তিনে দুয়ে দশ: ষষ্ঠদশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন
গণি কোম্পানির তিনতলা বাড়ি। আমাকে দোতলার একটা রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন, অনে বইয়ুন। সেলিমা আঁইয়ের।
আমি বসার কিছুক্ষণ পর একটা মেয়ে রুমে ঢুকল। ষোড়শী। ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পুরো রুমটা সুগন্ধে ভরে উঠল। আমি ভালোভাবে দেখে নেওয়ার আগেই বলে উঠল সে, আস্‌সালামু আলাইকুম, স্যার।
ড. মোহাম্মদ আমীন

ওয়া আলাইকুমুস সালাম।

স্যার, আমি সেলিমা।

চোখ তুললাম। সেলিমা শোভনমাখা মিষ্টি  হাসির এক টুকরো শ্রদ্ধালো  সুগন্ধের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে বলল, নিউটনের ছাত্রী।

কার ছাত্রী?
সেতারের হঠাৎ কুটুস শব্দের মতো কর্ণগ্রাহী হাসির একটা শব্দ রটিয়ে সেলিমা বলল, গণি ভাইয়া বলেন— আমি নিউটনের ছাত্রী। নিউটেন বলতে গিয়ে নিউটন বলে ফেলেন। তার বস্তা বস্তা টাকা, কিন্তু লেখাপড়া নেই। খুব মজা না স্যার?
বইপত্র নিয়ে এসো। শুরু করি।
সেলিমা ধীরপদে বের হয়ে গেল। শ্যামলারা সাধারণত মসৃণ চামড়ার অধিকারী হয়। কিন্তু সেলিমার চামড়া এত মসৃণ যে, স্পর্শের চেয়ে অধরা অনুধাবনই অনেক বেশি মাধুর্যের মনে হলো। ডিআইজির কথা মনে পড়ল। মানুষের আচরণটাই সবার আগে চোখে পড়ে।দুই মিনিটের মধ্যে এক গাদা বই নিয়ে সেলিমা আমার সামনে বসে পড়ল।
এখন কী পড়বে?
স্যার, আমাদের ফিজিক্সে আইনস্টাইন নামের এক ভদ্রলোকের কথা আছে। তিনি অনেক জ্ঞানী ছিলেন । উনি স্যার কখন জন্মগ্রহণ করেছেন?
জানি না।
১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মার্চ জার্মানির উলম নগরে জন্মগ্রহণ করেছেন।
নিউটন কখন জন্মগ্রহণ করেছেন?
জানি না।
১৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা জানুয়ারি
লিংকনশায়ারের উল্‌সথর্প ম্যানর নামক স্থানে। তিনি ট্রিনিটি কলেজ থেকে ১৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেছেন। তাঁর বিখ্যাত বইটার নাম কী জানি স্যার? কখন প্রকাশিত হয়েছিল, তাও মনে পড়ছে না। ১৬৮৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ক্যাম্ব্রিজের এমপি হয়েছিলেন।
বললাম, ‘ফিলসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা’, ১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল। এই বইয়ে তিনি মহাকর্ষ এবং গতির তিনটি সূত্র লিখেছেন।
আমি আপনাকে যে প্রশ্নগুলো করলাম, এগুলো কি স্যার পরীক্ষায় আসবে?
আসতেও পারে।
গত বছর স্যার আমরা একটা দেশে গিয়েছিলাম। অনেক দিন ছিলাম। ওই দেশের লোকদের লাল গাড়ির মালিক হওয়া নিষেধ। স্যার আমি কোন দেশে গিয়েছি বলেন তো?
বলতে পারব না। জন্ম থেকে আমি বাংলাদেশে।
চায়না গিয়েছিলাম। আপনি কি স্যার বমি খান?
তুমি খাও?
খাই।
কী!
মধু। পোকার বমি। আচ্ছা স্যার, বলুন তো, strut অর্থ কী?
অভিধান দেখে বলতে হবে। আমি লিখে নিয়েছি। আগামীকাল বলব।
আচ্ছা স্যার, এরিস্টটল কখন জন্মগ্রহণ করেছেন?
যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ৩৮৪ বছর আগে।
যিশুখ্রিষ্ট কখন জন্মগ্রহণ করেছেন?
এরিস্টটলের জন্মের ৩৮৪ বছর পরে।
ভূমাবাদী মানে কী?
পরমাত্মায় বিশ্বাসী।
শূর্পী অর্থ কী স্যার?
জানি না।
ছোটো কুলা। আমরা ছোটোবেলায় শূর্পী দিয়ে খেলতাম। আপনি স্যার অনেক কিছু জানেন না। এগুলো কী স্যার পরীক্ষায় আসবে?
আসতে পারে। পরীক্ষায় না এলেও জেনে রাখা উচিত। আমি পুলকিত হচ্ছি, তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারলাম। আরও জানতে পারলাম— আমি কত কম জানি।
লজ্জা লাগছে না, স্যার?
একটা জিনিস আমি জানতাম না, জানতে পারলাম, লজ্জার কী— এ তো আনন্দের বিষয়। আমি জানতে পেরেছি— আমি অনেক কম জানি। এর চেয়ে বড়ো জানা আর কিছু হতে পারে না। আমি ওমরের কাছেও অনেক কিছু শিখেছি।
জাবির ইবনে হাইয়ান, রসায়ন বিজ্ঞানের প্রথম জনক, তিনি স্যার কখন জন্মগ্রহণ করেছেন?
বছরটা মনে নেই। সম্ভবত অষ্টম শতকে।
৭২১ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের তুস নগরে।
এবার আমি তোমাকে প্রশ্ন করি? রাগে মনে মনে ফোঁস ফোঁস করে বললাম।
সাক্ষাৎকার আমি নিচ্ছি। আমি প্রশ্ন করব, আপনি উত্তর দেবেন। আমি কি স্যার ভুল বলেছি? আপনি স্যার অনেক কিছু জানেন না।
বললাম, একজন মানুষ সবকিছু জানে না।জানা সম্ভবও নয়। আমি যা জানি না, তা শিখে এসে তোমাকে জানাব। এটাই শিক্ষকতা। তুমি যা জানতে চেয়েছ এবং আমি যা বলতে পারিনি, লিখে নিয়েছি। আগামীকাল উত্তর দেব।
আমি যাই?
কোথায়?
আম্মুকে বলতে।
কী?
আপনার কাছে পড়ব।
মানে?
এতক্ষণ আমি আপনার ইন্টারভিউ নিচ্ছিলাম। আমাকে পড়ানোর যোগ্যতা আপনার আছে কি না।
পাস করলাম কই? ত্রিশটা প্রশ্ন করেছ। পাঁচটার উত্তরও তো দিতে পারিনি।

সেলিমা খুশি হয়ে বলল, আপনি একশতে একশ পেয়েছেন স্যার। প্রত্যেক টিচারকে আমি এভাবে প্রশ্ন করেছি। তারা সবাই ধমক দিয়ে বলেছেন—এসব পরীক্ষায় আসবে না। ক্লাসের বই বের করো। কেবল আপনিই বললেন— শিখে এসে শেখাব। তাই তাদের পত্রপাঠ

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

বিদায় করে দিয়েছি। আমি আম্মুকে ডেকে আনি। আম্মু বলবে— মাসে আটশ টাকার কথা। আপনি রাজি হবেন না। বলবেন—বারোশ টাকার নিচে হবে না। আমি কালো তবে মনটা ভালো।

মনে মনে ভাবলাম, আবার আরেক ওমরের পাল্লায় পড়লাম নাকি। জানি না কপালে কী আছে। হয়তো অতিরিক্ত চারশ টাকা চেয়ে বসবে। ওমর চোর হলে, এ মেয়ে ডাকাত হতে অসুবিধা কোথায়।
বললাম, যদি রাজি না হন?
তার বাপ রাজি হবে। আমি কোনো শিক্ষকের কাছে পড়তে রাজি হয়েছি—এটাই তাদের ভাগ্য।
কয়েক মিনিট পর সেলিমার মা এসে পর্দার ওপার থেকে বললেন, মাস্টর সাব, মাসে আটশ ট্যাঁয়া গরি দিয়ুম। মাইয়াওয়া পড়াইবান।
আমি বললাম, বারোশ টাকার নিচে হবে না।
সেলিমার মা বললেন, আইচ্ছা দিয়ুম। তই ওবা ভালা গরি পড়াইবান।
ঠিক আছে চাচি।
আঁর মাইয়া বওত গম। নিজর বইনর ডইল্যা পড়াইবেন দে।
আচ্ছা।
——————-
শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com
——————————-
ওয়েব লিংক
error: Content is protected !!