তিনে দুয়ে দশ: দ্বিতীয় পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

ইউনিভার্সিটি থেকে রাজিবের গাড়িতে করে সোজা ডিআইজি সাহেবের বাসায়। ফটকে কয়েকজন মানুষ পুলিশের পোশাক পরে পাহারা দিচ্ছে। রাজীবকে দেখে ফটক খুলে দিল।

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

ভিতরেও পুলিশের পোশাকপরা কয়েকজন লোক দেখলাম। উঠানের ডান পাশে বাগান। একজন মালী কাঁচি হাতে আগাছা পরিষ্কার করছে। দুজন মানুষ বারান্দায় বসে তিনজন পুলিশের সঙ্গে কানাকানি করছিল। আমি সকৌতুকে চারদিকে তাকিয়ে রাজীবকে বললাম, এটি কি ডিআইজি সাহেবের বাসা?
অফিস-কাম বাসা। এটার আলাদা নাম আছে, ডিআইজি ভবন। শুধু ডিআইজির জন্য বিশেষভাবে নির্মিত। এমন বাড়িকে বাসা বলে না, বাসভবন বলা হয়।
সৌন্দর্যের চেয়ে দাপট বেশি কেন? এমন জায়গা শিশুর বাসযোগ্য হতে পারে, কিন্তু কিশোরদের নয়। অনেকটা কয়েদখানার মতো।
আমি আর রাজীব অতিথি রুমে গিয়ে বসলাম। এখানেও ক্ষমতার দাপট। ক্রেস্ট আর দামি পাথরের ভাস্কর্যে রুম ভর্তি। আমরা যাওয়ার কিছুক্ষণ পর নাশতা এলো। নাশতা এলো বলতে নিয়ে এলো এক ভদ্রলোক। নাশতা তো আর হাঁটতে পারে-না! নাশতার বহর দেখে আমার চোখ কপালে।
এত নাশতা কেন?
রাজীব ফিসফিস করে বলল, চুপ। এটা ডিআইজির বাসা।
কয়েক মিনিট পর এক ভদ্রমহিলা ঢুকলেন। রাজীব উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ভাবি সালাম। আমি রাজীবকে অনুসরণ করলাম।
ভদ্রমহিলা, সবুজ-গোলাপি রঙের পাটাতনের উপর বিচিত্র চিত্র আঁকা শাড়ি পরেছেন। গোলাকার মুখে হাসি আর ব্যক্তিত্ব, দুটোই

ড. মোহাম্মদ আমীন

ভারিক্কি সৌজন্যে সজাগ। আমি একবার তাকিয়ে একটা ইংরেজি ম্যাগাজিন টেনে নিয়ে চোখ বুলাতে শুরু করি।
ভদ্রমহিলা আমাদের অদূরে একটা সোফায় বসতে বসতে বললেন, আপনারা কেমন আছেন?
রাজীব বলল, ভালো।
পথে কষ্ট হয়নি তো?
না। আপনারা কেমন আছেন? ওমর কোথায়?
ছেলেটার জন্য ভারি চিন্তায় আছি।
ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে রাজীব আমাকে বলল, ইনি ডিআইজি ভাবি। মানে, তোমার ছাত্র ওমর সুলতানের মা।
আমি আবার সালাম দিলাম, আসসালামু আলাইকুম।
রাজীব আমাকে দেখিয়ে বলল, ভাবি এ-ই আপনার ছেলের নতুন টিচার। অসাধারণ বুদ্ধি, প্রবল মেধা রাখে।
টিচার তো ভাই কম দেননি। ছেলেটাকে পড়ানোর মতো একজনও পাওয়া গেল না। এত বড়ো শহরে একটাও কি ভালো টিচার নেই?
লজ্জা পেয়ে গেল রাজীব। আমি তার চেয়েও বেশি।

আত্মরক্ষার গলায় রাজীব বলল, ভাবি, শেষবারের মতো দেখুন। এ যদি না পারে তাহলে, আই অ্যাম সরি।
সরি, কেন ভাই?
আর কেউ আপনার ছেলেকে পড়াতে পারবে না। যদি আমার এ বন্ধু না-পারে।
মিসেস ডিআইজি বললেন, কেন যে ছেলেটাকে কোনো শিক্ষক পড়াতে পারছে না, বুঝতে পারছি না। সীমাবদ্ধতাটা কার?
আমি বললাম, অবশ্যই শিক্ষকের। রোগ ধরতে না পারলে চিকিৎসা করবে কীভাবে?
মিসেস ডিআইজি বললেন, পনেরো-বিশ দিনের বেশি কোনো টিচার টিকছে না। গত এক বছরে ত্রিশ জনের অধিক শিক্ষক বদলাতে হয়েছে। স্কুলের টিচার আনলে দুই দিনও পড়াতে পারে না। একজন স্কুল টিচারকে থাপ্পর পর্যন্ত মেরেছে।

মহিলা টিচার আনেন?
এনেছিলাম, আরও ভয়ংকর অবস্থা হয়েছে। একদিন পর চলে গেছে। সবাই আমার ছেলেটাকে বকাবকি করে, মারে। টিচার শাসন করবে ঠিক আছে। শাসনের নামে পুলিশ হয়ে যেতে হবে কেন?
রাজীব হেসে বলল, ভাবি, পুলিশের বাসায় ঢুকলে সবাই পুলিশ হয়ে যায়।
আমি বললাম, ওমর কী বলে?
মিসেস ডিআইজি বললেন, তার অভিযোগ একটাই। শিক্ষক পড়াতে পারছেন না, বোঝাতে পারছেন না। শুধু মারেন।

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

রাজীব বলল, সমস্যা আছে। তবে তোমার কাছে সমাধান আশা করছি।
মিসেস ডিআইজি বললেন, কী যে করি? ডিআইজি সাহেবকে প্রতিদিন জবাবদিহি করতে হয়। বেচারা রাতদিন ডিউটি করেন। রাতে বাসায় এসে ছেলের খবরাখবর নিয়ে রেগে যান। আমি চিন্তায় সারারাত ঘুমাতে পারি না। কিছু খেতে পারি না, অস্থির লাগে। শুধু ছেলেটার কথা মনে পড়ে। এত বড়ো অফিসারের ছেলে, শেষ পর্যন্ত গণ্ডমূর্খ হয়ে থাকবে বুঝি!
আমি বললাম, চিন্তা করবেন না ম্যাডাম। আমি চেষ্টা করব। আশা করি ওমর সবার প্রত্যাশিত ছেলে হয়ে উঠবে।
রাজীব বলল, এখন ভাবি আমি আসি?
মাঝে মাঝে আসবেন ভাই।

ক্রমশ: তৃতীয় পর্ব।

সূত্র: তিনে দুয়ে দশ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

Language
error: Content is protected !!