ট্রুথ সিরাম: সত্য বলার ঔষধ; স্কোপোলামাইন (Scopolamine); ডেভিলস ব্রিদ (Devil’s Breath); শয়তানের শ্বাস

 ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/ট্রুথ-সিরাম-সত্য-বলার-ঔষধ/
স্কোপোলামাইন(Scopolamine) একটি ভয়ংকর ড্রাগ। যা সাধারণ্যে  ডেভিলস ব্রিদ (Devil’s Breath) বা শয়তানের শ্বাস’ নামে সমধিক পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম হায়োসিসিন। এছাড়া  বুরুন্ডাঙ্গা, কলম্বিয়ান ডেভিলস ব্রিদ, রোবট ড্রাগ, জম্বি ড্রাগ প্রভৃতি নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে সম্প্রতি সাধারণ মানুষকে লুটে নিতে ব্যবহার করা হচ্ছে স্কোপোলামাইন (Scopolamine) নামের এই ভয়ঙ্কর ড্রাগটি। 
এবার দেখা যাক, স্কোপোলামাইন বা ডেভিলস ব্রিদ (Devil’s Breath) কি? ডেভিলস ব্রিদের ক্ষতিকর যে উপাদান তার নাম  নাম বুরানডাঙ্গা। তবে চিকিৎসাশাস্ত্রে এই উপাদানটি স্কোপোলামাইন বা হায়োসিসিন নামে  আগে থেকেই পরিচিত। বর্তমানে স্কোপোলামিন বা স্কোপোলামাইন ভয়ংকর মাদক হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর উৎপত্তি লাতিন আমেরিকার কলম্বিয়ায়।  ইকুয়েডর ও ভেনিজুয়েলাতেও এই মাদকটির ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।   ধুতরা ফুলের মতো অভিন্ন প্রজাতির স্কোপোলামাইন প্রকৃতপক্ষে নাইটশেড পরিবারভুক্ত ফুলের গাছ। বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই গাছের বীজ থেকেই ভয়ংকর এই মাদকটি প্রস্তুত করা হয়। মাদকটি অবিকল কোকেন পাউডারের মতো সাদা। তবে এর ক্ষতির মাত্রা কোকেন থেকে অনেকগুণ বেশি। এটি এত  ভয়ংকর ও প্রতিক্রিয়া এত বেশি তীব্র যে,  মাত্র ১ গ্রাম স্কোপোলামিন দিয়ে বারো জনের বেশি মানুষকে মেরে ফেলা যায়।
বাংলাদেশে স্কোপোলামাইন:  স্কোপোলামিন বাংলাদেশেও এসে গেছে। তবে এখানে মাদক হিসেবে এর ব্যবহার নগণ্য। মূলত সাধারণ মানুষকে লুটে নেওয়ার জন্য মাদকটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এই মাদকের সাহায্যে অন্য সর্বস্বান্ত করে দেওয়া যেমন সহজ, তেমনি নিরাপদ।
কেউ একজন কোনো একটি ঠিকানা  লেখা  একটা কাগজ আপনার নাকমুখের সামনে এগিয়ে দিয়ে বললেন,  এই ঠিকানাটা কোথায়?” কিংবা  দেখতে অত্যন্ত নিরীহ বা অসহায় ব্যক্তি  একটি প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে বললেন ‘বাবা, এই প্রেসক্রিপশনের ওষুধের নামটা কী? কোথায় পাওয়া যাবে?’ সাধারণত যে-কেউ এসব কাজে অতি স্বতস্ফূর্ততায় সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। এগিয়ে এলেন তো আপনি ফেঁসে গেলেন। আপনি কাগজটি দেখলেন। অতি খুদে লেখা।  ইচ্ছে করে খুদে অক্ষরে লেখা হয়েছে। পড়তে পারছেন না। ভালোভাবে পড়ার জন্য কাগজটি নাকমুখের কাছে নিয়ে গেলেন। কাগজে আগে কৌশলে স্কোপোলামিন লাগানো ছিল। আপনি ওই কাগজ চোখের কাছাকাছি ধরার সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে রাখা স্কোপোলামিনের গন্ধ নিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে নিলেন। এরপর আপনার স্বকীয়তা বলতে কিছু থাকবে না। ইদানীং এটিএমবুথের কী-প্যাডেও লাগিয়ে রাখা হচ্ছে স্কোপোলমিন পাউডার।
ইচ্ছা করেই কাগজে লেখাগুলো ছোট করে রাখা হয় যাতে ‘সম্ভাব্য টার্গেট’ মোবাইল বা কাগজটা ভাল করে পড়ার জন্য নাক ও মুখের কাছাকাছি নিয়ে আসতে বাধ্য হয়। তাদের দেওয়া কাগজ, ফোন বা অন্যকিছু আপনি নাক, চোখমুখের কাছাকাছি ধরার সাথে সথে সেখানে লেগে থাকা স্কোপোলামিন আপনার নিঃস্বাসের সাথে গ্রহণ করে ফেললেন। এর পরে আপনার আর কিছুই করার থাকবেনা। আক্রমনটা ব্যাংকের এটিএম বুথের কি-প্যডে লেগে থাকা পাউডার থেকেও হতে পারে।
নিশ্বাসের সঙ্গে স্কোপোলামিন গ্রহণ করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আপনার মাথা ঝিমঝিম করতে থাকবে। আপনি পুরো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বেন না। আপনার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে অন্যের হাতে চলে যাবে। বুঝবেন না আপনি কী করছেন! আপনাকে বলা মাত্র আপনি নিজ থেকেই সানন্দে সব করতে থাকবেন। আপনার কাছে থাকা টাকাপয়সা, গহনা, মোবাইল যা আছে তা বলার সঙ্গে সঙ্গে  ডেভিলস ব্রিদ’ চক্রের সদস্যের হাতে দিয়ে দেবেন।
এই ছিনতাইয়ের সাথে নিযুক্ত থাকা ডেভিলস ব্রিদ চক্রের সদস্যরা সাধারণত জুয়েলারি দোকান ও ব্যাংকের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে এবং অবস্থাসম্পন্ন নারী পথচারী টার্গেট করে। এই ঘটনা অনেকেই ফেস করেছেন কিংবা ফেসবুক বা বন্ধু বান্ধবের কাছ থেকে শুনেছেন। অনেকের নিকট আত্বীয়ও এইভাবে সব খুইয়েছেন।
সবার কাছে এটা একটা গোলক ধাঁধাঁ যে এটা আসলে কী? কয়েক মুহুর্তের মধ্যে ‘চিন্তাশক্তি অকার্যকর হয়ে হিপনোটাইজড হওয়া এবং ভিকটিমের নিজ থেকেই সব দিয়ে দেওয়া’ কীভাবে সম্ভব?
স্কোপোলামাইন (Scopolamine) এর ব্যবহার: ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে চিকিৎসা কাজে বিশেষ করে অ্যানেসথেসিয়ার জন্য  প্রথম স্কোপোলামাইন ব্যবহার শুর হয়। তবে এটি সরাসরি ব্যবহার করা হতো না। মরফিনের সঙ্গে মিশিয়ে অতি সামান্য পরিমাণ ব্যবহার করা হতো। এনস্থেশিয়ার জন্য প্রথমে এককভাবে স্কোপোলামাইন ব্যবহারের প্রস্তাব করা হলেও পরে স্কোপোলামাইন এবং মরফিনের সংমিশ্রণে ব্যবহার করা হয়। যা, প্রসবেকালীন অ্যামনেসিয়া এবং সিনারজিস্টিক ব্যথা কমানোর জন্য বছরের পর বছর ব্যবহার করা হতো।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইনটারোগেশন সেলে শত্রুপক্ষের আটককৃত সৈন্যদের কাছ থেকে তথ্য আদায় করার জন্য স্কোপোলামিন ব্যবহার করা হতো। এটা প্রয়োগ করলে ভিকটিমের চিন্তাশক্তির নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে থাকে না। নিজের ভালোমন্দ সবকিছু নিয়ন্ত্রণকারীর ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে।  ফলে স্কোপোলামিন গ্রহণকারী ব্যক্তি কোন মিথ্যা বলতে পারে না। তবে কতটুকু সত্যি বলে তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলেন, ৪৪ শতাংশ আবার কেউ বলেন ৮০ শতাংশ। যেটুকুই হোক, যা পাওয়া যেত তাই বাকি সত্য নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট বলে গণ্য করা হতো।
চামড়া দিয়ে শরীরে স্কোপোলামাইন  প্রবেশ করালে  ২০ মিনিটের মধ্যে প্রতিক্রিয়া শুরু হয় এবং যা আট ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। সময় লাগে এবং ৮ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে  স্কোপোলামাইন গ্রহণকারী গভীর গোধুলীনিদ্রা বা টুইলাইট স্লিপে আচ্ছন্ন থাকেন। আর এ সময়ের মধ্যে তাকে দিয়ে সব কিছুই করানো সম্ভব।
স্কোপোলামিন, গ্রহণকারীর মন ও শরীরকে এতো গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলে যে, গ্রহণকারী ব্যক্তি নিজের চিন্তা শক্তি হারিয়ে অন্যের কথা মতো কাজ করতে থাকে; এমনকি স্বাচ্ছন্দে নিজেকে নিজে খুন করার মতো ঘটনাও ঘটিয়ে ফেলতে পারে। যখন এই মাদকের কার্যকরিতা শেষ হয়ে যায় তখন ভিকটিম তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া কিছুই মনে করতে পারে না। তাই প্রতিকার পাওয়ারও কোন পথ থাকে না।
স্কোপোলামিনচক্রের সদস্যদের অপতৎপরতা ক্রমশ বাড়ছে। নিজে নিজে সাবধান হলে যে-কেউ এর শিকার হতে পারেন। রাস্তাঘাটে অপরিচিত সকলের থেকে সতর্ক থাকুন। চলার পথে সর্বত্র এবং সর্বদা বিশেষ করে জুয়েলারি ও ব্যাংক থেকে বের হবার সময় অতি সাবধানতা বাঞ্ছনীয়।  রিক্সা-সিএনজি প্রভৃতির যাত্রী ও পথচারী হবার সময়েও সতর্ক থাকা আবশ্যক। মাস্ক পরুন। তাহলে কোভিডের মতো স্কোপোলামিনের আক্রমণ বহুলাংশে প্রতিহত করা যাবে। মাস্ক পরলে দুষ্কৃতিকারী আপনাকে সহজে টার্গেট করবে না এবং টার্গেট করলেও মাস্ক আপনাকে প্রতিরোধ  দিবে।  সচেতন হলে ততক্ষণে আপনি বুঝে যাবেন যে ‘আপনার সঙ্গে কী হতে যাচ্ছে’!
ট্রুথ সিরাম: যেসব রাসায়নিক পদার্থ মানবদেহে প্রয়োগ করলে মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা হ্রাস পায়  এবং মস্তিস্কে জমা থাকা পূর্বস্মৃতি হতে সকল সত্য তথ্য বিবেচনা না করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে ফেলে তাকে ট্রুথ সিরাম বলে। Truth Serum এক ধরনের বারবিচুরেটজাতীয় পদার্থ। এটি মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অংশের উপর প্রভাব ফেলে। ফলে এক ধরনের কৃত্রিম হেলুসিলনেশন তৈরি হয়।
ট্রুথ সিরাম আবিষ্কারের ইতিহাস: ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে ড.রবার্ট হোস সর্বপ্রথম লক্ষ্য করেন যে অবচেতনকারী ঔষধ স্কোপোলামিন রোগীর দেহে প্রবেশ করালে রোগী এমন এক মানসিক অবস্থার মধ্যে প্রবেশ করে যে,  ঘোরের মধ্যে নিজ থেকে সকল সত্য তথ্য গল্পের মত বলতে শুরু করে। অর্থাৎ কোন মানুষের ওপর স্কোপোলামিন প্রয়োগ করলে মানুষটি আপনাআপনি সকল সত্য তথ্য প্রশ্নের উত্তরের প্রেক্ষিতে বলে দেয়। ডক্টর রবার্ট হোস দাগি আসামিদের শারীরিক শাস্তির মাধ্যমে সত্য কথা আদায় করার যন্ত্রণা কমানোর জন্য বা গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে গোপন তথ্য উদঘাটন করতে এই কৌশল ব্যবহার করতে চাননি।
নিরাপরাধ মানুষ ষড়যন্ত্রের শিকার হলে তাকে যন্ত্রণাদায়ক জিজ্ঞাসাবাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গোপন তথ্য আদায় করার জন্য সেনাবাহিনীর ডাক্তারগণ শত্রুপক্ষের স্পাইদের ওপর ব্যাপক হারে প্রয়োগ করতে থাকেন এই ওষুধগুলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই ঔষধগুলো “ট্রুথ সিরাম” নামে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় বর্তমানে অনেক দেশে এই ড্রাগ আইন সঙ্গতভাবে প্রয়োগ করা হয়।
২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের মুম্বাইয়ে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলায় আটক হওয়া জঙ্গী আজমল কাসাবকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় Truth Serum প্রয়োগ করা হয়। ১৯৫০-১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সিআইএ  project MKULTRA এবং Project MKDELTA পরিচালনার সময় Truth Serum ব্যবহার করে। স্নায়ু যুদ্ধের সময় রাশিয়ার কেজিবি Truth Serum এর ব্যাপক ব্যবহার করত।
ট্রুথ সিরাম যেভাবে কাজ করে: ট্রুথ সিরাম মানবদেহে ইনজেকশনের মাধ্যমে সরাসরি রক্তে প্রবেশ করানো হয় অথবা ট্যাবলেট হিসেবে মুখে বা পায়ুপথে ব্যবহার করা হয়। Truth Serum রক্তে প্রবেশ করার পর প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে স্পাইনাল কর্ডে প্রবেশ করে। স্পাইনাল কর্ড থেকে ঔষধ মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্সে প্রবেশ করে। মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অংশগুলো Truth Serum এর প্রভাবে প্রভাবিত হয় এর ফলে একই সাথে একাধিক সংকেত মস্তিষ্কে প্রেরিত হলে Truth Serum এর প্রভাবে শুধু একটি সংকেত বিশ্লেষিত হয়। বাঁকি সংকেতগুলো উপেক্ষিত থাকে।Truth Serum এর প্রভাবে হেলুসিনেশন তৈরি হয়। হেলুসিনেশনকালে মানুষ কোনো কথা বলতে থাকলে স্মৃতি থেকে শুধু সত্য কথা বলতে থাকে। সে চিন্তা করে মিথ্যা বলতে পারে না। কারণ মিথ্যা কথা বলার সময় চিন্তা করে সাজিয়ে গুছিয়ে বলতে হয়। কিন্তু Truth Serum প্রয়োগ করলে মস্তিষ্কের একসঙ্গে একাধিক চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পায়। তাই মানুষ মিথ্যা না বলে শুধু সত্য বলে।
ট্রুথ সিরামের ট্রুথ: গবেষণায় দেখা যায় Truth Serum 45% ক্ষেত্রে বেশ ভালো কেরামতি দেখায়। কিন্তু 25 থেকে 30 শতাংশ ক্ষেত্রে এটি ভালো কাজ করে না।
আদালত ও ট্রুথ সিরাম: Truth Serum এর প্রভাবে অপরাধী যে জবানবন্দি দেয় তার সত্যতা অনেক দেশের আদালত কর্তৃক গৃহীত নয়। আবার তথ্য অনুসন্ধানকারী যখন অপরাধীর কাছ থেকে তথ্য গ্রহণ করে তখন সে বুঝতে পারে না যে সেই তথ্যটি সত্য না মিথ্যা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে ঘোষণা করে যে Truth Serum Drug “unconstutionally coerced”. প্রশ্ন আসতে পারে যে যদি সত্যি কাজ করে তাহলে কেন সব সময় এই Truth Serum ব্যবহার করা হয় না?  গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রভাবে যে হেলুসিনেশন তৈরি হয় তা অপরাধীর মস্তিষ্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অনেকে তার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। কেউ চিরদিনের মত পাগল হয়ে যায়। অনেকে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলে। একজন অভিযুক্তকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে এ ধরনের শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার আইনসঙ্গত নয়। এটি মানবাধিকার লঙ্ঘন এর পর্যায়ে পরে। তাই Truth Serum ব্যবহারের আগে অবশ্যই আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়। আদালত অনুমতি দিলে তবেই Truth Serum প্রয়োগ করা যাবে।
ঔষধ হিসেবে ট্রুথ সিরাম: Truth Serum হিসেবে ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন ধরনের ঔষধের মধ্যে সোডিয়াম পেন্টাথল, সোডিয়াম এমিটাল, GABA-A রিসেপ্টর, স্কোপোলামিন, এমোবারবিটাল ইত্যাদি বহুল ব্যবহৃত ও উল্লেখযোগ্য। এরমধ্যে সোডিয়াম পেন্টাথল বেশি ব্যবহৃত হয়। 
সোডিয়াম পেন্টাথল(Sodium Pentothal): সোডিয়াম পেন্টাথল বিভিন্ন নামে পরিচিত যেমন সোডিয়াম থায়োপেন্টাল(Sodium thiopental), থাইয়োপেনটোন, ট্রাপানন।
১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের Ernest H. vowiler এবং Donalee L. Tabern অ্যাবোট ল্যাবরেটরিতে প্রথম এটি আবিষ্কার করেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে Dr. Ralph M. waters মানবদেহে প্রথম এটি প্রয়োগ করেন। বিষাক্ত ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় যে ইনজেকশন ব্যবহৃত হয় তার একটি উপাদান সোডিয়াম পেন্টাথল। সোডিয়াম পেন্টাথল স্বল্পমেয়াদী বারবিচুরেটজাতীয় ঔষধ। সাধারণ অবচেতনকারী ঔষধ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। এটি WHO এর অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের তালিকাভুক্ত। 
ট্রুথ সিরামের ব্যবহার:  সাধারণ এনেসথেসিয়া (অপারেশনের আগে অজ্ঞান করা) দেয়ার জন্য ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন ধরনের ট্রুথ সিরাম। মনোরোগের চিকিৎসা করতেও Truth Serum ব্যবহার করা হয়। অপরাধীর কাছ থেকে সত্য তথ্য আদায় করতে ইন্টারোগেশন সেলে Truth Serum ব্যবহার করা হয়।
ট্রুথ সিরাম এর অপব্যবহার
বেশি মাত্রায় Truth Serum ব্যবহার করলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে। চিরদিনের মত কথা বলার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। উচ্চমাত্রার নেশা হওয়ার কারণ এই Truth Serum। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাজি ডাক্তাররা Truth Serum অপব্যবহার করে বহু সৈন্যের মৃত্যু ঘটিয়েছিল।
ট্রুথ সিরামের দাম:  ট্রুথ সিরাম এর ১৫mg ইনজেকশন এর ভায়াল 10000 টাকায় বিক্রি হয়। ১mg ভায়ালের দাম 15 টাকা এটা শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
Truth test বা NARCO test: নারকো টেস্ট হলো এক প্রকার বিশেষ পরীক্ষা, যার মাধ্যমে অপরাধীর কাছ থেকে সত্য তথ্য উদ্ধার করা হয়। অপরাধীর শরীরে ট্রুথ সেরাম প্রয়োগ করা হলে অপরাধীর মস্তিষ্কে এক ধরনের হেলুসিনেশন তৈরি হয়।এই অবস্থায় অপরাধী বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা কথা বলতে পারে না। কারণ truth serum এর প্রভাবে অপরাধীর মস্তিস্কে চিন্তা করার ক্ষমতা লোপ পায়। এর ফলে অপরাধীর মস্তিষ্কে জমাকৃত স্মৃতি হতে সত্য তথ্য বের হয়ে আসে।
Language
error: Content is protected !!