তালব্য ও মূর্ধন্য ধ্বনির উদ্ভব

তালব্য ও মূর্ধন্য ধ্বনির উদ্ভব [পার্ট-১]
 
বাংলা ভাষায় তিন পদের শ/ষ/স, তিন পদের ঞ/ণ/ন কিভাবে এল? তালব্য ধ্বনি আর মূর্ধন্য ধ্বনি কতটা আলাদা? জেনে নিই গল্পের মতো।
আগে একটু দেখে নিই বাংলা ভাষা বিবর্তনের প্রধান বাঁকগুলো:
 
বাংলা< গৌড়ীয় অপভ্রংশ< মাগধী প্রাকৃত< আদি ইন্দো-আর্য (ইন্ডিক)< প্রাচীন আর্য (ইন্দো-ইরানিক)< আদি ইন্দো-ইউরোপীয়।
 
সব জীবিত ভাষারই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর একাধিক কথ্য বা আঞ্চলিক রূপ থাকে। আদি ইন্দো-আর্য ভাষার স্ট্যান্ডার্ড রূপটির নাম সংস্কৃত আর কথ্য ভার্শনগুলোর নাম প্রাকৃত। বাংলা এসেছে মাগধী মতান্তরে গৌড়ীয় প্রাকৃত ভার্শন থেকে। প্রাচীন আর্য ভাষার একটি শাখা হচ্ছে ইন্দো-আর্য, আরেকটি শাখা হচ্ছে ইরানিক। প্রাচীন ইন্দো-আর্য তথা সংস্কৃত ভাষায় রচিত ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে বেদ (Veda) আর প্রাচীন ইরানিক জাতির ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে আবেস্তা (Avesta)। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার অন্যান্য শাখাগুলো হচ্ছে গ্রিক, রোমানস (ল্যাতিন, ইতালিক, ফ্রেন্স, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ ও রোমানিয়ান), কেলতিক, জার্মানিক (ডয়েচ, ডাচ, ইংলিশ, ড্যানিশ, নর্স, সুইদিশ ও আইসল্যান্ডিক), স্লাভিক (রুশীয়, সার্বো-ক্রোয়েশীয়, পোলিশ), বালতিক (লিথুয়ানিয়ান), আলবেনীয়, আর্মেনিক, হিত্তাইত ও তোখারীয়।
 
বাংলাসহ ইন্দো-আর্য ভাষাগুলোতে যেমন প্রতিটি বর্গে ৫টি করে ধ্বনি আছে (যেমন ক/খ/গ/ঘ/ঙ), প্রাচীন ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় তেমন পাঁচটি বর্গে ৩টি করে স্পর্শধ্বনি ছিল। যথা kw বর্গ: kw, gw, ghw, ক বর্গ: ক, গ, ঘ, ḱ বর্গ: ḱ, ɡ́, ɡ́h, ত বর্গ: ত, দ, ধ এবং প বর্গ: প, ব, ভ। অদ্ভুত ব্যাপার প্রাচীন সেমিটিক (আরবি-হিব্রু) ভাষাতেও তিনটি করে ধ্বনির বর্গ ছিল: কাফ/গিমেল/ক্বফ, তা/দাল/ত্বোয়া, থা/ধাল/যোয়া, সিন/যা/ৎসাদ এবং ল্সিন/লাম/দ্বদ। পণ্ডিতরা অনুমান করেন কোন এক সময় হয়ত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা আর সেমিটিক ভাষাও অভিন্ন ছিল [যার কাল্পনিক নাম Nostratic], কিন্তু এ তত্ত্বের ভাল প্রমাণ পাওয়া যায়নি, অর্থাৎ এটি প্রমাণিত নয়।
 
ইন্দো-ইউরোপীয় বর্গের তৃতীয় কলামটি (ghw, ঘ, ɡ́h, ধ, ভ) হচ্ছে ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি, অনেক সময় একে murmured ধ্বনি বলা হয়। বর্তমানে কেবল ইন্দো-আর্য ভাষায় এই কলামটি (ঘ, ধ, ভ) আছে, আর সকল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় এই ধ্বনিগুলো হারিয়ে গেছে। যেমন ইন্দো-ইউরোপীয় bhrehter সংস্কৃতে হয়েছে ভ্রাতা/ভ্রাতৃ আর ফারসিতে বেরাদর, গ্রিকে frater, ইংরেজিতে brother আর রুশীয় ভাষায় brato।
যাই হোক, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার পূর্বোক্ত ধ্বনিগুলো সবই স্পর্শধ্বনি (stop বা plosive)। ḱ/ɡ́ বর্গটিকে বলা হয় palatovelar, জিহ্বার পিঠ (dorsal) তালুর সঙ্গে লাগিয়ে এ ধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়। ḱ/ɡ́ খুবই বিরল ধ্বনি, বর্তমান ম্যাসিডোনীয় ভাষায় এই ধ্বনি আছে। ḱ ও ɡ́-এর IPA রূপ হচ্ছে c ও ɟ। বাংলা একাডেমির প্রতিবর্ণীকরণ ও উচ্চারণ অভিধানে যথাক্রমে চ ও জ-এর প্রতিবর্ণ হিসাবে c ও ɟ ব্যবহার করা হয়েছে, টেকনিক্যালি এটা ভুল। কেননা চ ও জ স্পর্শধ্বনি নয়, ঘৃষ্টধ্বনি (affricates)। চ ও জ ধ্বনির IPA প্রতীক যথাক্রমে tʃ ও dʒ। আর ভাষাতত্ত্বে চ ও জ- ধ্বনির সর্বাধিক গৃহীত প্রতিবর্ণ হচ্ছে č ও ǰ [আমরাও č ও ǰ ব্যবহার শুরু করতে পারি]।
 
তালব্য ও মূর্ধন্য ধ্বনির উদ্ভব [পার্ট-২]
 
আমরা ইন্দো-ইউরোপীয় [সংক্ষেপে ই.ইউ বলা যাক] ভাষায় বর্গাকারে ১৫টি স্পর্শধ্বনির কথা পেয়েছি। আদি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় এ ছাড়াও s, তিনটি কণ্ঠ্যধ্বনি (h, h₂ ও h₃), চারটি অন্তস্থ ধ্বনি y, w, r, l এবং দুইটি নাসিক্যধ্বনি m ও n ছিল। আদি ই.ইউ ভাষায় r, l, m, n ধ্বনিগুলো স্বরধ্বনির মতো সিল্যাবিক অর্থাৎ নিজে নিজেও উচ্চারিত হতে পারত। ই.ইউ ভাষাতত্ত্বে r, l, m, n-এর সিল্যাবিক রূপ-কে যথাক্রমে r̥ l̥ m̥ n̥ লেখা হয়। এই সিল্যাবিক r̥ l̥-ই হচ্ছে সংস্কৃত স্বরধ্বনি ঋ ও ৯ (বাংলাসহ আধুনিক ইন্দো-আর্য ভাষাগুলোতে এই সিল্যাবিক বা স্বরতুল্য উচ্চারণ আর নাই)। সার্বো-ক্রোয়েশীয় ভাষায় এখনও সিল্যাবিক r̥ উচ্চারণ আছে। সিল্যাবিক m̥-এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ হচ্ছে আদি ই.ইউ শব্দ ḱm̥tom (শত) যা একটু পর সবিস্তারে বলব।
 
ই.ইউ শাখা ভাষাগুলোতে ḱ/ɡ́/ɡ́ʰ বর্গটির খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিবর্তন ঘটে। গ্রিক, রোমানস, কেলতিক, জার্মানিক ও তোখারীয় শাখায় এই বর্গটি ক-বর্গের (ক/গ/ঘ) সাথে মিলে যায়। এই ভাষাগুলোকে ‘কেন্তুম’ ভাষা বলে। আর ইন্দো-আর্য, ইরানিক, বালতিক, স্লাভিক ও আর্মেনীয় শাখায় kw বর্গটি ক-বর্গের সাথে মিলে যায়, অন্যদিকে ḱ/ɡ́/ɡ́ʰ ধ্বনিগুলোর জায়গায় শিসধ্বনির (s, sh, z- জাতীয় ধ্বনি) উদ্ভব ঘটে। এই ভাষাগুলোকে বলা হয় satem (শতম) ভাষা। পূর্বোক্ত ḱm̥tom (শত) শব্দটি ল্যাতিনে হয়েছে centum (কেন্তুম), জার্মানিক hund (ইংরেজি hundred), গ্রিক katon (হে-কাতন>হেক্টো- একশত); অন্যদিকে সংস্কৃতে হয়েছে শতম, আবেস্তান- satem, স্লাভিক sto, লিথুয়ানিয়ান šimtas (শিমতাস)।
আদি ই.ইউ ḱ ধ্বনির জায়গায় সংস্কৃতে পূর্ণ তালব্য ‘শ’ (ɕ), বালতিক শাখায় আংশিক তালব্য š (ʃ) এবং ইরানিক, স্লাভিক ও আর্মেনীয় শাখায় s ধ্বনির উদ্ভব ঘটে। ɡ́ ও ɡ́ʰ ধ্বনির জায়গায় সংস্কৃতে যথাক্রমে জ ও ঘোষ-হ (ɦ), বালতিক শাখায় ž (ʒ) আর ইরানিক, স্লাভিক ও আর্মেনীয় শাখায় z ধ্বনির উদ্ভব ঘটে। যেমন গ্রিক ডেকা, ল্যাতিন decem (দেকেম), সংস্কৃত দশ। ল্যাতিন equas, সংস্কৃতে অশ্ব। গ্রিকো-ল্যাতিন spek (দেখা), সংস্কৃতে স্পশ্ (>অসূর্যস্পশ্যা)। ই.ইউ ɡ́ʰimos, ইরানিক zima, সংস্কৃত হিম। ইংরেজি know, সংস্কৃতে জ্ঞা। ই.ইউ ɡ́onu থেকে ইংরেজি knee, সংস্কৃতে জানু।
 
তালব্য ও মূর্ধন্য ধ্বনির উদ্ভব (পার্ট-৩)
 
ইন্দো-ইউরোপীয় [ই.ইউ] ভাষাবংশের শতম শাখাসমূহে এরপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। r, u/w, k, i/y ধ্বনিসমূহের পর s (স) থাকলে তা পশ্চাৎ-দন্তমূলীয় শিসধ্বনিতে (সংস্কৃতে ষ, অন্যান্য শতম ভাষায় š/ʃ) পরিণত হয়। ভাষাতত্ত্বে একে ruki sound law বলা হয়। যেমন ই.ইউ wisós থেকে সংস্কৃত বিষ (víṣas), আবেস্তান viša, অন্যদিকে ল্যাতিন virus। ই.ইউ h₁oḱtṓ (আট) থেকে সংস্কৃতে অষ্ট (aṣṭá), আবেস্তান ašta, অন্যদিকে ল্যাতিন octō। ই.ইউ dr̥ḱtós থেকে সংস্কৃতে দৃষ্ট (dr̥ṣṭá), আবেস্তান dərəšta। ই.ইউ h₂éḱs- থেকে সংস্কৃতে অক্ষ ( ákṣa), আবেস্তান aša।
 
সংস্কৃত ব্যাকরণের ষ-ত্ব বিধান এই ruki sound law-এরই পরিবর্ধন মাত্র।
 
এর মাধ্যমে শতম ভাষাসমূহে sh জাতীয় ধ্বনির উদ্ভব ঘটে। আমরা দেখি যে পশ্চিম ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে শ/ষ লেখার জন্য আলাদা বর্ণ নাই। কিন্তু শতম ভাষাগুলোতে (ইন্দো-আর্য, ইরানিক, আর্মেনীয়, স্লাভিক ও বালতিক) সিন/শিন জাতীয় দুইটি আলাদা বর্ণ আছে। অনেক পরে অবশ্য পশ্চিম ইউরোপীয় ভাষাগুলোতেও /শ/ ধ্বনির উদ্ভব ঘটেছে, এখন অনেক জোড়াতালি দিয়ে সেটা লেখা হয় (যেমন ইংরেজিতে sh, ফরাসিতে ch, ইতালিয়ানে sc, ডয়েচ/ডাচ sch)।
 
এইবার তালব্য শ ও মূর্ধন্য ষ- এর উচ্চারণগত তুলনা করি। বাংলাসহ বিশ্বের বেশিরভাগ ভাষায় একটাই hushing শিসধ্বনি (ʃ /শ/) রয়েছে যা আংশিক তালব্য (Palato-alveolar)। অন্যদিকে সংস্কৃত, ম্যান্দারিন ও পোলিশ ভাষায় একদিকে রয়েছে পূর্ণ তালব্য (Alveolo-palatal) ‘শ’ (আইপিএ: ɕ), অন্যদিকে রয়েছে মূর্ধন্য (Retroflex) ষ (আইপিএ: ʂ)। অবশ্য ম্যান্দারিন ও পোলিশ তালব্যধ্বনি কেবল i ও y-এর পূর্বে বসতে পারে, সংস্কৃত তালব্য ‘শ’ সর্বস্থানিক।
 
প্রচলিত ব্যাকরণে বলা হয় যে তালব্য ধ্বনি কঠিন তালু থেকে এবং মূর্ধন্যধ্বনি জিহ্বার ডগার উলটা পিঠ দিয়ে উচ্চারিত হয়। ভাষাতত্ত্বে এই ক্রাইটেরিয়া মানা হয় না, বলা হয় যে একই স্থান থেকে তালব্য ও মূর্ধন্যধ্বনি উচ্চারিত হতে পারে। উচ্চারণের সময় জিহ্বার সামনের অর্ধেকের মাঝখানটা উঁচু হয়ে ওঠাকে বলা হয় palatalization (তালব্যায়ন??)। জিহ্বার মধ্যভাগ উঁচু হয়ে সম্পূর্ণ উত্তল (convex) আকার ধারণ করলে উচ্চারিত হয় পূর্ণ তালব্য (Alveolo-palatal) ধ্বনি। আর গম্বুজের মতো (domed) আংশিক উত্তল আকারে উচ্চারিত হয় ঈষৎ তালব্য (Palato-alveolar) ধ্বনি। অন্যদিকে জিহ্বা উত্তল না হলে (flat) কিংবা নিচের দিকে বসে গিয়ে অবতল (concave) আকার নিলে উচ্চারিত হয় মূর্ধন্যধ্বনি (Retroflex)। ধ্বনি যত তালব্য হয়, সেটা তত কোমল (soft) শোনায়। মূর্ধন্য ষ, বাংলা /শ/ ও পূর্ণ তালব্য ‘শ’-এর মধ্যে মূর্ধন্য ষ কর্কশতর আর তালব্য ‘শ’ সবচেয়ে কোমল। কেউ চাইলে খেয়াল করে দেখবেন অন্যান্য বাংলাভাষী অঞ্চলের তুলনায় ময়মনসিংহ বিভাগের মানুষের উচ্চারিত চ ও শ কোমলতর।
 
error: Content is protected !!