ঢাকার প্রথম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ

ড. মোহাম্মদ আমীন

ঢাকার প্রথম মসজিদ, ঢাকার প্রথম মুসলিম শিলালিপি
পুরান ঢাকায় অবস্থিত বিনত বিবির মসজিদ ঢাকা শহরের প্রথম মসজিদ। নারিন্দা পুলের উত্তর দিকে অবস্থিত বিনত বিবির মসজিদটির গায়ে উৎকীর্ণ শিলালিপি অনুসারে ৮৬১ হিজরি মোতাবেক ১৪৫৭ খিষ্টাব্দে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে তাঁর কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি এটি নির্মাণ করান। মসজিদটি চৌকোনা এবং এতে দুইটি গম্বুজ ও চারটি মিনার রয়েছে। বিনত বিবি মসজিদে প্রাপ্ত শিলালিপ ঢাকার প্রথম মুসলিম শিলালিপি।

ঢাকার প্রথম মন্দির/ জাতীয় মন্দির
ঢাকার প্রথম মন্দির বকশিবাজারের ঢাকেশ্বরী মন্দির। ধারণা করা হয়, সেন রাজবংশের রাজা বল্লাল সেন ১২শ শতকে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বাংলাদেশের জাতীয় মন্দির।

ঢাকার প্রথম গির্জা
১৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দের পর্তুগিজরা হুগলি নদীতীরে একটি বন্দর স্থাপন করার পর এটি তাদের ব্যাবসা বাণিজ্যের পীঠস্থান হয়ে ওঠে। তারা এখানে একটি দূর্গ তৈরি করে। ধর্মকর্ম সম্পাদনের জন্য গোয়া থেকে আগত অগাস্টিয়ান ফ্রায়ার্সদের ক্ষুদ্র একটি দলের রক্ষণাবেক্ষণের সুব্যবস্থা করেন। ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দের ক্যাপ্টেন পেড্রো ট্র্যাভারেস নামের এক ব্যক্তি আকবরের কাছ থেকে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচার এবং চার্চ প্রতিষ্ঠার অধিকার লাভ করেন। পর্তুগিজ নির্মিত এই চার্চটি ১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রকৃত নাম “ইধংরষরপধ ড়ভ ঐড়ষু জড়ংধৎু”.

ঢাকার প্রথম গুরুদুয়ারা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের পাশে অবস্থিত “গুরুদুয়ারা নানক শাহী” বাংলাদেশের প্রথম গুরুদুয়ারা। কথিত হয়, ঢাকার এই গুরুদুয়ারাটি যেখানে অবস্থিত, সে স্থানে ষোড়শ শতকে শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক অল্প সময় জন্য অবস্থান করেছিলেন। শিখ ধর্মের ৬ষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ সিং-এর সময়(১৫৯৫-১৬৪৪ খ্রি.) ভাইনাথ; মতান্তরে আলমাস্ত নামের জনৈক শিখ ধর্ম প্রচারক এস্থানে আগমন করে এটি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। কারো কারো মতে, গুরুদুয়ারাটি নির্মাণের কাজ শুরু হয় ৯ম শিখ গুরু তেগ বাহাদুর সিং এর সময় (১৬২১-১৬৭৫ খ্রিঃ) এবং ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে এর নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয়।

ঢাকার প্রথম ব্রাহ্মসমাজ মন্দির
পাটুয়াটুলীর মুখে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের পাশে ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ শে অগাস্ট স্থাপিত ব্রাহ্মসমাজ মন্দির ঢাকার প্রথম ব্রাহ্মসমাজ মন্দির। ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে দীননাথ সেন, ঢাকায় ব্রাহ্মদের নিজস্ব উপাসনালয় নির্মাণের প্রস্তাব করলে ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ শে অগাস্ট ৯ সদস্যের একটি নির্মাণ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দীননাথ সেন। জনৈক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিজের বাড়িটি ব্রাহ্ম সামাজকে দান করেন। মতান্তরে এই জমির মালিক ছিলেন কলতাবাজারের জামিদারগণ। ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই সেপ্টেম্বর জমি রেজিস্ট্রি হয়। অবশ্য ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে অভয় কুমার দত্ত, পাটুয়াটুলির মোড়ে মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। উমাকান্ত ঘোষ এই মন্দির ভবনের নকশা প্রস্তুত করেন; রামমাণিক্য সেন নির্মাণ কাজ পরিচালনা করেন। দোতলা সমান উচ্চতার একতলা এ মন্দিরটির নির্মাণ ব্যয় প্রায় দশ হাজার টাকা। ডেভিড কফ এ মন্দিরটিকে সেকালে দক্ষিণ এশিয়ার ব্রাহ্ম মন্দিররের মধ্যে সর্ববৃহৎ ও আকর্ষণীয় বলে উল্লেখ করেন। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ শে অগাস্ট মন্দিরের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই ডিসেম্বর মন্দির উদ্বোধন হয়। এই উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন নবাব আবদুল গণি, নবাব আহসানুল্লাহ, ত্রিলোচন চক্রবর্তী, বরদাকিঙ্কর রায়, লক্ষ্মীকান্ত দাস, কৃষ্ণকুমার বসু প্রমুখ। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন দীননাথ সেন।

প্রথম কবরস্থান ও প্রথম শ্মশান
১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার পুরনো নাখাসে মিউনিসিপ্যালিটির তত্ত্বাবধানে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক কবরস্থান স্থাপন করা হয়। ঢাকার প্রথম স্বীকৃত শ্মশানের মধ্যে দয়াগঞ্জ শ্মশানঘাট, পোস্তগোলা ও লালবাগের শ্মশানের কথা জানা যায়।

বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদ
ঢাকার প্রাণকেন্দ্র পল্টনে অবস্থিত বায়তুল মোকাররম মসজিদ বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ। পাকিস্তানের বিশিষ্ট শিল্পপতি লতিফ বাওয়ানি ও তার ভাতিজা ইয়াহিয়া বাওয়ানির উদ্যোগে এই মসজিদ নির্মাণের পদক্ষেপ গৃহীত হয়। তখন মসজিদে একসঙ্গে ৩০,০০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। ধারণক্ষমতার দিক দিয়ে এটি বিশ্বের ১০ম বৃহত্তম মসজিদ। পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার মিলনস্থলে মসজিদটির জন্য ৮.৩০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। সে সময় মসজিদের অবস্থানে একটি বড়ো পুকুর ছিল। যা ‘পল্টন পুকুর’ নামে পরিচিত ছিল। এটি ভরাট করে ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ শে জানুয়ারি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান মসজিদের কাজের উদ্বোধন করেন। সিন্ধুর বিশিষ্ট স্থপতি আব্দুল হুসেন থারিয়ানি মসজিদ কমপ্লেক্সটির নকশা করেন। মসজিদটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবার পর ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ শে জানুয়ারি শুক্রবার প্রথমবারের মতো নামাজ পড়া হয়। ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ শে মার্চ থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এই মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। বর্তমানে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদটি আটতলা। নিচতলায় রয়েছে বিপণিবিতান ও একটি বৃহত্তর অত্যাধুনিক সুসজ্জিত মার্কেট কমপ্লেক্স। দোতলা থেকে ছয়তলা পর্যন্ত প্রতি তলায় নামাজ পড়া হয়। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে সৌদি সরকারের অর্থায়নে মসজিদটি সম্প্রসারিত করা হয়। বর্তমানে এই মসজিদে একসঙ্গে ৪০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।

ঢাকার ইতিবৃত্ত: প্রথম ও প্রধান

error: Content is protected !!