ডাকটিকিট: আদি থেকে অন্ত ইতিহাস

ড. মোহাম্মদ আমীন

ডাকটিকিট: আদি থেকে অন্ত ইতিহাস

ডাকটিকিটের জনক

যুক্তরাজ্যের রোল্যান্ড হিলকে বলা হয় ডাকটিকিটের জনক। ডাকটিকিট চালুর আগে প্রাপককেই ডাক মাশুল দিতে হতো।সেসময় চিঠির পাতার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে ডাক মাশুল নির্ধারিত হতো। অনেক সময় প্রাপক বিভিন্ন

ড. মোহাম্মদ আমীন

অজুহাতে ডাক মাশুল দিতে চাইত না। এছাড়া আরও অনেক অসুবিধা ছিল। অসুবিধাসমূহ দূর করার লক্ষ্যে রোল্যান্ড হিল ডাক বিভাগের সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাব দেন। এর অন্যতম ছিল ডাকটিকিটের প্রচলন। ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রস্তাবানুসারে প্রাপকের পরিবর্তে প্রেরককে ডাকমাশুল প্রদানের রীতি প্রবর্তন করা হয়।  একই সঙ্গে ওজনের ভিত্তিতে ডাক মাশুল দেবার পদ্ধতিও চালু করা হয়।

পৃথিবীর প্রথম ডাকটিকিট
১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাজ্যে পৃথিবীর প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। প্রথম ডাকটিকিটে ব্রিটেনের রানির প্রতিকৃতি ছিল। এটি কালো রঙের। রঙের কারণে নাম হয় ব্ল্যাক।  মূল্য ছিল ১পেনি। ব্ল্যাক রঙ এবং ১ পেনি মূল্যমানের কারণে বিশ্বের প্রথম ডাকটিকিটটির নাম হয় পেনি ব্লাক।  
উপমহাদেশে ডাকটিকিট-কাহিনি
১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জুলাই সিন্ধু প্রদেশে উপমহাদেশের প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। কিন্তু সিন্ধু প্রদেশ এখন পাকিস্তানভুক্ত হওয়ায় ভারতে প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশের তারিখ ধরা হয় ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দ। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জুলাই সিন্ধু প্রদেশে যে ডাক টিকিট প্রকাশিত হয়েছিল তারও আগে ভারতে দুই রকম ডাকটিকিট ছিল। যা ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার টাকশালে ছাপানো হয়েছিল। অর্থাৎ উপমহাদেশের প্রথম ডাকটিকিট ছাপা হয় ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দে কালকাতার টাকশাল থেকে। তাতে সিংহ ও তালগাছের নকশা ছিল। তবে এ টিকিটগুলো শেষ পর্যন্ত চালানো হয়নি। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জুলাই যে টিকিট ছাপানো হয় তাতে লাল, সাদ ও নীল এবং একটি গোলাপি বেল্টের মাঝখানে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির তীর আঁকা একটি নকশা ‘এম্বস্’ করে দেওয়া হতো। তাতে  লেখা থাকত  ‘Scinde District Dawk’ (সিন্ডে ডিসট্রিক্ট ডওক)। প্রতিটি ডকাটিকিটের মূল্য ছিল দু পয়সা ।
উপমহাদেশের প্রথম ডাকটিকিট
১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জুলাই উপমহাদেশে প্রথম  ডাকাটিকিট প্রথম চালু হলেও তা সিন্ধু প্রদেশ থেকে প্রকাশিত হওয়ায় বলা হয়: ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ১লা অক্টোবর উপমহাদেশের প্রথম ডাকটিকিট চালু করা হয় । এক পয়সা মূল্যের এই পোস্টকার্ড এবং আধা আনা মূল্যের খামে ভারতের যে-কোনো অংশে চিঠি পাঠানোর ব্যবস্থা ছিল।
ব্রিটিশ ভারতে প্রকাশিত ডাকটিকিট
ব্রিটিশ ভারতে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ডাকটিকেটের সংখ্যা: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির (১৮৫৪-১৮৫৮) শাসনামলে ১৮টি, রানি ভিক্টোরিয়ার (১৮৫৮-১৮৮২) শাসনামলে ১৯টি, রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের (১৮৮২-১৯১১) শাসনামলে ২৪টি, রাজা পঞ্চম জর্জের (১৯১১-১৯৩৫) শাসনামলে ৬৭টি এবং রাজা ষষ্ঠ জর্জের (১৯৩৫-১৯৪৭) শাসনামলে ৫২টি। এ সময় মোট ১৮০টি ডাকটিকিটের মধ্যে ২৮টি ছিল স্মারক ডাকটিকিট।
পাকিস্তানে প্রথম ডাকটিকিট: পাকিস্তানে প্রথম ডাকটিকিট চালু হয় ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে।
বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিট
বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকেট প্রকাশিত হয়, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে জুলাই এবং  ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে জুলাই তা আনুষ্ঠানিকভাবে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। প্রথম ৮টি ডাকটিকিট প্রকাশের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ডাকটিকিটের ইতিহাসের সূচনা।
বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটের ডিজাইনার
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য জন স্টোনহাউসের পরামর্শ অনুযায়ী ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলের শেষদিকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ডাকটিকিট প্রকাশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।অতঃপর  যুক্তরাজ্য প্রবাসী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি গ্রাফিক শিল্পী অধ্যাপক বিমান মল্লিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে এক প্রস্থ ডাকটিকিটের নকশা তৈরি করে দেওয়ার অনুরোধ করেন।তিনি তা যথাসময়ে প্রস্তুত করে দেন।১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে জুলাই বাংলাদেশের প্রথম ৮টি ডাকটিকিট ও ফাস্ট ডে কাভার বিভিন্ন দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ উপলক্ষ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। 
বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটের ছাপাখানা ও মূল্যমান
বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটগুলো প্রকাশিত হয় লন্ডনের ফরম্যাট ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে। মুদ্রিত ডাকটিকিটগুলোর মূল্যমান ছিল ১০পয়সা, ২০পয়সা, ৫০পয়সা, ১.০০রূপি, ২.০০রূপি, ৩.০০রূপি, ৫.০০রূপি, ১০.০০রূপি। ডাকটিকিটগুলোর নকশা প্রণয়ন করেন বিমান মল্লিক।আটটি ডাকটিকিট বিশিষ্ট প্রতি সেটের মূল্য ছিল ২১ টাকা ৮০ পয়সা।
বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটের বিষয়
প্রথম প্রকাশিত ডাকটিকিটগুলোর বিষয় ছিল- বাংলাদেশের মানচিত্র (১০ পয়সা); ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃশংস গণহত্যা (২০ পয়সা), সাড়ে সাত কোটি নাগরিক (৫০ পয়সা), মুক্তিযুদ্ধের পতাকা (১ রুপি), শেকল ভাঙা (২ রুপি), ১৯৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল (৩ রুপি), শেখ মুজিবুর রহমান (৫ রুপি) এবং বাংলাদেশকে সমর্থন করুন (১০ রুপি)।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিট

স্বাধীনতার পর  ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকেট প্রকাশিত হয়। ওই ডাকটিকেটে ছিল শহিদ মিনারের ছবি। বাংলাদেশের প্রথম ডাক টিকিটের ডিজাইনার  ছিলেন  রিপ্টি চিন্টনিশ।বাংলাদেশের বর্তমানে ডাকটিকিট ছাপানো হয় সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস, গাজীপুর থেকে।

বিবিধি

১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ডাকটিকিটের ডিজাইনার ছিলেন কে. জি. মুস্তফা।১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে প্রকাশিত প্রতীক ছিল সংগ্রামের প্রতীক হিসাবে আগুনের ফুলকি, যার ডিজাইনার ছিলেন নিতুন কুন্ডু। সাত বীরশ্রেষ্ঠের স্মরণে প্রথম ডাকটিকেট প্রকাশিত হয় ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর। এর ডিজাইনার ছিলেন আহমেদ এফ করিম।


√ শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক

error: Content is protected !!