জয় বাংলার কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার

ড. মোহাম্মদ আমীন

জয় বাংলার কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে প্রচারিত সালাম সালাম হাজার সালামজয় বাংলা বাংলার জয়-সহ অনেক উদ্বুদ্ধকরণ এবং তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়-সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের কণ্ঠশিল্পী আব্দুল জব্বার ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই ফেব্রুয়ারি  কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ শে আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁকে দেখতে গেলে তিনি বলেছিলেন, ১৭ কোটি মানুষের অর্ধেকেও যদি আমাকে এক টাকা করে দেন তাহলে সাড়ে আট কোটি টাকা হবে। অনেকের কাছে আহ্বান করেছি, আমার উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে পারিনি। যাই হোক, সে অন্য কথা। আজ তাঁর মৃত্যদিবস। এ দিবসে শুবাচ তাঁকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে।

তাঁর গাওয়া সালাম সালাম হাজার সালাম গানটি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মার্চ প্রথম বেতারে প্রচারিত হয়। গানটি ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দে  বিবিসি  পরিচালিত ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ বাংলা গান হিসেবে ২০টি সেরা গানের মধ্যে ১২তম অবস্থান পায়। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে গাজী মাজহারুল আনোয়ার জয় বাংলা, বাংলার জয় গানটি  রচনা করেন।বিবিসির জরিপে গানটি ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাংলা গান’ হিসেবে ২০টি গানের মধ্যে ১৩তম স্থান পায়। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের লেখা  ও সত্য সাহা‘র সুরে আবদুল জব্বারের গাওয়াতুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়” ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নারায়ণ ঘোষ মিতা‘ পরিচালিত বাংলা চলচ্চিত্র এতটুকু আশা ছায়াছবির একটি গান। গানটি বিবিসি বাংলা ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই এপ্রিল হতে ৩রা মে পর্যন্ত বাংলা গানের শ্রোতাদের নিয়ে পরিচালিত জরিপে  ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ বিশটি বাংলা গানের তালিকায় স্থান পায়। 

পারিবারিক জীবন: আব্দুল জব্বারের প্রথম স্ত্রী গীতিকার শাহীন জব্বার। তাঁদের সন্তান মিথুন জব্বারও একজন সংগীতশিল্পী। আবদুল জব্বারের দ্বিতীয় স্ত্রী রোকেয়া জব্বার মিতা। তিনি ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে ডিসেম্বর আত্মহত্যার চেষ্টা করেন  এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়  ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে ডিসেম্বর মারা যান। তাঁর তৃতীয় স্ত্রীর নাম হালিমা জব্বার।

 কর্মমুখর জীবন: আবদুল জব্বার ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে মেট্রিক পাশ করেন। এরপর সংগীতে মনোনিবেশ করেন।  ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে  তিনি পাকিস্তান বেতারে গায়ক হিসেবে তালিকাভুক্ত হন ।  তিনি ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম গান করেন। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তিনি বিটিভির নিয়মিত গায়ক। আবদুল জব্বার  ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে জহির রায়হান পরিচালিত পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গিন

ড. মোহাম্মদ আমীন

চলচ্চিত্র সংগম-এর গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঢেউয়ের পর ঢেউ ছবিতে রাজা হোসেন খানের সুরে “সুচরিতা যেও নাকো আর কিছুক্ষণ থাক’ গানে কণ্ঠ দেন। রবীন ঘোষের সুরে পিচ ঢালা পথ (১৯৭০) ছবির ‘পিচ ঢালা এই পথটারে ভালবেসেছি’ এবং নাচের পুতুল (১৯৭১) ছবির শিরোনাম গান “নাচের পুতুল” গানও আবদুল জব্বার গেয়েছেন।আবদুল জব্বার ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে সারেং বৌ  চলচ্চিত্রে আলম খানের সুরে “ও..রে নীল দরিয়া” গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জনে করে।

২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে আবদুল জব্বারের  প্রথম মৌলিক গানের অ্যালবাম কোথায় আমার নীল দরিয়া মুক্তি পায়। অ্যালবামটির গীতিকার মোঃ আমিরুল ইসলাম, সুরকার গোলাম সারোয়ার। একই বছর তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা গানের অ্যালবামের কাজ শুরু করেন। গীতিকার আমিরুল ইসলাম রচিত ‘বঙ্গবন্ধু দেখেছি তোমায় দেখেছি মুক্তিযুদ্ধ’ শিরোনামের গানটিতে কণ্ঠ দেওয়ার পূর্বে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে অ্যালবামের কাজ বন্ধ হয়ে যায়।নিচে আবদুল জব্বারের কয়েকটি জনপ্রিয় গান দেওয়া হলো। শুনতে পারেন।

১. সালাম সালাম হাজার সালাম,

২. জয় বাংলা বাংলার জয়

৩.  তুমি কি দেখেছ কভু

৪. “ও..রে নীল দরিয়া

৫. “সুচরিতা যেও নাকো আর কিছুক্ষণ থাক

৬. পিচ ঢালা এই পথটারে ভালবেসেছি

৭. এক বুক জ্বালা নিয়ে

৮.বন্ধু তুমি শত্রু তুমি

৯.বিদায় দাও গো বন্ধু তোমরা

১০. তুমি আছো সবই আছে

১১. তারা ভরা রাতে

১২. আমি তো বন্ধু মাতাল নই

স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান:  ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আবদুল জব্বার  স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সালাম সালাম হাজার সালাম ও জয় বাংলা বাংলার জয়সহ অংসখ্য গানে কণ্ঠ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করেছেন।বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদান অসামান্য। মুক্তিযুদ্ধকালীন তিনি ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টির কাজ করেন। তিনি সেসময় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে  বিভিন্ন  গণসংগীতে গান গেয়ে প্রাপ্ত ১২ লাখ রুপি দান করেছিলেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা: বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক (১৯৭৩), একুশে পদক (১৯৮০), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৬), বাচসাস পুরস্কার (২০০৩), সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস – আজীবন সম্মাননা (২০১১), জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার।


শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
error: Content is protected !!