল হক এবং মায়ের নাম সৈয়দা রাশিদা হক। বাবার চাকুরির কারণে তাঁকে ছাত্রজীবনের বেশ কিছু  গুরুত্বপূর্ণসময় ফরিদপুর শহরে কাটাতে হয়েছে।  ফরিদপুর মিশন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সৈয়দ মাইনুল হোসেনের প্রতিষ্ঠানিক অধ্যয়নের সূচনা। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে  তিনি ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুর জেলা স্কুলে ভর্তি হন ৷ ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৯   খ্রিষ্টাব্দে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে  ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) স্থাপত্য বিদ্যায় নকশা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম শ্রেণিতে স্থাপত্য বিদ্যা পাশ করেন।

 প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন শেষ করে তিনি ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ‘ইএএইচ কনসালটেন্ট লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র স্থপতি হিসাবে যোগদান করেন। চার মাস

স্থপতি সেয়দ মাইনুল হোসেন

পর এই  চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে ‘বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড’ নামের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র স্থপতি হিসাবে যোগদান করেন।  ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বরে ‘বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেড’ নামক প্রতিষ্ঠানের চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে ‘স্থপতি সংসদ লিমিটেড’ নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র স্থপতি হিসাবে চাকুরি শুরু করেন। ১৯৭৯  খ্রিষ্টাব্দে থেকে ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি আরও বেশ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র স্থপতি হিসাবে কাজ করেন। ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ‘শহীদুল্লাহ অ্যান্ড এসোসিয়েট লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে জুনিয়র স্থপতি হিসেবে যোগদেন ৷ বারবার কর্মত্যাগের কারণে তিনি পদবিতে কখনো সিনিয়র হতে পারেননি, তবে অভিজ্ঞতায় হয়েছেন সিনিয়রের সিনিয়র। মেধাবী হলেও তিনি বৈষয়িক ও আর্থিক বিষয়ে দূরদর্শী ছিলেন না। সৃজনশীল মেধাবীরা সাধারণত এমনই হয়। যা স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেনের চরিত্রে পুরোপুরি দেখা যায়। 

 সৈয়দ মাইনুল হোসেন ছিলেন বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান স্থপতি। ‘ঢাকা মিউজিয়াম’ ও ‘জাতীয় স্মৃতিসৌধ’-সহ আরো অনেক কাজের নকশা বাস্তবায়ন করে তিনি প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন।  ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সৈয়দ মাইনুল হোসেন ৩৮টি বড়ো বড়ো স্থাপনার নকশা প্রণয়ন করেছেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: জাতীয় স্মৃতিসৌধ (১৯৭৮), বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর (১৯৮২), ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইস্টিটিউট (১৯৭৭), বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন (১৯৭৮), চট্টগ্রাম ইপিজেড এর অফিস ভবন (১৯৮০), শিল্পকলা একাডেমীর বারো’শ আসন বিশিষ্ট অডিটোরিয়াম, উত্তরা মডেল টাউন (আবাসিক প্রকল্প ) (১৯৮৫)। তিনি ১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে একুশে পদকে ভূষিত হন। তাঁর শেষ জীবন কাটে মারাত্মক অর্থ কষ্টে। বারবার চাকুরি পরিবর্তন করায় তিনি কোনো বড়ো পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেননি। জাতীয় স্মৃতিসৌধের রচয়িতা জীবনকাহিনি ছিল সত্যি করুণ।
স্মৃতিসৌধের ডিজাইন করার সম্মানী বাবদ দুই লাখ টাকা পাবার কথা ছিল। পেয়েছে এক লাখ টাকা। ৫০% কেটে নেওয়া হয়েছে আয়কর-সহ নানা খাতে।  ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এরশাদ জাতীয় স্মৃতিসৌধ উদ্‌বোধন করেন। সেই অনুষ্ঠানে স্থপতি মইনুল হোসেনকে আমন্ত্রণই জানানো হয়নি। পরে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পূর্তমন্ত্রী বলছিলেন, “দুঃখিত, তাঁর কথা আমাদের মনেই ছিল না”। অনুষ্ঠানের দিন অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা চলে যাবার পর সৈয়দ মাইনুল হোসেন জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন তাঁর অমর সৃষ্টি।
একসময় তাঁর আর্থিক অবস্থা এত করুণ হয়ে যায় যে, একবেলা আহারের জন্য অনেকের কাছে হাত পর্যন্ত পাততে হয়েছে।  চিকিৎসা-সাহায্য দূরে থাক কেউ  খোঁজ খবর পর্যন্ত নেননি। এরূপ দুঃসহ অবস্থায়  ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই নভেম্বর মাসে ৬২ বছর বয়সে বিনাচিকিৎসায় মারা যান বাংলাদেশের জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন।

আমি শুবাচ থেকে বলছি

error: Content is protected !!