তিনে দুয়ে দশ: ষষ্ঠ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

তিনে দুয়ে দশ: ষষ্ঠ পর্ব

কয়েক বছর আগের কথা। ‘পূর্বকোণ’ পড়ছিলাম। এটি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত বহুল প্রচারিত একটি পত্রিকা। প্রথম পাতায় বিশাল আকারের এক বিজ্ঞাপন, ‘গৃহশিক্ষক আবশ্যক’।

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

ফৌজি ফ্লাওয়ার মিল-এর ডিজিএম সাহেবের ছেলেদের পড়াতে হবে, দুজন। আমি যেখানে থাকি সেখান থেকে মাত্র শখানেক গজ দক্ষিণে ফৌজি ফ্লাওয়ার মিল। বিজ্ঞাপনে হাজার দশেক টাকা বিল আসবে। আমি আগ্রহী হয়ে উঠি। একটা টিউশনি তখন খুব জরুরি ছিল।
যথাসময়ে যথাসম্ভব আকর্ষণীয়ভাবে সেজেগুজে হাজির হই ফৌজি ফ্লাওয়ার মিলে। ডিজিএম সাহেবের রুমে ইন্টারভিউ। মেডিক্যাল-ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছেলেরা পর্যন্ত লাইন দিয়েছে। কয়েকজন ছাত্রীও আছে। আমি ছাড়া সবাই প্রথম বিভাগ।
এখন কী হবে?
কৌশল বদলাতে হবে, ঝুঁকি না নিলে সুখী হওয়া যায় না। আমার প্রথম বিভাগ নেই, তাতে কী! কথাকে প্রথম বিভাগের বাবা বানিয়ে নেব। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ড. অনুপম সেন, ইংরেজি বিভাগের ড. এম হক এবং বাংলা বিভাগের ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ স্যার সাক্ষাৎকার বোর্ডের সদস্য। হাসি পেল।
মশা মারতে কামান,
আইলের উপর মোটরগাড়ি,
একটু করে থামান।
যথাসময়ে আমার ডাক পড়ল।
তিন প্রফেসরের মধ্যিখানে বসে আছেন ভাবী-ছাত্রের পিতা মাহবুবুল মান্নান চৌধুরী। টকটকে ফরসা চেহারার ভদ্রলোকের নিখুঁত শরীরে দামি পোশাক চকচক করছে মরীচিকার মতো। শীতাতপের হালকা হাওয়ায় চুলগুলো খুব ধীরে ধীরে নড়ছে। দেখলে বারবার সালাম দিতে ইচ্ছে করে।
অনুপম সেন বললেন, কাগজপত্রগুলো বের করো।
আমি বললাম, আমার কিছু শর্ত আছে। শর্ত মানলেই কেবল ইন্টারভিউ নিতে পারেন। নইলে চলে যাব। আপনাদের সময় নষ্ট করব না।
মাহবুবুল মান্নান সাহেব বললেন, বলুন।
আপনার ছেলে যতক্ষণ আমার কাছে পড়বে ততক্ষণ আমার তত্ত্বাবধানে থাকবে। হুটহাট ডাকা যাবে না। আমি বন্ধুর মতো হাসব, শিক্ষকের মতো বকব, প্রয়োজনে ডাকাতের মতো পেটাব। কিছু বলা যাবে না।
আর কোনো শর্ত? প্রশ্ন করলেন মাহবুবুল মান্নান চৌধুরী।
অনিবার্য কারণ ছাড়া টিচিং টাইমে ছেলেকে অন্য কোথাও পাঠানো যাবে না। বেড়াতে যাওয়ার প্রয়োজন হলে আগেভাগে বলতে হবে। যাতে বেড়ানোর ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার সুযোগ পাই। বেড়ানোর ক্ষতি পুষিয়ে দিতে না

ড. মোহাম্মদ আমীন

পারলে, বেড়ানোও বন্ধ। সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে, আমাকে নিয়োগ দিলে, ভালো লাগুক আর না লাগুক তিন মাস পড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। ওই সময় যদি মনে করেন, বেতন দেবেন না, তাতে আমার আপত্তি নেই। অন্য শিক্ষকও রাখতে পারেন। তবে কোনো অবস্থাতে তিন মাসের আগে আমাকে বিদায় করা যাবে না।
আর কোনো শর্ত?
না।
আলাউদ্দিন আল আজাদ বললেন, তুমি কী বাবা আমাদের ইন্টারভিউ নিলে, না কি আমরা তোমার ইন্টারভিউ নিলাম? কথা তো সব তুমিই বলেছ।
মাহবুবুল মান্নান সাহেব বললেন, যদি আপনার কোথাও চাকরি হয়ে যায়?
চলে যাব।
যদি অন্য কোনো টিউশনিতে আমাদের চেয়ে ভালো বেতন দেয়, তাহলে আমাদেরটা কি ছেড়ে দেবেন?
না।
মাহবুবুল মান্নান সাহেব প্রফেসরগণের সঙ্গে ফিসফিস করে কী যেন আলাপ করলেন। তারপর কলিংবেল টিপে পিয়নকে ডাকলেন। পিয়ন এলে বললেন, আমি গৃহশিক্ষক পেয়ে গেছি। সবাইকে চলে যেতে বলো।
আমার ঝুঁকি আমাকে সুখী করে দিল।
ছাত্র দুইজন। আকিদ কাদের চৌধুরী ও মুহিবুল কাদের চৌধুরী। উভয়ে ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র। আকিদ অষ্টম শ্রেণিতে মুহিবুল ষষ্ঠ শ্রেণিতে। দুজনেই বাবার মতো ফর্সা এবং নাদুসনুদুস।
আমার বেতন পনেরোশ টাকা, রীতিমতো অবিশ্বাস্য।
এ টিউশনিটা পাওয়ার পর ইউনিভার্সিটিতে আমি বড়োলোকের ছেলের মতো চলতে শুরু করি।

————————————————————————-

——————————————–
————————————————-
শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com

error: Content is protected !!