তাজিকিস্তান (Tajikistan): ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

তাজিকিস্তান (Tajikistan)

তাজিকিস্তান শব্দের অর্থ তাজিকদের আবাসস্থল। প্রাচীন পারসিভাষী তাজিক নামের নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোক যে ভূখণ্ডে বসবাস করত সেটি বর্তমানে তাজিকিস্তান নামে পারিচিত। তাজিক (Tajik) সোগাডিয়ান ভাষার (Sogdian) শব্দ। এর আঞ্চলিক পারসি উচ্চারণ তাজি(Taz)। তাজিং (Tazig) শব্দটি প্রাচীন আরবীয় বৃহৎ উপজাতি টেরিদের আঞ্চলিক ভাষা হতে এসেছে। এর অর্থ আরব। তারা ছিল নব্য পারস্য, যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। তবে তাদের আরবীয় হতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা ছিল না। অনেকে মনে করেন, তিব্বতি Tag Dzig বাগ্‌ভঙ্গি হতে তাজিকিস্তান শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ বাঘ বা চিতাবাঘ।খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে তাজিকিস্তানে জনবসতি শুরু হয়।

তাজিকিস্তানের মোট আয়তন ১,৪৩,১০০ বর্গকিলোমিটার বা ৫৫,২৫১ বর্গমাইল। জলীয়ভাগের পরিমাণ ১.৮%। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে মোট জনসংখ্যা ৮৬,১০,০০০ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ৪৮.৬। আয়তন ও জনসংখ্যা বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ৯৮-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ১৫৫-তম। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী এর জিডিপি (পিপিপি) হচ্ছে ১৭.৫৫৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার (১২৮-তম) এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ২,২৪৭ ইউএস ডলার। অন্যদিকে ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে জিডিপি (নমিনাল) ৮.৫৭২ বিলিয়ন ইউএস ডলার (১৩৬-তম) এবং মাথাপিছু আয় ৯৪৯ ইউএস ডলার। তাজিকিস্তানের মুদ্রার নাম সুমনি [Somoni (TJS)]। তাজিকিস্তানের অধিবাসীদের তাজিকিজস্তানি বলা হয়।

১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়ন হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর স্বাধীনতা পূর্ণভাবে কার্যকর করা হয়। তাজিকিস্তানের রাজধানীর নাম দুসনাবে। এটি দেশের বৃহত্তম শহর। দুসানবে (Dushanbe) ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ স্টালিনবাদ নাম ধারণ করার পূর্ব পর্যন্ত দাইয়ুসামবে (Dyushambe) নামে পরিচিত ছিল। মানডে বা সোমবার হতে দাইয়ুসামবে নাম গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ, যে গ্রামে শহরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল সেটি একসময় সোমবারে বসত এবং তাই সোমবারের বাজার হিসাবে পরিচিতি ছিল।

তাজিকিস্তান দক্ষিণ-পূর্ব মধ্য এশিয়ার একটি স্থলবেষ্টিত প্রজাতন্ত্র। এর উত্তরে কিরগিজস্তান, উত্তরে ও পশ্চিমে উজবেকিস্তান, পূর্বে গণচীন এবং দক্ষিণে আফগানিস্তান। দেশের ৪৫% এলাকা জুড়ে অবস্থিত গোর্নো-বাদাখশান তাজিকিস্তানের একটি স্বায়ত্তশাসিত এলাকা। এটি একটি জাতিগত অঞ্চল। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান হতে পৃথক হয়ে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের অংশ হিসাবে গণ্য হয়। তাজিকিস্তান প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানের পাশ্ববর্তী দেশ হলেও উভয় দেশের মধ্যে বাস্তবে কোনো সীমান্ত নেই। কারণ দুই দেশের মধ্যখানে অবস্থিত ওয়াকহান করিডোর আফগানিস্তানের অংশ। এ করিডোরের প্রশস্ততা কোথাও কোথাও দশ মাইলেরও কম। এটি একসময় সিল্ক রুটের অন্যতম অংশ ছিল। তবে পরবতীকালে সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়।

তাজিকিস্তানে মহাবীর আলেকজান্ডারের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাজিকিস্তানের বিখ্যাত হ্রদ ইস্কানদারকুল (Iskanderkul), মহাবীর আলেকজান্ডারের সম্মানে রাখা হয়েছে। দশম শতকে ইসমোলি সোমোনি ছিলেন তাজিকিস্তানের জনপ্রিয় শাসক। তার নামে তাজিকিস্তানের সর্বোচ্চ পর্বতের নামকরণ করা হয়। ফারগানা উপত্যাকা একইসঙ্গে তিনটি স্বাধীন রাষ্ট্র তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরগিজিস্তানের অংশ। তাজিকিস্তানের ৯০ ভাগ এলাকা পার্বত্য। আয়তন বিবেচনায় এটি মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে ছোট দেশ। অ্যালুমিনিয়াম, জিংক, সীসা, রাসায়নিক ও নানা রকম সারের উৎপাদন ও কারখানার জন্য তাজিকিস্তান বিখ্যাত।

১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে তাজিকিস্তান দরিদ্র রাষ্ট্রে পরিণত হলেও, ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে তাজিকিস্তান আমু নদীর (আমু দরিয়া) ওপর একটি সেতু নির্মাণ করে। যা তাজিকিস্তানকে আফগানিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ১৩৫ মিটার দীর্ঘ এ সেতু নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করেছে। সেতুটিকে ‘তাজিক-আফগান ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ও বলা হয়। তাজিকিস্তানের জনগণের অধিকাংশ দরিদ্র হলেও শিক্ষার ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী বিনা ব্যয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রেখেছে। তাই তাদের শিক্ষিতের হার অনেক বেশি। শিক্ষিতের হার বিবেচনায় তাজিকিস্তানের স্থান বিশ্বে ১২-তম।

তাজিকিস্তানে ৯০০ নদী এব প্রায় ২০টি প্রধান হ্রদ রয়েছে। দেশের ৯০%-এরও বেশি এলাকা পর্বতময়। পামির পর্বতমালা এবং আলায় পর্বতমালা তাজিকিস্তানে অবস্থিত। দেশটির উত্তর প্রান্তে মধ্য এশিয়ার আরেক প্রধান পর্বতমালা তিয়ান শান পর্বতমালার একাংশ চলে গেছে। পর্বতগুলোর উত্তরে ও দক্ষিণে দুটি নিম্নাঞ্চল রয়েছে। এখানেই তাজিকিরা ব্যাপক পরিমাণে বাস করে। কারাকুল তাজিকিস্তানের বৃহত্তম হ্রদ। সাধারণভাবে এটি ব্ল্যাক লেক (Black Lake) নামে পরিচিত। এর ব্যাস ৩২ মাইল। লাখ লাখ বছরের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় এটি সৃষ্টি হয়েছে। এতে পানি ঢোকার বা বের হওয়ার কোনো পথ নেই। কেবল বাস্পীভবন দ্বারা পানি কমে। মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে জনবহুল এলাকা সির দরিয়া নদীবিধৌত ফের্গানা উপত্যকার একাংশ উত্তর তাজিকিস্তানে পড়েছে। এই দীর্ঘ উপত্যকাটি উত্তরে কুরামিন পর্বতমালা ও দক্ষিণে তুর্কেস্তান পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত।

তাজিক ভাষা ও রুশ ভাষা তাজিকিস্তানের সরকারি ভাষা। এদের মধ্যে তাজিক ভাষাতে প্রায় ৬২% লোক এবং রুশ ভাষায় প্রায় ৫% লোক কথা বলে। এখানে প্রচলিত অন্যান্য ভাষাগুলোর মধ্যে উজবেক (১৬%), ফার্সি এবং পশতু ভাষা অন্যতম।

তাজিকিস্তানে ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ঘোষণা করা হয়। এ বিষয়টি সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোর মধ্যে তাজিকিস্তানকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দানা করেছে। তবে তাজিকিস্তানে অন্য যে কোনো ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের তথ্যানুসারে দেশটির ৯৮ শতাংশ লোক মুসলমান। এদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ সুন্নি এবং ৩ শতাংশ শিয়া মুসলমান। আর বাকি দুই শতাংশের মধ্যে অর্থোডক্স, প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিক খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও ইহুদি রয়েছে। তাজিকিস্তানের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোকে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। এই রেজিস্ট্রেশন ছাড়া কোনো দল উপসনার জন্য একত্রিত হতে পারে না।

১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ নভেম্বর তাজিকিস্তানের বর্তমান পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। একটি পৌরাণিক কাহিনির ওপর ভিত্তি করে তাজিকিস্তানের জাতীয় পতাকার ডিজাইন করা হয়েছে। তাজিকদের বিশ্বাস, স্বর্গ সাতটি অতি মনোহর আর্কিডের উপর স্থাপিত। আর্কিডগুলো সাতটি পৃথক পর্বতে অবস্থিত এবং প্রত্যেক পর্বতের চূড়ায় একটি করে দেদীপ্যমান তারকা রয়েছে। ইসলাম ধর্মে বিভিন্ন ঘটনার কারণে সাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা। তাজিকিস্তানের জাতীয় পতাকায় সাতটি তারকা ইসলামধর্মে বর্ণিত সাতটি স্বর্গের প্রতীক।


গ্যাবন (Gabon): ইতিহাস ও নামকরণ

ঘানা (Ghana) : ইতিহাস ও নামকরণ

রোয়ান্ডা (Rwanda) : ইতিহাস ও নামকরণ

গিনি (Guinea) : ইতিহাস ও নামকরণ

শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka) : ইতিহাস ও নামকরণ

সিরিয়া (Syria) : ইতিহাস ও নামকরণ

তাইওয়ান (Taiwan) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!