ডালকুত্তা: কীভাবে এল নামের ইতবৃত্ত

ড. মোহাম্মদ আমীন

ডালকুত্তা
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, হিন্দি ডালকুত্তা অর্থ— (বিশেষ্যে) লম্বা, ছিপছিপে ও মসৃণ ত্বকবিশিষ্ট শিকারি কুকুরের প্রজাতিবিশেষ। অন্যান্য অভিধানেও একই অর্থ পাওয়া যায়। অভিধানে দেওয়া এই বর্ণনার সঙ্গে ডালমেশিয়ান ও গ্রেহাউন্ড প্রজাতির লম্বা, ছিপছিপে ও মসৃণ ত্বকবিশিষ্ট শিকারি কুকুরের অধিক মিল পাওয়া যায়। অধিকন্তু, ইউরোপীয়দের মাধ্যমে এ দুই প্রজাতির কুকুর তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য ও সহজপাল্য এবং অভিজাত ও শৌখিন হিসেবে বাংলায় বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। সুতরাং, বাংলায় কেবল ডালমেশিয়ান বা গ্রেহাউন্ড নয়; বরং  লম্বা, ছিপছিপে ও মসৃণ ত্বকবিশিষ্ট শিকারি কুকুর হিসেবে প্রথম থেকে উভয় প্রজাতির কুকুরকে ডালকুত্তা বলা হতো। এখন দেখা যাক, ডাল কী?

শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর বাঙ্গালা ভাষার অভিধান গ্রন্থে লিখেছেন: “ডালকুত্তা … [হি—ডাল্‌না=( শিকারীর ভাষায় ) ধরিবার জন্য শিকারের পশ্চাৎ ছাড়িয়া দেওয়া; কুত্তা=কুকুর। পশ্চাদ্ধাবিত হইয়া শিকার করিবার জন্য যে কুকুরকে ছাড়িয়া দেওয়া ( ডালা ) যায়]”জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বর্ণনা দেখে বলা যায়, হিন্দি ডালনা বা ডাল শব্দের একটি অর্থ— ‘শিকারে লেলিয়ে দেওয়া’, ‘শিকারি’। এই ডানা ‘ডাল্‌না’ থেকে ‘ডাল’ ও কুকুর-অর্থে ‘কুত্তা’ মিলিত হয়ে হিন্দি ‘ডালকুত্তা’ নির্মিত হয়েছে। যা বাংলায়  ‘ডালকুত্তা’ রূপে আত্তীকৃত হয়ে অভিধানে এবং বাঙালির মনে স্থান করে নিয়েছে।  সুতরাং,  ডালকুত্তা অর্থ— শিকারি কুকুর, শিকারে লেলিয়ে দেওয়া কুকুর।  অর্থাৎ, ডালমেশিয়ান বা গ্রেহাউন্ড যে প্রজাতিরই হোক না, লম্বা ছিপছিপে মসৃণ ত্বকবিশিষ্ট শিকারি কুকুর মাত্রই ডালকুত্তা বা ডালকুকুর।

সাধারণভাবে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়া ডালকুত্তা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন শান্ত মেজাজের অধিকারী বেশ বন্ধুবাৎসল কুকুর। এর বড়ো একটি গুণ হলো বুদ্ধিমত্তা। ডালকুত্তাকে সামান্য বা সাধারণ প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও অল্প সময়ে বেশ সহজে  নানা কাজের জন্য দক্ষ করে তোলা যায়। তাই  এটি প্রথম থেকে উপমহাদেশের অভিজাত মহলে জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। ইংরেজ আমলে বাংলার প্রায় সব অভিজাত ও ধনী বাবুদের বাসায় ডালকুকুর থাকত। শিকার ছাড়াও ডালকুকুর পালন ছিল একটি আভিজাত্যের পরিচায়ক। নজরুলের ‘লিচু চোর’ কবিতায় অভিজাত বাবুদের ডালকুকুর কী করেছে দেখা যাক—

"বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাড়া।"

নজরুলের এই কবিতা হতে দেখা যায়, ডালকুত্তা শব্দের বাংলা হলো: ডালকুকুর। অনেকের মতে, ডালমেশিয়ান  হতে হিন্দি ডালকুত্তা নামের উদ্ভব। যা বাংলায় নিজস্ব শব্দ হিসেবে আত্তীকৃত হয়ে যায়। প্রসঙ্গত, ক্রোয়েশিয়ার ঐতিহাসিক ডালমেশিয়া (Dalmatia) অঞ্চল ছিল এজাতীয় কুকুরের আদি জন্মস্থান। এখান থেকে প্রজাতিটি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিস্তি বনাম ভিস্তিওয়ালা

ভিস্তি ফারসি শব্দ। ভিস্তি থেকে ভিস্তিওয়ালা।  অভিধানমতে, ভিস্তি অর্থ— ১.পানি বহনের জন্য চর্মনির্মিত এক প্রকারের থলি, মশক। ২.মশকে করে পানি বহনকারী; মশকে পানি সরবরাহকারী; ভিস্তিওয়ালা। অর্থাৎ ভিস্তি ও ভিস্তিওয়ালা সমার্থক। “জুতা আবিষ্কার” কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—
“তখন বেগে ছুটিল ঝাঁকে ঝাঁক
মশক কাঁখে একুশ লাখ ভিস্তি।
পুকুরে বিলে রহিল শুধু পাঁক,
নদীর জলে নাহিকো চলে কিস্তি।”

এখানে ভিস্তি মানে ভিস্তিওয়ালা, ভিস্তি তো আর ছুটতে পারে না। এখন কেউ মশকে পানি সরবরাহ করে না। অভিধানে বর্ণিত মশকও নেই। তাই বর্তমানে ভিস্তি ও ভিস্তিওয়াল শব্দদুটোর প্রচলন নেই।

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ফারসি ভিস্তি অর্থ— (বিশেষ্যে) অধুনালুপ্ত জলবহনের জন্য ব্যবহৃত মেষাদি পশুর চামড়ার তৈরি থলি, মশক; মশক ভরে জল সরবরাহ যার পেশা।

 
 
 
error: Content is protected !!