তুরস্ক (Turkey) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

তুরস্ক (Turkey)

তার্কি বা তুর্কি শব্দের অর্থ ল্যান্ড অব তুর্কস। ল্যাটিন টার্কিয়া (Turcia) এবং আরবি তার্কি-ই (Turkiyye) শব্দের উৎপত্তি। এটি একটি নৃতাত্ত্বিক

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

জনগোষ্ঠীর নাম। এ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী যে এলাকায় বসবাস করত সে এলাকাটি তার্কি বা তুর্কি নামে পরিচিতি পায়। তুর্ক (Türk) শব্দের অর্থ সৃষ্ট (created)। ঈশ্বর তুর্কি জাতিকে পরম যত্নে শ্রেষ্ঠ করে সৃষ্টি করেছেন। আর তারা আরও পরম যত্নে যে ভূখণ্ডটি সৃষ্টি করেছে সেটিই তার্কি বা তুরস্ক।

তুরস্কের মোট আয়তন ৭,৮৩,৫৬২ বর্গ কিলোমিটার বা ৩,০২,৫৩৫ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ১.৩%। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, মোট জনসংখা ৭,৭৬,৯৫,৯০৪ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১০১। আয়তন বিবেচনায় তুরস্ক পৃথিবীর ৩৭-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায়  ১৮-তম। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ১০৭-তম জনবহুল দেশ। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, তুরস্কের জিডিপি (পিপিপি) ১.৫০৮ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার (১৭-তম) এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ১৯,৬১০ ইউএস ডলার (৬১-তম)। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ৮০৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার (১৮-তম) এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ১০,৪৮২০ ইউএস ডলার (৬৬-তম)। তুরস্কের মুদ্রার নাম লিরা। রাজধানী আঙ্কারা।

তুরস্কের সরকারি নাম প্রজাতন্ত্রী তুরস্ক। এটি পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। তুরস্কের প্রায় পুরোটাই এশীয় অংশে, পর্বতময় আনাতোলিয়া বা এশিয়া মাইনর উপদ্বীপে পড়েছে। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা আনাতোলিয়াতেই অবস্থিত। তুরস্কের বাকি অংশের নাম পূর্ব বা তুর্কীয় থ্রাস এবং এটি ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় অবস্থিত। এই অঞ্চলটি উর্বর উঁচু নিচু টিলাপাহাড় নিয়ে গঠিত। এখানে তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইস্তানবুল অবস্থিত। সামরিক কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জলপথ এশীয় ও ইউরোপীয় তুরস্ককে পৃথক করেছে — মার্মারা সাগর, এবং বসফরাস প্রণালী ও দার্দানেল প্রণালী। এই

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

তিনটি জলপথ একত্রে কৃষ্ণ সাগর থেকে এজীয় সাগরে যাবার একমাত্র পথ তৈরি করেছে। তুরস্ক পৃথিবীর ঠিক মধ্যখানে অবস্থিত। কামাল আতাতুর্ক বিমান বন্দরে গিয়ে বিভিন্ন দেশের দূরত্ব হিসাব করলে এটি বুঝা যায়।

তুরস্ক মোটামুটি চতুর্ভুজাকৃতির। এর পশ্চিমে এজীয় সাগর ও গ্রিস; উত্তর-পূর্বে জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও স্বায়ত্বশাসিত আজারবাইজানি প্রজাতন্ত্র নাখচিভান; পূর্বে ইরান; দক্ষিণে ইরাক, সিরিয়া ও ভূমধ্যসাগর।

তুরস্ক পৃথিবীর ঠিক মধ্যখানে অবস্থিত। কামাল আতাতুর্ক বিমান বন্দরে গিয়ে বিভিন্ন দেশের দূরত্ব হিসাব করলে এটি বুঝা যায়। ইস্তানবুল পৃথিবীর একমাত্র শহর, যা দুটি মহাদেশব্যাপী বিস্তৃত। ইস্তানবুলের গ্র্যান্ড বাজারে ৬৪টি রাস্তা, ৪০০০ দোকান ও ২৫ হাজার কর্মী রয়েছে। আয়তন ৩৩,০০০ বর্গফুট পৃথিবীর প্রাচীন মল ও বৃহত্তম মলের অন্যতম।১৪৫৫ খ্রিষ্টাব্দে  প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে  ৯১ মিলিয়ন লোক এখান থেকে বাজার করে। তুরস্কের অ্যান্টিওকে মনুষ্য-তৈরি প্রথম খ্রিস্টান চার্চ নির্মিত হয়। নুহের নৌকার শেষ খাবারে গৃহীত পুডিঙের মিষ্টি এবং অম্লস¦াদ এখনও তুরস্কেওর প্রায় সবখানে পাওয়া যায়। ১৫০৩ খ্রিষ্টাব্দে  লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি বসফরাস এর উপর একটা সেতু নির্মাণের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। যা নির্মিত হয়েছে।

প্রশাসনিক সুবিধার্থে তুরস্ককে ৮১টি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়েছে। সব বিভাগ আবার সাতটি অঞ্চলে বিভক্ত। তবে এই সাতটি অঞ্চল কোনো প্রশাসনিক

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

বিভাজন নয়। প্রতিটি প্রদেশ কয়েকটি জেলায় বিভক্ত। তুরস্কে মোট জেলা আছে ৯২৩টি। প্রতিটি প্রদেশের নাম সেই প্রদেশের রাজধানীর নাম। আর প্রতিটি প্রাদেশিক রাজধানী সংশ্লিষ্ট প্রদেশের কেন্দ্রীয় জেলা। সবচেয়ে বড় শহর ইস্তাাম্বুল। তুর্কি জনগণের প্রায় ৭০.৫০ শতাংশ লোক শহরে বসবাস করে।

তুর্কি ভাষা তুরস্কের সরকারী ভাষা। এখানকার প্রায় ৯০% লোক তুর্কি ভাষায় কথা বলেন। এছাড়াও এখানে আরও প্রায় ৩০টি ভাষা প্রচলিত। এদের মধ্যে আদিগে,আরবি, আর্মেনীয়, আজারবাইজানি, জর্জীয়া, কুর্দি (প্রায় ৪০ লক্ষ বক্তা), এবং রোমানি উল্লেখযোগ্য।

তুরস্ক বিশ্বের ৮০% হ্যাজেলনাট একই রপ্তানি করে। তুরস্ক প্রথমে ইউরোপে কফির প্রচলন করে। তুরস্ক তাদের বিখ্যাত টিউলিপ ফুল ডাচদের সরবরাহ করে। ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত ৯০০০ প্রজাতির পাখির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। তন্মধ্যে ৪৫৩ প্রজাতির পাখি এক ইস্তানবুলেই পাওয়া যায়। তুরস্কে প্রায় ৯০০০ প্রজাতির ফুল পাওয়া যায়। তন্মধ্যে ৩০০০ একান্তভাবে স্থানীয়। অন্যদিকে পুরো ইউরোপে পাওয়া যায় মাত্র ১১,৫০০ প্রজাতির ফুল। এ পরিসংখ্যান থেকে আনাতোলিয়ার উদ্ভিদকুল ও প্রাণীকুলের সমৃদ্ধি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।

তুরস্কের প্যাটারায় (Patara) সেন্ট নিকোলাস জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সান্তাক্লুজ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তুরস্কের অন্তর্গত  ভূমধ্যসাগরের নিকটবর্তী আন্তালিয়া অঞ্চলে ডেমের এর বিশপ ছিলেন। ইপিসাস (Ephesus) এর নিকটবর্তী কোনো এক স্থানে কুমারি মেরি বসবাস করতেন। সেন্ট পল (Saint Paul) তুরস্কের তার্সাসে জন্মগ্রহণ করেছেন। শুধু তাই নয়, বিখ্যাত নবি ইব্রাহিম (Abraham) সানলুফিরায় জন্মগ্রহণ করেন। মহাপ্লাবনের পর নুহ নবি

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

(Noah) পূর্ব তুরস্কের মাউন্ট আরারাতের (Mount Ararat) দিকে নৌকা পরিচালনা করেছিলেন এবং সে পবতে তিনি অবতরন করেছিলেন।

সম্ভবত ইস্তানবুল ইউরোপের বৃহত্তম শহর। তবে এর কিছু অংশ এশিয়ায় পড়েছে। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের তুরস্ক আন্ডার গ্রাউন্ড রেলওয়ের জন্য বিখ্যাত। লন্ডনের পর এটি বিশ্বের দ্বিতীয় আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ে। ইতিহাসবেত্তাদের ধারণা, ১১,০০০ বছর আগে তুরস্কে প্রথম কৃষিকাজের সূচনা হয়েছিল। উত্তর-মধ্য তুরস্কের চাটালহ্যাইকসহ আর নানা জায়গায় অতিপ্রাচীনকালে অধিবাসীরা পরিকল্পিত চাষাবাদ গড়ে তোলে এবং পরবর্তী চাষাবাদের জন্য বীজসংগ্রহ কৌশলের সূচনা ঘটায়। তখন থেকে এখনও এতদঞ্চল বিভিন্ন শস্যের জন্য বিখ্যাত।

তুরস্কের ৯৯ ভাগ লোক মুসলিম কিন্তু প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ খ্রিস্টান এখানে ধর্মীয় পবিত্রস্থান পরিদর্শনের জন্য তীর্থযাত্রী হিসাবে আগমন করেন। পৃথিবীর ৩০০ মিলিয়ন অথডোক্স খ্রিস্টানের জগদ্বিখ্যাত কুলপতি, আধ্যাত্মিক সেন্ট, ধর্মীয় নেতা প্রমূখ বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের ছোট্ট একটি কোণে অবিস্থত ইস্তানবুলে বসবাস করতেন।

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

যিশুখ্রিস্টের বারোজন শিষ্যের অন্যতম পিটার (Apostle Peter) দ্বারা অ্যান্তিওখা অঞ্চলে নির্মিত  সেন্ট পিটার চার্চ খ্রিস্টানদের ধর্মীয় প্রার্থনা করার জন্য নির্মিত প্রথম চার্চ। প্রথম শতকে নির্মিত সার্বভৌম কর্তৃত্বপূর্ণ গির্জা (patriarchal church)বর্তমান ইস্তানবুলের অখ্যাত জেলা ফিন্ডিকলির (Fındıklı) মাটির নিচে অবস্থিত বলে মনে করা হয়। ইস্তানবুল হাগিয়া সোফিয়া ক্যাথেড্রালের (Hagia Sophia cathedral) জন্যও বিখ্যাত। বর্তমানে এটি মিউজিয়াম হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১,৭০০ বছর আগে স্থাপিত আর্মেনিয়ান অ্যাপসোলিক চার্চটিও বর্তমান কাইসেরি (Kayseri) অঞ্চলে অবস্থিত।

কিংবদন্তির ট্রোজান যুদ্ধ পশ্চিম তুরস্কে সংঘটিত হয়েছিল। তুরস্কের চাটালহোইউক (Catalhoyuk) এলাকায় খ্রিস্টজন্মের ৭ মিলিয়ন বছর আগেকার মনুষ্যবসতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। প্রাচীনকালের সাত সপ্তাচার্যের দু্িট তুরস্কের এপিসাস (Ephesus) ও হ্যালিকার্নাসাস (Halicarnasus) এলাকায় ছিল।

তুরস্কের আনাতোলিয়া কিংবদন্তির মহাকবি হোমার, কিং মিডার, হেরিডোটাস এবং সেন্ট পলের জন্মস্থান হিসাবে খ্যাত। জুলিয়াস সিজার কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের শাসক বিখ্যাত সম্রাট পুনস্টাকে (Pontus) পরাজিত করে তুরস্ক দখল করার পর তুরস্কের মাটিতে  বিখ্যাত উক্তি “Veni, Vidi, Vici (I came, I saw, I conquered”  উচ্চারণ করেছিলেন। কুমারি মেরিকে উৎসর্গ করে নির্মিত প্রথম চার্চ ইফিসাসে অবস্থিত (Ephesus)।এ পর্যন্ত জ্ঞান ইতিহাসের প্রাচীন চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব  ১২৭৫ অব্দে  হিটিটি (Hittite) সাম্রাজ্য ও মিশরীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে।

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন  তৃতীয় হাটুসিলিস (Hattusilis III) ও দ্বিতীয় রামেসেস (Ramses II)। তুরস্কের কাদেশ (কধফবংয) অঞ্চলে এ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। এ জন্য এর নাম ছিল কাদেশ-চুক্তি। আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট আঙ্কারার নিকটবর্তী স্থানে কঠিন গেরো গিঁট (Gordian knot) খুলেছিলেন। তার্কিস কম্বল তৈরির জন্য যে কঠিন গেরো দেওয়া হয় তাকে গোর্ডিয়ান গিঁট বলা হয়।

তুরস্কের জাতীয় পতাকাকে বায়রাক বা লাল পতাকা। বর্তমান পতাকাটি সরাসরি অটোমান সাম্রাজ্যের পতাকা হতে অবিকল গ্রহণ করা হয়। ১৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে  পতাকাটি গৃহীত হয়।


স্লোভাকিয়া (Slovakia) : ইতিহাস ও নামকরণ

স্লোভেনিয়া (Slovenia) : ইতিহাস ও নামকরণ

স্পেন (Spain) : ইতিহাস ও নামকরণ

সুইডেন (Sweden) : ইতিহাস ও নামকরণ

সুইজারল্যান্ড (Switzerland) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

All Link

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

Knowledge Link

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

 

error: Content is protected !!