তিনে দুয়ে দশ: সপ্তম পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

তিনে দুয়ে দশ: সপ্তম পর্ব

ওমরের অবয়ব চায়নিজ কিশোরের মতো মায়াময়। গাঠনিকভাবে মোটাও না চিকনও না; বেতের মতো টানটান। দেখলে আদর করতে ইচ্ছে করে। ভীষণ ঘন চুলগুলো ছোটো করে ছাঁটা। বড়ো হলে মনে হয় এত ভালো লাগত না। হাঁটাচলায় তার রাজহংসের

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।
ড. মোহাম্মদ আমীন

গাম্ভীর্য। বুঝতে পারছি না, এমন একটা ছেলে কীভাবে এত বেয়াড়া হয়ে গেল।
প্রথম দিনের ধকলটা মনটাকে এখনও বিশ্রীভাবে দখল করে আছে। যেতে ইচ্ছে করছে না, তবু যেতে হবে। অপমানের উলটো পিঠে বসে থাকে প্রতিকার, তার পাশে সম্মান। আমাকে দেখতে হবে ওমরের এমন আচরণের কারণ। এই বেয়াড়া ছেলেটিকে বেয়ারা বানাতে হবে যে-কোনো মূল্যে।
ডিআইজি সাহেবের বাসভবনে ঢোকার সময় ফটকে পুলিশের পোশাক পরা এক ভদ্রলোক বলল, মাস্টার সাহেব, ছোটো স্যার বডি স্প্রে দিয়ে গেছেন। এদিকে আসুন, শরীরে একটু ভালোভাবে মেরে দিই। নইলে ছোটো স্যার বকবেন আমাদের।
আপনি কে?
আমি পুলিশ। পোশাক দেখে বুঝতে পারছেন না?
আমি ভেবেছিলাম পুলিশের পোশাক পরা কোনো মানুষ। ছোটো স্যার আমার জন্য দিয়েছে। আপনারা মেরে দিচ্ছেন না তো?
আমরা পুলিশের লোক। আপনার সন্দেহ অমূলক ভাবার কোনো কারণ নেই। তই একটা কথা আছে মাস্টর সাব।
কী কথা?
কাউয়ার মাংস কাউয় খায় না।
বুঝেছি।
কী বুঝেছেন?
আপনি কাউয়া, আপনার ছোটো স্যারও কাউয়া।
ড্রয়িং রুমে বসার কয়েক মিনিট পর কনস্টেবল জমির একটা রুমে নিয়ে গেল। তিনশ বর্গফুটের কম হবে না। চার দেওয়ালের পাশে চারটি বড়ো শেলফ। তাতে নানা ধরনের খেলনা। দেওয়ালে ঠাঙানো দামি ফ্রেমে নানাজনের অগণিত ছবি। অধিকাংশই বিদেশি নায়ক-নায়িকা আর গায়ক-গায়িকা। রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে খুঁজলাম, নেই। রিডিং টেবিলের রং পাকা পেঁপের বিচির মতো কালো, কিন্তু চকচক করছে তেলমখা চুলের মতো। বাংলাদেশি নয়, দেখলেই বোঝা যায়। বিছানাটা সাদা চাদরে ঢাকা। একটা চেয়ারে তিনটি তোয়ালেÑ দুটি হাতলে, একটি পিঠে। টেবিলের বিপরীতে আরও দুটি চেয়ার। এগুলোও বিদেশি।
তানজিমা ম্যাম এসে বললেন, এইটা ওমরের রুম। এখানেই তাকে পড়াবেন। দেখুন টিচার, ছেলেটা একটু বেশি কথা বলে। ছোটোবেলা থেকে আদর পেয়ে পেয়ে এমন হয়ে গেছে। আমাদের একমাত্র ছেলে।
ম্যাম আদর খুব ভালো জিনিস। তবে…
তবে কী?
আদরের মেমরি খুব শক্ত। একবার আদর পেলে বারবার পাওয়ার লোভ আসে। তাই আদর দেওয়ার আগে আদর ধারণ করে রাখার মতো উপযুক্ত আয়তনের পাত্রও দিতে হয়। যাতে আদররাশি যেখানে-সেখানে ছড়িয়ে না পড়ে। মিষ্টি যেমন-তেমন করে রাখা যায় না। পিঁপড়ে ধরে। ওমর আদর পেয়েছে, কিন্তু আদর রাখার উপযুক্ত পাত্র পায়নি। তাই একটু বেয়াড়া হয়ে গেছে। ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করবেন না। পাত্রটা বড়ো করে দিতে পারলেই হলো।
উপযুক্ত পাত্র কী?
আদরের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় শাসন। তার সঙ্গে ভালোবাসা। দেখুন ম্যাম, সন্তানের ক্ষেত্রে ভালোবাসা আর আদর কিন্তু এক নয়। একটি আবেগ, অন্যটি অভিজ্ঞান।
ভদ্রমহিলা ওমরের চেয়ারের পিছনে আর একটা তোয়ালে বিছাতে বিছাতে বললেন, তাহলে কি আদর আর দেব না?
এমন করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। এতদিন তার সব কথায় কান দিয়ে এসেছেন। সব আবদার শুনেছেন। এখন যদি না দেন তো সে আপনার কানই নষ্ট করে দেবে। সে এখন আদর ছাড়া কিছু বোঝে না। যদি পারেন আদর কমিয়ে ভালোবাসা দিতে চেষ্টা করেন। তাকে এমনভাবে শাসন করতে হবে যেন, শাসনটাও তার কাছে আদরণীয় হয়ে ওঠে।
আদর কি বেশি করছি?
একটা চেয়ারে চারটে তোয়ালে দিলেন, একটু বেশি হয়ে গেল না!
ওমর এখনও রুমে ঢোকেনি। সে স্কুল থেকে এসে খেতে বসেছে। গৃহকর্মী সাফিয়া নাশতা দিয়ে গেল। প্রচুর নাস্তা। বড়ো ঘরের নতুন জামাইকেও অত দেওয়া হয় না। তানজিমা ম্যাম কাপে চা ঢালতে ঢালতে বললেন, আপনি আমার ছেলের কথায় কিছু মনে করেননি তো?
মনে করলে কি আসতাম?
আমার ওমর ব্যতিক্রমী একজন। অনেক ব্রিলিয়ান্ট। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সে ছিল জেলার সেরা ছাত্র। যেখানে গিয়েছে সেখানে ফার্স্ট হয়েছে। গান-বাজনা, ড্রয়িং, খেলাধুলা সবকিছুতে ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এরপর কেন যে এমন হয়ে গেল। দোষ আমাদেরই।
তার সঙ্গে একদিন কথা বলেই বুঝতে পেরেছি।
কী বুঝেছেন?
ওমরের মধ্যে মানবতা আছে, আছে ভালেবাসার নিঃশব্দ পদচারণা। তবে বেশ অভিমানী। এটুকু যিনি ধরতে পারবেন, তিনি কখনো তাকে অবহেলা করতে পারবেন না।
কিন্তু তাকে যে কেউ সহ্যই করতে পারে না।
এমন হলো কীভাবে?
ওমরের পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। তানজিমা ম্যাম কথা ঘুরিয়ে দিয়ে বললেনÑ টিচার, নিজের সন্তানের মতো করে পড়াবেন।
নিজের সন্তান মানে? ওমর রুমে ঢুকতে ঢুকে তার মাকে তীক্ষè গলায় প্রশ্ন করল।
এটা কথার কথা।
কথা বলো, কথার কথা কখনো বলো না। ডিসগাস্টিং।
এ কেমন কথা?
আমার বাবা আছে, আবার আর একজনকে বাবার মতো বলছ কেন? মাম, তোমার এমন আদিখ্যেতাপনা আমার একদম ভালো

পুথিনিলয়, বাংলাবাজার।

লাগে না। তুমি এখন যাও। আমি পড়াব। অসহ্য!
আমি থাকলে অসুবিধা কী?
পড়ার সময় এসো, এখন আমি টিচারকে পড়াব।
একটু দেখি, তুমি কীভাবে পড়াও।
তুশি থাকলে ঘ্যানঘ্যান করবে শুধু। তোমাদের জন্মই হয়েছ এজন্য, কিছুক্ষণ আমার সঙ্গে, কিছুক্ষণ ডিআইজি সাহেবের সঙ্গে, কিছুক্ষণ কাজের লোকদের সঙ্গে; যাও তো মাম।
তানজিমা ম্যাম ওমরকে চার-তোয়ালেওয়ালা চেয়ারটায় বসিয়ে দিয়ে প্রবল অনিচ্ছা নিয়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন।
ওমর বলল, এক আপদ গেল, আর এক আপদ সামনে। অসহ্য।


error: Content is protected !!