তিনে দুয়ে দশ: পঞ্চদশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন
 
ভয়ে ভয়ে ডিআইজি সাহেবের অফিস কক্ষে ঢুকে সালাম দিলাম। কী জানি কেন ডেকেছেন। নিশ্চয় জরুরি কিছু। ওমর কি তাহলে খুবই অশোভন কিছু করেছে? এমন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। আমাকে দেখে ডিআইজি সাহেব হ্যান্ডশেকের জন্য ডান হাত বাড়িয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বললেন, প্লিজ বসুন।
ড. মোহাম্মদ আমীন

আমি বসার সঙ্গে সঙ্গে কনস্টেবল চা-নাশতা নিয়ে এল। ড্রয়ার থেকে একটা রেডিমেড শার্ট, একটা টাই এবং কয়েকটা গেঞ্জি বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এগুলো আপনার জন্য।

থ্যাংক ইউ, স্যার।
কনস্টেবল এসে উপহারগুলো একটি সুন্দর প্যাকেটে ভরে আমার সামনে রেখে চলে গেলেন।
ভালো আছেন? প্রশ্ন করলেন ডিআইজি সাহেব।
জি।
আমার এক বন্ধুর ছোটো বোন, খুব ভালো ছাত্রী। তাকে মাঝে মাঝে গিয়ে যে একটু পড়াতে হবে।
আমি তিনটা টিউশনি করি।
একটু কষ্ট হবে। প্রয়োজনে আপনার আসা-যাওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করবে। আপনার সুবিধামতো যাবেন, আসবেন; নো প্রবলেম।  অনেকদিন থেকে তারাও আমার মতো শিক্ষক-সমস্যায় ভুগছেন। গল্পে গল্পে আপনার কথা বলে ফেলি। সঙ্গে সঙ্গে অনুরোধ করে বসে— আমি যেন আপনাকে তার বোনের টিচার হওয়ার অনুরোধ করি। খুবই ক্লোজ ফ্রেন্ড, না করতে পারলাম না।
কিন্তু স্যার?
মেয়েটি অসাধারণ। যেকোনো শিক্ষক তাকে পড়াতে পারবে না। ওমরের চেয়েও ভয়ানক। আমি মনে করি, একমাত্র আপনিই তার উপযুক্ত। কেবল মেধা দিয়ে পড়ানো যায় না। পড়াতে হলে প্রতিভা লাগে। আপনার দুটোই আছে।
ভয় পেয়ে গেলাম। ওমরের চেয়ে ভয়ানক, অধিকন্তু মেয়ে। এই মেয়ে নির্ঘাত ডাইনি হবে, কপালে আমার খারাবি আছে মারাত্মক। এখন কী হবে? ডিআইজি সাহেব থেকে রেহাই পাওয়া যাবে মনে হয় না। পুলিশের আবদার আদেশের চেয়ে কঠিন। তবু এত বড়ো একজন লোক প্রশংস করছেন—শরীরটা বকের পালকের চেয়ে হালকা হয়ে গেল। প্রশংসা লাশের লোমেও শিহরন ছড়িয়ে দেয়, আমি কোন ছাড়।
টিচার?
জি।
মেয়েটা অনেক ভালো। প্রথম সাক্ষতেই আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ত। খুব মজা পাবেন পড়িয়ে। আপনিও অনেক জানতে পারবেন। মসজিদের ইমামের মতো ফরজ আদায়ের সওয়াব এবং চাকুরির বেতন—একসঙ্গে। আমি অবসর পেলে তার কাছে ছুটে যাই গল্প করার জন্য। আরে ভাই, কাজে আনন্দ না থাকলে সেটা তো জবরদস্তি।
ডিআইজি সাহেবের বন্ধু, নিশ্চয় হোমড়াচোমড়া কেউ হবে। রাজার বন্ধু রাজাই হয়। সবচেয়ে বড়ো কথা, তিনি এমনভাবে বললেন—না করতে পারলাম না। ছাত্রী অধিকন্তু ভয়ানক— আলাদা আকর্ষণ আমার মনে গুঞ্জন শুরু করে দিল।
বললাম, ঠিক আছে।
আপনি তাহলে ওয়েটিংরুমে অপেক্ষা করুন। কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার বন্ধু চলে আসবে। বিশাল ধনী লোক। তবে লেখাপড়া জানে না। কথায় কষ্ট পাওয়া চলবে না। মনে করবেন— ওটাই ওদের কালচার।
আমি ওয়েটিংরুমে চলে গেলাম। সত্যি সত্যি কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডিআইজি সাহেব একজন মোটা-কালো মাঝবয়সি লোকসহ

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

ওয়েটিংরুমে ঢুকে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ইনি আমার বন্ধু। খুব সহজ-সরল মানুষ। মনটা পুলিশের চেয়ে বড়ো। লেখাপড়া করেনি- এ আর কী! লেখাপড়া করলে পয়সাটা কামাতো কে? তাই না, গণি?

আমি দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম।
ডিআইজি সাহেব লোকটিকে উদ্দেশ করে বললেন, এ আপনার ব্রিলিয়ান্ট বোনের শিক্ষক।
মোটা কালো লোকটা আমাকে নিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, আঁর নাম গণি কোম্পানি। আঁর বইন সেলিমা তলোয়ারত্তুন বেশি ব্রেইনি। পুরা উপজেলাত বদ্দা এইল্যা ব্রেইনি মাইয়ো-পোয়া আঁর নাই। হনো মাস্টার পড়াইত ন-পারে। মাস্টাররে পড়াই দে। মাইয়া নয়, কিরিচ।
কোথায় পড়ে আপনার বোন?
সে নিউটনের ছাত্রী।
কার ছাত্রী?
নিউটনের।
নিউটনের ছাত্রী হলে আবার আমাকে কেন নিচ্ছেন?
এবছর ক্লাস এইডুত্তন নাইনুত উইট্টেদে। রোল এক।
আমি বললাম, নিউটনের ছাত্রী নয়, বলুন— নিউটেনের ছাত্রী।
 নিউটন আর নিউটেন এক জিনিস।
 নিউটন কে জানেন?
জানি তো।
কে?
এইডুত্তুন নাইনুত উডিলে ইতারে নিউটন হয়। ওবা মাস্টার, ঠিক আছে না?
আপনার কীসের ব্যাবসা?
মেডিও আছে, সোনাও আছে। পানিও আছে বিষও আছে। অনত্তে কিছু লাইলে হইয়ুন। বেয়াকগিন দিত পাইজ্জুম। কী লাইগব আপনার?
আমার লাগার মতো কিছু আপনি দিতে পারবেন না।
আঁর এই গাড়ির দাম হতো জানো না?
আমি এত ছোটো গাড়িতে চড়ি না।
কিয়ত চড়ন দে?
বাসে।
—————————————————–
শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com
——————————-
ওয়েব লিংক
error: Content is protected !!