জাপান (Japan) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

জাপান (Japan)

জেপান (Geppun) শব্দ হতে জাপান নামের উদ্ভব। জাপানি ভাষার এর নাম নিহন বা নিপ্পন (Nihon / Nippon)। এর অর্থ সূর্যোদয়ের দেশ। ইটালিয়ান পর্যটক মার্কো পোলোর মাধ্যমে চায়নার সাংহাই দ্বীপের স্থানীয় ভাষার অনুবাদ হতে এ নামটি এসেছে। এর চায়না উচ্চারণ পিনইয়ান (pinyin)। আঞ্চলিক উচ্চারণ ছিল জিতপান(Jitpaun)। যার অর্থ সূর্যের উৎস বা সূর্যোদয়ের দেশ। জাপানের অবস্থান ছিল পূর্ব চায়নায়। পূর্বদিকে সূর্য উদিত হয়। চায়নার এ অংশ হতে জাপানের দিকে তাকালে মনে হতো জাপান হতেই সূর্য উদিত হচ্ছে। তাই দেশটির নাম রাখা হয় জাপান। আবার অনেকে মনে করেন, জাপান শব্দের অর্থ সূর্যের সা¤্রাজ্য। তখন লোকদের বিশ্বাস ছিল, জাপান সূর্যের আদি সাম্রাজ্য। তাই সূর্য প্রথমে জাপানে উপনীত হতেন। এ জন্য দেশটির নাম রাখা হয় জাপান বা সূর্যের সাম্রাজ্য।

জাপান (জাপানি: নিপ্পন) এশিয়া মহাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। ছোট-বড় প্রায় ৩,০০০ দ্বীপ নিয়ে জাপান গঠিত। চারটি প্রধান দ্বীপ হল হনশু, হোক্কাইদো, কিয়ুশু এবং শিকোকু। জাপানিরা জাপানি ভাষায় তাদেও দেশকে নিহোং বা নিপ্পোং বলে ডাকে, যার অর্থ “সূর্যের উৎস”। জাপান, চীনা সাম্রাজ্যগুলির পূর্বে অবস্থিত বলে এরকম নাম করা হয়েছিল। ইংরেজিতে জাপানকে অনেক সময় ‘land of the rising sun’ অর্থাৎ সূর্যোদয়ের দেশ বলা হয়। টোকিও জাপানের বৃহত্তম শহর ও রাজধানী। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদে অ্যাস্কেল্যাটর পাওয়া যায় জাপানে। এর দৈর্ঘ্য মাত্র ৫ ধাপ (step)। জাপানে বেকারত্বের হার মাত্র ৪%।

জাপানের মোট আয়তন ৩৭৭,৯৪৪ বর্গ কিলোমিটার বা ১৪৫,৯২৫ বর্গমাইল। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের অনুমিত হিসাব অনুযায়ী লোক সংখ্যা ১২৬,৮৮০,০০০ এবং প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যা ৩৩৭.১। জনসংখ্যার মধ্যে ৯৮.৫% জাপানি, ০.৫% কোরিয়ান, ০.৪% কোরিয়ান, ০.৬% অন্যান্য। আয়তনের দিক হতে জাপান পৃথিবীর ৬২-তম কিন্তু জনসংখ্যার দিক হতে ১০-ম। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, জাপানের জিডিপি (পিপিপি) ৪.৮৪৩ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার (৩য়)এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৩৮,২১৬ ইউএস ডলার (২৯-তম)। জিডিপি নমিনাল ৪.২১০ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৩৩,২২৩(২৫-তম)। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী গিনি ৩৭.৬ এবং এইচডিআই ০.৮৯০ (১৭-তম)। জাপানি মুদ্রার নাম ইয়েন। জাপানি জাপানের সরকারি ভাষা। এ ভাষাতে জাপানের প্রায় ৯৮% লোক কথা বলেন।

খ্রিস্টজন্মের ৩০ হাজার বছর পূর্ব হতে জাপানে সমৃদ্ধ বসতি গড়ে উঠে। জনসংখ্যার দিক হতে জাপান পৃথিবীর ১০ম। এর ৭০-৮০% ভুমি পর্বতময়। জাপানে ১০০টি সক্রিয় ভলকানো (volcanoes) রয়েছে। এখানে প্রতিবছর কমপক্ষে ১৫০০টি ভূমিকম্প হয়।

জ্যামাইকায় উৎপাদিত কফির ৮৫% জাপানে রপ্তানি হয়। এ দেশে ১৫ বছরের উর্ধ্ব জনগণের মধ্যে শিক্ষিতের হার ৯৯%। জাপানের রাজধানী টোকিও পৃথিবীর বৃহত্তম মৎস্য বাজার। এখানে প্রতিদিন ২০০০ টন মাছ ক্রয়-বিক্রয় হয়। টয়োটা জাপানের একটি গাড়ি-প্রস্তুত কোম্পানি। এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গাড়ি-প্রস্তুত কোম্পানি হিসাবে খ্যাত।

এশিয়ার মূল ভূখন্ডের মধ্যে কোরীয় উপদ্বীপ জাপানের সবচেয়ে কাছে, মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে জাপানের স্থলসীমান্ত নেই। আর একটি নিকটবর্তী ভূখ- পূর্ব রাশিয়া, যা ওখটস্ক সাগর ও জাপান সাগরের অপর পারে অবস্থিত। জাপানের ভূ-প্রকৃতি পর্বতময় এবং ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকাই পাহাড়ি।

জাপানের বেশির ভাগ মানুষ নদীসমূহের নিম্ন অববাহিকার সমভূমি ও নিম্নভূমিতে, বা পাহাড়ের একেবারে পাদদেশের ঢালগুলিতে, কিংবা সমুদ্রের তীরে বাস করে। জাপান বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। টোকিও ও কোবে নগরীর মধ্যবর্তী নগর এলাকাটিতে জনঘনত্ব অত্যন্ত উচ্চ। জাপানের ১৭% ভূমিবিশিষ্ট এই এলাকাটিতে মোট জনসংখ্যার ৪৫% বসবাস করেন। জাতিগতভাবে ও সংস্কৃতিগতভাবে সমগ্র জাপানে প্রায় একই ধরনের লোকের বাস। জাপানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যা খুবই কম। জাপানি ভাষাই প্রধান ভাষা। বৌদ্ধ ধর্ম ও জাপানের নিজস্ব শিন্তো ধর্ম এখানকার প্রধান ধর্ম।

জাপানে ৭ম শতক থেকে একজন সম্রাট শাসন করে আসছেন। ১২শ শতকে শোগুন নামের সামরিক শাসকদের উদ্ভব ঘটে। শোগুনেরা ছয় শতকেরও বেশি সময় ধরে সম্রাটের সাথে ক্ষমতার অংশীদার ছিল। ১৭শ শতকের শুরুতে একটি শক্তিশালী সামরিক সরকার প্রায় সব বিদেশীর জন্য দেশটির সীমান্ত বন্ধ করে দেয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান অক্ষশক্তিদের পক্ষে যুদ্ধ করে। জাপানের পরাজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এতে দেশের বেশির ভাগ শিল্পকারখানা, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং নাগরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। যুদ্ধে পরাজয়ের কারণে জাপান তার উপনিবেশগুলোও হারায়। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সাময়িকভাবে জাপান দখল করে। সংশোধিত সংবিধান অনুসারে স¤্রাটকে আলংকারিক রাষ্ট্রপ্রধান বানানো হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী এই পর্বে জাপান অত্যন্ত দ্রুত ধ্বসে পড়া অর্থনীতি গড়ে তোলে।

জাপানের প্রতিটি প্রধান দ্বীপের মধ্য দিয়ে একটি পর্বতশ্রেণি চলে গেছে। বিশ্বখ্যাত ফুজি পর্বত জাপানের সর্বোচ্চ পর্বত। জাপানের সমতল ভূমি খুব কম বলে অনেক পাহাড়-পর্বতের গায়েই একেবারে চূড়া পর্যন্ত চাষবাস করা হয়। জাপান প্রশান্ত মহাসাগরের একটি ভূমিকম্প এলাকাতে অবস্থিত বলে দ্বীপগুলিতে প্রায় নিম্ন আকারের ভূকম্পন অনুভূত হয় এবং আগ্নেয় তৎপরতা দেখতে পাওয়া যায়।

জাপান মূলত একটি নগরভিত্তিক রাষ্ট্র। মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪% কৃষিকাজে নিয়োাজিত। শহুরে জনসংখ্যার প্রায় ৮ কোটি হনশু দ্বীপের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে এবং কিয়ুশু দ্বীপের উত্তরাংশে বসবাস করে। এ দেশের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলিতে সরু ঘিঞ্জি রাস্তা, জনাকীর্ণতা, বায়ু দূষণ এবং কিশোর অপরাধ প্রধান সমস্যা।

জাপানের প্রধান দুইটি ধর্ম হলো শিন্তো ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম। শিন্তো ধর্মে মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে কিছু বলা নেই বলে বৌদ্ধ ধর্ম ও শিন্তো ধর্ম বহু যুগ ধরে জাপানে সহাবস্থান করেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিন্তো উপাসনালয় এবং বৌদ্ধ মন্দিরগুলি প্রশাসনিকভাবে সংযুক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানেও বহু জাপানি দুই ধর্মই সমানভাবে অনুসরণ করে। ৬ষ্ঠ শতকে জাপানে প্রথম বৌদ্ধ ধর্মের প্রচলন হয়। ৬ষ্ঠ ও ৯ম শতকের মাঝামাঝি সময়ে চীন থেকে কনফুসিয়াসবাদের আগমন ঘটে। কিন্তু বৌদ্ধধর্মের তুলনায় এর গুরুত্ব ছিল কম। ১৫৪৯ খ্রিষ্টাব্দে জাপানে খ্রিস্টধর্মের আগমন ঘটে এবং এক শতক পরে এটিকে সরকার নিষিদ্ধ করে দেয়। ১৯শ শতকের শেষভাগে এসে এটি আবার জাপানে উপস্থাপিত হয়। বর্তমানে জাপানে প্রায় ৩০ লক্ষ খ্রিষ্টান আছে।

জাপানে ঘরের মেঝে কোনো উঁচুস্থান দেখলে বুঝতে হবে, ওখানে আপনার জুতো খুলে রাখতে হবে। জাপানিদের গড় আয়ু ৮৪ বছর। যা মার্কিন নাগরিকদের চেয়ে ৪ বছর বেশি। জাপানে ৫০ হাজারের অধিক লোকের বয়স ১০০ বছের বেশি। এ দেশে জোরে জোরে শব্দ করে গবগব শব্দে নুডলুস খেলে মনে করা হয় আপনি খাওয়ারটা উপভোগ করছেন। এ দেশে গৃহপালিত পশুর সংখ্যা শিশুদের চেয়ে অধিক। আত্মহত্যার হার পৃথিবীর সব দেশের মধ্যে জাপানেই সবচেয়ে বেশি। বিখ্যাত ফুজি পর্বতের আওকিগাহারা (Aokigahara) প্রথাগত সুসাইড স্পট হিসাবে খ্যাত। জাপানের পরিবারের লোকজন প্রায়শ গোসলের জন্য একই পানি ব্যবহার করে। এখানে অনেক রাস্তার কোনো নাম নেই।

জাপানের একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো, সে দেশে শিশুদের ডায়াপারের চেয়ে বয়স্কদের ডায়াপার অধিক বিক্রি হয়। তারা মানে শিশুদের চেয়ে বুড়োরাই অধিক ডায়াপার পরিধান করে। জাপানিদের বিশ্বাস কালো বিড়াল সৌভাগ্যের প্রতীক। আর একটা বিষয়, এ দেশে কোনো বিষয়ে সরাসরি ‘না’ বলা অশোভনীয় মনে করা হয়। উপহার দাতার সামনে উপহার-বক্সের আবরণ ছিড়ে ফেলা অশোভনীয়। ঘাম মোছার জন্য জাপানে অনেক লোক টাওয়েল বহন করে। অধিকাংশ জাপানি ঘরে মেহমানদের ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত জুতো রাখা হয়।

জাপানে একটি মন্দির আছে, যা তাদের কাছে অতি পবত্রি বলে পরিচিত। এ মন্দিরটি প্রতি বিশ বছর অন্তর ভেঙে পূনঃনির্মাণ করা হয়। জাপানি সংস্কৃতির একটি আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, এ দেশে বাকানো বা এলোমেলো দাঁতকে আকর্ষণীয় মনে করা হয়। এ বিশ্বাসের কারণে অনেক জাপানি বালিকা তাদের দাঁতকে এলোমেলো বা অসোজা করে দেওয়ার জন্য দাঁতের ডাক্তারের কাছে যায়। ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও জাপানিদের ভিন্নতা দেখা যায়। এখানে প্রতিবছর জাপানি পুরুষদের মধ্যে দ্রুত জামা-ইস্ত্রি (fastest shirt ironer) প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এ প্রতিযোগিতায় যিনি যত দ্রুত জামা ইস্ত্রি করতে পারেন, তিনিই জয়ী হন।

জাপানে কিছু ল্যাকটেশন বার আছে। যেখানে মানুষের তাজা দুগ্ধ পাওয়া যায়। এ দুগ্ধ গ্লাস দিয়ে পান করা যায় আবার সরাসরি স্তন হতেও পান করার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে দামের মধ্যে হেরফের রয়ে।ে কৃষিখাত সরকার থেকে প্রচুর ভর্তুকি পায়। প্রতি হেক্টর জমিতে জাপানের কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ বিশ্বের সর্বোচ্চগুলির একটি। জাপান তার স্বল্প পরিমাণ কৃষিজমি ব্যবহার করে কৃষিতে প্রায় ৪০% স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে


ইন্দোনেশিয়া (Indonesia): ইতিহাস ও নামকরণ

ইরান(Iran): ইতিহাস ও নামকরণ

ইরাক (Iraq) : ইতিহাস ও নামকরণ

বার্মা (Burma) : ইতিহাস ও নামকরণ

কিরগিজিস্তান (Kyrgyzstan) : ইতিহাস ও নামকরণ

জাপান (Japan) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!