তাউই তালুই-এর তালুক সুলুক

ইউসুফ খান

তাউই তালুই-এর তালুক সুলুক

এই পোস্টের লিংক: https://draminbd.com/তাউই-তালুই-এর-তালুক-সুলুক/

বানানো উচ্চারণ

আসল শব্দ আর তার উচ্চারণ না জেনে বানান দেখে পড়লে যে ভুল উচ্চারণ হয় তার প্রচুর উদাহরণ হয়। রাঢ়ী আমাদিগ্‌কে কথাটাকে বিদ্যাসাগর লিখেছেন আমাদিগকে। এই বানান দেখে আরাঢ়ীরা ভুল উচ্চারণ করে আমাদিগঅকে। বাংলায় অ-কে ও উচ্চারণের প্রবণতা আছে বলে বাঙালী হিন্দি ভরোসা-কে ভরসা লিখতো। যারা লিখতো তারা ভরোসা-ই উচ্চারণ করতো। কিন্তু যারা লেখা পড়ে শিখলো তারা উচ্চারণ করলো ভর্‌সা। এখন সবাই ভর্‌সা-ই বলে। বাংলায় অ্যা-কার নেই বলে ইংরেজি ক্যাবিন-কে বাংলায় কেবিন লিখতো, কিন্তু ক্যাবিন পড়তো। কিন্তু যারা পড়ে শিখলো তারা উচ্চারণ করলো কেবিন্‌। এখন আর কেউ ক্যাবিন বলেই না, সবাই কেবিন। একটু আলাদা একটা উদাহরণ হচ্ছে বীটন-কে ভুল করে বেথুন লেখা এবং বলা।
 
 
নামের ফেরে
ওয়েদার মানে আবহাওয়া আর ক্লাইমেট মানে জলবায়ু। কিন্তু আবহাওয়া আর জলবায়ুর আক্ষরিক মানে একই! দুটো আলাদা জিনিস বোঝাতে একই মানের দুটো আলাদা ভাষার শব্দকে কাজে লাগানো হয়েছে। তেমনি উচ্ছে-র হিন্দি শব্দ হচ্ছে করেলা। কিন্তু বাঙালী তার পুরনো চেনা ছোটো ছোটো উচ্ছেকে উচ্ছে বলে, আর পরে আসা বড়ো বড়ো উচ্ছেকে করলা বলে। এখানেও দুটো আলাদা জিনিস বোঝাতে একই মানের দুটো আলাদা ভাষার শব্দকে কাজে লাগানো হয়েছে!
 
 
দখিন দুয়ার
বাংলা ভাষা মুণ্ডারী-সাঁওতালী উৎসের ভাষা। বাংলার এই অস্ট্রিক কাঠামোয় নানা জাতের ভাষার মাটির প্রলেপ পড়েছে। বাংলায় দ্রাবিড়ের প্রভাব অনেক প্রাচীন, তবে সেন যুগে এসে বাংলায় দ্রাবিড় দাপট বেড়েছে। বাংলা প্রায় দেড়শো বছর ধরে কর্ণাটক থেকে আসা সেন-দের শাসনে ছিলো। তাই বাংলার সমাজ জীবনেও দক্ষিণের দ্রাবিড় প্রভাব অনেক। বাংলার অন্ত্যজদের সঙ্গে দ্রাবিড় সম্পর্ক খুব নিবিড়। বাংলার মনসামঙ্গল নিয়ে যে এত কাব্যাকাব্যি, সেই মঞ্চাম্মা স্বয়ং সাউথাগত। কালীর যে এত রূপ তার মূল ধরে টান দিলে কয়েকটাই হয়তো দূর দক্ষিণে টান পড়বে। যেমন করালী কালী। বাংলা স্থাননাম নিয়ে যেদিন আসল গবেষণা হবে সেদিন বোঝা যাবে বাংলার তলে তলে কত মুণ্ডারী দ্রাবিড় তলানি আছে। যেমন তমলুক কাঁকিনাড়া।
 
সেন রাজারা কর্ণাটকের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে চলতো। এদের সঙ্গে বাংলায় কানাড়ী তেলেগু তামিল লোকজনের যাতায়াত ছিলো। সেন আমলে বাংলায় ভুরি ভুরি কন্নড় তেলেগু তামিল শব্দ ব্যবহার হয়েছে। সেগুলোর অনেক অবশেষ এখনও বাংলা ভাষার ঢেকুরের সঙ্গে চোরা গ্যাসের মতো উঠে আসে। বাঙালী পণ্ডিত প্রথমেই চেষ্টা করে সেগুলোকে আর্যামির আরকে চুবিয়ে মার্ডার করতে, আর সেটা একান্তই না পারলে হতাশ হয়ে শব্দগুলোকে দেশী বলে দাগিয়ে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলে।
 
 
তাউই তালুই
কন্নড় ভাষায় তায়ি মানে মা। সেন আমলে রাজার ভাষার এই মা বাংলায় আসন পাতে। বাঙালী ছেলেমেয়ে তাদের শাশুড়িকে মা ডাকে। কিন্তু দাদাদিদির শাশুড়ি তো আর ভাইবোনদের মা নয়। কিন্তু তারাও তাদের দাদাদিদির শাশুড়িকে ভদ্রভাবে মাতাশ্রী মার্কা ডাক ডাকতে তখনকার প্রচলিত বিকল্প শব্দ তায়ি বলে ডাকতো। দুটো আলাদা জিনিস বোঝাতে একই মানের দুটো আলাদা ভাষার শব্দকে কাজে লাগানো হয়েছে। এই তায়ি পরে তাউই হয়েছে।
 
তেলেগুতে মা হচ্ছে তাল্লি তাল্‌ল্‌ই। এখান থেকে বাংলা তাল্‌ই হয়েছে। তাল্‌ই-র বানান তালই দেখে আমরা তালুই উচ্চারণ করি। এখন বানানও তালুই হয়ে গেছে।
 
দাদাদিদির শ্বশুরকে ডাকার জন্য ভাইবোনদের শব্দ হলো তাউই-বাপ। তার ফলে তাউই হয়ে গেলো তাউই-মা। এ যেন কিং জর্জ ছিলন শুধুই জর্জ, কিন্তু দ্বিতীয় জর্জ আসার ফলে তিনি হয়ে গেলেন প্রথম জর্জ।
 
বাংলার উচ্চবর্ণের মধ্যে তাউই তালুই কথাদুটো তত প্রচলিত নয়। সেই জন্যই আমার এই দক্ষিণপন্থী ধারণা আরও বল পাচ্ছে।
তাত থেকে চাচা কথাটা এসেছে, তাতগু মানেও চাচা, বাবার ছোটো ভাই। বাবার বিয়ান মানে দাদাদিদির শাশুড়ি বোঝাতে তাউই কথাটা পুরুষ মানুষ তাত বা তাতগু থেকে এসেছে এটা কেউ কেউ বলছে বটে কিন্তু তাতে যুক্তি দেখতে পাচ্ছি না। এবং যথারীতি বাকীরা এটাকে দেশী বলে হাত ধুয়ে পালিয়েছে।
বানান লেখক যেমন লিখেছেন তেমন
 
 

শুবাচি জনাব ইউসুফ খানের লেখা

ইউসুফ খানের লেখা ওয়েব লিংক:
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
error: Content is protected !!