ডিরোজিয়ো, ইয়ং বেঙ্গল, সর্বশ্রেষ্ঠ প্রথম আধুনিক ভারতীয়, ইন্ডিয়ান গেজেট, কলকাতা গেজেট, অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন, উপমহাদেশের সবচেয়ে কমবয়সী অধ্যাপক, প্রথম অধ্যাপক, মুক্তবুদ্ধির প্রথম পথিকৃৎ, সর্বশ্রেষ্ঠ বালক প্রতিভা, আধুনিক ভারতের প্রথম জাতীয় কবি

ড. মোহাম্মদ আমীন

হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিয়ো

ডিরোজিয়ো, ইয়ং বেঙ্গল, সর্বশ্রেষ্ঠ প্রথম আধুনিক ভারতীয়, ইন্ডিয়ান গেজেট, কলকাতা গেজেট, অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন, উপমহাদেশের সবচেয়ে কমবয়সী অধ্যাপক, প্রথম অধ্যাপক, মুক্তবুদ্ধির প্রথম পথিকৃৎ, সর্বশ্রেষ্ঠ বালক প্রতিভা, আধুনিক ভারতের প্রথম জাতীয় কবি

সর্বশ্রেষ্ঠ আধুনিক ভারতীয় হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিয়ো ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল কলকাতার এন্টালি-পদ্মপুকুর এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা  ফ্রান্সিস ডিরোজিয়ো  খ্রিস্টান ইন্দো-পর্তুগিজ খ্রিষ্টান। মা  সোফিয়া জনসন ডিরোজিয়ো ছিলেন ইংরেজ। তাঁর পারিবারিক নাম ছিল ‘ডি রোজারিয়ো’। ডিরোজিয়ো ছিলেন মিশ্র পর্তুগিজ— ভারতীয় এবং ইংরেজ বংশোদ্ভূত। তাই সাধারণ বিবেচনায় তিনি  ইঙ্গ-ভারতীয়। তবে তিনি নিজেকে ভারতীয় বলতেন।

অধ্যয়ন:  ডিরোজিওর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় ছয় বছর বয়সে ডেভিড ড্রমণ্ড নামের এক স্কটিশের  প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুলে।  চৌদ্দ বছর বয়সে ডিরোজিও ড্রমন্ডের স্কুলের অধ্যয়ন শেষ করেন।  এসময় তার বাবা মারা যান। ফলে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। তিনি পিতার অফিসে কেরানির চাকরি নেন। কিছুদিন পর চাকরি ছেড়ে ভাগলপুরে মাসির বাড়ি চলে যান। মাসির স্বামী আর্থার জনসন ছিলেন ভাগলপুরে নীলকুঠির মালিক। মাসির বাড়ির কাছেই গঙ্গা নদী। গঙ্গা নদী তাঁর কবিতার প্রেরণা। গঙ্গার তীরের  দৃশ্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন।

ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান বালক:  ডিরোজিও তাঁর লেখা কবিতাইন্ডিয়া গেজেট  পত্রিকায় পাঠাতে শুরু করেন। ১৮২৫ খ্রিষ্টাব্দে বহুমুখী সংবাদপত্র এবং সাময়িকীতে কবিতা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কাব্যিক প্রতিভা ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। বোদ্ধা  সমাজ বালক ডিরোজিওর কবিতা পড়ে বিস্মিত।  সেই কিশোর বয়সে তিনি মুক্তচিন্তক এবং কলকাতার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভাবান হিসেবে স্বীকৃতি অর্জ ন করতে সক্ষম হন। ইন্ডিয়া গেজেট এবং ক্যালক্যাটা জার্নাল সংবাদপত্র তাঁর শিক্ষাগত উৎকৃষ্টতা (বিভিন্ন শিক্ষাগত পুরস্কার সহ) এবং ছাত্র নাটকে তাঁর সফল প্রদর্শনের সংবাদ প্রকাশ করে। বালক ডিরোজিও যখন বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের Lectures on Philosophical Theology গ্রন্থের জমজমাট সমালোচনা লিখে ফেলেন তখন পুরো ভারতবর্ষ হতভম্ব হয়ে যায় তার প্রতিভায়। বালক বয়সে তিনি ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ প্রতিভার স্বীকৃতি পেয়ে যান। 

ইন্ডিয়া গেজেট, ডিরোজিও  এবং কলকাতা গেজেট: আর্থিক কারণে ডিরোজিয়োকে ১৪ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে হয়।  তিনি প্রথমে তাঁর পিতার কলকাতা কার্যালয়ে যোগদান করেন। পরে  কাকার ভাগলপুর নীল কারখানায় বদলি হযন।১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দে ইন্ডিয়া গেজেট প্রকাশিত ডিরোজিয়োর কবিতা দেখে পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক জন গ্রান্ট এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে,   আঠারো বছর বয়স্ক ডিরোজিয়োর পাণ্ডুলিপি থেকে একটা বই প্রকাশের সুযোগ দিয়ে কলকাতায় ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানান। এর পর তিনি গ্রান্টের সহযোগী সম্পাদক হয়েছিলেন।  কয়েক বছর পর ডিরোজিও প্রকাশ করেন বিখ্যাত সংবাদপত্র ক্যালকাটা গেজেট । 

উপমহাদেশের সবচেয়ে কমবয়সী অধ্যাপক: ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে কবিতার বই ছাপানোর জন্য কলকাতা আসেন। তার শহর আগমনের খবর পৌঁছে যায় সর্বত্র। বিখ্যাত হিন্দু কলেজে (বর্তমান প্রেসিডেন্সি কলেজ)-এ  চতুর্থ শ্রেণির জন্য সাহিত্য ও ইতিহাসের একজন শিক্ষক প্রয়োজন ছিল। কলেজ কর্তৃপক্ষ ডিরোজিওকে প্রস্তাব দিলে তা তিনি সানন্দে গ্রহণ করেন।   ডিরোজিয়ো ১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে ১৭ বছর বয়সে নতুন হিন্দু কলেজের ইংরেজি সাহিত্য এবং ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে  নিয়োগ পান। ১৮ বছর বয়সে তিনি হিন্দু কলেজের ইংরেজি সাহিত্য এবং ইতিহাসের অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ‍এত কম বয়সের অধ্যাপক পৃথিবীতে বিরল। 

প্রথম কবিতার বই: ১৮২৭ খ্রিষ্টাব্দে ডিরোজিওর প্রথম কবিতার বই ‘দ্যা পোয়েমস’ প্রকাশিত হয়। ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ  ‘দ্যা ফকির অব ঝঙ্গীরা অ্যান্ড আদার পোয়েমস’। ভাগলপুরের নদীতীরে ঝঙ্গীরা নামক আশ্রমে এক ফকির বাস করতেন। এই ফকিরের জীবনযাপন গ্রন্থটির মূল উপজীব্য। 

অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন: অল্পদিনের মধ্যেই ডিরোজিও শিক্ষার্থীদের মধ্য  এত উৎসাহের সঞ্চার করতে সক্ষম হন যে, তাঁর সহায়তায় ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। মানিকতলার এক বাগানবাড়িতে প্রতিষ্ঠানের  পাক্ষিক সভাগুলি অনুষ্ঠিত হতো।  এর মাধ্যমে তিনি মুক্তবুদ্ধির প্রসার ও ধর্মীয় গোঁড়ামি মুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধারণা প্রধান করে যেতে থাকেন। 

মুক্তবুদ্ধির প্রথম পথিকৃৎ:  ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে রাজা রামমোহন রায় ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। যারা হিন্দু আদর্শকে মানলেও পৌত্তলিকতাকে অস্বীকার করেছিল তারা তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন। ইতোমধ্যে ডিরোজিয়োর সমাজ পরিবর্তনের ধারণা ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলেছিল। তিনি একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত এবং চিন্তানায়কে পরিণত হন।  অল্পকালের মধ্যে কলেজে তাঁর চারপাশে একদল বুদ্ধিমান ছেলের গোষ্ঠী তৈরি হয়। তিনি তাঁদেরকে মুক্ত চিন্তা, প্রশ্ন করা এবং অন্ধভাবে সবকিছু গ্রহণ না-করতে অনুপ্রাণিত করতেন। তাঁর কার্যকলাপ বাংলায় বৌদ্ধিক বিপ্লব ঘটাতে সমর্থ হয়েছিল। এটাকেই বলা হয়েছিল য়ং বেঙ্গল আন্দোলন এবং তাঁর ছাত্রদের বলা হোত ডিরোজিয়ান্স। ধর্মের প্রতি তাদের মনোভাব ছিল ভলতেয়ারের মতো। হিন্দু ধর্মকে খোলাখুলিভাবে নিন্দা করতেও তারা ইতস্তত করেনি।

ইয়ং বেঙ্গল: ইয়ং বেঙ্গল: ইয়ং বেঙ্গল হলো  ডিরোজিয়োর নেতৃত্বে হিন্দু কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত একটি মুক্তবুদ্ধির বুদ্ধিবৃত্তিক  আন্দোলন। এর সদস্যবর্গ হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও-র অনুসারী ছিলেন।  ডিরোজিও তাঁর ছাত্রদের  জ্ঞানানুরাগী হতে এবং যে কোনো অন্ধবিশ্বাস পরিত্যাগ করে মুক্তবুদ্ধি আর নিজকীয় চিন্তায় নির্ভরশীল হওয়ার প্রেরণায় উদ্‌বুদ্ধ করেতেন।  ডিরোজিওর দ্বারা প্রচন্ডরূপে প্রভাবিত ছাত্ররাই একত্রে ‘ইয়ং বেঙ্গল’ নাম ধারণ করে। এরা হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন সংস্কার ও রীতিনীতিকে এক কথায় মেনে না নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ধর্মে নিষিদ্ধ খাবার-দাবার গ্রহণ শুরু করেন, গর্বভরে প্রচারও করেন। এসব করার জন্য অনেকের পরিবারের সাথে বিচ্ছেদও ঘটে যায়। শুধু রক্তের সম্পর্কের বাইরেও এই নব্যবঙ্গের সদস্যরা গড়ে তোলেন গভীর বন্ধুত্ব। এদের মধ্যে কেশব সেন, রামতনু লাহিড়ী, রাধানাথ শিকদার, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, গৌরদাস বসাক, ভূদেব মুখোপাধায়, বঙ্কুবিহারী দত্ত, শ্যামাচরণ লাহা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এদের সবাই ডিরোজিওর সরাসরি শিষ্য নন, কয়েকজন তার ভাবধারা তার মৃত্যুর পরও দীক্ষিত হয়েছেন এবং কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁদেরই একজন।

প্রথম বহিষ্কৃত শিক্ষক:  ডিরোজিয়োর বিরুদ্ধে গোঁড়া হিন্দু পরিবার থেকে আগত ছাত্রদের অধিকাংশের মধ্যে ধর্ম বিষয়ে প্রচলিত মতের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস ও ঘৃণা সৃষ্টির অভিযোগে তাঁকে হিন্দু কলেজ থেকে বহিষ্কারের প্রস্তাব করা হয়।  ব্যাপারটা রাধাকান্ত দেবের (১৭৮৪-১৮৬৭) নেতৃত্বে রক্ষণশীল হিন্দুদের কর্তৃত্ত্বাধীন হিন্দু কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিষদের নজরে আনা হয়। সমাজ সংস্কারের নামে প্রথাগত চিন্তাধারার বিরুদ্ধে যাওয়ায় হিন্দু কলেজের শিক্ষক পদ থেকে ডিরোজিয়োকে অপসারণ করার প্রস্তাব  ৬-১ ভোটে অনুমোদিত হয়। ডিরোজিয়োকে বরখাস্তের দাবি শুধু রামকমল সেনের মতো হিন্দুরাই তোলেনি, বরং এইচ এইচ উইলসনের মতো খ্রিস্টানরাও তুলেছিল। ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ডিরোজিয়োকে হিন্দু কলেজ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষে প্রথম বহিষ্কৃত শিক্ষক।

পত্রিকা প্রকাশ:  ইউরেশীয় সম্প্রদায়ের কল্যাণ সাধনের কাজেও ডিরোজিয়ো সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন এবং ‘দ্য ইস্ট ইন্ডিয়ান’ নামে একটি ইংরেজি দৈনিক সংবাদপত্র সম্পাদনা করতে শুরু করেন। তাঁর প্রেরণায় উদ্‌বুদ্ধ হয়ে ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ‘দি ইনকোয়ারার’ নামের একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা এবং পরের মাসে দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ও রসিককৃষ্ণ মল্লিক ‘জ্ঞানান্বেষণ’ নামে বাংলায় (পরে ইংরেজিতেও) একটি সংবাদপত্র প্রকাশ করতে শুরু করেন। 

সোসাইটি ফর দ্য অ্যাকুইজিশন অফ জেনারেল নলেজ:  ডিরোজিয়োর অনুসারী  ছাত্ররা ডিরোজিয়ান্স নামে পরিচিত হতেন। ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলনের সদস্যরা একটা দ্বিতীয় সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যার নাম ছিল সোসাইটি ফর দ্য অ্যাকুইজিশন অফ জেনারেল নলেজ। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের অবস্থা সম্বন্ধে জ্ঞানার্জন এবং তা সম্প্রসারিত করা।

আধুনিক ভারতের প্রথম জাতীয় কবি:  ডিরোজিয়োকে তাঁর জীবদ্দশায় আধুনিক ভারতের  প্রথম ‘জাতীয়’ কবি বলা হতো। কারণ ইঙ্গ-ভারতীয় কবিতার ইতিহাস মূলত  ডিরোজিয়োকে দিয়ে শুরু হয়েছিল। তাঁর কবিতা  টু ইন্ডিয়া – মাই নেটিভ ল্যান্ড এবং দ্য ফকির অব জঙ্গীরা জাতীয়তাবোধ ও দেশাত্ববোধক প্রেরণার প্রথম সর্ব জনীন  প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত।  

রোগাক্রান্ত ও মৃত্যু: ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই ডিসেম্বর ডিরোজিও ধর্মতলা অ্যাকাডেমিতে পরীক্ষা নিতে গিয়েছিলেন। সে দিনই তিনি কলেরায় আক্রান্ত হন। সে সময় রোগটি ছিল দুরারোগ্য। অন্তিমকালে তাঁর পাশে মা ও বোন ছাড়াও ছিলেন কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, জন গ্রান্ট। ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে ডিসেম্বর ডিরোজিও কলেরায় আক্রান্ত হয় মারা যান। গির্জা ও খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে বিরূপ  অভিমতের কারণে পার্ক স্ট্রিটের গোরস্থানে তাকে সমাহিত করতে বাধা দেওয়া হয়। গোরস্থানের বাইরে তাকে সমাহিত করা হয়। 

স্মারক ডাকটিকেট:   ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই ডিসেম্বর ডিরোজিয়োর নামে একটা স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছিল।

 

error: Content is protected !!