তিনে দুয়ে দশ: প্রথম পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন
বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমার একটি টিউশনির ঘটনা নিয়ে লেখা ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা গল্পের সম্পূর্ণ অংশ নিয়ে লিখিত কিশোর উপন্যাস তিনে দুয়ে দশ-এর প্রথম পর্ব। কিছুদিন আগে সংক্ষিপ্ত গল্পটি একজন শুবাচি শুবাচে দেওয়ার পর বেশ কয়েক জন পুরো উপন্যাসটি শুবাচে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের অনুরোধ করেন। 
একটা টিউশনি করবে?
পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

আমি দুটো টিউশনি করি। আর একটা সম্ভব নয়।

একটা আর কাউকে দিয়ে দাও। কফিল করবে।
উচিত হবে না।
উচিত না হলেও ভালো হবে। রূপ-রস, থ্রিলিং, এক্সাইটিং সব পাবে নতুন টিউশনিতে।
কোথায়?
ষোলো শহর।
ছাত্র না ছাত্রী?
ছাত্র।
তাহলে রূপ-রস আর থ্রিলিং কীভাবে আসবে?
এখানেই তো রহস্য। তুমি আগে শুরু কর, তারপর বুঝতে পারবে।
ছাত্রের বাবা কী করেন?
পুলিশ অফিসার।
কোন ক্লাসে?
কার ক্লাস জানতে চাইছ— ছাত্র না ছাত্রের বাবার?
কথায় কথায় ঢং ধরো না। ছাত্র কোন ক্লাসে পড়ে?
নবম শ্রেণি, সবে অষ্টম শ্রেণি ছেড়েছে।
বাবার র‌্যাংক?
ডিআইজি। জানো, ডিআইজি কী! তোমার থানার ওসি যদি শোনে তুমি ডিআইজির ছেলের গৃহশিক্ষক, তাহলে সে চিংড়ি মাছের মাথার মতো তার মাথাটাও তোমাকে দিয়ে দেবে। ডিআইজি নাম শুনলে গাছের পাতা পর্যন্ত থমকে যায়। বিভাগের বাপ, এসপিদের বস। ডিসিদের সেকেন্ড গড।
বিভাগীয় কমিশনারই তো বিভাগের মা-বাপ।
ব্রিটিশ আমলের কথা বাদ দাও। এখন জেলার মা-বাপ এসপি, বিভাগের মা-বাপ ডিআইজি ।
বিভাগীয় কমিশনার?
ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার। তাঁর বডিগার্ডও পুলিশ।
এতসব কীভাবে জানো?
আমার এক কাকা বিভাগীয় কমিশনার অফিসে চাকরি করেন। তিনি বলেছেন— বিভাগীয় কমিশনারের অফিস জাস্ট পোস্ট অফিস। ডিআইজি একটা নিঃশ্বাস ছাড়লে ঝড় ওঠে। বিভাগীয় কমিশনার তুফান দিলেও কিছু হয় না; গাছের পাতাটি পর্যন্ত নড়ে না। অমন অফিসারের ছেলের হাউজ টিউটর, মানেটা বোঝ?
না ভাই, আমি পারব না।
কেন পারবে না।
বড়ো অফিসারের ছেলেরা বড়ো অফিসারের মতো দেমাকি হয়। শিক্ষকের ওপরও আমলাগিরি ফলাতে চায়। আর ভালো লাগে না। গৃহপালিত আর গৃহশিক্ষক দুটোর মধ্যে সূক্ষ্ম একটা মিল আছে।

ভালো বেতন দেবে। ভালো নাশতা

ড. মোহাম্মদ আমীন

পাবে। পুলিশ পর্যন্ত স্যালুট দেবে। এখন যে টিউশনি কর সেখানে খাওয়ায় মাস্টার বিস্কুট। এখনে পাবে শ্যালক বিস্কুট। মাস্টারের চেয়ে শ্যালকের দাম অনেক বেশি। শ্যালক, কলিজায় ঘা দিলেও ভালো।

মাস্টার বিস্কুট মানে বেলা বিস্কুট। শ্যালক বিস্কুট আবার কী?
পুলিশ সবাইকে শ্যালক ডাকে। গৃহশিক্ষকও শ্যালক। পুলিশের বাসায় গৃহশিক্ষকদের চায়ের সঙ্গে যে বিস্কুট দেওয়া হয়, সেটাই শ্যালক বিস্কুট। একটা শ্যালক বিস্কুট দিয়ে তুমি একশটা মাস্টার বিস্কুট পাবে। মুখে ঢুকালে তানসেনের গানের মতো সুর তোলে। স্বাদে পায়ের তালু পর্যন্ত মিষ্টি হয়ে যায়। ডায়াবিটিস হওয়ার আগে খেয়ে নাও। সময় পাবে না পরে।
লোভ দিও না।
ডিআইজির বাসার মলা মাছের পেটি আমাদের রুই মাছের মাথার চেয়ে বড়ো। আমার বাবা, ডিআইজি সাহেবের বাসায় প্রতিমাসে যতগুলো মাছ পাঠায় তত মাছ কর্ণফুলি নদীতেও নেই।
এত দেয় কেন?
বড়শিতে কেন মাছ গাঁথা হয়?
বড়ো মাছ ধরার জন্য।
আমার বাবাও একই কারণে ডিআইজি সাহেবের বাসায় মাছ দেয়। অত কথা বলে লাভ নেই, তুমি রাজি হয়ে যাও।
ডিসি অফিসের এক কেরানির বাসায় টিউশনি করেছিলাম কিছুদিন। কেরানির বউয়ের দেমাক দেখে শরীরে আগুন ধরে যেত। আমার দিকে এমনভাবে তাকাত, যেন আমি একটা গৃহপালিত পশু। তোমার মা আমার সঙ্গে এমন আচরণ করেন কেন? জানতে চেয়েছিলাম ছাত্রীর কাছে। ছাত্রী বলেছিল, বাবা ডিসির সিএ না? ডিআইজির বউ কেমন হবে বোঝো।
এরা এমন না। অনেক ভালো।
আর একজনকে দাও। আমার একার পক্ষে চারটা টিউশনি অসম্ভব।
তুমি ছাড়া এই ছেলেকে আর কেউ পড়াতে পারবে না। যেমন মেধাবী, তেমন বিপজ্জনক। শয়তানিতে হিটলার, বুদ্ধিতে স্মাগলার আর ভদ্রতায় ট্রাফালগার।
আমার যে সময় নেই।
সময় বের করে নাও।
আমি বললাম, কীভাবে?
সময় জমিদার বাড়ির ষোড়শী না যে বের করতে ঘাম ফেলতে হবে। মানুষ লেবু চিপে রস বের করতে পারে, শুকনো সরিষা থেকে গ্যালন গ্যালন তেল বের করতে পারে, আর তুমি সামান্য সময় বের করতে পারবে না। এটা কোনো কথা হলো?
সময়ের অপর নাম জীবন।
এই রকম লাখ লাখ জীবন যানজটে হারিয়ে যাচ্ছে। অত কথা বলে লাভ নেই। তুমি টিউশনিটা করবে। নইলে আমার ইজ্জত থাকবে না।
পুলিশে ছুঁলে নাকি ছত্রিশ ঘা। এক ঘা সওয়ার শরীর আমার নেই। ছত্রিশ ঘা! সাদি একটা টিউশনি খুঁজছে, তাকে দাও। সে পুলিশের ছেলে।
দিয়েছিলাম। একুশ দিন টিকেছিল সে। ছাত্র এমন নাকানিচুবানি খাইয়েছে, জীবনে মনে হয় সে আর টিউশনিই করবে না।
সত্যজিৎকে দাও।
পারবে না। ওই ছাত্রের সামনে গেলে সে ভয়ে প্রস্রাব করে দেবে।
পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

তরুণকে দাও।

তরুণ সতেরো দিন ছিল। আঠারো দিনের মাথায় পালিয়ে চলে এসেছে।
আমি কয়দিন পারব?
তুমি শেষ ওষুধ। তুমি না পারলে স্বয়ং সরস্বতীও পারবে না। এত বড়ো পুলিশ অফিসারের বাড়ির মাস্টার-না, ঝাড়ুদার হতে পারাও ভাগ্যের। তার সুপারিশে তোমার চাকরিও হয়ে যেতে পারে। দুদিন পর তিনি আইজিপি হবেন। তখন তার এক অনুরোধে হাজার হাজার লোক এসআই হবে। পারলে আমিই করতাম। আমার তো সে যোগ্যতা নেই।
টিউশনি শুধু টাকার জন্য নয়। এটি টাকার চেয়ে বড়ো কিছু। বিসিএস প্রস্তুতির একটা মোক্ষম কোচিং, টাকা তো আছেই। কোথায় কার ভাগ্য লুকিয়ে আছে কে জানে। বিভিন্ন কিছু চিন্তা করে আমি টিউশনিটা করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
রাজীব বলল, এখনই চলো।
আমি যে কিছু খাইনি?
ডিআইজির বাসায় এমন খাবার খাওয়াবে, রাতেও আর খেতে হবে না। পুলিশ মানুষ তারা, যেমন খায় তেমনি খাওয়ায়।
ক্রমশ: দ্বিতীয় পর্ব—।
———————————————————————-
error: Content is protected !!