ডাক পুরুষ ও ডাকের বচন: প্রজ্ঞাবান এক অবতারের কাহিনি

ড. মোহাম্মদ আমীন
এই পেজের সংযোগ: https://draminbd.com/ডাক-পুরুষ-ও-ডাকের-বচন-প্রজ/

ডাক পুরুষ নামে খ্যাত ডাক  প্রাচীন বাংলার একজন বচনকার। খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত উত্তর ভারতে খনার বচনের চেয়েও ডাকের বচন অধিক জনপ্রিয় ছিল।প্রচলিত মত ও কয়েকজন গবেষকের অভিমত, ডাক ছিলেন একজন গোপ। স্বর্গধামে গমন করে স্বর্গ থেকে প্রয়োজনীয় উপদেশ এবং জ্ঞান নিয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফেরত আসতেন বলে তাঁর নাম ‘ডাক পুরুষ’। অসমিয়া সাহিত্যে বুরুঞ্জি লেখকের মতে, মহাপ্রাজ্ঞ হিসেবে

ড. মোহাম্মদ আমীন

খ্যাত ডাক, উত্তর-পূর্ব ভারতের কামরূপ জেলার বরপেটা মহকুমার অন্তর্গত লোহি ডাঙ্গরা নামক গ্রামে বসবাস করতেন। এখানেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং এখান থেকে তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রচার ও প্রসার।অনেকে মনে করেন, তাঁর জন্ম পূর্ববঙ্গ। বাংলাদেশে প্রচলিত ডাকের বচনের সাহিত্যিক অভিব্যক্তি থেকে ডাককে গোপসন্তান বলা হয়েছে। তবে অসমিয়া সাহিত্যে তিনি কুম্ভকাররূপে অভিহিত। 

ডাক কী এই খ্যাতিমান বচনকারের আসল নাম? শব্দটির অনেক অর্থ রয়েছে। ‘ডাক’ শব্দ দিয়ে মন্ত্রসিদ্ধ বা তন্ত্রশাস্ত্রে অভিজ্ঞ কোনো পুরুষকেও বোঝায়। ডাক শব্দটি এখানে ‘ডাকিনী’ শব্দের পুংবাচক পদ। প্রসঙ্গত, ডাকিনী অর্থ মন্ত্রসিদ্ধা স্ত্রীলোক। বৌদ্ধ তন্ত্রশাস্ত্রে বর্ণিত ডাকিনী শক্তিদেবীর অন্যতম সহচরী। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, ‘ডাক’ ও ‘ডাকিনী’ অর্থে যথাক্রমে তন্ত্রশাস্ত্রজ্ঞ কোনো বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনীকেও বোঝায়।  তবে সাহিত্যে আলোচ্য ডাক বা ডাক পুরুষ-এর অসাধারণ ভূয়োদর্শনকে গুরুত্ব দিয়ে পণ্ডিত ও গবেষকগণ এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে,  ডাক যদি ব্যক্তিবিশেষ কেউ হন তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো গুণী ব্যক্তি।  বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ভবের প্রাক্কালে ডাকার্ণব নামে একটি বৌদ্ধ শাস্ত্রীয় গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। এটাকে ডাকের বচনের প্রামাণিক গ্রন্থরূপে গণ্য করা হয়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল রাজদরবারের পুথিশালা থেকে গ্রন্থটি উদ্ধার করেন।ডাকার্ণব গ্রন্থটি মূলত ডাকের বচনের সমাহার। যদিও অনেকে মনে করেন এখানে খনার বচনেরও প্রভাব পরিলক্ষিত।

 ডাক মহাসিদ্ধ ডাক পুরুষ নাম সমধিক খ্যাত ছিলেন। তিনি ছিলেন ক্ষণজন্মা এবং অত্যন্ত প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী। তাঁর প্রজ্ঞা ও জ্ঞান সাধারণ মানুষকে এতই বিমোহিত করে দিয়েছিল যে, জীবদ্দশাতেও তিনি দেবতা  এবং অবতারের মর্যাদায় উপনীত হন। ডাক পুরুষকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করার উদ্দেশ্যে পলিত হয় লৌকিক উৎসব ডাক সংক্রান্তি। খনার বচন অনেক জনপ্রিয়। তবে তাঁকে নিয়ে কোনো এমন কোনো লৌকিক উৎসব পালিত হয় না। হিন্দু বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী আশ্বিন মাসের শেষ দিনে সমগ্র রাঢ়বাংলার গ্রামীণ হিন্দু কৃষক সমাজ এই উৎসব পালন করে থাকেন। এসময় ধানখেতে ফুল-ধরা সবুজ ধানগাছকে গর্ভিণীগণ্যে পূজা এবং সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মীদেবীর আরাধনা করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠান-আয়োজনের মাধ্যমে কিংবদন্তির  এই মহান ‘ডাক পুরুষ’-এর কাছে পার্থিব-অপার্থিব নানা আশীর্বাদ কামনা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, উত্তর-দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, হাওড়াহুগলিবর্ধমানবাঁকুড়াবীরভূমমেদিনীপুর এমনকি উড়িষ্যাতেও ডাক পুরুষের স্মৃতি ও সম্মানার্থে ডাক সংক্রান্তি পালন করা হয়।

ডাকতন্ত্রে  সিদ্ধ পুরুষ হিসেবেও ডাক অত্যন্ত খ্যাত। তার আবির্ভাব নিয়ে রয়েছে একাধিক জনপ্রিয় জনশ্রুতি  এবং কিংবদন্তি। বঙ্গীয় কৃষক সমাজের কিংবদন্তি অনুযায়ী, দূর অতীতে বাংলায় এক মহাপরাক্রমশালী বলবীর্যবান ও মন্ত্রৌষধি জ্ঞানসম্পন্ন মহাপুরুষ জন্ম নিয়েছিলেন। তিনি প্রতিবছর আশ্বিন মাসের সংক্রান্তির আগের রাতে নির্দিষ্ট শুভলগ্নে লাঠি ও জ্বলন্ত মশাল হাতে বীরত্বব্যঞ্জক ভঙ্গিতে বজ্রের মতো নিনাদ করতে করতে বিধাতার কাছে

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

যেতেন। বিধাতার কাছে গিয়ে তিনি পৃথিবীর মানুষের যাবতীয় দুঃখের বিষয়গুলো ব্যক্ত করে সেসব দুঃখ থেকে পরিত্রাণের উপদেশ এবং আশীর্বাদ নিয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফেরত আসতেন। কথিত হয়, পৃথিবীর মানুষের সংবাদ নিয়ে স্বর্গধামে গমন করে স্বর্গ থেকে প্রয়োজনীয় উপদেশ এবং জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানের রসদ নিয়ে পুনরায় পৃথিবীতে ফেরত আসতেন বলে তাঁর নাম ‘ডাক পুরুষ’। অনেকের মতে, ডাক পুরুষ আশ্বিন-সংক্রান্তির পূর্বরাত্রে নির্দিষ্ট সময়ে পল্লিবাসীকে ডাক দিয়ে উন্মুক্ত প্রান্তরে নিয়ে গিয়ে শারীরিক কসরত বা ব্যায়াম এবং মন্ত্রৌষধির শিক্ষা দিতেন। ডাক দিয়ে এই পুরুষ লোকদের বের করতেন। তাঁর ডাকে সবাই সাড়া দিতেন। তাই তাঁর নাম হয়ে যায় ডাক পুরুষ। 

৩. ডাক সংক্রান্তি

ডাকপুরুষের কিংবদন্তির স্মৃতিকে জিইয়ে রেখে তাঁর সম্মানে এখনো রাঢ়-বঙ্গের নানা অঞ্চলের যুবকরা প্রতিবছর আশ্বিন মাসের সংক্রান্তির আগের রাতে মাঠে গিয়ে সারারাত কুস্তি, লাঠিখেলা, মশাল জ্বালানো প্রভৃতি ক্রীড়া-কৌতুক করেন এবং  রাতশেষে নদী বা পুকুরে স্নান করে পাত্রভরে ‘ডাক জল’ নিয়ে বাড়ি ফেরেন। কৃষক পরিবারের প্রত্যেকে নিমপাতা ও তালশাঁস খেয়ে আনীত জল পান করেন। তাদের বিশ্বাস, এটি ডাক পুরুষের আদেশ বা বাণী। এমন করলে সারাবছর তাদের শরীরস্বাস্থ্য ভালো থাকবে। ধনসম্পদ বাড়বে। ভালো ফসল হবে।
 
ডাক-সংক্রান্তির দিন অনেক জায়গায় ধানখেতে লৌকিক দেবী ‘গাড়সে ষষ্ঠী’র পূজা করা হয় এবং ভোরবেলা ‘ধানে ডাক’ দেওয়া হয়। উৎসবের দিন কৃষকবধূরা ঘরে ঘরে নতুন আউশ ধানের তণ্ডুলের গুড়োর সঙ্গে নারকেল ও গুড় মিশিয়ে পিঠে তৈরি করে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আনন্দোৎসবে মেতে ওঠেন। ওইদিন সমস্ত কৃষিকাজ বন্ধ রাখা হয়। উৎসবের তিন-চার দিন আগে থেকে বাছাই করা শুকনো পাটকাঠি আঁটি করে বেঁধে রাখা হয়। উৎসবের পূর্বরাত্রে মশাল জ্বেলে গ্রামের কৃষকরা ঘুরে বেড়ায় এবং ‘ওহো ওহো’ শব্দ করে আনন্দ প্রকাশ করে।
সকালে প্রজ্জ্বলিত মশালের শেষাংশ একত্র করে বৃহৎ অগ্নিকুণ্ড সৃষ্টি করে গা-হাত-পা-মুখ গরম করে। ভোরবেলা কমবয়স্ক ছেলেরা বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে কুলো পিটিয়ে নিচের ছড়াটি আবৃত্তি করে পুরো গ্রামকে জাগিয়ে তোলে —
“আশ্বিন যায় কার্তিক আসে
মা লক্ষ্মী গর্ভে বসে
আমন ধানের সার বসে।
এপারের পোকামাকড় ওপারেতে যায়
ওপারের শিয়াল কুকুরে ধরে ধরে খায়।
হোঃ হো হো—।”
নানা স্থানে নানাভাবে এই উৎসব পালন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম অঞ্চলে কার্তিক মাসের শেষদিন ‘ডাক সংক্রান্তি’ বা ডাক উৎসব পালন করা হয়। এদিন স্থানীয় অধিবাসীরা ধানগাছের কাছে গিয়ে বলেন— ‘ধান ফুলো, ধান ফুলো—’। বাঁকুড়ায় কার্তিক সংক্রান্তিকে ‘মাথান ষষ্ঠী’ও বলা হয়। মেদিনীপুর অঞ্চলে ঐদিন ধানখেতে শরকাঠি পোঁতার সময় কৃষকরা সমস্বরে বা এককভাবে ছড়া কাটেন—
“অন্ সরষে শশার নাড়ি
যারে পোকা ধানকে ছাড়ি
এখানে আছে খুদমালিকা
এখানে আছে ওল
মহাদেবের ধ্যান করে বল রে হরিবোল।”

৪. ডাকের বচন

আমরা প্রায় সবাই খনার বচনের সঙ্গে কমবেশি পরিচিত, ডাকের বচন বিষয়ে অনেকে তেমন একটা জানি না। খনার বচনের মতো ডাকের বচনও প্রায় অভিন্ন এবং জনপ্রিয়। খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত উত্তর ভারতে খনার বচনের চেয়েও ডাকের বচন অধিক জনপ্রিয় ছিল। ডাক তাঁর বচনকে ‘ডাকর কথা’ বলেছেন, চাকমা ভাষায় যা ‘দাগর কধা’ নামে পরিচিত। ডাকের কথা ডাকার্ণন গ্রন্থে সংকলিত। ‘খনার বচন’ রচয়িতার প্রকৃত নাম লীলাবতী; লীলাবতী আর্যার প্রণেতা ও খনা একই ব্যক্তি।

ভাব ও ভাষা বিচারে পণ্ডিতগণ ডাকের বচনগুলোকে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে রচিত বলে মনে করেন। যা চর্যাপদের প্রায় সমসাময়িক বা চর্যাযুগের শেষদিকে রচিত। তবে বর্তমানে প্রাপ্ত অনেক বচনে এরূপ প্রাচীনত্ব পরিলক্ষিত হয় না।  এর কারণ, লোকর মুখে মুখে বচনগুলোর প্রচলন ছিল এবং কার্যত কোনো লিখিত রূপ ছিল না। তাই  যুগের প্রবাহে মূল বচনগুলোর ভাষিক গঠনের পরিবর্তন ঘটেছে।  তবে ডাকার্ণবে ডাক-এর অবিকল বচন পাওয়া যায়। তদ্‌সত্ত্বেও কোনো কোনো বচনের প্রচার সীমিত ছিল বলে সেগুলির প্রাচীনত্ব একেবারে লুপ্ত হয়নি। এখানে তেমন কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করা যায়: 

১.  বুদ্ধা বুঝিয়া এড়িব লুন্ড।

আগলে হৈলে নিবারিব তুন্ড\

২. ডাঙ্গা লিড়ান বন্ধন আলি।

তাতে দিও নানা শালী\

৩. ভাষা বোল পাতে লেখি।

বাটাহুব বোল পড়ি সাথি\ 

৩নং কবিতাটি অনেকের মতে, বাংলা সাহিত্যে ভাষা নিয়ে রচিত প্রথম সুস্পষ্ট কবিতা। এটি ছাড়া বাংলা ভাষায় ভাষা নিয়ে এত সুস্পষ্ট উল্লেখের কোনো কবিতা বা পঙ্‌ক্তি চর্যাপদ বা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। ডাকের বচনে বাঙালির জীবনাচরণের সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক বিষয়ে নানা মনস্তাত্ত্বিক ঘটনার  কৌতূহলোদ্দীপক প্রকাশও লক্ষ করা যায়। এসব প্রবাদ/প্রবচন প্রমাণ করে যে, এসব বচনের রচয়িতাগণ এ দেশেরই লোক ছিলেন। একটি বচনে ঘর ও ঘরনি সম্পর্কে সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বলা হয়েছে:

‘ঘরে স্বামী বাইরে বইসে।

চারিপাশে চাহে মুচকি হাসে\

হেন স্ত্রীয়ে যাহার বাস।

তাহার কেন জীবনের আশ\

জীবনের অনিত্যতা সম্পর্কে ডাকের উপদেশ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। চর্যা যুগের শেষদিকে রচিত হলেও ডাকের বচনের ভাব ও ভাষা বেশ সহজবোধ্য। অনেকগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের যুগেও বাস্তবে অনুসৃত। ‘ঋণ করেও ঘি খাও’;  চার্বাকের এ নীতির প্রতিধ্বনি শোনা যায়  ডাকের বচনে। যা আরও স্পষ্ট আরও ব্যাখ্যাবহুল ও বাস্তব। ডাক বলেন:

‘ভাল দ্রব্য যখন পাব।

কালিকারে তুলিয়া না থোব\

দধি দুগ্ধ করিয়া ভোগ।

ঔষধ দিয়া খন্ডাব রোগ\

বলে ডাক এ সংসার।

আপনা মইলে কিসের আর\’ 

‘ডাক’ এর গৃহনির্মাণ সংক্রান্ত একটি বচন আজও গ্রাম বাংলায় সুপ্রচলিত। ‘পূবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ, উত্তরে কেলা, দক্ষিণে মেলা’। এটি একটি  ডাকের বচন। এর অর্থ: আদর্শ গৃহের পূর্বে থাকবে জলাশয়; পশ্চিমে থাকবে গাছ-গাছালি, উত্তরে থাকবে সুরক্ষার বন্দোবস্ত এবং দক্ষিণে থাকবে খোলামেলা। এসব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বাড়িই আদর্শ বাড়ি।  গ্রাম বাংলায় ঘর বাড়ি তৈরি করার সময় এখনো ডাকের এই প্রবচনটি যথাসম্ভব অনুসরণ করা হয়। কথিত হয়, ডাকপুরুষকে স্বয়ং বিধাতা এই উপদেশটি দিয়েছিলেন। এ বচনটি অসমিয়া ও বাংলা উভয় ভাষায় বিদ্যমান।

৫. ডাকার্ণব

তিববতি ভাষায় ডাক ও খনা শব্দের অর্থ প্রজ্ঞাবান। তিব্বতি ভাষায় খনার ব্যুৎপত্তি হচ্ছে স্খম (খন)। নেপালে প্রাপ্ত বজ্রডাকতন্ত্রে ডাকের বচনের মতো প্রবচনমালা পাওয়া যায়। তিব্বতি ভাষায় ডাকার্ণব মানে জ্ঞানসাগর (ডাক+অর্ণব)। বাংলাতেও অর্ণব অর্থ সাগর। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও দীনেশচন্দ্র সেনের মতে ডাকার্ণব বাংলা ভাষার আদিগ্রন্থ। এটি কৃষি, জ্যোতিষশাস্ত্র, গণস্বাস্থ্য ও প্রাত্যহিক জীবন সংক্রান্ত প্রাজ্ঞিক-বচনাদিতে লিখিত একটি অমূল্য গ্রন্থ। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র ও বরাহের বৃহৎসংহিতায় আবহবার্তা ও উপর্যুক্ত বিষয়সমূহে বহু শ্লোক রয়েছে। ডাকের বচনগুলিতে উভয় গ্রন্থের প্রভাব আছে। তবে ডাকের কথা ও খনার বচনে সামসময়িক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অভিযোজিত হয়েছে।

অসমিয়া ডাকভণিতায় ডাকের কথার ১১টি প্রকরণের কথা বলা হয়েছে, যথা: জন্মপ্রকরণ, রন্ধনপ্রকরণ, নীতিপ্রকরণ, বৃষলক্ষণ, গৃহিণীলক্ষণ, কৃষিলক্ষণ, জ্যোতিষপ্রকরণ, বর্ষালক্ষণ ইত্যাদি। বাংলা বচনগুলির বিষয় হলো আবহাওয়াবার্তা, কৃষি, ফল ও ফসল, পশুপালন, গণস্বাস্থ্য, জ্যোতিষ ও হোরাশাস্ত্র, বর্ষফল, যাত্রালগ্ন, বিধিনিষেধ, পরমায়ুগণনা, নারীর লক্ষণ, গর্ভস্থ সন্তান, প্রশ্নগণনা ইত্যাদি। ডাকের জন্মপ্রকরণ আত্মকথামূলক। খনার বচনেও আত্মকথন আছে, যেমন: ‘আমি অটনাচার্যের বেটী। গণা বাছায় কারে বা অাঁটি\’ (উল্লেখ্য যে, খনার বাবা ছিলেন একজন আচার্য ঠাকুর)।

ডাকের কথা মোটামুটি একই ছন্দে রচিত। কিন্তু খনার বচনে ছন্দবৈচিত্র্য আছে। উভয় বচনে দুই চরণের অন্ত মিল আছে এবং মিলের জন্য অনেক সময় শব্দ বিকৃত হয়েছে। এক চরণের খনার বচন পাওয়া যায়, যা প্রবাদরূপে প্রচলিত; তবে দুই থেকে চার চরণের বচনের সংখ্যাই অধিক। কিছু কিছু খনার বচন গীতিকবিতার মতো বেশ দীর্ঘ। বাংলা ডাকের কথায় এক চরণ ও দুই চরণবিশিষ্ট বচনের সংখ্যাই বেশি। এক চরণের কিছু ডাকের কথাও প্রবাদে ঠাঁই পেয়েছে।

ডাকের বচন ও খনার বচন

‘দক্ষিণ মুখী ঘরের রাজা’ এটি খনার বচন। যাত্রাকালে শূন্য কলসি দেখা বা হাঁচির শব্দ শোনাকে অনেকে এখনো অশুভ বলে মনে করে। অসময়ে বাড়িতে দাঁড়কাকের ডাক শুনলে গৃহবাসী আতঙ্কিত হয়। ডাইনে সাপ ও বামে শেয়াল দেখলে অনেক পথিক  একে এখনো অশুভ লক্ষণ মনে করে। বিবাহের পূর্বে ভাগ্যবতী সুশীলা ও সুনিপুণা নারী নির্বাচন করা হয় ডাক ও খনার বচনের আদর্শে। বাঙালির দৈনন্দিন কার্যকলাপ, আচার-অনুষ্ঠান, সংস্কার ও বিশ্বাস আজও জ্ঞাত-অজ্ঞাতসারে ডাক ও খনার বচন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যদিও আধুনিক সভ্যতা এতে প্রভাব বিস্তার করেছে।

অসমিয়া ডাকভণিতায় ডাকের কথার ১১টি প্রকরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যথা: জন্মপ্রকরণ, রন্ধনপ্রকরণ, নীতিপ্রকরণ, বৃষলক্ষণ, গৃহিণীলক্ষণ, কৃষিলক্ষণ, জ্যোতিষপ্রকরণ, বর্ষালক্ষণ ইত্যাদি। বাংলা বচনগুলো বিষয় হলো আবহাওয়াবার্তা, কৃষি, ফল ও ফসল, পশুপালন, গণস্বাস্থ্য, জ্যোতিষ ও হোরাশাস্ত্র, বর্ষফল, যাত্রালগ্ন, বিধিনিষেধ, পরমায়ুগণনা, নারীর লক্ষণ, গর্ভস্থ সন্তান, প্রশ্নগণনা ইত্যাদি। ডাকের জন্মপ্রকরণ আত্মকথামূলক। খনার বচনেও আত্মকথন আছে, যেমন: ‘আমি অটনাচার্যের বেটী। গণা বাছায় কারে বা অাঁটি\’ (উল্লেখ্য যে, খনার বাবা ছিলেন একজন আচার্য ঠাকুর)।

ডাকের কথা মোটামুটি একই ছন্দে রচিত। কিন্তু খনার বচনে ছন্দবৈচিত্র্য আছে। উভয় বচনে দুই চরণের অন্ত মিল আছে এবং মিলের জন্য অনেক সময় শব্দ বিকৃত হয়েছে। এক চরণের খনার বচন পাওয়া যায়, যা প্রবাদরূপে প্রচলিত; তবে দুই থেকে চার চরণের বচনের সংখ্যাই অধিক। কিছু কিছু খনার বচন গীতিকবিতার মতো বেশ দীর্ঘ। বাংলা ডাকের কথায় এক চরণ ও দুই চরণবিশিষ্ট বচনের সংখ্যাই বেশি। এক চরণের কিছু ডাকের কথাও প্রবাদে ঠাঁই পেয়েছে।

খনার একটি আত্মকথামূলক বচনে আছে: ‘ভাষা বোল পাতে লেখি। বাচাহুব বোল পড়ি সাথি\’; এখানে ‘বোল’ মানে বুলি। দীনেশচন্দ্র সেন মনে করেন, বচনটিতে ভাষার প্রাচীনত্ব রক্ষিত হয়েছে। এর বক্তব্য থেকে ধারণা হয় খনা তাঁর বচনগুলি গাছের পাতায় লিখে পাঠ করতেন এবং এভাবেই তা বাঁচাতে চেয়েছেন।

খনার অনুসারী জ্যোতিষীদের মধ্যে প্রজাপতি দাস প্রণীত পঞ্চস্বরা বা গ্রন্থসংগ্রহ (আনু. ১৪শ শতক) গ্রন্থে প্রচুর খনার বচন, বিশেষত হোরাশাস্ত্রীয় বচন উদ্ধৃত হয়েছে। ইংরেজ আমলে কলকাতা থেকে গ্রন্থটি মুদ্রিত হয়। একই সময়ের ষষ্ঠীদাসের জ্যোতিষগ্রন্থেও বহু খনার বচন উদ্ধৃত হয়েছে। উনিশ শতকের শেষদিক থেকে বিশ শতকের তৃতীয় দশক পর্যন্ত আলোচনাসহ খনার বচনের বারোটিরও বেশি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে পি.এম ভট্টাচার্যের বৃহৎ খনার বচন প্রধান। এ সময়ের মধ্যে ডাকের কথা ও ডাকপুরুষের কথা শীর্ষক দুটি সংকলন প্রকাশিত হয়। কৃষি, কৃষিতত্ত্ব, কৃষক ইত্যাদি নামে প্রকাশিত অন্তত দশটি উৎকৃষ্ট সাময়িকপত্রের প্রতি সংখ্যায় অজস্র বচন উদ্ধৃত হয়েছে। অসমিয়া সাহিত্যর চাণেকী গ্রন্থে ডাক-ভণিতায় প্রায় এক হাজার ডাকের কথা সংকলিত হয়েছে।

খনার বচনে ব্যাবহারিক কথা, আর ডাকের কথায় নীতিকথা বেশি; এ কারণেই হয়তো খনার বচন মানুষ বেশি স্মৃতিবদ্ধ করে রেখেছে। উড়িয়া ও বাংলা ভাষায় খনার বচনের একাধিক সংগ্রহ পুস্তিকা আজও পাওয়া যায়। কোনো কোনো বাংলা অভিধান ও পঞ্জিকায় বেশকিছু খনার বচন উদ্ধৃত হয়েছে। আলি নওয়াজ সম্পাদিত খনার বচন, কৃষি ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি গ্রন্থে পাঠান্তরসহ ডাকের কথা, হিন্দি পরাশর বচন, মিথিলার ঘাঘ, ঢংক ও রাজস্থানের ভড্ডরীর বচন এবং তেলেগু কৃষিপ্রবচন সমেত সহস্রাধিক খনার বচন স্থান পেয়েছে।  ডাকের কথা ও খনার বচনে লোকায়ত বাংলার স্বরূপ প্রকাশিত হয়েছে। খনার বচন যে চমৎকার কবিতাও তার প্রমাণ উদ্ধৃত নমুনা থেকে পাওয়া যাবে:

শ্যামাংগী সুকেশী তনু লোমরাজি কান্তা।
সুভুরু সুশীলা কিম্বা সুগতি সুদন্তা।।
মধ্য ক্ষীণা যদি হয় পঙ্কজ নয়নী।
কুলহীনা হইলেও বরেষ্ট দায়িনী।।
কুদন্তা অথবা হয় অধিক ব্যাপিকা।
পিঙ্গল লোচনা অঙ্গ ষষ্ঠী সলোমিকা।।
মধুগুষ্টা যদি হয় রাজার বালিকা।
কুলে শ্রেষ্ঠা হইলেও অরিষ্ট দায়িকা।।
নেপালে প্রাপ্ত একটি কাব্য-সংকলনের নাম কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়। এটি বাংলাদেশেই সংকলিত হয়েছে। কাব্যটির নাম থেকে প্রমাণিত হয় যে, প্রাচীনকালে ‘বচন’ শব্দদ্বারা কবিতাকেই বোঝাত। 
————————————-
অনুসজ্জা: প্রমিতা দাশ লাবণী।
উৎস: 
১. বাংলার লোকসংস্কৃতির বিশ্বকোষ, দুলাল চৌধুরী, আকাদেমি অব ফোকলোর, কলকাতা: ৭০০০৯৪, প্রথম প্রকাশ:২০০৪, পৃষ্ঠা: ২৫৫-২৫৬।
২. আশুতোষ ভট্টাচার্য, বাংলার লোকসাহিত্য, ১ম খন্ড, কলকাতা, ১৯৬৩;
৩. শীলা বসাক, বাংলা ধাঁধার বিষয়বৈচিত্র্য ও সামাজিক পরিচয়, কলকাতা, ১৯৯০;
৪. আশরাফ সিদ্দিকী, লোকসাহিত্য (২ খন্ড, ১৯৯৪), ঢাকা; 
৫. Maria Edward Leach (ed), Standard Dictionary of Mythology, Folklore and Legends, Vols. I, II, New York, 1949;
———————–
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
error: Content is protected !!