জ্ঞানদাস, জ্ঞানদাস-পঙ্‌ক্তি, ঘরের শত্রু বিভীষণ

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/জ্ঞানদাস-জ্ঞানদাস-পঙ্‌ক/
জ্ঞানদাস-পঙ্‌ক্তি
“রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।।
হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাঁদে।
পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বাঁধে।।”— জ্ঞানদাস
কবি জ্ঞানদাস; শ্রীমঙ্গল, মঙ্গল ঠাকুর বা মদনমঙ্গলা নামেও পরিচিত। তিনি একজন মধ্যযুগীয় বাংলা কবি। জন্ম ১৫৬০ খ্রিষ্টাব্দে সিউড়ী/সিউড়ি; কাটোয়ার অন্তর্বর্তী কাঁদরা গ্রামে মঙ্গলাখ্য বিপ্রবংশে। তিনি ছিলেন ভক্ত বৈষ্ণব। সমকালীন বটপত্রে জ্ঞানদাস সম্পর্কে সামান্য কিছু তথ্য আছে। জ্ঞানদাস সংগীতেও দক্ষ ছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মতো নিজের লেখা গানে সুর দিয়েছেন। সম্ভবত এ ক্ষেত্রে জ্ঞানদাস বাংলা সাহিত্যে প্রথম, যিনি গান লিখে সুর দিয়েছেন— একসঙ্গে গীতিকার ও সুরকর। কীর্তন গানেও তাঁর দক্ষতা ছিল। কীর্তনের নতুন ঢঙ তাঁর মেধারই সৃষ্টি। জ্ঞানদাসই প্রথম ‘ষোড়শ-গোপাল’-এর রূপ বর্ণনা করে পদ রচনা করেন। তিনিই বাংলা এবং ব্রজবুলিতে রাধাকৃষ্ণবিষয়ক প্রায় দুশ; মতান্তরে চারশ পদ রচনা করেন। তাঁর রচিত মাথুর ও মুরলীশিক্ষা বৈষ্ণবগীতিকাব্যের দুটি মূল্যবান গ্রন্থ।
ঘরের শত্রু বিভীষণ
‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ একটি বাগ্‌ধারা। এ বাংলা বাগ্‌ভঙ্গিটির অর্থ— স্বজন শত্রু, যিনি নিজের আপনজনের ক্ষতি করে, স্বজনবিনাশী, গোপনে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে স্বজনের ক্ষতিসাধনকারী, বন্ধুবেশী শত্রু। একটি পৌরাণিক কাহিনি হতে বাগ্ভঙ্গিটির উদ্ভব। বিভীষণ ছিলেন রাবণের ছোটো ভাই। রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও বিভীষণ ছিলেন বিশ্রবা মুনির সন্তান। তাঁদের মা নিকষা ছিলেন সুমালী রাক্ষসের মেয়ে। নিকষার আরেক নাম কৈকসী। সুমালী তাঁর মেয়ে নিকষাকে বিশ্রবা মুনির কাছে পাঠান। বিশ্রবা মুনি তখন ধ্যান করছিলেন। নিকষা আসায় তাঁর ধ্যান ভেঙে যায়। ক্ষুব্ধ মুনি অভিশাপ দিয়ে বসেন নিকষাকে— তোমার সব সন্তানই হবে ভীষণাকার রাক্ষস। অভিশাপ শুনে বিমূঢ় নিকষা। মুনিকে অনেক অনুনয়-বিনয় করেন নিকষা। অবশেষে বিশ্রবা মুনি শান্তস্বরে বললেন— শাপ পুরো বন্ধ করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে তোমার শেষ সন্তানটি রাক্ষস হলেও ধর্মনিষ্ঠ হবে।
রাম-রাবণের যুদ্ধের গল্প অনেকের জানা। রাবণ সীতাকে উঠিয়ে নিলে রাম সীতাকে উদ্ধারের জন্য ধর্মযুদ্ধ ঘোষণা করেন। তখন রাবণের এই ধর্মনিষ্ঠ ছোটো ভাই রামের পক্ষে যোগ দেন। রাক্ষস-রাজ্যের নানা গোপন কথা ফাঁস করে করে রামকে তিনি জিততে সহায়তা করেন। বিভীষণের এই কাজ ধর্মের পক্ষে হলেও, তিনি নিজের পরিবারের সঙ্গে শত্রুর মতো আচরণ করেছিলেন। বিভিীষণের কাজ ছিল ভণ্ডামি এবং প্রতরণার মাধ্যমে স্বজনের ক্ষতি। তাই কোনো আত্মীয়স্বজন কিংবা ঘরের বা পরিবারের কেউ শত্রুর মতো আচরণ করলে, তাকে ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ বলা হয়।
মন বনাম মণ 
মন: অভিধানে ভিন্ন ভুক্তিতে ভিন্নার্থের দুটি মন পাওয়া যায়। একটি তদ্ভব মন এবং অন্যটি বাংলা মন।
তদ্ভব মন: সংস্কৃত মনস থেকে উদ্ভূত মন। যার অর্থ (বিশেষ্যে) — যে বৃত্তির সাহায্যে মানুষ বা অন্যান্য প্রাণী তার চারপাশের জগৎ ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অবহিত হয় এবং কোনো বিষয় চিন্তা বা কোনো বিষয় অনুভব করতে পারে; চিত্ত, হৃদয়, অন্তঃকরণ, অন্তরিন্দ্রিয়। স্মরণ (মনে পড়া)। বোধ, ধারণা (মনের দুয়ারে দাঁড়িয়ে থেকো না চোখের দুয়ারে এসো)। ইচ্ছা, প্রবৃত্তি (মন চায় ঘুরে আসি)। নিষ্ঠা (মন দিয়ে কাজ করা। মনোযোগ (লেখাপড়ায় মনোনিবেশ। পছন্দ (মনের মতো বই)।
বাংলা মন: বাক্যে বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা মন অর্থ— ওজনের অধুনালুপ্ত এককবিশেষ, চল্লিশ সের (আনুমানিক ৩৭.৩২৪ কিলোগ্রাম)। এক মন চাল দাও।
মণ: মণ, বানানের কোনো শব্দ পাওয়া যায় না। এটি অর্থহীন ও ভুল বানানের একটি শব্দ; সের অর্থে প্রচলিত মন বানানের ভুল বানান। প্রচলিত ব্যাকরণ বিধিমতে, এমন বানানের শব্দ গঠন হতে পারে না।
error: Content is protected !!