তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন
ওমরের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। বিশ দিন পর রেজাল্ট। সে তিন সপ্তাহের জন্য ইউরোপ ভ্রমণে যাবে। গত বছর গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। কী ভাগ্য! কর্ম হোক যেনতেন, জন্ম হোক ভালো। ধনীর মেয়ে কালোও শশী, বোচকা গালে ভোরের হাসি।
হায়াৎ মামুদ ও ড. মোহাম্মদ আমীন

সামানে আমার পরীক্ষা। কিছুদিন অ্যাকাডেমিক বইগুলো গিলতে হবে— বিরক্তিকর কাজের একটি। কিন্তু পাশের জন্য গিলতে হয়। পাশ না করলে সনদ পাব না, সনদ না পেলে চাকুরি পাব না। চাকুরি না পেলে খাব কী? ডিআইজি সাহেবও সনদ দিয়ে চাকুরি নিয়েছেন।

সেলিমা পড়বে। আকিদ-মুহিবকেও পড়াতে হবে। লজিং বাড়ি ছেড়ে একটা ভালো মেসে উঠে গেলাম। এটি অভিজাত মেস হিসেবে পরিচিত।
ইউরোপ যাবার আগের দিন ডিআইজি সাহেব গাড়ি পাঠালেন। বাসায় নয়, অফিসে যেতে বলেছেন। বিশেষ কথা আছে। ওমর আর তানজিমা ম্যাম ঢাকা। ডিআইজি সাহেব বিকেলে ঢাকার উদ্দেশে চট্টগ্রাম ছাড়বেন। আগামীকাল ছাড়বেন বাংলাদেশ।
ডিআইজি সাহেব আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। গাড়ির আওয়াজ শুনে এগিয়ে এলেন, কেমন আছেন?
ভালো।
এক মাস পর চলে আসবেন।
দেখি।
আসতে হবে।
চেষ্টা করব।
দেশে ফেরামাত্র সেলিমাকে টেলিফোন করব।
আমার জন্য আপনার বাসা অনেক দূরের পথ। ওমরের এখন সমস্যা নেই। সে নিজে নিজে পড়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। একজন ভালো টিচার দিই?
 বুসেফিলাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আলেকজান্ডার প্রয়োজন। ওমর বুসেফিলাস, আপনি আলেকজান্ডার।
ডিআইজি সাহেবের উক্তির মধ্যে সত্যতা থাকুক বা না থাকুক, আমি খুশি হলাম। প্রশংসা দায়িত্বকে কর্তব্যের চূড়ায় তুলে দিতে পারে। আমি মুগ্ধ হলাম, মোহিত হলাম প্রাণিত আবেগে। প্রশংসা প্রার্থনার নিঃশ্বাস, ঈশ্বর কী খুশি হন প্রশংসায়।
পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

ডিআইজি সাহেব আমার হাতে একটা খাম এগিয়ে দিয়ে বললেন, এটি রাখুন।

কী?

আগামী দুই মাসের বেতন।

বুঝলাম, আমার আগমন নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা। সবিনয়ে প্রত্য্যখ্যান করে বললাম, আমি ওমরকে ভালোবাসি, আমি আসব।
বিদায় নিয়ে চলে এলাম।
দিন চলছে দিনের মতো। একা হলেই ওমরের কথা মনে পড়ে যায়। তার হাসি, হতভম্ব করে দেওয়া কথা, বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ, হঠাৎ বিব্রতকর মন্তব্যে মাথা গরম হয়ে যাওয়া লজ্জা— সব আমার মনে ধিকধিক করে চিকচিক আনন্দে। চোখের পলকে বিশ দিন শেষ। রেজাল্টের খবর জানি না।আশা করি ভালো করবে।
তেইশ কী চব্বিশ দিন পর মেসের বাবুর্চি এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, স্যার ওমর আইস্যে।ওয়ারে একজন ভদ্দরলোক আছে, মনে অয় ডিআইজি সাব। রাজিব স্যারও আছেন। অনরে ডাহেদ্দে। মেসের বেয়াকগুনোরলাই এক গাড়ি জিনিস আইন্নে।
সত্যি! প্রশ্ন নয়, আবেগভরা আনন্দ। আমি আপ্লুত। চৌকাঠের বাইরে পা দিতে না দিতে দেখলাম ওমর। সে দৌঁড়ে এসে পা ছুঁয়ে সালাম করে জড়িয়ে ধরল। আমি হতবাক। এই প্রথম সে আমাকে সালাম দিল, তাও আবার কদমবুসিতে।
তুমি সালাম দিতে শিখেছ?
বাবা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
তুমি ডিআইজি সাহেবকে বাবা ডাক?
লজ্জার হাসি দিয়ে ওমর বলল, ডিআইজি কারও বাবা হতে পারে না। আপনি বলেছিলেন— বাবা বাবাই। হোক সে ডিআইজি কিংবা ভিক্ষুক।
কথার মাঝখানে ডিআইজি সাহেব গেট পেরিয়ে আমাদের পাশে চলে এলেন। তাঁর পেছনে রাজিব। হাতে একটা প্যাকেট।
আমি সালাম দিলাম।
টিচার, ডিআইজি সাহেব আমার সালামের জবাব নিয়ে বললেন “আমার ছেলে বার্ষিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েছে। কলেজিয়েট স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। সপ্তম থেকে অষ্টম পর্যন্ত তার রোল পঞ্চাশেও ছিল না। এক বছরের মধ্যে আপনি আমার অপদার্থ ছেলেটাকে হীরার টুকরো বানিয়ে দিয়েছেন।
আপনার ছেলে হীরা নয়, অ্যান্টিম্যাটার। এস্তেতিনের মতো দুর্লভ। প্রথম দিনেই আমি চিনে ফেলেছিলাম।
আমি জানি না কীভাবে এমন অবিশ্বাস্য পরিবর্তন সম্ভব হলো।
প্রশংসা আমার মনে অদ্ভুত এক আনন্দ বইয়ে দিল। আমি মাটির দিকে তাকিয়ে। মেসের সব সদস্যরা বাইরে এসে ডিআইজি সাহেবকে অভিবাদন জানিয়ে ঘিরে ধরেছে।
মেস ম্যানেজার প্রদীপ বলল, স্যার, ভিতরে আসুন ।
ডিআইজি সাহেব মেসে ঢুকে প্যাকেট খুলে একটা  ঘড়ি বের করলেন, ছোটো ভাই সুইজারল্যান্ড থেকে এনেছে। হাতে দিতে গিয়ে দেখলাম, আমার হাতের চেয়ে যোগ্য আর একটা হাত রয়ে গেছে। সে হাতটা খালি। তাই নিয়ে এলাম আপনার হাতে পরানোর জন্য। হাতটা দেন, আমি নিজেই পরিয়ে দেব।
বাম হাত এগিয়ে দিতে লজ্জা করছিল, ডান হাত এগিয়ে দিলাম।
ডিআইজি সাহেব বললেন, বাম হাত দেন। ছেলেরা বাম হাতেই পরে।
তাঁর কথার বিচ্ছুরণ আমাকে এমনভাবে ছুঁয়ে দিচ্ছিল আমি সম্মোহিতের মতো বাম হাতটা এগিয়ে দিলাম। তিনি আমার বাম হাতে ঘড়িটা পরিয়ে দিয়ে বললেন, এটি কোনো বস্তু নয়, ভালোবাসা।
আনন্দে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। এমনভাবে কেউ আমাকে কোনোদিন উপহার দেয়নি। স্বর্ণ মোড়ানো রাডো ঘড়িটার দাম তৎকালের অর্ধ লাখ টাকারও বেশি।
ওমর আবার পায়ে ধরে সালাম করে বলল, স্যার, আপনি আমাকে বদলে দিয়েছেন। আগের সবকিছু চুরমার করে দিয়েছেন। আপনি স্যার, আমার নষ্ট সত্তার নন্দিত ড্রেজার।
ওমরের মুখে প্রথম স্যার সম্বোধন, পুলকিত বিস্ময়ে বললাম, ওমর?
স্যার?
আমি তো টিচার!
আপনি আমার স্যার, আপনি আমার টিচার; আপনি আমার ড্রেজার।
আমি কখনো তোমার স্যার হব না, টিচার ডাকবে। ওই ডাক ওমর ছাড়া কাউকে মানায় না।
ওমর রাজিবের হাত থেকে গিফ্ট পেপার মোড়ানো প্যাকেটটা নিয়ে আমার হাতে তুলে দিয়ে আবার পা ছুঁয়ে সালাম করল, এটি আপনার।
কী?
আপনি প্রতিমাসে আমার কাছে যে টাকাগুলো জমা রাখতেন।
ওমরের আচরণ দেখে আমার চোখে সত্যি সত্যি জল এসে গেল। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চার মতো ডুকরে কেঁদে দিলাম। সেও কেঁদে দিল।
স্যার, আমাকে কিছু বলুন; কান্নার জলে জলে ওমর বলল।
কিছু বলতে পারলাম না। আমার লেখা একটা কবিতার দুটো লাইন মনে পড়ে গেল:
“স্বপ্ন যেখানে রুদ্রকঠিন, করাল ভীষণ অন্ধকার
প্রকৃতি সেখানে মৃন্ময় বিলাস ভালোবেসে একাকার।”
 ওমরের এমন আচরণে আবেগপ্রবণ হয়ে ডিআইজি সাহেবও আমাকে জড়িয়ে ধরলেন,  টিচার, ওমর আমাকে পাত্তা দিত না।
তাই তো দেখতাম, রাজিব বলল।
ড. মোহাম্মদ আমীন

এ পিচ্চি ছেলের কাছে আমি ছিলাম কেবল ডিআইজি। কোনোদিন ভাবিনি বাবা ডাক শুনব। আপনি তাকে জানোয়ার থেকে মানুষ করে দিয়েছেন। বলুন কী দিয়ে এমন অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন?

ভালোবাসা, শুধুই ভালোবাসা।
ডিআইজি সাহেব বললেন, আপনি আমার কাছ থেকে কী চান? গাড়ি-বাড়ি, টাকা, চাকুরি, বিদেশ গমন? যা চান তাই  দেব। বলুন কী চান?
ভালোবাসা, শুধুই ভালোবাসা।
ওমর বলল, সবার দেওয়া-নেওয়া হলো। টিচার আমাকে কিছু দেবেন না?
কী চাও?
ভালোবাসা এবং ভালোবাসা। একটা চুমো, অনেক গভীর আবেগে—
কাছে এসো।
ওমর মুখটা এগিয়ে দিল।মুখ নয়, যেন নিজেকেই এগিয়ে দিল। কানে কানে বিশাল শব্দে বলল,
In your hands, holding my hands
Future and fate, really true
It is all in you.
———————–
শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com
—————————————————-
——————————-
ওয়েব লিংক
—————————
অন্যান্য
error: Content is protected !!