জেলখানাকে  চৌদ্দ শিক বলা হয় কেন, চৌদ্দো শিক, চৌদ্দ শিকের ভাত

ড. মোহাম্মদ আমীন

জেলখানাকে চৌদ্দ শিক বলা হয় কেন, চৌদ্দো শিক, চৌদ্দ শিকের ভাত আজীবন বনাম আমরণ

জেলখানাকে  চৌদ্দ শিক বলা হয় কেন
শিক ফারসি শব্দ। ফারসি ভাষায় শব্দটির  অর্থ—  লৌহদণ্ড, গারদ, বন্দিশালা, জেলখানা, কারাগার, কারাদণ্ড প্রভৃতি। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত শিক অর্থ—  লোহা বা অন্য ধাতুর তৈরি শলাকা, গরাদ। চৌদ্দ শিক কথায় বর্ণিত শিক অর্থ—  বন্দিশালা, কারাগার, গারদ, জেলখানা প্রভৃতি।  সুতরাং,  চৌদ্দো শিক অর্থ— চৌদ্দো বছরের কারাদণ্ড। বাংলায় লৌহদণ্ড অর্থে শব্দটির একক ও স্বাধীন ব্যবহার রয়েছে। তবে বাংলায় কারাগার বা কারাদণ্ড অর্থ প্রকাশে শিক শব্দের স্বাধীন ব্যবহার নেই বললেই চলে। অনেকে মনে করেন, চৌদ্দ শিক অর্থ চৌদ্দো শিকের তৈরি জেলখানা। আসলে এটি সত্য নয়। চৌদ্দ শিক বলতে চৌদ্দ শিকের তৈরি জেলখানা  বুঝায় না৷ এ দিয়ে চৌদ্দো বছরের কারাদণ্ড বুঝায়। কথায় বলে, তোমাকে চৌদ্দো শিকের ভাত খাওয়াব৷ এর অর্থ— তোমাকে চৌদ্দ বছর কারাগারে রাখব, তোমাকে চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড ভোগের ব্যবস্থা করব। এখন প্রশ্ন হলো—   চৌদ্দো বছর কেন? কেন ঊনিশ বছর নয়, বিশ বছর বা অন্য সংখ্যা নয়?
 
ব্রিটিশ ভারতীয় দণ্ডবিধি আইনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বলতে সর্বোচ্চ চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ড বুঝাত। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কেউ চৌদ্দো বছর কারাগারে থাকলে তার শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বলা হতো। অর্থাৎ, চৌদ্দ বছর কারাদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সমার্থক।  ব্রিটিশ আইনে মৃত্যুদণ্ডের পরবর্তী গুরুদণ্ড যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সময়জ্ঞাপক অঙ্ক  হিসেবে চৌদ্দো বছর  নির্ধারণের পর চৌদ্দো শিক কথাটির উদ্ভব। এর অর্থ চৌদ্দো বছরের কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
 
 
 
আজীবন বনাম আমরণ
 
আজীবনআমরণ দুটোই শুদ্ধ এবং অর্থবহ। তবে ভিন্নার্থ ধারণ করে অভিধান নামের শব্দগুদামে  পৃথক মোড়কে পরিবেশিত। বাংলা একাডেমির ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে আজীবন মানে  ‘যাবজ্জীবন’ বা সমগ্র জীবনব্যাপী এবং আমরণ অর্থ— মৃত্যু পর্যন্ত স্থায়ী বা মরণ অবধি । হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ গ্রন্থেও একই অর্থ দেওয়া আছে । শব্দদুটো  প্রথমে সমার্থক মনে হলেও কোনো অভিধানে  আজীবন এবং অর্থে আমরণ কিংবা আমরণ-এর অর্থে আজীবন লেখা হয়নি । তবে আজীবন এবং আমরণ কথায় নিহিত ঘটনা জীবন থেকে মরণ পর্যন্ত স্থায়ী চঞ্চল ও  ঘুর্ণায়মান কক্ষপথে চলতে চলতে কোনো একসময় উভয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় মহাকালের অসীম গহ্বরে। তাই আজীবন ও আমরণ শব্দের  আভিধানিক অর্থ  অভেদের দিক থেকে দেখলে একরকম আর ভেদের দিক থেকে দেখলে অন্যরকম মনে হয় ।
 সাধারণভাবে বলা হয়, আজীবন=আমরণ। তবে  একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, শব্দের অর্থ কেবল অভিধানের বর্ণনার ওপর নির্ভর করে না। বাক্যের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। বাক্যে গেলে একটি শব্দ নানা অর্থ এমনকি বিপরীত অর্থও দ্যোতিত করতে পারে। তাই আজীবন ও আমরণ  শব্দ দুটির অর্থ কী হবে তা শব্দদুটোর  ব্যবহারের সময় প্রাসঙ্গিকতা, ভিত্তি প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে।  যেমন:
 
(১) যতিন দাশ আমরণ অনশন করেছিলেন। বাক্যটির অর্থ যতীন দাশ মৃত্যু অবধি অনশন করছিলেন। কখন থেকে মৃত্যু অবধি? যেদিন থেকে তিনি অনশন শুরু করেছিলেন সেদিন থেকে মৃত্যু অবধি। এক্ষেত্রে “যতিন দাশ আজীবন অনশন করেছিলেন।” বলা সমীচীন হবে না। তাহলে  তাঁর অনশন-পূর্ব জীবনকালও অনশনের আওতায় এসে যায়। যা আদৌ সত্য নয়। অতএব, আমরণ-এর স্থলে আজীবন সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
 
 (২) আমি আমরণ বাক্‌স্বাধীনতার পক্ষে থাকব। বাক্যটির অর্থ  আমি বজ্জীবন বা সমগ্র জীবন বাক্‌স্বাধীনতার পক্ষে থাকব। এখানে যদি বলা হয়: আমি আজীবন বাকস্বাধীনতার পক্ষে থাকব। সেক্ষেত্রে আমরণ ও আজীবনকে সম্ভত সমার্থক বিবেচনা করা যেতে পারে।   
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, আজীবন (আ+জীব্‌+অন) অর্থ—  (ক্রিয়াবিশেষণে) জীবনভর, যাবজ্জীবন। সংস্কৃত আমরণ (আ+মরণ) অর্থ— (ক্রিয়াবিশেষণে) মরণ অবধি এবং (বিশেষণে) মরণকাল পর্যন্ত বিস্তৃত।
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, আজীবন (আ+জীব্‌+অন) অর্থ—  (ক্রিয়াবিশেষণে) জীবনভর, যাবজ্জীবন। সংস্কৃত আমরণ (আ+মরণ) অর্থ— (ক্রিয়াবিশেষণে) মরণ অবধি এবং (বিশেষণে) মরণকাল পর্যন্ত বিস্তৃত।
 
 
√— — — — — — — — — — — — — — — — —√
আবশ্যিকভাবে আপনার আগ্রহ সৃষ্টি করবে এমন কয়েকটি লিংক: প্রয়োজনীয় কিছু লিংক:
শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

শুবাচ আধুনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান

এক মিনিট সময় দিন বানানগুলো শিখে নিন

 
 
 
 
 
 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!