জোশুয়া মার্শম্যান ও সত্যেন সেন

ড. মোহাম্মদ আমীন

জোশুয়া মার্শম্যান  ১৭৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে এপ্রিল ইংল্যান্ডের ওয়েস্টবারি লি অঞ্চেলে  জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর হুগলির শ্রীরামপুরে মারা যান। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ-ভারতের অবিভক্ত বঙ্গ রাজ্যের  খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক এবং বাইবেলের ভারতীয় ভাষার অন্যতম অনুবাদক।  তাঁর বাবা জন মার্শম্যান ছিলেন নাবিক।  মা কুজেনার ছিলেন ফরাসি।  ১৭৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডে তাদের বিয়ে হয়।  পিতার আর্থিক অবস্থার কারণে জোশুয়া  গ্রামের স্কুলের বাইরে কোনো উচ্চতর শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। ১৭৯১ খ্রিষ্টাব্দে জোশুয়া ও হ্যানা মার্শম্যানের বিয়ে হয়।  ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দে তাঁরা ব্রিস্টল চলে যান।  সেখানে জোশুয়া মার্শম্যান ব্রোডমিড ব্যাপটিস্ট গির্জার সদস্য হিসাবে  গির্জার আওতাধীন  একটি অবৈতনিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং একই সঙ্গে ব্রিস্টল ব্যাপটিস্ট কলেজে  ছাত্র হিসেবে অধ্যয়ন শুরু করেন।

১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে মে জোশুয়া, হ্যানা ও তাদের দুই সন্তান পোর্টসমাউথ বন্দর থেকে ‘ক্রাইটেরিয়ন’  জাহাজে চড়ে ভারত অভিমুখে যাত্রা করেন এবং  ১৩ই অক্টোবর কলকাতার কয়েক মাইল উত্তরে শ্রীরামপুরের ড্যানিশ উপনিবেশে অবতরণ করেন। শ্রীরামপুর আসার পর মার্শম্যান দম্পতির আরও দশটি সন্তান হয়, যদিও তাদের পিতা মৃত্যুকালে বারো ভাইবোনের মাত্র পাঁচজন জীবিত ছিলেন। সর্বকনিষ্ঠ কন্যা হ্যানা। তিনি হেনরি হ্যাভলককে বিয়ে করেন। হেনরি পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ভারতে একজন সেনানায়কের পদ লাভ করেন। লণ্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে তার মূর্তি রয়েছে।

উইলিয়াম কেরি ও জোশুয়া মার্শম্যান ছিলেন পরস্পর বন্ধু ও সহকর্মী।  মার্শম্যান এবং কেরি যুগ্মভাবে অনেকগুলো ভারতীয় ভাষায় বাইবেল অনুবাদ করেন। এছাড়া তাঁরা  ধ্রুপদী ভারতীয় সাহিত্যে প্রচুর বই ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। মার্শম্যান বাইবেলের একটি চীনা অনুবাদও সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি ভারতীয় সংবাদপত্রগুলোর উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা নেন। 

১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই জুলাই উইলিয়াম কেরি, জোশুয়া মার্শম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড  একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে “প্রাচ্য সাহিত্য ও পাশ্চাত্য বিজ্ঞান বিষয়ে এশীয়, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য যুবকদের শিক্ষাদানের জন্য একটি নতুন কলেজ” প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। বিবৃতিটির লেখক ছিলেন মার্শম্যান। এই বিবৃতির উপর ভিত্তি করে শ্রীরামপুর কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। 

জোশুয়ার ছেলে জন ক্লার্ক মার্শম্যান পরবর্তীকালে শ্রীরামপুর কলেজের ধর্মপ্রচারণা কর্মকাণ্ডে বিশিষ্ট ভূমিকা নেন। এছাড়া তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা ভাষার অনুবাদের কাজেও যুক্ত ছিলেন। তার প্রকাশিত নাগরিক আইনের নির্দেশিকাটি মেকলের কাজের আগে পর্যন্ত ভারতীয় আইনের প্রধান নথি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। জন ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের ইতিহাসের একটি গ্রন্থও লিখেছিলেন।

জোশুয়া মার্শম্যান, কনফুশিয়াস (১৮১৪)। Elements of Chinese grammar: with a preliminary dissertation on the characters, and the colloquial medium of the Chinese, and an appendix containing the Tahyoh of Confucius with a translation।  তার লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ।

 সত্যেন সেন

সত্যেন সেন  হলেন প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পী সংঘ উদীচী সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী, সাহিত্যিক এবং শ্রমিক-সংগঠক সত্যেন সেন  ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ শে মার্চ  তৎকালীন বিক্রমপুর বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার টংগিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামের সেন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় ডাক নাম ছিল লস্কর। তার পিতার নাম ধরনীমোহন সেন এবং মাতার নাম মৃণালিনী সেন। সত্যেন সেন-এর পিতৃব্য ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য। আরেক পিতৃব্য মনোমোহন সেন ছিলেন শিশুসাহিত্যিক।  ১৯১৯  খ্রিষ্টাব্দে সোনারং হাইস্কুলে তার প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন শুরু হয়। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে সোনারঙ হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করার পর কলকাতার  একটি কলেজ থেকে এফএ  এবং বিএ পাস করেন। অতঃপর ভর্তি হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে এমএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে কারাবরণ করলে জেলে থেকে বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন।  

তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীন ভারত সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।  ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য তাকে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী গ্রেফতার করে।  ১৯৫৩ সালে মুক্তি পেয়ে নিজ গ্রাম সোনারাংয়ে ফিরে আসেন। ওই সময়  তাদের পরিবারের অনেকে কলকাতায় চলে যান। সত্যেন সেন যুক্ত হন কৃষক আন্দোলনের সাথে।  কারাগারে থাকাকালীন তিনি চক্ষূরোগে আক্রান্ত হন।  মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চোখের পীড়া গুরুতর রূপ নেয়।  উন্নত চিকিৎসার জন্য মস্কো যান। এখানে অবস্থানকালে  ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সংবাদ পান।  ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে  তিনি দেশে ফিরে আসেন।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে  সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্ত, শহীদুল্লাহ কায়সারসহ  আরও কয়েকজন প্রগতিশীল যুবক মিলে  উদীচী গঠন করেন। গান রচনার মাধ্যমে সত্যেন সেনের সাহিত্য জগতে আশা।  শ্রমিকদের নিয়ে তিনি গান এবং পালা রচনা করতেন। গানের দল গঠন করে শ্রমিকদের এ কবিগান তিনি রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ পরিবেশন করতেন। তাঁর লেখা ১১টি গানের মধ্যে ‘চাষি দে তোর লাল সেলাম/তোর লাল নিশানারে’ গানটি তখন চাষিদের জাতীয় সঙ্গীত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৫৬ সালে বিক্রমপুরের ষোলঘরে কৃষক সমিতির সম্মেলনে প্রথম তারই নেতৃত্বে গানটি গাওয়া হয়। প্রথমে তিনি দৈনিক ‘মিল্লাত’ এবং পরে  দৈনিক ‘সংবাদ’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। 

সাহিত্যিক হিসেবে তিনি খ্যাত ছিলেন। তার প্রথম উপন্যাস ভোরের বিহঙ্গী (১৯৫৯) এবং শেষ উপন্যাস একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে (১৯৭১)। ছোটোদের জন্য লিখিত তার বিখ্যাত গল্প পাতাবাহার (১৯৬৮)। তাঁর লেখা অন্যান্য উপন্যাস হচ্ছে:  রুদ্ধদ্বার মুক্ত প্রাণ (১৯৬৩), অভিশপ্ত নগরী(১৯৬৯), পাপের সন্তান (১৯৬৯), সেয়ান (১৯৬৯), পদচিহ্ন (১৯৬৯), পুরুষমেধ(১৯৬৯), আলবেরুনী(১৯৭০), সাত নম্বর ওয়ার্ড(১৯৭০), বিদ্রোহী কৈর্বত(১৯৭০), কুমারজীব(১৯৭০), অপারেজয়(১৯৭০), মা(১৯৭০), উত্তরণ(১৯৭০)। তার অন্যান্য লেখার মধ্যে গ্রামবাংলার পথে পথে (১৯৬৬), আমাদের পৃথিবী (১৯৬৮), মসলার যুদ্ধ (১৯৬৯),  এটোমের কথা(১৯৭০),  অভিযাত্রী (১৯৭০),  মানবসভ্যতার উষালগ্ন (১৯৭১),  মনোরমা মাসিমা (১৯৭১),  প্রতিরোধ সংগ্রামে বাংলাদেশ (১৯৭১),  বিপ্লবী রহমান মাষ্টার (১৯৭৩),  সীমান্ত সূর্য আবদুল গাফফার (১৯৭২),  জীববিজ্ঞানের নানা কথা (১৯৭৭) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার; ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমি পুরস্কার; ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্য মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।

 ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই জানুয়ারি তিনি শান্তি নিকেতনের গুরুপল্লীতে মারা যান।

——————————————————————

জোশুয়া মার্শম্যান ও সত্যেন সেন

লিংক: https://draminbd.com/জোশুয়া-মার্শম্যান-ও-সত্য/

error: Content is protected !!