তিনে দুয়ে দশ: ঊনবিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

প্রচণ্ড রোদ। পথ তেমন বেশি না হলেও বাস থেকে নেমে হেঁটে ডিআইজি সাহেবের বাসভবনে যেতে যেতে পুরো শরীর ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেল। জ্যেষ্ঠ মাসের রোদ এবার আগুনের হলকা, বদমেজাজি জ্যেষ্ঠের মতোই পীড়াদায়ক। পাঁচ টাকা দিয়ে রিকশায় যাওয়া যায়, কিন্তু রিকশাওয়ালাকে দেওয়া

ড. মোহাম্মদ আমীন

যাবে না। খরচ বেড়ে গেছে ইদানীং, খরচ বেড়ে গেলে খরচ কমিয়ে দিতে হয়। এমাসে গোপালের জামা-কাপড় কিনতে হবে। একশ টাকা প্রয়োজন। পাঁচ টাকা করে জমালে বিশ দিনে একশ টাকা হয়ে যাবে। খরচ কম করাই সবচেয়ে বরকতি আয়।
ফটক পার হওয়ার আগে বডিতে, বডি স্প্রে দিলাম। তবু মনে হলো গন্ধ বের হচ্ছে। অবশ্য ওমর এখন আগের মতো আমার শরীরে দুর্গন্ধ পায় না। যদিও আমি পাই। তার মানে ওমর এখন আমাকে ভালোবাসে। ভালোবাসা দুর্গন্ধের ফরাসি আতর।  ভালোবাসা যেখানে অল্প, দোষ সেখানে অল্পস। মায়ের কিছু নিজ সন্তানের মল ভালোবাসার অফুরন্ত অর্গল। 

রিডিং রুমে ঢোকার আধ মিনিটের মধ্যে ওমর চলে এল। সে এখন জানালার কাচের ফাঁকে চোখ রেখে আমার জন্য অপেক্ষা করে। নতুন প্রেমিক-প্রেমিকারা যেমন করে। দেখামাত্র চলে এল। তার হাতে মার্ক টোয়েনের দি অ্যাডভেঞ্চার্স অব টম স্যোয়ার।
এসিটা বাড়িয়ে দাও, ওমরকে বললাম।
এখন চব্বিশ ডিগ্রি ফারেনহাইটে চলছে। বাড়িয়ে দিলে আরও গরম লাগবে। আপনার শরীর ঘামে জবজব। কমিয়ে দিতে হবে।
ঠিক আছে, কমিয়ে দাও।
বিশ করে দিলাম। টিচার, ঠান্ডা পেতে চাইলে ফ্যান বাড়াতে হয়, এসি কমাতে হয়। মনে থাকবে তো?
থাকবে। তুমি তো এখন বেশ পড়ুয়া হয়ে গেছ।
ওমর টেবিলের বইগুলো গোছাতে গোছাতে বলল, আগে বই দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যেত। এখন বই না দেখলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। আপনি বইয়ের নাম লিখে দেবেন, আমি আনিয়ে নেব। এভাবে বিশাল এক লাইব্রেরি বানিয়ে ফেলব। বইকে আপনি কী বলেছিলেন, স্যার?
অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের সেতুবন্ধ। 
টিচার, পৃথিবীর বৃহত্তম লাইব্রেরি কোনটা?
লাইব্রেরি অব কংগ্রেস; আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে। এখানে ১৬৮ মিলিয়নের অধিক বই আছে।

হ্যাঁ। ওমর টম সয়ার থেকে চোখ না তুলে বলল।

এখন মার্ক টোয়েন রাখো। ইংলিশ গ্রামার বের করো।
আমি এর চেয়ে বড়ো লাইব্রেরি বানাব। আমার লাইব্রেরিতে বই থাকবে ২০০ মিলিয়ন। আপনি হবেন চিফ লাইব্রেরিয়ান।
কথার ফাঁকে ডিআইজি সাহেব রুমে ঢুকলেন, টিচার আপনি কেমন আছেন?
দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বললাম, ভালো।
তিনি আমাকে একটা প্যাকেট দিয়ে বললেন, এখানে স্যুটের কাপড় আছে। আপনি দরজির কাছে দিয়ে রসিদটা জমিরের হাতে দেবেন। ইদের আগে সেলাই করে নেবেন। এটা পরে আমাদের বাসায় আসতে হবে। একসঙ্গে সেমাই খাব। আদেশ এবং অনুরোধ- আসবেন তো?
আসব।
ওমর বলল, ডিআইজি সাহেব, ইদের দিন আমি স্যারের সঙ্গে যাব। স্যার এলে একসঙ্গে চলে যাব। দুদিন থাকব।
গাড়ি নিয়ে যাবে। তুমি যতদিন থাকবে ততদিন গাড়িও থাকবে। গাড়ি করে ঘুরবে। সকালে জমির চলে যাবে।
না। কেউ যাবে না; ওমর বলল, “স্যারের সঙ্গে বাসে চড়ে যাব। রিকশায়  ঘুরব। রিকশাওয়ালার চাটগাঁইয়া গানটা শুনোনি? রিকশা চালাও রসিক বন্ধুরে- – -।” ওমর এমনভাবে কথা বলছে-উভয়ের সম্পর্ক কী তা ভুলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।ওমর একদম স্বাভাবিক।         

 তোমার নিরাপত্তাটা কে দেবে শুনি? ডিআইজি সাহেব বললেন।

দেশে এত ছেলেমেয়ের নিরাপত্তা কে দেয় শুনি?
আমরা দিই।
তাদের সঙ্গে তো কোনো পুলিশ দাও না, গাড়ি দাও না। আমার সঙ্গে কেন?
তারা ডিআইজির ছেলে না।
ওমর বলল, এজন্য তোমাকে বাবা ডাকি না। ডিআইজি ডাকি। তুমি যাও। আমার অনেক পড়া বাকি। তোমার সঙ্গে ফালতু কথা বলে নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। আমি পড়ছি, টিচার সময়ে বড়ো হিসেবি। তুমি যাও।  নিজের হিসেব ষোলো আনা, অন্যের হলে কাড়ি কানা। অসহ্য।

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

ডিআইজি সাহেব বললেন, টিচার, আপনার বেতন আরও চারশ টাকা বাড়িয়ে দিলাম।
আমি তো স্যার রাজা হয়ে যাব!
চারশ টাকা বেতন বাড়লে কীভাবে রাজা হবেন? ডিআইজি সাহেব হেসে বললেন।
আমার রাজ্য ভূমি নয়, টাকাও নয়— মন। মন ইচ্ছা করলে চারশ টাকাকে চার কোটি বানিয়ে নিতে পারে। আবার চার কোটিকে করে দিতে পারে চারশ। রাস্তার হাজার হাজার লোকের হাসি দেখে আমার তাই মনে হয়, স্যার।
আপনি অনেক ভালো মানুষ, বলেই ডিআইজি সাহেব চলে গেলেন।
ওমর বলল, টিচার?
বলতে হবে না, তোমার কমিশন এখন ছয়শ চল্লিশ টাকা হলো।
আমি ভাংতি নেব না। ছয়শ টাকা দিলেই চলবে। কী মজা! আপনার বাড়ছে বেতন আর আমার বাড়ছে কমিশন।
থ্যাংক ইউ, প্রতিমাসে চল্লিশ টাকা, তার মানে বছরে চারশ আশি টাকা— কী করব আমি অত টাকা?
আমার অ্যান্টিম্যাটার সংগ্রহ প্রকল্পে ইনভেস্ট করবেন।
আমার একটা অ্যাস্তোতিন প্রকল্প আছে।
কী?
গোপাল, আমার অলৌকিক শিশু।

তাকে একদিন নিয়ে আসবেন।

তুমি গেলে দেখতে পাবে।
ওমরকে এখন টাকা দিতে কষ্ট হয় না। জীবনে প্রথম শিখলাম: দেওয়া- নেওয়ার মাহাত্ম্য। আটশ থেকে ষোলোশ টাকা। ছয়শ টাকা কমিশন বাদ দিলে আমার থেকে যাচ্ছে এক হাজার টাকা। তার উপর রাজকীয় খাবার, শ্যালক বিস্কুট এবং দেশ-বিদেশের নামিদামি বই পড়ার অফুরন্ত সুযোগ। বিসিএস পাশ আমার নিশ্চিত। ওমর সোনার ডিমপাড়া হাঁস, আধুনিক যুগের জীবন্ত স্মার্ট ফোন। আদেশ দিলেই গুগুল হয়ে চলে আসে জ্ঞানের স্টোর- বই; অ্যান্টিম্যাটার।

শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com
—————————————————-
——————————-
ওয়েব লিংক
তিনে দুয়ে দশ: অষ্টাদশ পর্ব
—————————
অন্যান্য
error: Content is protected !!