জামবাটি, জোড়বাংলা, জঙ্গলকাটা বাসিন্দা, চড়ুকে হাসি

ড. মোহাম্মদ আমীন 
বাম থেকে হায়াৎ মামুদ ড. মোহাম্মদ আমীন ও নির্মলেন্দু গুণ।
সংযোগ: https://draminbd.com/জামবাটি-জোড়বাংলা-জঙ্গলক/
জাম বাটি ও জামবাটি: ফারসি উৎসের জাম ও বাংলা বাটি মিলে জামবাটি। জাম অর্থ (বিশেষ্যে) বড়ো পেয়ালা, বড়ো পাত্র, বড়ো বাটি। এটি যে-কোনো কিছুর তৈরি হতে পারে। বাটি অর্থ (বিশেষ্যে) প্রান্তভাগ উঁচু ও হাতলবিহীন ছোটো পাত্রবিশেষ। জাম ও বাটি প্রায় সমার্থক। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, জামবাটি অর্থ (বিশেষ্যে) কাঁসার তৈরি বড়োবাটি। এই অর্থ অনুযায়ী জামবাটি হতে হলে তাকে কাঁসার তৈরি ও বড়ো আকারের বাটি হতে হবে। এটাই জাম, বাটি ও জামবাটির তফাত। অর্থাৎ সকল জামবাটি বাটি, কিন্তু সকল বাটি জামবাটি নয়।
“. . . সে জামবাটিতে অন্তত আধ কাঠা মুড়ি ধরে।” ইছামতি, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
জোড়বাংলা: গায়ে গা লাগানো দুটি দোচালা মন্দিরের মাথায় মধ্যখানে চূড়া সংযোগে যে মন্দির তৈরি হয় তাকে জোড়বাংলা বলা হয়। চূড়াটি এমনভাবে স্থাপিত হয় যাতে দুই মন্দিরের সমান পরিমাণ অংশ জুড়ে থাকে।
“. . . পশ্চিম বাংলায় সমাদৃত হয়েছিল জোড়বাংলা শৈলী।’’ কলকাতার মন্দির-মসজিদ, তাঁরাপদ সাঁতরা।”
জঙ্গলকাটা বাসিন্দা: কলকাতার আদি অধিবাসী শেঠ ও বসাকরা হোগলাবন জঙ্গল কেটে সাফ করে বসবাস শুরু করেন। এজন্য তাদের জঙ্গলকাটা বাসিন্দা বলা হতো। এরাই সুতানুটির পত্তন করে।
“ইহারা হোগলাবন কর্ত্তন করিয়া বাস করায় ইঁহাদিগকে  জঙ্গলকাটা বাসিন্দা কহে।” দেবগণের মর্ত্ত্যে আগমন, দূর্গাচরণ রায়।”

চড়ুকে হাসি: প্রচণ্ড কষ্ট ও ভয়ানক যন্ত্রণা হওয়া সত্ত্বেও লোক দেখানো হাসিকে চড়ুকে হাসি বলা হয়। বাংলা চড়ুকে আর সংস্কৃত হাসি নিয়ে ‘চড়ুকে হাসি’ কথাটি গঠিত। চড়কপূজার সময় চড়ক গাছে যারা ঘুরে তাদের বলা হয় চড়ুকে। চড়ক পূজার উৎসবে বহু প্রকারের দৈহিক যন্ত্রণা ধর্মের অনুষঙ্গ বিবেচিত হয়। চড়কগাছে সন্ন্যাসীকে লোহার হুড়কা দিয়ে চাকার সঙ্গে বেঁধে দ্রুতবেগে ঘোরানো হয়। তার পিঠে হাতে পায়ে জিহ্বায় এবং শরীরের অন্যান্য অঙ্গে বাণ শলাকা বিদ্ধ করা হয়। কখনও কখনও জ্বলন্ত লোহার শলাকা তার গায়ে ফুঁড়ে দেয়া হয়। এটি খুব ক্লেশের কাজ ছিল। তবু চড়ুকে সন্ন্যাসী ক্লেশ লুকিয়ে রেখে হাসত এবং হাসিমুখে দর্শক-পূজারীদের অভিবাদন জানাত। 

এই ঘটনা হতে  চড়ুকে হাসি  বাগ্‌ধারাটির উদ্ভব।
একসময় কথাটি বহুল প্রচলিত ছিল। এখন তেমন আর শোনা যায় না। প্রসঙ্গত,  ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে ক্লেশের  নিয়মসমূহ বন্ধ করে দেয়। তবু গ্রামের সাধারণ লোকের মধ্যে এখনও প্রচলিত আছে। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, চড়ুকে হাসি অর্থ (বিশেষ্যে) কৃত্রিম হাসি, অট্টহাসি।
“শূন্যে তে সন্ন্যাসী বাবাজী কতই হাসিতেন আর পা ছুঁড়িতেন। একে বলে চড়ুকে হাসি। প্রাণ যায় তবু হাসি।” মহেন্দ্রনাথ দত্ত,  কলকাতার পুরানো কাহিনী ও প্রথা।
error: Content is protected !!