তিনে দুয়ে দশ: তৃতীয় ও চতুর্থ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

তিনে দুয়ে দশ: তৃতীয় ও চতুর্থ পর্ব


ডিআইজি সাহেবের স্ত্রীর নাম তানজিমা। আচরণে মার্জিত, রুচিতে প্রমিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। কথায় অমায়িক, আপ্যায়নে আন্তরিক। খুব ভালো লেগে গেল আমার।

ড. মোহাম্মদ আমীন

আপনি মাসে আটশ টাকা করে পাবেন। সপ্তাহে চার দিন আসতে হবে। সময় মেইন্টেইন করলে কৃতজ্ঞ থাকব।
বললাম, আমি ছাত্র, পেশাদার শিক্ষক নই। টাকার কথা বলে লজ্জা দেবেন না। পড়াতে এসেছি, টাকার বিষয়টা পরে দেখা যাবে। আগে শুরু করি।
আমার বাবা ছিলেন শিল্পপতি। তিনি বলতেন- লেনদেনের বিষয়টা সবসময় আগে মিটিয়ে নেওয়া ভালো।
ঠিক আছে ম্যাম। আমি আপনার ছেলেকে পড়াব। আবারও বলছি, অর্থের পরিমাণ-অপরিমাণ নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই।
আমার কথা শুনে হাসলেন মিসেস তানজিমা, কেন ভাই?
আমার বাবা শিল্পপতি নন, অসাধারণ এক সাধারণ মানুষ। তিনি বলতেনÑ শিক্ষাদান কেবল আর্থিক লেনদেনের বিষয় নয়। এটি জীবনদানের বিষয়। অর্থ দিয়ে এর মূল্যায়ন হয় না। অধিকন্তু আমার কাছে আটশ টাকা আর আট টাকার তফাত তেমন বেশি নয়।
কী বললেন?
যেমন টাকা তেমন চলার যোগ্যতা আমি রাখি। তৃপ্তি আসলে ইচ্ছানির্ভর, অর্থনির্ভর কোনো বিষয় নয়। নইলে নিম্ন মধ্যবিত্তের মুখে এত হাসি দেখতেন?
আমার সাহেব পুলিশের লোক। তিনি কোনো কিছুতে ফাঁক রাখা পছন্দ করেন না। আটশ টাকায় রাজি তো?
সে সময় আটশ অনেক মোটা অঙ্কের টাকা। বিসিএস অফিসারদের প্রারম্ভিক বেতন ছিল ষোলোশ পঞ্চাশ। ছাত্র

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

বয়সে দুই ঘণ্টা ব্যয় করে, বিসিএস অফিসারের অর্ধেক বেতন পাওয়ার কথা শুনে আমি খুশি না হয়ে পারিনি। যদিও আমি এর দ্বিগুণ বেতনে একটা টিউশনি করি।
বললাম, ওমরকে ডাকুন।
তানজিমা ম্যাম বললেন, বেতন নিয়ে আপনার কিছু বলার আছে?
আমি বুঝতে পারছিলাম, তিনি আমার সন্তুষ্টির নিশ্চয়তা চাইছেন। বললে আরও বাড়িয়ে দেবেন। আমি সেদিকে গেলাম না। তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, টাকাটা কোনো বিষয় নয়।
তাহলে আসল বিষয় কী?
আপনার সন্তানকে কিছু শেখাতে পারলে এবং তাতে আপনারা সন্তুষ্ট হলে, আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হব। এটাই আসল বিষয়।
বেতন?
আপনাদের ভালোবাসা।
আর টাকা?
ওটা না দিলেও চলবে। আমার আরও দুটি টিউশনি আছে।
কী দেব?
ভালোবাসা।
আপনি বসুন, আমি ওমরকে নিয়ে আসছি।


টাকা এক অদ্ভুত জিনিস। শুধু পরিমাণ দিয়ে এর মান নির্ণয় করা যায় না। টাকার ক্ষমতা ক্রয়ের সামর্থ্যকে ঘিরে চক্করিত। এত আকর্ষণীয় বেতনের টিউশনিটা রাজিব কেন আমাকে দিয়ে দিল বুঝতে পারছিলাম না। অবশ্য সে টিউশনি করে না, বড়োলোকের ছেলে, গাড়ি হাঁকিয়ে চলে। কিন্তু সে অন্য কাউকে না দিয়ে আমাকে দিল কেন? রাজিবের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা আছে, তবে আমার চেয়েও ঘনিষ্ঠ অনেক বন্ধু তার আছে, যাদের অধিকাংশ হিন্দু। ধর্মের প্রতি টান জন্মগত। প্রত্যেকে হন্যে হয়ে এমন একটা টিউশনি খুঁজছে। নিশ্চয় কোনো সমস্যা আছে।
সালাম দাও।
তানজিমা ম্যামের গলা শুনে চোখ তুলে তাকাই। চৌদ্দ-পনেরো বছরের ফুটফুটে এক কিশোর তানজিমা ম্যামকে জড়িয়ে ধরে আমার দিকে তাকিয়ে। তার চোখে লেশমাত্র কৌতূহল নেই, বরং কিছুটা উপহাস আর কিছুটা অবজ্ঞা। দুটোই আমার কাছে ভীষণ কষ্টের মনে হলো।
এই আপনার ছাত্র ওমর।
আমি বললাম, কেমন আছ?
ওমর নিঃশ্চুপ।
তোমার নতুন স্যার। বাবা, সালাম দাও; কিশোরকে উদ্দেশ তানজিমা ম্যাম বললেন।
ওমর বলল, আমি তোমার ছেলে। বাবা নই। আমি বাবা হলে ডিআইজি সাহেব আমার কী হবে? মাম, নতুন একটা লোকের সামনে মিথ্যা কথা বলিও না।
সালাম দাও বলছি।
দেব না। তাকে দিতে বলো।
আমি বললাম, আস্সালামু আলাইকুম।
ওমর বলল, ওয়া আলাইকুম সালাম।
তুমি কেমন আছ?

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

আপনি আসতে না আসতে প্রশ্ন শুরু করে দিলেন। টিচারদের এ অভ্যাসটা আমার একদম পছন্দ না। প্রশ্ন করব আমি, আপনি উত্তর দেবেন। আপনি শিখতে এসেছেন, না শেখাতে এসেছেন?
তানজিমা ম্যাডাম বললেন, একটা থাপ্পড় দেব। সালাম দিতে বলছি, সালাম দাও। বেয়াদবি করা ভালো না।
মাম, তুমি পাগলের মতো কথা বলছ কেন?
ওমর, ভালো হবে না বলছি, সালাম দাও।
আমি সালাম দিতে পারব না। সালাম তো আশীর্বাদ, এটা বড়োদের কাজ।
তোমার বেয়াদবির কথা আব্বু এলে বলে দেব।
বললে তুমিই বকা খাবে। মনে নেই সেদিন ডিআইজি সাহেব কী বলেছিল?
কী বলেছিল?
সারাদিন বাসায় বসে কী কর, জানোয়ারটাকে যদি একটু আদবকায়দা শেখাতে না পার? ইউনিভার্সিটিতে কী পড়েছ? আরও বলব?
তানজিমা ম্যাম বললেন, দেখলেন টিচার, কেমন অসভ্য। আপনার সঙ্গে বেয়াদবি করলে হাড়গুলো মাংস বানিয়ে দেবেন। আমরা কিছু মনে করব না। দিন দিন কন্ট্রোলের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মারতে বলো, মারলে আবার চিল্লাচিল্লি কর কেন? সব দুমুখো সাপ।
তানজিমা ম্যাম বললেন, আমাদের একমাত্র ছেলে।
রাজীব তা-ই বলেছে।
কলিজার টুকরো, হৃদয়ের হৃদয়, পুরো নাম সৈয়দ ওমর সুলতান। তাকে আপনার হাতে তুলে দিলাম, বলেই তানজিমা ম্যাম চলে গেলেন।
রাজীব কেন আমাকে টিউশনিটা দিল এবার বুঝতে পারলাম।

উৎস: তিনে দুয়ে দশ, ড. মোহাম্মদ আমীন, তিনে দুয়ে দশ।


শুবাচলিংক: www.draminbd.com

তিনে দুয়ে দশ: প্রথম পর্ব

তিনে দুয়ে দশ: দ্বিতীয় পর্ব

তিনে দুয়ে দশ: তৃতীয় ও চতুর্থ পর্ব


তিনে দুয়ে দশ: প্রথম পর্ব (শুবাচ লিংক)

তিনে দুয়ে দশ: দ্বিতীয় পর্ব (শুবাচ লিংক)

তিনে দুয়ে দশ: তৃতীয় ও চতুর্থ পর্ব (শুবাচ লিংক)

 

error: Content is protected !!