ঠ এর ঠিসিস: ঠেকা ঠেক ঠোক ঠিকঠাকা ঠেকা ঠিকানা ঠিক ঠুমরি ঠাওর ঠমকা ঠমঠম ঠাড়ি ঠাঁই ঠাম

ঠ-এর ঠিকানা: বাংলা ডিকশনারিতে ঠ এর ঘরে যত শব্দ আছে মুড়িয়ে মাড়িয়ে তার সব কটাই হিন্দি মারাঠি গুজরাটি নেপালি ওড়িআ অসমীয়াতে আছে, একই মানে একই বানানে। ঠ দিয়ে শব্দ সবচেয়ে বেশি সংরক্ষিত আছে নেপালিতে। নেপালের পাহাড়-প্রাচীর তার প্রাচীন রূপ ধরে রাখতে সাহাযা করেছে বোধ হয়। সবকটা ভাষা একসঙ্গে নিয়ে বসলে বাংলার সব ঠ-শব্দের মিসিং লিঙ্ক গুলো এসে পরপর জুড়ে যাবে, সব শব্দের ব্যুৎপত্তির বাত্তি জ্বলে যাবে। ঠেঁটি কাপড় কেন ঠেঁটি আর ঠ্যাঁটা লোক কেন ঠ্যাঁটা তা ঘণ্টাখানেক ঘাঁটলে পরে অমনি বোঝা যাবে। অঙ্গবঙ্গকলিঙ্গ সহ আবিন্ধ্যহিমাচল জুড়ে এই একই ঠঙ্কার শুনতে পাবার কারণ এই আদ্যধ্বনি আমাদের আদিম অস্ট্রিক উৎস থেকে উৎসারিত। অস্ট্রিক ঠ ঢ ধ্বনিই মারহট্ট থেকে শিলহট্টে ধ্বনিত হচ্ছে। বাংলা তথা অন্য ভাষার ডিকশনারির ঠ-ভুক্তির শব্দগুলোর সাকিন সাঁওতালি মুণ্ডারিতেই। ঠ দিয়ে শুরু কোনও সংস্কৃত শব্দ নেই। ঋগ্‌বেদের অসুররা ঠ পারত। তারপরে অস্ট্রিকরা। কিন্তু এই আদিম অসংস্কৃত অসুর-অস্ট্রিক ঠ ধ্বনি দ্রাবিড় আর সংস্কৃত জিভে জট পাকিয়ে দিয়েছে। ঠ-এ ঠেকে তারা ঠ-কে স্থ স্ত থ ত দ ট st set sta esta th নানা ভাবে ম্যানেজ করেছে। বাঙালি ঠ পারে কিন্তু কিছু ঠ তাদের মুখেও থ ত ধ হয়ে গেছে। ঠাই-থই ঠাক-তাক ঠাম-ধাম ঠঠ্‌ঠর-থর্‌থর ঠঠমঠ-থতমত ঠাণ-থান ঠাণা-থানা ঠানেদার-থানেদার। উচ্চারণে ভাষা ভাটির দিকে যায় উজানে যায় না। ভাষা খটখটে থেকে মধুমধুর হবার পথও এটা।
রঠরঠ: ঠ এর মূল মানে halt hold pause sudden.stop স্ট্যাচু.হয়ে.যাওয়া থামা স্থ থ। মাঠ দিয়ে হাঁটছিলাম, চড়াক্‌ করে বাজ পড়তেই থ হয়ে গেলাম, still stiff numb terrified হয়ে গেলাম। হিন্দিতে ঠঠনা মানে চম্‌কে গিয়ে থম্‌কে যাওয়া। বাংলা শব্দে একানে ঠ বেঁচে আছে শুধু র-ঠ কথাটাতে। র-ঠ করলে চলবে না কাজটা এখনই সেরে ফেলতে হবে – মানে রয়ে থেমে করলে হবে না ঝটপট করে ফেলতে হবে। ‘কী তোমার কেমন চলছে’ কথার উত্তরে ‘ওই র-ঠ-র-ঠ করে চলছে আর কী’ – মানে রয়ে থেমে রয়ে থেমে চলছে, গয়ংগচ্ছ করে চলছে। রওয়া হচ্ছে stay থাকা আর ঠওয়া হচ্ছে stop থামা। কাজটা র-ঠ করে সেরে নাও না – মানে ফেলে রেখে ছড়িয়ে রেখে ছ্যাড়াং ব্যাড়াং করে সেরে দাও।
গোটা পঞ্চাশেক ডিকশনারি ঘাঁটলে পরে মাত্র তিনটেতে র-ঠ পাওয়া যাচ্ছে। যোগেশরায়ে আছে –
র-ঠ .. ব্য. (রহ ও স্থা ধাতু হইতে)। রহিয়া-থাকিয়া, অর্থাৎ বিলম্ব করিয়া, প্রঃ – র-ঠ করিয়া কাজ করা – রহিয়া বসিয়া।
সুধীরকুমার করণের ঝাড়খণ্ডী শব্দকোষে আছে –
অমন র-ঠ কর‌্যে কাজ করলে কাজট হব্যেক কখন? তর সব কাজে র-ঠ।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন র-ঠ এন্ট্রিতে র এর মানে রওয়ানা ধরে র-ঠ মানে করেছেন – দ্রুত বিলম্বিত গতির ভাব। মানে বুঝিনি।
শুরুর দিকের বাংলা ডিকশনারিগুলোতে ঠ দিয়ে এন্ট্রি প্রায় না-থাকার মতোই থাকতো, কেউ আধপাতা তো কেউ সিকিপাতা, বাঁ হাতে চ্যাংমুড়ি কানির পুজো দেবার মতো করে। সে যুগের একটা বিখ্যাত দুখণ্ডী ডিকশনারিতে ঠ-শব্দের জন্য বরাদ্দ মাত্র এক পাতা, ২৩০০ পাতায় ১ পাতা। যদিও তখনই কথাগুলো বেশি জলচল ছিলো বলে তেনারা সহজেই রেকর্ড করে যেতে পারতেন, কিন্তু করেননি। তাই শব্দ হিসেবে ঠ এর লিখিত প্রমাণ প্রমাণ-সাইজের বঙ্গীয় শব্দকোষগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে না।
ঠ এর মূল মানে থ থামা স্থ স্টপ এই ব্যাপারটা মগজে গেঁথে নিলে ব্রেনের সব কটা তালা খুলে যাবে, ফলে ঠ আছে এমন অসংখ্য শব্দের মানে জলবৎ তরলম্‌ হয়ে যাবে। বাংলায় ঠ এখন একা একবর্ণ নেই, কিন্তু বহুবর্ণ শব্দে ঠ দিব্যি আছে।
আপনাদের হাতে আমি আমার এই ঠ এর ঠিসিস থামিয়ে দিচ্ছি। ধৈর্য থাকলে পড়তে পারেন। থিসিস কথাটার থ হচ্ছে ঠ, থমা দে না to place.
ঠা: ঠা মানেও থামা। রজনীকান্তের শব্দসিন্ধুতে আছে –
ঠা, বিং নিশ্চল, স্থির; ২। বি, – বাদ্যের প্রকার ভেদ।
ঠা বাজানো মানে থেমে থেমে বাজানো, বাজনার ধীর লয়। তেমনি ঠারে গাওয়া মানে লয় দিয়ে দিয়ে গাওয়া।
১৭ শতকের ধর্ম্মরাজের গীতে কবি রামনারায়ণ লিখেছেন –
কালু কয় কি হেতু কল্লনা কর মন।
ঠাএ বিনাশিব গোপে দেখিবে এখন॥
ঠাএ মানে নড়তে না দিয়ে, যেখানে আছে সেখানে দাঁড় করিয়ে। ১৭৪৩এ মানোএল ‘ঠাইতে’ লিখে মানে দিয়েছেন অল্প বিলম্ব করা।
ঠা-ঠা মানে থেকে থেকে ধীরে ধীরে। যোগেশ রায়ে আছে – ঠা-ঠা চলা, ঠা-ঠা ঢেঁকীতে পাদ-দেওয়া; বাঁয়াতে ঠা ঠা আঘাত।
ঠায়: মিস আমাকে পড়াতো আর আমি ঠায় মিসের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, কোনও পড়া মাথায় ঢুকতো না। আমি একা মেয়ে আধঘণ্টা ধরে এখানে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি আর এখন তোমার আসার সময় হলো? – এই সব ঠায় হচ্ছে নট.নড়ন.চড়ন ফিক্সড্‌ সেট্‌। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা মানে জায়গা থেকে না নড়ে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। ওড়িআয় ঠউরিবা মানে স্থির দৃঢ় অনড় হয়ে থাকা টিকে থাকা। শরীরে মনে বিষয়ে বস্তুতে।
ঠাড় ঠাড়া
ঠা ঠাড় ঠাড়া মানে থামা দাঁড়ানো। রোদে ঠাড়াচ্ছিস ক্যানে ছাবায় আয়। চৈতন্যচরিতামৃতে আছে –
গোবিন্দ পাশ শুনি প্রভু পুছে স্বরূপেরে;
‘রঘু ভিক্ষা লাগি ঠাড় না হয় সিংহদ্বারে’?
ঠাড়ি:  যে ঠাড় আছে থেমে আছে দাঁড়িয়ে আছে সে ঠাড়ি। বিদ্যাপতির পদাবলীতে আছে– ঠাড়ি রহল রাই নাহি আগুসারে।
যে গাই এর বাছুর নেই বা গাবিন নয় বা দুধ দেয়া থেমে আছে বা থেমে গেছে সে গাই ঠাড়ি গাই। বীরভূমের ভাষায় – গাইটা অখুন ঠাড় আছে দুধ দিছে নাই। যে মাগির বাচ্চা নেই বা পোয়াতি নয় বা বাচ্চা বিয়োনো থেমে গেছে সে ঠাড়ি মাগি। বিধবা রাঁড়িও তাই ঠাড়ি। সেজন্য ঠাড়ি রাঁড়ি একসঙ্গে বলা হতো। বছর-বিয়োনো বন্ধ বলে ঝাড়া হাতপা ঠাড়ি-রাঁড়িরা অনেকেই গায়ে গতরে ডাঁটো হতো। তাই অন্য জা-দের কাছ থেকে এদেরকে শুনতে হতো – তুই ঠাড়ি মাগি, ধান সিজোনোর হাঁড়ি তুই নামাবি না তো কে নামাবে লো?
ঠঠ্‌মঠ্‌ ঠর্‌মর্‌ ঠঠ্‌ঠর্‌: ঠ হওয়া মানে থ হওয়া। ঠঠমঠ হওয়া মানে থতমত হওয়া থতমত খাওয়া। থতমত-র আদি রূপ ঠঠ্‌.মঠ্‌ এখনও আছে অসমীয়াতে। মানে চম্‌কে থম্‌কে বাকরুদ্ধ চলৎশক্তিহীন dumbstruck dumbfounded হওয়া।
অসমীয়াতে আছে ঠরমর। অসমীয়াতে ঠর ঠরঙা মানে হাত পা থেমে যাওয়া stiff numb rigid হওয়া, আর ঠরমর খা মানে ঠরঙা হয়ে মরার মতো হওয়া মূর্ছা যাওয়া। ঠরমর অন্য ভাষাগুলোতে ঠাড়মোড় হয়ে আছে। বাংলাতেও ছিলো ঠাড়মোড়। ১৭১১র কাছাকাছি ঘনরাম লিখেছেন –
রাজারে সংগ্রামে জিনি সহর প্রবেশে।
ঠাড়মোড় হ’লো লোক তরাসে হুতাশে॥
ত্রাসে ফ্রিজ় অসাড় হয়ে ওখানেই পা আটকে যাওয়ার মতো হওয়া।
বাংলায় আগে ছিলো ঠঠ্‌ঠর। বাংলা অভিধানে এখনও আছে। ঠঠ্‌ঠর মানে এক ঠেঁয়ে দাঁড়িয়ে থেকে কাঁপা। আমার রেজ়াল্ট দেখে বাবা রেগে ঠঠ্‌ঠর করে কাঁপতে লাগলো। ঠঠ্‌ঠর-ই পরে হয়েছে থথ্‌থর থরথর। কাব্যে আরও অ্যালানো থরোথরো। ভূমিকম্পে বাড়িঘর থথ্‌থর করে কাঁপে, মায়ের হাতে কঞ্চি দেখে বাচ্চা থর্‌থর করে কাঁপে। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পালালো বোঝাতে থরথর বলা চলবে না।
ঠমক ঠুমকা: ঠমক মানে থমক, থামা, থমকে থমকে চলা। বাফারিংএ ভিডিও দেখার মতো। চার্লি চ্যাপলিনের মতো অঙ্গভঙ্গি করতে বা সেলফি তুলতে আমাদের পোজ় দিয়ে পজ় দিতে হয় মানে ঠ হতে হয় ঠমকাতে হয় – দুটো মিলে ঠাটঠমক পোজ়পজ়। বাংলা ইংরিজি দুটোতেই দুঅংশের ধাতু এক। ঠাটঠমক মানে হাবভাব ভাবভঙ্গি।
থামার ছন্দে ছন্দে তালি মারাকে বলে ঠুমকা দেওয়া।
বাইশ কবি মনসায় আছে –
ঠমক না কর মাতা করি হে মিনতি।
মানে থমকে দিওনা মা, থামিও না আটকিও না।
শ্রীকৃষ্ণমঙ্গলে আছে –
ঠমকি ঠমকি ধাএ জননীর কোলে।
গোরক্ষবিজয়ে আছে যুগী মীননাথের চিত্তে দোলা লাগাতে মঙ্গলা কমলা
‘নয়ানে নয়ানে চাহে মাথা নাড়ি কথা কহে
ঠমকে দেখায় দুই স্তন’
দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার লিখেছেন –
বুড়ী ঠমক দিয়া ঘাটলার সিঁড়ি ভাঙে।
১৪০০ সালের আশেপাশে চণ্ডীদাস তাঁর তুড়ি পদাবলীতে লিখেছেন –
হাসির ঠমকে চপলা চমকে।
এখন আমরা বলি হাসির দমকে। ঠ এর বদলে দ।
১৮৭৯ সালে বিহারীলাল চক্রবর্তী তাঁর সারদামঙ্গল কাব্যে লিখেছেন –
কমলা ঠমকে হাসি, ছড়ান রতনরাশি,
অপাঙ্গে ভ্রুভঙ্গে আহা ফিরে নাহি চাও॥
১৯২১ সালে নজরুল বিদ্রোহী কবিতায় লিখেছেন –
আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’…
যে মেয়ে পথ যেতে যেতে চকিতে চম্‌কে উঠার মতো ঠমক ছমক করতে করতে চলে সে ছমক-ছলো ছম্মক-ছল্লো। ছল্লো মানে ছলিয়া মানে যে ছলা কলা করতে জানে বা করে।
ঠুমরি ঠুমকি: এক রাগ থেকে অন্য রাগে এমনকি এক তাল থেকে অন্য তালে যেতে লয় দিতে হয় থামতে হয়। তাই ঠুমরি। তেমনি ঠুমক ঠুমক নাচ, থমকে থমকে নাচ, ঠাক ঠাক করে নাচ। বনবন করে তুর্কি নাচন না।
ঠাওর ঠাহর: রোদ থেকে এলি একটু ঠাওর হয়ে বোস। মাথা ঠাওর করে শোন, আমি মরলেই সিন্দুকের চাবিটা আগে নিয়ে নিবি। আজকাল ঠিক মতো ঠাওর করতে পারি না, ছুঁচে সুতোটা পরাতে পারি না। হাতে ঠাওর নেই, সই করতে গেলে হাত কাঁপে।  এই সব ঠাওরে মানে স্থির। পুরনো বানান ঠাঅর ঠাউর ঠাহর। ১৭৮৫তে আওগুস্ত ওসাঁ লিখেছেন— ঠাউরাওন। ঠাউরচোখা লোক মানে যার স্থির নজর, যার চোখ এড়িয়ে কিছু করা যাবে না। ফরস্টারে আছে ঠাহর ঠাহরন; ঠাহরন্যা ঠাহরান্যা মানে ইন্সপেক্টর সার্ভেয়ার। বাংলার ঠাওর ওড়িআয় ঠাৱ ঠউর, হিন্দি ঠৌর ঠউর, মারাঠি ঠাৱর ঠাওর। অসমিয়াতে ঠাৱতে মানে থিতোতে, ঠাৱর মানে সেটল্‌ড ফিক্সড্‌ জায়গা থেকে না নড়া। ওড়িআয় ঠউর মানে স্থিরতা। সাঁওতালিতে ঠহরি মানে ধীরে ধীরে। হিন্দিতে ঠহরনা মানে থামা। ‘তুম তো ঠহ্‌রে পরদেশী সাথ ক্যা নিভাওগে।’
দুর্গাপঞ্চরাত্রিতে আছে পার্ব্বতী সারকাস্টিকালি শিবকে তড়পাচ্ছেন—
“তব দোষ নাই ধুতুরাতে কয়
তেঁই সে এমন সাজ॥…
ভাঙ্গের ঘোরে নয়ন ফিরে
চলিতে ঠাওর নাই।”
আলালে আছে— এ কথাটী বড় সহজ নহে – ঠাওরিয়া উত্তর দিতে হইবে। গিরিশ ঘোষের বিল্বমঙ্গল ঠাকুর নাটকে সাধককে থাক-র মুখঝামটা – ময়না মিন্‌সে, তিন দিনে একটা উপায় ঠাওরাতে পার্‌লি নি! হাকিমের লোক এসে বসুক, তার পর ঠাওরাবি!
ঠাণ ঠাঞি ঠাম: মানুষ যেখানে থামে এবং থাকে সেটা তার ঠা ঠে ঠাক ঠাৱ ঠাৱী ঠাম ঠাণ ঠাঞ ঠাঞি ঠাহি ঠাঁই ঠাঁয় ঠাই ঠাএ ঠিণ ঠিঞ ঠিঞা ঠেঞ। বাঁকড়ো ভাষায় বলে – ছেল্যাগুলা কুন ঠে গেলো বটে? উয়ার ঠিনে যা, ঠিক পায়্যেঁ যাবি। ঠায় ঠায় জল দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের ঠান মাইঠান মাইথন, সাঁইয়ের ঠিঞা সাঁইঠিঞা সাঁইথিয়া। ঠান ঠানু থেকে স্থান স্থাণু। ঠান দিয়েই অধিষ্ঠান প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান আফগানিস্তান। ঠাম থেকেই ধাম। অসমিয়াতে ঠাম মানে ধাম। বাংলার ঠাঁই অসমিয়াতে ঠাৱ নেপালিতে ঠাউঁ মারাঠিতে ঠাঈ ঠায়ী ওড়িআতে ঠাআ। ওড়িআতে ঠা মানেও জায়গা। মুণ্ডারিতে সাঁওতালিতে ঠাই ঠাও মানে place spot.
চর্যা ৮এ কম্বলাম্বরপাদ লিখেছেন –
“সোণে ভরিলী করুণা ণাবী।
রূপা থোই নাহিক ঠাবী॥
(সোনায় ভরেছে করুণা নাৱ
রূপো থোয়ার নেইকো ঠাঁৱ)
বড়ু চণ্ডীদাস ঠা ঠাই দুইই লিখেছেন –
কহিলোঁ মোঁ ই সকল তোহ্মার ঠাএ।;
তাহার ঠাইক জাইতেঁ লাগে বড় ডরে।
জ্ঞানদাস ঠান ঠাম দুইই লিখেছেন –
কহ জননীর ঠান।;
চুড়ার টালনি বামে মউরচন্দ্রিকা ঠামে।
বিদ্যাপতির পদে আছে –
গিরিধর সেবি ঠাম নহি পায়ব
বিদ্যাপতি রহু ধান্ধে॥
রামপ্রসাদ লিখেছেন –
ঠাই ঠাই কৃষ্ণসার নীলগাও বাউট বিস্তর।
গিরিশ ঘোষ লিখেছেন –
আর ওঁর ঠেঁয়ে কিছু নাই।”
ঠা ঠাই থা থাই: গভীর পুকুরে আমরা দাঁড়ানোর ঠা পাই না। অকুল পাথারে পড়ে বা মহাবিপদে পড়ে আমরা যখন হাবুডুবু খাই তখনও আমরা কোথাও ঠাই পাই না। এই ঠা ঠাই পরে হয়েছে থা থাই। জল থই থই এর সঙ্গে গুলিয়ে কেউ কেউ থাইকে থই বলে।
ঠেঠ ঠেঁটা: রাঢ়ী বুলিতে ঘড্ডি আর বাহ্যি মানে ঘরের আর বাইরের, বিহারি বুলিতে ঠেঠ ঔর সদ্‌রি মানে ঘরের আর সদরের। ঠেঠ বিহারি বোরি মানে খাঁটি বিহারি বুলি। ঘরোয়া আদি অকৃত্রিম অবিমিশ্র বেমিশেল বে-বনাৱটি শুরু-র সরল নিপাট ভানহীন কাঁচা পালিশহীন। টমসন ঠেঠ মানে দিয়েছেন pure genuine contentious. যে ছেলে ঘরের বাইরের সদরকে দেখেনি, সে লোকসমাজে মেশার মতো নয়, সে ঘর.ল্যাচ্‌ড়া ঠেঠা ছেলে, ঠেঠের ঠাটের ঠেঞের ঘরের uncivilised unpolished raw. এখন বাংলায় ঠেঠা হয়েছে ঠেঁঠা ঠ্যাঁটা আর তার মানে দাঁড়িয়েছে খবিশ ছেলে, যে সভ্য সিভিল সমাজের মতো নয়, অসব্বো, কাঁচা ভাষায় কথা বলে। তেমনি ইংরিজেতেও ভালগার এর আসল মানে ছিল ভিলেজের গ্রামের, এখন মানে দাঁড়িয়েছে অশ্লীল। শহুরে বয়ানে গ্রাম্য বা গেঁয়ো মানেই অশ্লীল গাঁইয়া খ্যাত্‌।
ঠেঞে ঠনে: বাঙাল বাংলায় বলে তোর থেকে আমি পাঁচ বছরের ছোটো আর তোর থেকে আমি পাঁচ টাকা পাই। than আর from দুটোই তোর থেকে। কিন্তু ঘটি বাংলায় বলে, তোর কাছ থেকে আমি পাঁচ টাকা পাই। এটাকেই রাঢ়ে বলে তোর ঠেঞে তোর ঠেঁয়ে তোর ঠেঙে তোর থনে। মানে তোর ঠাঁই থেকে। ঝাড়খণ্ডীতে বলে – উয়ার ঠুঁ কদালটা মাগ্যে আন। আঞ্চলিকে আছে – কার ঠনে নিবি। বাংলার ঠেঞে থনে ঠুঁ ঠনে ওড়িআয় ঠউঁ ঠারু।
ঠাণ্ডা ঠাইঠান্‌ডা:  চোরটাকে লোকে এমন মারান মেরেছে যে একটু আগেও একটু একটু নড়ছিল, এখন একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে। তেড়ে মেরে ডান্ডা করে দিই ঠান্ডা। বেশি ইত্‌রামি করলে এক চড়ে ঠান্ডা করে দোব। সারাক্ষণ চিল্‌বিল্‌ করছিস কেন, দুদণ্ড ঠান্ডা হয়ে বসতে পারিস না? এই সব ঠান্‌.ডা মানে নট নড়ন চড়ন হওয়া, ঠা হওয়া। অস্ট্রিক শব্দ ঠান্ডা-র মূল মানে এটাই। এই ঠান্ডা মানে fridge cold নয় freeze hold stop still. যদিও এই ঠান্ডাই পরে কোল্ড ঠান্ডা মানেতে চালু হয়েছে। আঞ্চলিকে আছে, দিনাজপুরের ভাষায় – লোক্‌টা ঠানডা হৈ গেল্। মানে লোকটা মরে গেলো। ঢাকার ভাষায় – দুদ্‌ খাইয়া পোলাডা এতক্‌খনে ঠাইঠানডা ঐসে। পাবনার ভাষায় – কাম্‌টা ঠান্‌.ঠাহরে কর্‌লি বালো ঐবনে। ঠান্‌ডাআরে যাও, শময়্‌ আসে। দূরে থাকা ছেলের কাছে মায়ের আকুল আকুতি – বাপ তুই একবার আমাকে দেখা দিয়ে যা, আমার কলজেটা ঠান্ডা করে দিয়ে যা, তোকে দেখার জন্যে আমার জানটা ধড়ফড় করছে বাপ। মানে জানটাকে ধড়ফড় করা থেকে ধীরঠির করাটাই ঠান্ডা করা। মায়ের হৃদপিন্ডের টেম্পারেচার হাই হয়ে আছে সেটাকে কুল করতে হবে এমন না।
ঠিক: ফটোগুলো দ্যাখ, এদের মধ্যে কোন মেয়েটাকে বিয়ে করবি ঠিক কর সেই মতো আমরা মুরুব্বিরা কথা এগোব। তোমরা তাহলে বিয়ের দিন ঠিক করো। তোরা বিয়ে বাড়ি কী পরে যাবি ঠিক কর। তোর তো কথার ঠিক নেই। ভাত খাবি না রুটি খাবি ঠিক করে আমাকে বল। এইসব জায়গায় ঠিক কথাটায় মানেও থামা settle fix stop at. এটা না ওটা, ওটা না সেটা এইরকম দোলাচল করতে করতে একটায় এসে থিতু হওয়া থামা ঠ হওয়া। তাই ঠিক। এই ঠিক মানে correct না।
ঠিকা: ঠিকে-ঝি ঠিকেদার ঠিকাগাড়ি ঠিকাকুলি ঠিকাপ্রজা – এগুলোতে ঠিকা মানে ঠিক করা settle fix. দুপক্ষের কমবেশি দরাদরির পর একটা মাঝামাঝি দরে এসে থামা। ঠিকাচুক্তি করা মানে তুমি-আমি সেটল করলাম তুমি আমার এই কাজটা এত টাকা নিয়ে চুকিয়ে দেবে।
ঠিকানা: ঠিকানা মানে থাকার ফিক্সড জায়গা। ‘ওর কোনও ঠিকঠিকানা নেই’ বা ‘ঠায়ঠিকানা নেই’ কথাটাতে সামনের ঠিক-টার মানেও স্থির ফিক্সড। মোটেই রাইট প্রপার এইসব নয়। ওড়িআতে এটাকে বলে ঠাআঠিকানা ঠউর.ঠিকণা। হিন্দির ঠৌর.ঠিকানা ঠাৱর.ঠিকানা মানে সন্ধান আতাপাতা। মুণ্ডারি ঠেকান বা ঠিকান মানে to find out.
ঠিকঠাক: লোকটা যেখানে থাকে সেটা তার থাকার জায়গা, ঠাক। ঠিকঠাক-এর ঠিক এর মানে fixed আর ঠাক এর মানে place ঠাণ স্থান। ঠাক থেকে হয়েছে থাক এবং তাক। পুরোহিতরা নারায়ণের সিংহাসনে যে আধারটাতে শালগ্রাম শিলা বসিয়ে রাখে সেটা ঠাট। মারাঠিতে ঠাক মানে to stand still. মুণ্ডারিতে ঠক্‌রাও মানে to settle, to decide.
‘মা তুমি মালতীর মাকে আমার টেবিল গোছাতে বোলো না তো, মাসি গুছোলে কোনও কিছুই ঠিকঠাক থাকে না।’ ‘তুমি ফাইলটা দেখে নিয়েছো, সব ঠিকঠাক আছে তো, everything is in place?’ ‘কী খবর, সব ঠিকঠাক তো?’ – মুণ্ডারি ঠাকঠিক ঠিকঠাক মানে কোনও নড়চড় নেই everything is in place যার ভাবার্থ right proper exact good. সাঁওতালি নেপালি অসমীয়া অভিধানেও ঠাক্‌ঠিক এবং ঠিক্‌ঠাক দুটোই আছে।
ঠেকা: গল্পটা এখন কোথায় এসে ঠেকেছে? আচ্ছা কেল্টোদা, বুল্টির সঙ্গে আমার প্রেমটা এখন এই জায়গায় এসে ঠেকেছে, এবার কী করব বলো তো। অঙ্কটা এখানে এসে ঠেকে গেছি। বাবাকে অনেক করে ঠেকিয়ে রেখেছি, এক-দু মাসের মধ্যে তুমি চাকরি না পেলে আমার অন্য কোথাও বিয়ে দিয়ে দেবে। হিটলারকে একমাত্র রাশিয়া ঠেকিয়ে দিয়েছিল। সংসারটাকে ও একা হাতে ঠেকিয়ে রেখেছে। মড়াটা ঘাটে গিয়ে ঠেকেছে। এই রাস্তাটা মোড়লদের জমির আলে গিয়ে ঠেকেছে। নৌকোটা চড়ায় ঠেকে গেছে।  এই সব ঠেকা মানে ঠ-হওয়া থামা স্টপ। ওই খানে দাঁড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হল্ট পজ়। আমি এখন ঠ্যাকায় পড়ে আছি, এখান থেকে কী করে বেরোবো জানি না— মানে ঠেকে গেছি আটকে গেছি থেমে আছি, এগোতে পারছি না। জীবনানন্দ দাশ একবার এক প্রকাশককে চিঠিতে লিখেছিলেন, “বেশি ঠেকে পড়েছি, … এখুনি চার-পাঁচশো টাকার দরকার।…”
ঠেকামেয়ে: গায়ে হলুদের পর যে মেয়ের বিয়ে ঠেকে গেছে থেমে গেছে, তারপর অন্য কেউ তাকে বিয়ে করছে না সে ঠেকামেয়ে। অভিধানে লিখছে ঠেকামেয়ে মানে কুলীন ব্রাহ্মণের চিরকুমারী মেয়ে। দীনবন্ধু মিত্র সুরধুনী কাব্যে লিখছেন –
যে কন্যা কুমারীভাবে চিরদিন রয়
কুলীন মহলে তারে ‘ঠ্যাকা মেয়ে’ কয়॥
ঠেক: মানুষ যেখানে গিয়ে ঠেকে সেটা তার ঠেক ঠ্যাক। ও আর কোথায় যাবে, দ্যাখ ওকে হয় তাসের ঠেকে পাবি নয় তো গাঁজার ঠেকে পাবি। বীরভূমে বলে— সকাল থেকে এখানেই ঠ্যাক নিয়েঁচি। রংপুরের ভাষায় – এ আবার কোন্‌ ঠাকার মান্‌শি। চাল ডাল রাখার হাঁড়িকেও বলতো ঠেক।
ঠোক: যা দিয়ে আমি ঠেকিয়ে রেখেছি তা ঠেকো ঠ্যাকা স্টিক। যে বিষয়টা ধরে আমি থেমে আছি আটকে আছি অন্য কিছুতে যেতে রাজি নই, যেটাতে স্টিক করে আছি তা আমার ঠোক ঠোঁক। বাচ্চাটা মেলায় যাবে বলে ঠোক করে আছে, ঠোক ধরে বসে আছে। মুণ্ডারিতে ঠেকাও মানে to be steadfast.
(ত্রুটি মার্জনীয় শুদ্ধি প্রার্থনীয়)
ইউসুফ খান, কলকাতা ২০২১ সেপ্টেম্বর ১১
error: Content is protected !!