ড. মোহাম্মদ আমীনের বাণী: জীবন বাণী

জীবন বাণী: ড. মোহাম্মদ আমীনের বাণী

সংযোগ: https://draminbd.com/ড-মোহাম্মদ-আমীনের-বাণী-জী/

[১]

মিশে যাওয়া মানে পিশে যাওয়া। বাড়ি, মানুষ, গাড়ি, জানোয়ার সবক্ষেত্রে অতি ঘনত্ব ভীষণ ক্ষতিকর। চারাগাছ নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে রোপন করা হয়। ঘেঁষাঘেষি করে রোপন করলে কোনো চারাই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠার সুযোগ পেত না। কারো সঙ্গে একদম মিশে যাবেন না, তাহলে পিশে যাবেন; বরং উপযুক্ত দূরত্বে পাশাপাশি অবস্থান করে স্বাধীনসত্তায় উভয়ে বেড়ে উঠুন। অতি মেশামিশি সস্তাও করে দেয়।

[২]

সন্তান-সন্ততি নিজের ছায়া। নিজের ছায়ার সঙ্গে কখনও লড়াই করা যায় না। মেনে নিতে হয় সব। প্রতিবাদও কোনো কাজ করে না।

[৩]

আমি কি জন্মগ্রহণ করিনি যে, ঘুস দিয়ে জন্ম নিবন্ধন করতে হবে? এ কেমন দেশ, যে দেশে জন্ম নিয়েও জন্মকে নিবন্ধিত করার সময় ঘুস দিতে হয়! জন্ম না নিলে একটা কথা ছিল। আমি তো জন্ম নিয়েছি, তো ঘুস দিতে হবে কেন? জাতি আমার কাছ থেকে উত্তম কী আশা করতে পারে?

[৪]

যারা সারাক্ষণ মৃত্যুচিন্তা করে তারা জীবন্মৃত, প্রকৃতপক্ষে পচার অপেক্ষায় নির্জীব পড়ে থাকা অকল্যাণের প্রতিভূ আর সম্প্রদায়ের আবর্জনা। এদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে পুরো সম্প্রদায়টাই একসময় আবর্জনা হয়ে যায়।

[৫] 

ছেলে কি স্যার তার মায়ের মতো, আই মিন আপনার স্ত্রীর মতো হয়েছে?

তুমি কি কাপড় উলটেও দেখেছ?

সরি, স্যার; বুঝতে পারলাম না।

আমার ছেলে একজন পুরুষ, কিন্তু আমার স্ত্রী একজন মহিলা। পুরুষ কীভাবে মহিলার মতো হয়? ‍ভণ্ডামির একটা সীমা থাকা উচিত।

[৬] 

প্রেমে পড়া আর গর্তে পড়ার তফাত হচ্ছে এই, গর্ত হতে কোনোভাবে উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু প্রেমে পড়লে তা হতে উদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা নেই; এর সমাপ্তি তিল তিল মৃত্যু। আর একটা পার্থক্য, মানুষ ইচ্ছে করে গর্তে পড়ে না, কিন্তু ইচ্ছে করে প্রেমে পড়ে।

[৭]

তুমি যদি অন্যের জিনিসকে আকড়ে রাখ, স্বাধীনভাবে অন্যের ইচ্ছেকে নিবেদিত করার সুযোগ না দাও, বরং বিভিন্নভাবে বাধার সৃষ্টি কর তাহলে তুমি নিশ্চিত একা হয়ে যাবে। এটি দাম্পত্য জীবন-সহ সকল সুসম্পর্কের বিষানল।

[৮]

অপমানকারীকে অপমান করে তার সমকাতারে দাঁড়ানো আমার পছন্দ নয়। পরিবর্তে গুরুত্ব কমিয়ে দূরত্ব বাড়িয়ে দিই। ভীতু বলুন আর উদার বলুন এটাই আমার স্বভাব।

[৯]

আমি যা বলছি তা যদি সবার কথা হয়, তাহলে ওই কথা বলা অনাবশ্যক। চর্বিত চর্বন হাস্যকর। আমার মতামত যদি সবার মতামত হয় তাহলে আমি কোন যুক্তিতে ওটাকে আমার মতামত দাবি করব? আমার মতামতে যত ভিন্নমত আসবে ততই আমার মতামতের মৌলিকত্ব শক্তিশালী হবে।

[১০]

প্রবল বিশ্বাস দুর্বল বিবেচনার লক্ষণ। বিশ্বাস যত দৃঢ় হয়, জ্ঞান তত শীতল ও প্রজ্ঞা তত ক্ষীণ হয়। ব্যক্তি তখন খুব দ্রুত মানসিক ও জ্ঞানগতভাবে অন্ধ হয়ে পড়ে। তার বিবেচনাবোধ বিশ্বাস নামক কুসংস্কারের মলে পরিণত হয়। এই অবস্থাকে বলে উগ্রতা।

[১১]

কেবল সংখ্যাধিক্য যদি শক্তির উৎস হতো, তাহলে এক কোটি বিশ লাখ ইহুদি একশ সত্তর কোটি মুসলিমকে রাঁধুনির বটির নিচে পড়ে থাকা পুঁটি মাছের মতো তার ইচ্ছাবটির ক্রীড়নক বানাতে পারত না। মাথার সংখ্যা নয়, মাথার ভেতরে অবস্থিত মগজই মুখ্য বিষয়।

[১২]

যদি প্রকৃত শান্তি, পূর্ণ স্বস্তি ও ভাবনাহীন জীবন চান তো প্রিয়জনের গোপনীয় বিষয়ে নজর রাখার ন্যূনতম আগ্রহও মন থেকে ধুয়েমুছে ফেলুন। এমন আগ্রহ উভয়ের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।

[১৩]

প্রত্যেকের ধর্ম প্রত্যেকের কাছে পবিত্র। অন্যের ধর্মকে অপমান, অবহেলা বা ঘৃণা করা মানে নিজের ধর্মকে অনুরূপ অপমান, অবহেলা বা ঘৃণার বিষয়ে পরিণত হওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেওয়া। নিজের ধর্ম, মতবাদ ও বাকস্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখার প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে অন্যের ধর্ম, মতবাদ ও বাকস্বাধীনতাকে সম্মান করা।

যে সম্প্রদায় কেবল নিজেকে শ্রেষ্ঠ এবং অন্যকে নিকৃষ্ট মনে করে তারা কূপমণ্ডূক। এরা কেবল নিজেদের শ্রেষ্ঠ এবং অন্যদের নিকৃষ্ট মনে করতে গিয়ে পক্ষান্তরে অন্য সব সম্প্রদায়ের কাছে নিকৃষ্ট আবর্জনায় পরিণত হয়। এমন সম্প্রদায় খুব দ্রুত প্রজ্ঞাহীন, প্রভাবশূন্য ও ভাসমান হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার জন্য অন্য সম্প্রদায়সমূহের কৃতদাসে পরিণত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

যারা অন্যের শান্তি বিঘ্নিত করে তারা কখনও শান্তিতে থাকতে পারে না। নিজের স্বাধীনতা সুরক্ষার প্রথম শর্ত অন‍্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

[১৪]

প্রতিটি ইটে নাম লেখা থাকে। এরূপ নামাঙ্কিত হাজার হাজার ইটের ত্যাগে গড়ে উঠা ভবনে ইটনামের কোনো চিহ্নই থাকে না। কেবল ভবনটাই দৃশ্যমান থাকে। এভাবে হাজার হাজার মানুষের ত্যাগে স্বাধীন হয় দেশ, গড়ে উঠে ইতিহাস, প্রতিষ্ঠা পায় সংস্থা; কিন্তু নাম থাকে কেবল নেতার। প্রকৃত ত্যাগীদের নামচিহ্ন ভবনের ইটের মতো সিমেন্টের আস্তরে ঢাকা পরে যায়।

[১৫]

একটা মেয়ে ব্যভিচার কাজে হাতেনাতে ধৃত হয়েছে। তার বিচার সভায় যোগ দিয়েছেন হাজার হাজার ইহুদি। এসময় ওই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন যিশু খ্রিস্ট।

কী হয়েছে, যিশু জানতে চাইলেন।

বিচারক বললেন, মেয়েটি ব্যভিচার কাজে হাতেনাতে ধরা পড়েছে।

তোমরা কী করতে চাও?

আমাদের মোজেস বলেছেন, এমন অপরাধের একমাত্র শাস্তি প্রস্তর নিক্ষেপ করে হত্যা। আপনি কী বলেন?

যিশু কোনো উত্তর না দিয়ে চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে মুখ করে আঙুল দিয়ে শূন্যে কী জানি লিখে চলেছেন।

ইহুদি নেতারা বারবার তাঁকে একই প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। অবশেষে যিশু চোখ খুলে নেতৃবৃন্দের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের মধ্যে যে নিষ্পাপ সেই ওকে প্রথম পাথরটা নিক্ষেপ করুক।

কথা শেষ করে যিশু আবার চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে শূন্যে লিখতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখেন, অভিযুক্ত মেয়েটি ছাড়া বাকি সবাই চলে গেছেন।

যিশু মেয়েটিকে বললেন, যাও, এমন আর কোরো না।

[১৬]

বাংলা শেখার বহু বাংলা বই আছে। ভালো বাংলা শিখতে চাইলে উইকিপিডিয়া, গুগল প্রভৃতি হতে বাংলা বানান শেখা পরিত্যাগ করুন। ওখানে ত্রিশ ভাগ ভুল। মাতৃভাষা মায়ের মতন। আপনি কি আপনার মাকে অন্যের ঘরে দাসিগিরি করতে পাঠিয়েছেন, না কি পরিত্যাগ করেছেন? নিজের মাকে নিজের ঘরে খুঁজুন। অন্যের কাছে নিজের সত্তাকে ভিক্ষাপাত্র বানিয়ে দেওয়ার মতো ইতরামি আর কিছু হতে পারে না। মনে রাখবেন,
“আপন ঘরে মানায় মা,
কোথাও না আর কোথাও না। ”
— ড. মোহাম্মদ আমীন
[১৭]
আমি স্বর্গ চাই না, স্বর্গের লোভে যারা আকর্ষণীয় পৃথিবীটাকে নরকে পরিণত করার সহিংস উন্মাদনায় লিপ্ত তাদের বিনাশ চাই।
[১৮]
কেউ তোমাকে তোমার ভবিষ্যৎ বুঝিয়ে দেবে না। নিজের ভবিষ্যৎ নিজেকে বুঝে নিতে হয়। অন্যের দ্বারা আরোপিত ভবিষ্যৎ কখনও নিজের নয়, অন্যের ভবিষ্যৎ। আমাদের দেশের অধিকাংশ শিশুর ভবিষ্যৎ অন্যের দ্বারা আরোপিত। তাই তারা যুগের চেয়ে অনেক পিছিয়ে; একবিংশ শতকেও মধ্যযুগের চিন্তায় আচ্ছন্ন থেকে যায়।
[১৯]
মানুষ কি কুকুর জন্ম দেয়? নইলে মানুষ, মানুষ দ্বারাই কুকুরের বাচ্চা অভিহিত হয় কেন? গাধার মধ্যে কোনো মানুষ নেই, কিন্তু হাজার হাজার মানুষ গাধা সম্বোধনে সম্বোধিত হয়। তাহলে মানুষ কি গাধাও জন্ম দেয় শুয়োরের বাচ্চা ডাক শুনেনি এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। মানুষ কি তাহলে শুয়োরও জন্ম দেয়?
মানুষে কুকুরের বাচ্চা, গাধার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা, গন্ডার, বানর, হায়েনা এমন কি জানোয়ার পর্যন্ত আছে; কিন্তু জানোয়ারে কোনো মানুষ নেই। এজন্য বুঝি মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব! যদিও স্বঘোষিত!
কী আজিব জীব মানুষ!
[২০]
বৃদ্ধাশ্রম, গৃহাশ্রমের চেয়ে উত্তম। গৃহাশ্রম অগ্নিকুণ্ড হলে বৃদ্ধাশ্রম দূর হতে আসা ওই অগ্নিকুণ্ডের আঁচ মাত্র। বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর বয়সে গৃহাশ্রমে অবস্থান নিকষ বন্দিত্ব। কেউ থাকে না শোনার, শোনানোর। অধিকার থাকে না স্বাধীনভাবে চলার, আকাশ দেখার কিংবা জোছনায় মেশার। বৃদ্ধাশ্রমে অন্তত স্বাধীনভাবে বলা যায়, চলা যায়, আকাশটা দেখা যায়। একটা বয়সে পৌঁছার পর একসময়ের অতি আকর্ষণীয় মানুষটি আবর্জনা হয়ে যায়। আবর্জনাও মূল্যহীন নয়, তবে আস্তকুঁড়ই হয় তার উপযুক্ত আশ্রয়। ঘরে কেউ আবর্জনা রাখে না, রাখলেও তা হয়ে উঠে ঘৃণা আর বিরক্তির উৎস— ঠিক অক্ষম হয়ে যাওয়া বৃদ্ধ পিতা-মাতার মতো।
“বৃদ্ধ মানায় বৃদ্ধাশ্রমে, আবর্জনা আস্তাকুঁড়
তোমার জন্যও আসছে খোকা
নয় সে তো নয় বেশি দূর!”
[২১]
প্রিয়জন প্রিয় থাকার জন্য কিছু বিষয় গোপন রাখে। আড়ি পাতাও একটি গোপনীয় বিষয়। শত্রুর গোপনীয় বিষয় জানার জন্য যত ইচ্ছে আঁড়ি পাতুন, প্রিয়জনের গোপনীয় বিষয় জানার জন্য সামান্য উদ্যোগও নেবেন না। তাহলে প্রিয়জনও আপনার শত্রু হয়ে যাবে, আপনিও প্রিয়জনের শত্রু হয়ে যাবেন। এমন লোক নিজেও শান্তি পায় না, প্রিয়জনদেরও শান্তি দেয় না। মনে রাখবেন, প্রত্যেকে পৃথক দেহের মতো পৃথক সত্তা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
[২২]
মুষ্টিবদ্ধ হাতের সঙ্গে যেমন করমর্দন করা যায় না, তেমনি প্রোফাইল বন্ধ রেখে প্রদত্ত বন্ধুত্বের আহ্বানও গ্রহণ করা যায় না। এ যেন দরজা বন্ধ রেখে গৃহে প্রবেশের অনুরোধ। আপনার দরজা বন্ধ রাখার পূর্ণ অধিকার আপনার রয়েছে। যাদের প্রয়োজন তারা কড়া নাড়বে; কিন্তু বন্ধ দরজা দিয়ে গৃহপ্রবেশের আমন্ত্রণ কি ভণ্ডামি নয়?
“দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি।
সত্য বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?”
[২৩]
ছেলে আপনার, মেয়েও আপনার; কিন্তু তাদের সত্তাটি আপনার নয়, সম্পূর্ণ তাদের। সুতরাং, ওখানে হস্তক্ষেপ করা মানে নিজের সন্তানদের কাছ থেকে অর্ধচন্দ্র নিয়ে গৃহে অবাঞ্ছিত হওয়ার পথ উন্মুক্ত করা। ভুলেও এমনটি করতে যাবেন না।
[২৪]
আমাকে তুই চিনিস?
কে?
আমি তোর বাপ।
আপনি আমাকে চেনেন?
কে?
আপনার সন্তান।
তুই নচ্ছার আমার সন্তান হতে যাবি কেন?
আপনিই তো বললেন!
কী বলেছি?
আমি তোর বাপ।
Language
error: Content is protected !!